মা যে আমার সবার সেরা, অনন্তকাল অবিরত!!!

প্রকাশের সময় : 2018-07-13 12:15:45 | প্রকাশক : Admin মা যে আমার সবার সেরা, অনন্তকাল অবিরত!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমার শোনিমকে “বাচ্চা শোনিম” বা “ছোট্ট শোনিম” বলার দিন শেষ। দিনে দিনে ও বড় হচ্ছে। বয়সে এবং গায়েগতরে বড় হচ্ছে। বেশ বড় বড় ভাবও দেখায়। কেবল লম্বাচুড়ায় নয়; কথাবার্তা, চালচলনেও ভাব দেখায়। তবে বড় হিসেবে ভাবসাবের যত হাম্বিতাম্বি সব দিনের আলোতেই। রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে ভাব দেখানো কমতে থাকে। কমতে কমতে একেবারে শুন্যের কোঠায় নেমে আসে ঘুমুবার সময়ে। তখন  সে আর বড় থাকে না। দিনে দেখানো সব বড়মানুষী ভাবসাব খাম্বি খেয়ে নেতিয়ে পড়ে। ঘুমুবার সময়ে বিছানায় তার মাকে চাইই চাই। পৃথিবীর সব ভুলে মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ খেলা না করে ঘুমুতে পারে না শোনিম।

কেবল আমার শোনিম নয়, কারো শোনিমই পারেনা। মাকে ছাড়া কোন শোনিমই বড় হতে পারে না। আমিও বড় হয়েছি আমার মাকে নিয়েই। সারাদিন যেমন তেমন, সন্ধ্যের পর মাকে লাগবেই। সারা বিকেল বাইরে খেলা করে মাগরিবের আজানের পরপর ঘরে ফিরে গোধূলীলগ্নের আলোছায়ায় মাকে হন্যে হয়ে খুঁজতাম। এঘর ওঘর খুঁজে  কোথায়ও পেলে শান্তি; জনম জনমের শান্তি। না পেলে চাপাকান্নায় মা মা বলে ডাকতাম। হয়ত মা পাশের বাড়ীতে গেছেন, এই তো এখনই ফিরবেন; তবুও মেনে নিতে পারতাম না। কান্না চলতেই থাকতো।

অবস্থাটা এমন যে, ঘরে মা নেই তো কিচ্ছু নেই। চোখভর্তি জল ছাড়া কিচ্ছু নেই। মাকে ঘরে না পেলে চোখ ভরে ভরা বর্ষার জল নামতো। চারদিক মনে হত আফছা অন্ধকার। নিজের হাতে হারিকেনের চিমনি মুছে পরিষ্কার করে সন্ধ্যাবাতি জ্বালালেও ঘর অন্ধকার অন্ধকার লাগতো। ঘরে মা থাকলে আলো লাগতো না। মা নিজেই আলো। পূর্ণিমার ঝলমলে আলো! চাঁদের মত দেখতে মায়ের মুখভর্তি আলো, আর আঁচলতলায় ঘ্রাণ। সে কী ঘ্রাণ! সেই স্পেশাল ঘ্রাণের আঁচলে জড়িয়ে অন্ধকারে বসে থাকলেও রাজ্যের শান্তি। শান্তি আর শান্তি!

বেশী শান্তি মাঘ মাসের রাতে জড়াজড়ি করে একসাথে ঘুমুতে। ছোট বেলায় গ্রামের ঘরে কণকণে শীতের বন্যা হতো। ঘর ভাঙা ছিল না, তবে টিনের ঘরে জানালা দরজার ফাঁক গলে সহজেই শীত ঢুকে পড়তো। আমরা রাত ন’টার মাঝেই খেয়েদেয়ে বিছানায় যেতাম। বিছানায় যেতাম শুয়ে শুয়ে রেডিওতে ‘উত্তরণ’ নামের প্রোগ্রাম শোনার জন্যে। মা বিছানায় আসতো আরো পরে। সব গোছগাছ শেষে বিছানায় আসতো। দিনের বেলায় রোদে ছড়ানো ঝরঝরে গরম লেপের নীচে মাকে পেয়েই জড়িয়ে ধরে তার শাড়ী এবং শরীরের ঘ্রাণ নিতাম। পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতাম। 

