হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৫ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-07-25 18:59:18 | প্রকাশক : Administrator
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৫ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বাসায় বিশেষ কিছু রান্না হলে, বা বাইরে থেকে কিছু আনা হলে কিছু না কিছু আমার জন্যে রাখতেন মা আমার। আমি বাইরে আছি বিধায় আমার জন্যে রেখে দিতেন। নিজে একটুও মুখে নিতেন না। সব রেখে দিতেন; কাউকে দিতেন না। আমি এলে সব বের করতেন। উঠতে বসতে আমার মুখে নিজ হাতে পুরে দিতেন! আজকাল মাঝে মধ্যে আমার শোনিমের মুখে খাবার তুলে দেবার সময় মায়ের কথা খুব মনে হয়। সব বাবামায়েরাই সন্তানের মুখে এভাবে খাবার পুরে দেন। কিন্তু সব সন্তানেরা দেয় না। দিতে পারে না!

আমিও দিতে পারিনি। ডাক্তার বারণ করাতেই দিতে পারিনি। বড় হয়ে আমি মাকে মিষ্টি খেতে দিতাম না; আমি খেতে বারণ করতাম। কী করবো! খেলেই প্রেসার বেড়ে যায়। যা কিছু ডাক্তার মানা করতো, মা সে সবই বেশী খেতে চাইতেন। পাগলের মত খেতে চাইতেন, লুকিয়ে রেখেও সামাল দেয়া যেত না। গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে মা একা একা বের করে খেতেন।

শেষমেষ বাসায় এসব নিষিদ্ধ করলাম। তারপরেও রক্ষে হলো না। একদিন দূপুরে খাবার টেবিলে বসে হঠাৎ করে ব্রেইনষ্ট্রোক হয়ে মা নিথর হয়ে পড়েন। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়। সব চেষ্টাই করলাম। কিন্তু মাকে পূরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারলাম না। পূরোপুরি প্যারালাইজড হয়ে গেলেন। কথা বন্ধ হয়ে গেল চিরতরে। বেঁচে রইলেন বটে, তবে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে একটানা ৩২টি মাস!

আমি কখনোই গান পাগল মানুষ ছিলাম না। আবার গান আমার পছন্দ নয়, সেটাও না। গান আমার পছন্দ এবং পছন্দের গানের সংখ্যাও মোটামুটি কম নয়। সুর ভাল হলে গান মনে লেগে যায়। মনের মধ্যে ঘোরপাক খায়। শুনলে শুনতেই ইচ্ছে করে। কিন্তু তাই বলে নিজ থেকে গান বাজিয়ে শোনা হয় না। আলসে মানুষদের এই এক সমস্যা। নিজ থেকে কিছু করি না; করার চেষ্টাও করিনা। কেউ দয়া করে বাজালে কান পেতে শুনি। মন লাগিয়ে শুনি।

মন লাগিয়ে শোনা গানের মাঝে মাকে নিয়ে প্রায় সব গানই আমার প্রিয়। অসম্ভব প্রিয়। গানগুলো জনপ্রিয়তায় যেমনি তুঙ্গে, গুণগত মানেও অতি উচ্চ আসনে অবস্থিত। যারা লিখেছেন বা সুর দিয়েছেন, মনের মাধুরী মিশিয়ে খুব দরদ দিয়েই করেছেন। তাই যখনই যেটা শুনি, প্রাণ জুড়িয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে মন দিয়ে শুনলে মাকে অনুভব করা যায়। গভীর ভাবে অনুভব করা যায়। সব কিছু ছাপিয়ে মা এসে মনের আঙিনায় নোঙর ফেলে।

এমনি নোঙর ফেলা মধুর একটি গান; অনেক অনেক ভাল গানের মাঝে সেরা গান। মধুর আমার মায়ের হাসি, চাঁদের মুখে ঝরে; মাকে মনে পড়ে আমার, মাকে মনে পড়ে! পরের লাইনগুলো আরো হৃদয়স্পর্শী। সে যে জড়িয়ে আছে, ছড়িয়ে আছে সন্ধ্যা রাতের তারায়! সেই যে আমার মা! বিশ্ব ভুবন মাঝে তাহার নেইকো তুলনা! গানের প্রতিটি কথায় হৃদয় এবং মন দুটোই ছুঁয়ে যায়। কেবল ছুঁয়ে যাওয়া নয়, চোখের কোনায় জল চিকচিক করে ওঠে। আমার ধারণা, কেবল আমার নয়; সব মা হারাদেরই করে।

