হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৬ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-08-18 15:59:31 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৬ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আসলে জ্ঞান আমার কোনকালেই তেমন করে ফিরেনি। এইকালেও যে খুব ফিরেছে সেটাও বলবো না। আর ঐকালেও তেমন ছিল না। ছোটকাল তো জ্ঞান না থাকারই কাল। কেবল সাধারণ জ্ঞান কিংবা ভক্তিশ্রদ্ধার জ্ঞান নয়, হিতাহিত জ্ঞানও মাঝেমধ্যে থাকতো না। কমতি পড়তো। ফলে যা করার তাই করতাম। সীমা ছাড়িয়ে দুষ্টামি করতাম। কার সামনে কোন্ দুষ্টামি করা যায়, আর কোনটা করা যায় না, সেটা বুঝতে পারতাম না।

তেমনি একজন হামিদ স্যার। আবদুল হামিদ বিএবিটি স্যার। তাঁর মত এমন সহজ সরল স্যার আমার জীবনে আর দ্বিতীয়জন আসেনি। তিনি ক্লাশে মন দিয়ে তাঁর কাজ করতেন, আর আমরা দুষ্টের দলেরা আমাদের কাজ করতাম। কোনদিন তিনি সেসবে কিছু মনে করতেন না। দেখলেও এড়িয়ে যেতেন। খুবই ঠান্ডা প্রকৃতির মানুষ। রাগতেন না কোন কালেও। একদিন ইংরেজী রিডিং পড়াচ্ছেন। সবার পেছনের বেঞ্চে বসা সোমপাড়ার প্রতাপ চন্দ্র ছঁরপশষু কে ‘কুইকুলি’ পড়লো। সবাই হো হো করে হেসে দিলাম। স্যার হাসলেন না। কিছু মনেও করলেন না। যখন আমার পালা এলো, আমি একটু বাড়তি সাহস করে ইধসনড়ড় কে ‘বাম্বো’ পড়লাম। আর যায় কোথায়! চেয়ার থেকে উঠে এসে আমার ঘাড়টি নুইয়ে পটাপট কয়েকটা কুনি।

মনে হয় স্যারের জীবনে এই প্রথম কাউকে মারলেন। এর আগেও মারেননি, হয়ত পরেও মারেননি। তবে আমাদের হেব্বী মারতেন শফিকুল স্যার। অংকের ক্লাশ চলছে। ক্লাশ কেপ্টেইন বলে টিচাররুম থেকে চক-ডাস্টার কিংবা বেত আনার কাজটা আমাকেই করতো হতো। স্যার কি কারণে যেন রাগের বশে বলে ফেললেন, একটা বেত নিয়ে আয়। স্যার আসলে সিরিয়াস্লি বলেননি। রাগের মাথায় স্বভাবসুলভ ভঙিমায় জাস্ট হুমকি স্বরূপ বলছিলেন। স্যারের বলতে দেরী; কিন্তু আমার যেতে দেরী হয়নি। চট করে বের হয়ে গেলাম।

আসলে সব সময় বের হবার জন্যে তৈরীই থাকতাম। টিচাররুমে যাওয়ার জন্যে কঠিনভাবে উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। অপেক্ষা কেবল উছিলার। কোন মতে উছিলা একটা পেলেই হলো। আর দেরী নয়। ক্লাশ চলাকালীন টিচার্স রুমে যাবার মজা অন্যখানে। মোট দুটো মজা। এক, বারান্দা দিয়ে নায়কসূলভ ভঙ্গিতে হেঁটে যাবার সময় অন্যক্লাশের সবাই ঘাড় বাঁকিয়ে দেখতো। এটা হলো নিজেকে দেখানোর মজা। আর দুই, টিচার্স রুম থেকে নতুন চক চুরি করা।