মায়ের কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক ছিল। কোন সমস্যা ছিল না। সমস্যা হতো পরে। দুচোখ বুঁজে ঘুমিয়ে যাবার পরে ভেজালটা লাগতো। ঘন্টা দু’য়েক ঘুমের পরে মূল সমস্যার উৎপত্তি হতো। আম্মার কড়া নির্দেশে ঘুমুতে যাবার আগে বাথরুম করতাম। বাইরে গিয়ে বাথরুম সেরে বিছানায় এলেও কাজ হতো না। রাত বারোটার আগেই ঘুমের ঘোরে একদফা বিছানায় করে ফেলতাম। প্রথমে নিজের হাফপ্যান্ট, পরে বিছানা; শেষমেষ মায়ের গায়ের শাড়ী। সব ভিজিয়ে একাকার করে ফেলতাম।

গা ভেজা টের পেলে মায়ের ঘুম ভাঙতো। লাফিয়ে উঠে আমাকে ঠেলে সরিয়ে নিজ হাতে ঠুসঠাস দু’ঘা পিঠে বসিয়ে দিতেন। আবার একই হাতে সব পরিষ্কারও করতেন। শীতের রাতে লেপ ভিজে গেলে কী যে দুরাবস্থা হয়, তা ভুক্তভোগীরাই জানে। আমি ভেজা লেপের পাশে চুপ করে বসে চোখ পিটপিট করে চোরের মত এদিক ওদিক তাকাতাম। মা বকবক করতেন আর টেনেটুনে আমার প্যান্ট পালটে দিতেন। ভেজা তোষকের উপর ছোট্ট কাঁথা বিছিয়ে আবার ঘুম পাড়াতেন। শরম লজ্জার মাথা খেয়ে এই আমি ঘুমাতাম। মায়ের কোলের মধ্যে ঢুকে গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়তাম। দ্বিতীয় দফা ভেজাবার আগ পর্যন্ত শান্তি মতই ঘুমাতাম।

মা আমার শান্তির প্রতিক। মহা শান্তির। একবার কায়দা মত একটা কাজ না করতে পারার জন্যে খুবই অশান্তিতে ছিলাম। কাজ তেমন কিছু না। মাথায় কুবুদ্ধি চেপেছে। ঘরের ধান চুরি করে বাজারে বিক্রি করবো। ফুরসত পাচ্ছিলাম না। চোখের সামনে ধান আর ধান। নতুন ধানের গন্ধে সারা বাড়ী মৌ মৌ করছে। উঠান ভর্তি ধান উঠেছে। বৈশাখী বোরো ধান। মা লোকজন নিয়ে মহাব্যস্ত ধান সিদ্ধ করা আর মুড়ি বানাবার কাজে। অথচ আমি সুযোগ পাচ্ছি না।

উঠোন কোণে সারি সারি মাটির পাতিলে বালি গরম করে মুড়ি ভাজার কাজ চলছে। মা নিজেই ভাজছেন। মায়ের আত্মবিশ্বাস, এই কাজে তার হাত খুব পাকা। মুড়ি খুব গোটাগোটা বড় সাইজের হয়। আমার মুড়িতে মন নেই। মন খুবই ছটফট করছে বাজারে যাবার জন্যে। শনি-মঙ্গলবারের হাটের বাজার। দূপুর দূপুর না গেলে হাটও শেষ; আশাও শেষ। শরীর খারাপের বাহানায় আজ  স্কুলেও যাইনি। মায়ের পাশে ঘুরে ঘুরে ঘেনর ঘেনর করতে লাগলাম।

অবশেষে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে মা সের পাঁচেক ধান বেচার অনুমতি দিলেন। সাথে শর্ত দিলেন আব্বাকে না জানাতে। পাঁচ সের মানে পাঁচ কেজির কাছাকাছি। বিশাল পাওয়া। আবার শর্তও খুব সহজ। খুশীতে গদগদ হয়ে একলাফে উঠোন কোণে স্তুপ হয়ে পড়ে থাকা ধান থেকে নিজ হাতে প্রথমে পাঁচ সের মাপলাম। পরে এদিক ওদিক তাকিয়ে অতিরিক্ত আরো পাঁচ সের মেপে চুপচাপ ছালায় ভরে নিলাম। এমনভাবে নিলাম যেন মা তো ভাল, আশেপাশের কাকপক্ষীও না বোঝে। তবে আমি ভালভাবেই বুঝলাম। মাত্র তের বছর বয়সে দশ সের ধান মাথায় করে দেড় মাইল পথ হেঁটে হাটে পৌঁছতে পৌঁছতে আমার ঘাড়ও শেষ; জানও শেষ।

