বদলে যাচ্ছে গ্রাম

প্রকাশের সময় : 2018-08-18 17:24:41 | প্রকাশক : Admin
�বদলে যাচ্ছে গ্রাম

ওয়াজেদ হীরাঃ শহরের আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে গ্রাম। শহরের সুবিধা পৌঁছে যাচ্ছে গ্রামেও। বদলে গেছে গ্রামীণ জীবন। পুরুষদের পাশাপাশি স্বাবলম্বী এখন গ্রামের নারীও। গ্রামে মাটির ঘর খুব একটা নেই বললেই চলে। অধিকাংশ গ্রামেই দেখা মেলে পাকা বা আধাপাকা বাড়ি। সরকারের স্থায়িত্বে উন্নয়নের সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে আর ক্রমশ বদলে যাচ্ছে সবকিছু।

ভূমিহীন-গৃহহীনরা সরকারের দেয়া বিনা পয়সায় ঘর পাচ্ছে। স্বল্পসুদে বা বিনাসুদে ঋণ নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নানা ধরনের আয়বর্ধক কাজে জড়িত হচ্ছে নারী। এতে সংসারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যেমন হচ্ছে; তেমনিভাবে পাল্টে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, সরকারের গৃহীত নানা প্রকল্পের কারণেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। এ জন্যই সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকেই।

জানা গেছে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে পরিবর্তন তথা দেশের মানুষের উন্নয়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সেবা দেয়া হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে সেই সেবাকার্যক্রম। এতে অজপাড়াগাঁও শব্দটি আর থাকছে না। পরিবর্তনের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে সবকিছুই। পালাবদল ঘটেছে গ্রামীণ অবকাঠামোতে, খাদ্যের প্রাপ্যতায়, জীবনযাত্রার মানে, যোগাযোগ ব্যবস্থায়, শিক্ষায় ও স্বাস্থ্যে। কুঁড়েঘরের জায়গায় এসেছে টিনের ঘর। শুধু কৃষিকাজ নয়, গ্রামের মানুষ এখন বহু ধরনের পেশায় নিজেদের যুক্ত করে জীবন বদলে নিচ্ছে।

ময়মনসিংহের শিল্প এলাকা ভালুকা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ‘ইন্তারঘাট’। বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত এই গ্রামে সম্প্রতি ১০ কিঃ মিঃ একটি পাকা রাস্তার কারণে বদলে গেছে গোটা গ্রামের চিত্র। মল্লিকবাড়ি  থেকে দেবরাজ পর্যন্ত ১০ কিঃ মিঃ এই রাস্তা হওয়ায় শুধু ইন্তারঘাট নয় উপকৃত হয়েছে সোনাখালি, ছিটাল, আউলিয়ারচালা গ্রামের কয়েক হাজার পরিবার। বর্তমানে পুরুষের পাশাপাশি নানামুখী কর্মে নিয়োজিত এলাকার নারীরাও। এসব গ্রামের উৎপাদিত নানা পণ্য নিয়ে সহজেই যাতায়াত করছেন।

যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন গতি এসেছে তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নও হচ্ছে। দারিদ্র্য জয় করে প্রতিটি পরিবার এখন উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেন। অথচ কয়েক বছর আগেও কাঁচা রাস্তার কারণে এলাকার মানুষ বেকার সময় কাটাতেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে হাঁটুসমান কাঁদায় পরিণত হতো রাস্তাটি। এখন এলাকার প্রতিটি মানুষের আয় বেড়েছে। আর্থ-সামাজিক অবস্থাও বদলে গেছে। বাচ্চাদের উন্নতমানের স্কুলে পড়াশোনা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুতই উপজেলাসহ অন্যান্য জায়গায় যেতে পারছেন গ্রামের মানুষ।

এলাকার উন্নয়ন তথা রাস্তাঘাটের জন্য মানুষের নানা ধরনের কাজ বেড়েছে। এতে আয়ও বেড়েছে। নানা ধরনের আয়বর্ধক কাজে জড়িত হয়ে সবাই এখন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। এলাকা সূত্রে জানা গেছে, রাস্তা ভাল হওয়ায় এলাকার অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। যারা অন্যের জমিতে কাজ করতেন তাদের অনেকেই ছোটখাটো ব্যবসা বা বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ করছেন। কেউ কেউ অটোরিক্সা বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালিয়েও জীবিকা নির্বাহ করছেন।

সন্ধ্যার পর এসব এলাকা ছিল ‘ঘুমন্ত গ্রাম’। আর এখন এসব গ্রামের মানুষ রাত দশটারও বেশি সময় পর্যন্ত বাজারে বসে টেলিভিশন দেখেন। চায়ের দোকানে আড্ডা আর গল্পে মেতে ওঠেন। ছিটাল গ্রামের চা বিক্রেতা সোহরার বলেন, আগে এলাকার মানুষই খুব একটা দোকানে আসত না। আর বর্ষায় তো কোন মানুষ সহজে ঘর থেকে বের হয়নি। আর এখন অন্য এলাকার মানুষ এসেও আড্ডা দেয়। সড়ক ভাল হওয়ায় রাত আর দিন নেই সবই সমান। আমারও ইনকাম বাড়ছে। বাড়িতে নতুন টিনের ঘর দিছি।

