হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৯ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-09-26 16:05:41 | প্রকাশক : Admin হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৯ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বিশাস যেমনি মা করতেন, বিশ্বাস বাবাও করতেন। কেবল আমরা বিশ্বাস করতে পারতাম না বাবা-মা এত মায়াশীল হয় কেমন করে! যতদিন নিজে বাবা হইনি ততদিন বুঝিওনি। আসলেই বুঝিনি। শোনিম হবার পর বুঝেছি। শোনিমের জন্ম হবার দিন ঘটনাক্রমে আমি বাংলাদেশে ছিলাম। একদিকে বাবা হবার আনন্দ, অন্যদিকে কঠিন এই সময়ে ওর মায়ের পাশে না থাকতে পারার অপরাধ বোধে লজ্জাও হচ্ছিল! এরপরও প্রথম সন্তানের মুখটি দেখার আশায় দিশেহারার মত সব কাজ ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বিশ ঘন্টা পরে আমি টোকিও পৌঁছালাম।

সারাটা পথ, সারাটা রাত প্লেনে বসে শুধু শোনিমের কথা ভেবেছি। নার্সিং হোমে পৌঁছেই গ্লাসের আঁধারে রাখা একগাদা সদ্যজাত শিশুর মাঝে আমার শোনিমকে খুঁজছি। এতগুলো বাচ্চার মাঝে চেনা তো কঠিন! প্রথমে চিনতেও পারিনি। মুচকী হেসে ওর মা চিনিয়ে দিল! জীবনে প্রথম শোনিমকে দেখলাম! ওর মায়াভরা মুখখানা দেখলাম; কোলে নিলাম! চোখ দুটি মিটমিট করছিল! শোনিমের নরম পরশে বুকের মধ্যে পরম শান্তির আবেশ পেয়ে মনে হলো আমার হারিয়ে যাওয়া বাবা সাড়ে নয় বছর পরে আবার ফিরে এসেছেন আমারই কোলে!!

২১শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫; স্ট্রোকে আক্রান্ত আব্বা হাসপাতালের বেড এ শুয়ে আছেন। নার্স খুশী, আব্বাও খুব খুশী; কাল আব্বা রিলিজ নিয়ে বাসায় ফিরবেন। রাতের ঔষধ খাইয়ে বিদেশ থেকে আমার পাঠানো চিঠিটা আব্বার হাতে দিয়ে নার্স বললো, ছেলের চিঠি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েন। সেই যে ঘুমালেন আর জাগলেন না! মধ্যরাতে নার্স এসে দেখলো আব্বা চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন! বুকের উপরে হাতে ধরে রাখা তার ছোট ছেলের শেষ পত্রখানি কঠিন মায়ায় আগলে ধরে শুয়ে আছেন!!

তেইশ বছর আগের ঘটনা! একটি দুটি নয়, গুণে গুণে তেইশটি বছর! একেবারে কম সময় তো নয়! তবুও কেন জানি না, আমার কাছে মোটেই তেমন মনে হয় না! বছর তো ভাল, তেইশটি দিনও মনে হয় না! মনে হয় এই তো সেদিন; সবকিছু এলোমেলো করে, কাউকে কিছু না বলে, কোন সময় না দিয়ে, বাবা আমার চলে গেলেন! দূর অচীনপুরে চলে গেলেন! অনেকটা অকালেই চির জীবনের জন্যে চলে গেলেন!!বাবা! আমার জন্মদাতা বাবা!! তবে কখনো তাঁকে বাবা বলে ডাকিনি; আব্বুও বলিনি। ডাকতাম আব্বা বলে। মাকে মা ডাকতাম, আম্মাও ডাকতাম। তবে মাকে তুমি করে সম্মোধন করলেও আব্বাকে আপনি বলতাম। জন্মলগ্ন থেকেই বলতাম। আমাদের সময়ে আশেপাশের সবাইকে দেখতাম বাবাকে আপনি করেই সম্মোধন করে। ভাবতাম এটাই বোধহয় রেওয়াজ। পরবর্তীতে নিজে বাবা হয়ে রেওয়াজটা ভেঙে ফেললাম। সন্তানের সাথে দূরত্ব কমানোর জন্যে বিষয়টি জরুরী মনে করেছিলাম। অবশ্য এই জমানায় কেবল আমি নই, “আপনি” শোনার রেওয়াজ সব বাবারই ভেঙেছে। হয়ত সবাই বিষয়টিকে জরুরী মনে করেছে।