আমি মায়ের জান! মায়ের কাছে কিছু চাইলে পারতপক্ষে কোনদিনও না করেনি! প্রথমে একআধটু গাইগুই করলেও শেষমেষ ঠিকই দিয়ে দিতেন। নিজের গাটে টাকা আছে, অথচ আমাকে বের করে দেননি, এমনটি ঘটেনি কোনকালে। একটা সময় আমাদেরকে খুব হিসেব করে চলতে হতো। আব্বা বেশ হিমশিম খেয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কোনভাবে মাস পার করতেই খুব কষ্ট হয়। মাসের শেষে হাতে কিছু থাকতো না বললেই চলে। এরমাঝেও কখনো সংসারের খরচ এদিক ওদিক করে বাঁচিয়ে হয়ত সামান্য কিছু জমিয়ে হাতে রেখেছেন মা; বিশেষ কোন কাজে খরচ করবেন এই কারণে।

সেটুকুও দিয়ে দিতেন যদি আমি চাইতাম মায়ের কাছে। খুব হাসিমুখেই দিতেন। এমনভাবে দিতেন যেন আমার জন্যেই জমিয়ে রেখেছেন। কোনভাবেই নিজের কষ্টের কথা বুঝতে দিতেন না। দেবার সময় টেনে বুকের কাছে নিয়ে আদর করতেন। পাইপাই করে জমানো অতি কষ্টের টাকাও দিতেন সদা হাস্যোজ্বল মুখে। লুকিয়ে রাখতেন সকল দুঃখ। আমাকে না বললেও বুঝতাম, সাংঘাতিক ভরসা আর বিশ্বাস করতেন আমাকে; বিশ্বাস করতেন, একদিন বড় হয়ে আমি তার সকল দুঃখ ঘুচিয়ে দেবো। চোখ ঝলমল হাসিমাখা মুখেই বিশ্বাস করতেন। 

সাত বছর আগে জুলাইয়ের উনিশে মাকে হারিয়ে আমি আজো তাঁর সেই হাসিমাখা মুখখানি খুঁজে বেড়াই। মাকে খুঁজে বেড়াই ঘরে ঝুলানো মায়ের ছবিতে, মায়ের হাজারো স্মৃতিতে। খুঁজে বেড়াই আমার শোনিমের মুখাবয়বে, শোনিমের গায়ের গন্ধে। আমি এখনো অনুভব করি, রাতজাগা মা আমার সারা ঘরময় হেঁটে বেড়ান। পড়ার ঘরে উঁকি দিয়ে আমার খবর জানতে চান। এখনো বিশ্বাস করি, মা আমার চলে যাননি! মা চলে যেতে পারেন না!

অমন হাসিমাখা সুন্দর মুখটি আমাকে ফেলে কেমন করে যাবেন! বৃষ্টিভেজা মাটিতে শেষবারের মত শুইয়ে দেবার সময়ও দেখেছি মা আমার হাসছেন। গভীর ঘুমে নিমজ্জিত মা আমার ঘুম চোখেই হাসছেন। এখনও কবর ধারে গেলেই মনে হয়, মা দেখছেন আমায়। সালাম দেবার পরে দিব্বি শুনতে পাই, সেই হাসিমাখা চোখে, হাসিমাখা মুখেই তিনি জবাব দিচ্ছেন। সারা পৃথিবী তন্ন তন্ন করে খুঁজেও যে মুখ আমি কোথাও পাইনা! জ্যোৎস্নার ভরা চাঁদেও পাই না। অগত্যা এদিক ওদিক করে জল ছলছল চোখে আমি বিড়বিড় করি। বিড়বিড় করেই চাঁদকে বলি, তুমি সুন্দর নও; গোলাপকে বলি, তুমি মিষ্টি নও; আমার মায়ের মত!! মা যে আমার সবার সেরা, অনন্তকাল অবিরত!!!      

 

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
সম্পাদকঃ তারেক মিন্টু,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা।

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ নিউ সার্কুলার রোড,
মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও বাড়ি-৬৩, রাস্তা-১৩,
সেক্টর-১৩, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com