টিচার্স রুম; ফিজিক্যাল স্যার চেয়ারে বসে ঘুমুচ্ছেন। আর কোন স্যার নেই রুমে। মহা সুযোগ আমার সামনে। টেবিলের উপর আস্ত চকের নতুন প্যাকেট চকচক করছে। আমি বিড়ালের মত পা ফেলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। এবং খুবই সফলতার সাথে চটজলদি আমার টার্গেট পূরণ করে বেতখানা হাতে নিয়ে বের হতে যাবো, অমনি ফিজিক্যাল স্যারের ডাক, খাঁড়া। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ডাক। আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম। নিজে খাঁড়াবো কি! আমার চুলও খাঁড়া হয়ে গেছে।

স্যার বললেন, পকেটে হাত দে। আমি দিলাম। এবার বললেন, নে, এবার বের কর। আমি করলাম। স্যার বললেন, টেবিলে রাখ। আমি রাখলাম। এবার বললেন, আবারো হাত দে। আরো একটা আছে। আমি সেটাও বের করে দিলাম। এভাবে চুরি করা দুটো চক নির্দয়ের মত স্যার রেখে দিলেন। আমার ঠোঁট এবং গলা শুকিয়ে আসছে। জিহ্বা দিয়ে বারবার মুছেও ঠোঁট ভিজিয়ে রাখা যাচ্ছে না। এবার স্যার মিটিমিটি করে তাকিয়ে বললেন, এবার যা। কেবল মনে রাখিস; চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা। যদি না পরে ধরা! মনে মনে বলতে বলতে ক্লাশে যা!!

ক্লাশে ফিরে এসে আরো বিপদে পড়লাম। সিরিয়াস্লি না বলার পরেও পোদ্দারী করে বেত আনতে যাবার কারণে শফিকুল স্যার তো আমার উপর আগে থেকেই ক্ষ্যাপা। বেতখানা হাতে পেয়ে সপাং করে পিঠে এক ঘা বসালেন। আমি হতবিহ্বল হয়ে তাকালাম। ‘উহ্’ করে পিঠে হাত দিলাম। স্যার বললেন, আসতে এতো দেরী করলি কেন? পুড়ে যাচ্ছে পিঠ আমার। সাংঘাতিক রকমের জ্বলা শুরু হয়েছে। স্যারের সেদিকে খেয়াল নেই। খেয়াল চকেমাখা আমার হাফপেন্টের পকেটটার মুখের দিকে। মুচকী হেসে বললেন, পকেটে হাত দে।

আমি চুরি করা শেষ চকটিও অগত্যা টেবিলে রাখলাম। চাপে পড়লে যা হয়; বের করে দিতেই হয়। কোন বুদ্ধি কাজে লাগে না। চাপে পড়লে বুদ্ধিজ্ঞানও লোপ পায়। বিশেষ করে প্রকৃতি বেটাইমে ডাকলে, মানে হাগুমুতু চাপলে জ্ঞান লোপ পায় খুব তাড়াতাড়ি। একদিন স্কুল শেষে বাসায় ফেরার পথে বাজার ধরে হাঁটছি। হিসু চেপেছে স্কুলে থাকতেই। এখনকার মত তখনকার সময়ে স্কুলে হাগু তো ভাল, হিসু করারও তেমন ব্যবস্থা ছিল না। তাই কোনভাবে চেপেচুপে বাসার পথে হাঁটছি।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল। চেপে রাখার সমস্যা। অগত্যা মধ্য বাজারের বুড়ির বাসার সামনে মোটামুটি একটা গাছের আবডাল পেয়ে বসে পড়লাম। হাফপেন্ট পড়া এই আমি হাঁফ ছেড়ে কর্ম শুরু করছি। আহ্ কী শান্তি! মহাশান্তি পেতে শুরু করেছি কেবল। অমনি কেউ একজন পেছন থেকে এসে আমার ঘাড়টি ধরে টেনে তুললো। আর কেউ নয়, সাক্ষাত যমদূত; সেই বুড়ি। ঘাড় ধরে টেনে তুলতে তুলতে মাটির দিকে তাকিয়ে বুড়ি গর্জে উঠলো। ও মায়া মাইয়া গো, কারবারডা দেখছোনি! বইতে না বইতে পূরাডা মাইখ্খালছে। মুইত্তা শেষ কইরাল্ছে আমরার ঘরের ভিডির মাডি।