আমার মা নিজেও মা হারা হয়েছেন। অবস্থা খুবই ভয়াবহ। মা নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিলেন। অন্তত সপ্তাহ খানেক কেউ তাঁর মুখে জোর করেও কিছু দিতে পারেনি। খানিকক্ষণ থেমে থেমে কেবল গগনবিদারী চিৎকার করে কান্না আর কান্না। কান্না বেশী করতেন রাতের গভীরে। কিছুক্ষণ চিৎকার করে আবার কিছুক্ষণ বিড়বিড় করে কান্না। কেউই থামাতে পারছে না। বলা যায় এক রকমের পাগল হয়ে গেলেন। প্রলাপ বকা শুরু করলেন। গর্ভধারীনি মাকে চিরতরে হারাবার বিষয়টি তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না।

কিন্তু এই তিনিই যে একদিন হারিয়ে যাবেন, আমাকে মা হারা করবেন; তা বুঝতে পারিনি তখন। মা হারা হবার বিষয়টি বোঝার বয়সও হয়নি আমার। একদিন বয়স হলো, জাগতিক নিয়মে আমিও মা হারা হলাম! কিন্তু মায়ের জন্যে মায়ের মত করে পাগলামো করতে পারলাম না। এসবে যোগ্যতা লাগে। পাগলামোর যোগ্যতা না থাকলেও বোঝার যোগ্যতা ছিল; আমি বুঝেছিলাম, আমার সব শেষ। আমাকে নির্ভেজাল ভাবে বিনাস্বার্থে ভালবাসার মানুষ বলতে আর কেউ নেই। যিনি ছিলেন তিনি অনন্ত অসীমের পানে চলে গেছেন। খুব একা হয়ে গেলাম। সব কিছু থেকেও যেন নেই। সবার মাঝে থেকেও খুব একা। চির জীবনের তরে একা হয়ে গেলাম!

মা বেঁচে থাকতে একা থাকলেও মনে হতো না আমি একা। আর সাথে থাকলে তো কথাই নেই। সাথে থাকলে গায়ে বিদ্যুতের মত শক্তি পেতাম। ক্লাশ সেভেন এ থাকতে এলাকায় বিদ্যুৎ চলে আসে। প্রথমে গফরগাঁও, পরে ধলা বিদ্যুৎ পায়। আর গফরগাঁয়ে চালু হয় সাথী সিনেমা হল। মধুরিমা হলের অনেক আগে এর যাত্রা শুরু। সাথী সিনেমার মাইকিং চলে সারাদিন সবখানে। রিক্সায় ছবির পোষ্টার লাগিয়ে মাইকিং। আর ততদিনে আমি হারিকেন নয়, বিদ্যুতের আলোয় সিনেমা বানানোর পরিকল্পনায় মহা বিভোর।

স্কুল আর পড়াশুনার ফাঁকে কেবল সিনেমার ফ্রেম কাটাকুটি নিয়ে সময় পার হচ্ছিল আমার। খুব তাড়াতাড়ি সিনেমা চালু করতে হবে। বাইরে বন্ধুদের অলরেডী ঘোষণা দেয়া হয়ে গেছে; ওরাও তাড়া দিচ্ছে। টিনের বেড়া ঘেরা আমাদের বাসার ভেতরে একটি অব্যবহৃত ছনের তৈরী পাকের ঘরও ছিল। রুছমত চাচা এমনি এমনি বানিয়ে রেখেছিলেন হয়ত। সেটাকেই সিনেমা হল বানিয়ে নিলাম। বিকেলে খেলার মাঠে অগ্রীম টিকেট বিক্রিও শেষ করে ফেললাম।