এদিকে, গ্রামের মহিলারা গরু, ছাগল লালনপালনের পাশাপাশি বাড়ির পাশে নানা ধরনের সবজির বাগান করেছেন। একসময় ধান আর আখ ছাড়া এসব এলাকায় যাতায়াতের সঙ্কটের জন্য অন্য ফসল আবাদ করত না কেউ। আর বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সবজির বাগান হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে করলা, শসা, লাউ, কুমড়া, বেগুন উৎপাদিত হচ্ছে এবং উৎপাদিত পণ্য দ্রুতই উপজেলাসহ রাজধানীতেও পাঠাতে পারছেন। যাদের মাটির ঘর ছিল অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় তারা এখন আরও ভালমানের ঘর তৈরি করছেন।

লাউ আর লালশাক বিক্রির জন্য একদিনও বাজারে যেতে হয় না। পাইকাররা ক্ষেত থেকেই সব নিয়া যায়। গ্রামের বেকার ছেলে মোটরসাইকেল ভাড়ায় চালিয়ে দৈনিক আয় করেন ৬০০-৮০০ টাকা। একটি রাস্তার কারণে কোন দিকেই বের হতে পারতো না। এখন যাতায়াত যেমন সহজ হয়েছে, অনেকের আয়ের পথও খুলছে।

এই সকল গ্রামের মতো দেশের অসংখ্য গ্রাম বদলে গেছে। গত কয়েক বছরে কোন কোন গ্রাম বদলে গেছে রাস্তাঘাট হওয়ার কারণে আবার কোনটি বিদ্যুতের সংযোগ পেয়ে। আবার কোন গ্রাম বিভিন্নভাবে পুঁজি পেয়ে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এনেছে। ভালুকা উপজেলার পাশের উপজেলা সখীপুর। লালমাটির বিখ্যাত টাঙ্গাইলের এই উপজেলার প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাম কালমেঘা। বিদ্যুত কিংবা পাকা সড়ক ছিল স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু এসব এলাকার মানুষের। আশপাশ এলাকার গ্রামে যাতায়াতের ভাল রাস্তা না থাকায় কেউ যেতেও পারত না অন্য গ্রামের কেউ আসতও না। বর্তমানে রাত জেগে বিদ্যুতের আলোয় পড়াশোনা হচ্ছে প্রতিটি ঘরেই।

গ্রামের ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসছে। অথচ রাস্তাঘাট বিদ্যুত সংযোগ পাওয়ার আগে এসব চিন্তাই করা যায়নি। এখন অনেকেই এলাকায় এসে নানা ধরনের প্রজেক্ট করতে চাচ্ছে। এতে করে অনেকের কর্মসংস্থান হবে। একই উপজেলার কুতবপুর গ্রাম বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত। রাস্তাঘাট আগে থেকেই ভাল থাকলেও অন্ধকারে ছিল এলাকা। সম্প্রতি বিদ্যুতের একটি সাবস্টেশন হওয়ায় গোটা গ্রাম আলোকিত। এলাকার যুবকরা বেশিরভাগ সময় বিদ্যুত পাওয়ার করণে কেউ কেউ পোল্ট্রি বা গরুর খামার করছেন। গ্রামের বাসিন্দা নিয়াজ হাসান বলেন, আমরা বিভিন্ন ধরনের রাইস মিল করেছি। অনেকেই খামার করেছেন। যোগাযোগ ভাল ছিল তবে বিদ্যুত থাকত না, এখন সেই চিন্তা নেই।

গত কয়েক মাসে একাধিক গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে গ্রামীণ জীবনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দৃশ্য। শুধু মধ্যাঞ্চলই নয় রাজশাহী, রংপুরের বিভিন্ন গ্রামেও দেখা গেছে উন্নয়নের চিত্র। গ্রামের রাস্তাঘাট আর খুব একটা কাঁচা নেই। অনেক গ্রামেই পৌঁছে গেছে বিদ্যুত। অনেক গ্রামেই বেশিরভাগ পাকা বাড়ি। গ্রামের বাসিন্দারা স্থানীয় বাজারসহ রাজধানীতে যোগাযোগ করে দ্রুতই উৎপাদিত নানা ধরনের ফসল সরবরাহ করতে পারছেন। অসুখ-বিসুখে হাসপাতালে যেতে পারছেন। বাচ্চাদের জন্য ভাল শিক্ষার ব্যবস্থা হচ্ছে। সরকার গ্রামীণ জীবনের উন্নয়নে নানা ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন অনেক গ্রাম যেভাবে বদলে গেছে এটা সরকার গৃহীত পদক্ষেপের ফল। আগামী কয়েক বছরে বড় পরিবর্তন হবে বলেও সংশ্লিষ্টদের মত। গ্রামীণ অর্থনীতির এই পরিবর্তনের পেছনে রেমিটেন্স, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নতি, কৃষির বহুমুখীকরণ ও পোশাক খাতের মতো শ্রমনির্ভর খাত ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লি−ষ্টরা। সরকারের দারিদ্র্য দূরীকরণ তথা গ্রামীণ উন্নয়নে ‘একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প’ বেশ জোরালো ভূমিকা রাখছে।

গত কয়েক বছরে পাল্টে গেছে প্রান্তিক জীবন, পাল্টে গেছে অনেক গ্রাম। বছরে দু’একবার যারা শহর থেকে নিজ গ্রামে ফেরেন বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে উন্নয়নের চিত্র দেখে তারাও অবাক হয়ে যান। সেই সঙ্গে মনের অজান্তেই স্বপ্ন বুনেন শহর ছেড়ে গ্রামে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার। জনকণ্ঠ

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com