ওটা ক্লাশ থ্রির ঘটনা। ওই বয়সে কেবল গোপনে গোপনে নয়, সবার সামনে ধরলেও তেমন সমস্যা হতো না। ঘাড়ে ধরলেও না, কানে ধরলেও না। অবশ্য কানে ধরায় আমার সমস্যা কোন কালেই ছিল না। আজও কান ধরায় আমার কোন সমস্যা নেই; কেবল গায়ে না হাত দিলেই আমি খুশী। আর এসবে আমার লজ্জাশরমও তেমন নেই; লজ্জা শরমের ব্যাপারটা আমার মধ্যে কোনকালে ছিলও না।

ভার্সিটিতে পড়ার সময়। একদিন চলার পথে ঢাকার গাবতলীতে ব্যস্ত রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে গেলাম। এমনি এমনি তো আর কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়ায় না! প্রকৃতি বেটাইমে ডাকলে তার ডাকে সাড়া দিতে দাঁড়াতেই হয়। ঢাকা তো আর টোকিও নয় যে মোড়ে মোড়ে পাবলিক টয়লেট পাবো। আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির ডাকে রেস্পন্স করছি। সামনে একটা বালির ঢিবি। বালির উপর যে জায়গাটাতে শরীর নির্গত দূষিত জল পড়ছিল, সেই জায়গাটা জল পড়ার কারনেই ক্রমান্বয়ে বালি সরে সরে পরিস্কার হচ্ছিল। এক পর্যায়ে হঠাৎ চোখ গেল সামনের দিকে। একটা ছোট সাইনবোর্ড বেরিয়ে এলো বালির নীচ থেকে। ওখানে লেখা, “এখানে প্রস্রাব করিবেন না; করিলে ১০০ বার কান ধরে উঠবস করানো হবে।” আমার তো আক্কেল গুরুম অবস্থা। কাজ শেষ না করেই পালাবার পথ খুঁজছি। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। এমন সময় কেউ একজন পেছন থেকে জামার কলারে ধরে মোটামুটি জামাই আদরে টেনে হেঁচড়ে পাশের অফিস ঘরে নিয়ে গেল।

অফিস ঘরের বড়কর্তার জিজ্ঞাসা, লজ্জা শরম নাই? যেইখানে সেইখানে খাড়াইয়া শুরু কইরা দেস্। বেডা খবিশ কোনহানকার! তুই তোকারি করাতে একটু বিব্রত হয়ে বললাম, “জ্বি জনাব, আমার মা নিজেও এটা বলতেন। তবে আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল, অনেকক্ষণ ধরে চেপে রেখেছিলাম। আর পারছিলাম না, তাই দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভবিষ্যতে এমন আর হবে না। যেইখানে সেইখানে আর দাঁড়াইয়া পড়বোনা।” কথাটি তার বিশ্বাস হলো না। “তর কথার বিশ্বাস কি? এমনি এমনি ছাইড়া দিলে তুই আবারো খাড়াইয়া পড়বি। কিছু একটা শাস্তি তর প্রাপ্য। হয় ১০০ বার কানে ধরে উঠবস, না হয় ১০টা ডান্ডার বাড়ি। ঝবষবপঃ ঙহব ঢ়ষবধংব.” মুখে ভেংচি কেটে কথা গুলো বললেন কর্তা বাবু।

লোকটার মুখে ভেংচি কাটা ইংরেজী শুনে আমার মনে হচ্ছিল প্রকৃতি আবার ডাকলে এবং কখনো সুযোগ পেলে আর বালির ঢিবি নয়, এই বেটার মুখেই দেবো। সেটাতো আর হবার জোঁ নেই। তাই সুবোধ বালকের মত ডান্ডার বাড়ি খাবার চেয়ে কান ধরে উঠবস করাকেই বেটার মনে করলাম। মানি মানুষের মান সম্মান তো এত ইজি ম্যাটার না যে কান ধরে ওঠবস করলেই সেটা চলে যাবে! তাই বিনা সংকোচে গোনা শুরু করলাম এক, দুই, তিন....চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com