শো শুরু এবং শেষ করতে হবে সন্ধ্যের আগেই। না হলে বাসায় ফিরলে দর্শকদের বাবা-মা ঘরে ঢুকতে দেবে না। প্রথম শোতেই হাউজফুল; দর্শক পাঁচজন। কাইয়ুম, মিরাজ, মহসিন, দুলাল আর জুলফিকার। (এর মাঝে কাইয়ুম, জুলফিকার আজ বেঁচে নেই!) প্রতি টিকেট দশ পয়সা করে; বক্স অফিস হিট হবার পালা। হলের বাইরে পোষ্টার লাগিয়েছি। ছবির নাম “আসামী”। সাথী সিনেমায় তখন রাজ্জাক শাবানার আসামী ছবি দারুন হিট। আমি আর অন্য নাম খুঁজে পাবো কোথায়!

শো’র শুরুতেই বাতি নিভিয়ে হল ঘরটি অন্ধকার করে নিলাম। পর্দায় প্রথমে “ধুমপান নিষেধ” লেখা আসলো; শুরু হলো সবার তালি। আমি ভীষন ভাব নিলাম। এরপর জাতীয় পতাকা। আমি মুখ দিয়ে জাতীয় সংগীত গাইছি আর হাত দিয়ে পতাকার ফ্রেমটি কাঁপাচ্ছি; যেন পতাকাটি পর্দায় পত পত করে উড়ছে। ছবি শুরু হলো। প্রথমে ছবির নাম, এরপরে নায়ক নায়িকার নাম। এরপরই পর্দায় ভাসলো নায়িকার ছবি; আর আমি গলা ছাড়লাম, ওরে ও ও পরদেশী! ও ও ও পরদেশী! যাবার আগে, দোহাই লাগে একবার ফিরে চাও! আবার তুমি আসবে ফিরে, আমায় কথা দাও!!!

ছবি শেষে লাইট জ্বালিয়ে দিলাম। এবার দর্শকদের বিদায়ের পালা। এক এক করে খুশীতে টগবগ করতে করতে চলেও গেল সবাই। বাসা থেকে পয়সা চুরি করতে পারলে সবাই আবার দেখতে আসবে এই আশ্বাসও দিয়ে গেল আমায়। প্রথম ছবির প্রথম শো’র সফল উপস্থাপনায় আমি যারপরনাই খুশী। মনের আনন্দে হলের মেঝেতে সদ্য জমা হওয়া ময়লা পরিষ্কারের কাজে নেমে পড়লাম। সব কিছু গুছিয়ে জায়গা মত রাখতে যাবো অমনি আমার চক্ষু চড়ক গাছ। তারে ঝুলানো অন্তত তিনটি ছবির ফ্রেম হাওয়া!

এ তো অবিশ্বাস্য! কে করলো এই কাজ? আমি হাঁউমাঁউ করে কান্না শুরু করলাম। অনেক যতেœ অনেক কষ্ট করে বানানো ফ্রেমগুলো খুঁজে না পাওয়াতে অস্থির হয়ে উঠলাম। কিন্তু কোন কিছুতেই কোন কূল কিনারা হলো না। পরদিন সাত সকালে কাইয়ুমের বাসায় গেলাম। কাইয়ুম রাজী হলো সত্যি ঘটনা বলতে। তবে শর্ত দিল এর বিনিময়ে ওকে ফ্রি টিকিটে ছবি দেখাতে হবে।

অগত্যা রাজি হলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে আশে পাশে কেউ আছে কি না ভাল করে দেখে নিয়ে কাইয়ুম আমার কানে কানে বললো, আমি করি নাই; আনোয়ার হোসেন দুলাল আর মহসিন মিইল্যা এই কামডা করছে। এ পর্যন্ত শুনে সমস্যা হয়নি; আমি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু যখন বললো, তিনটি ফ্রেমের একটিও আর অবশিষ্ট নেই; ছিড়ে কুটি কুটি করে পানিতে ফেলে দিয়েছে ওরা - শুনে মাথা আর সোজা করে রাখতে পারিনি। জ্ঞান কিভাবে ফিরেছিল সেটাও মনে নেই আজ। -চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com