জরুরী বিষয়কে জরুরী মনে করাও জরুরী। আমার আব্বার চিকিৎসাটাও খুব জরুরী ছিল। তবে তেমনভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি আমরা। হার্টের চিকিৎসা ঢাকাতে তেমনভাবে তখনও শুরু হয়নি। হয়ত দেশী বিদেশী সামান্য কিছু ঔষধ ছিল। কিন্তু ইসিজি মেশিন আর পালস মনিটর ছাড়া আর তেমন কিছুই ছিল না। আব্বা ছিলেন হার্টের রোগী। সাথে ডায়বেটিসও ছিল। তাই কাবু হয়েছিলেন বেশী। হাঁটতে কিংবা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে কষ্ট হতো। বেশী সমস্যা ছিল বুকে। ভারী হয়ে থাকতো; ব্যথা করতো। বুকে ব্যথা করলেই জিহ্বার নীচে এনজিষ্ট স্প্রে করতাম। এতে তৎক্ষনাৎ ব্যথা কমতো, তবে রোগের মাত্রা কমতো না।

আব্বা প্রথম রোগে পড়েন অর্থাৎ স্ট্রোক করে ১৭ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৭ সালে। রিটায়ারমেন্টে যাবার ঠিক দশদিন আগে। চল্লিশ বছরের সরকারী চাকুরী জীবনে শেষবারের মত অডিট অফিসার হিসেবে সেদিন গাজীপুর ট্রেজারীতে গিয়েছিলেন। মনে হয় এই কষ্টটাই সহ্য করতে পারেন নাই। একেবারে সিনেমার মত। কষ্ট পেলেন আর বুকে হাত চেপে ধরলেন। বুকের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা। সেই ব্যথা নিয়ে সেই যে বাসায় এসে বিছানায় পড়লেন আর তেমনভাবে পূরোপুরি সুস্থ হলেন না। আর কোনদিন অফিসের চেয়ারটায়ও বসতে পারলেন না!

তবে তাঁর কষ্টের বড় কারণ ছিলাম আমরা; আমাদের সংসার। রিটায়ারমেন্টের সময় হয়ে এল, কিন্তু সংসারের কিনারা তখনো হলো না। তখনো কেউ হাল ধরার মত পাশে নেই। অথচ সংসারে আমরা ছোট তিন সন্তান আব্বার উপরেই আছি। আমাদের পড়াশুনা শেষ হতে তখনো বাকী। এমনই অবস্থায় তিনি অবসরে গেলে কিভাবে সংসার চলবে, কিভাবে আমরা পড়াশুনা করবো, এই চিন্তায় মনে খুব টেনশান ছিল। এভাবেই সংসারের ঘানি নামক টেনশানের কারণেই নিজের জীবনটাকেও শেষ পর্যন্ত কিভাবে শেষ করে দিলেন, তা হয়ত তিনি নিজেও টের পাননি!

আসলে কোন বাবারাই কখনো টের পান না। আমার বাবাও পাননি। সবার সুখের ব্যবস্থা করতে করতে নিজেই অসুখে পড়লেন। কিন্তু নিজের অসুখটাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বড় করে দেখেননি; বরং লুকিয়েছেন। বুকে ব্যথা হলে বাম হাত দিয়ে হালকা করে চেপে ধরে মুখে হাসি হাসি ভাব রাখতেন। নিজে গোপনে সব কষ্টই করেছেন যাতে করে তাঁর কষ্টটা আমাদের কষ্টের কারণ না হয়। জীবনভর চেষ্টা করেছেন আমাদেরকে সবকিছুতেই ভাল রাখতে। এমনকি অবসর জীবনেও।

অবসর জীবনে নামাজ পড়ে, কোরআন পড়ে আর নাতিদের সাথে খেলা করে আব্বার সময় কাটতো।   কিন্তু কাবু হয়ে গিয়েছিলেন হৃদরোগ আর ডায়বেটিসের কাছে। সকালে রোজকার পত্রিকা পড়তেন দোতলার সিঁড়ির মুখে চেয়ারে বসে। এত জায়গা থাকতে সিঁড়ির মুখে বসে থাকাটার মানে প্রথমে বুঝতাম না। সকালে যখনই আমি বাসা থেকে বের হতাম আব্বা পেছন থেকে বলতেন, কিছু মুখে দিয়েছিস্ তো? রোজ রোজ মিথ্যে বলতে পারতাম না বলে আম্মা হাতব্যাগে নাস্তা দিয়ে দিতেন। আব্বা জানতেন আমার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা; তাই সিঁড়ির দরজায় বসে থাকতেন যেন আমি না খেয়ে বেরুতে না পারি!

আব্বা আমাদের ব্যাপারে খুবই কেয়ারিং ছিলেন। আমাদের কোন কষ্ট সইতে পারতেন না। কিন্তু নিজের কষ্ট চেপে রাখতেন। আব্বার মনে অনেক চাপা কষ্ট ছিল। কাউকে তিনি বলতেনও না, বুঝতেও দিতেন না। প্রতি বছর কোরবানী দিলেও একবার কোন এক ঝামেলায় কোরবানী দিতে পারেননি। ঈদের দিন সকালে আব্বা গেলেন ৩ কিঃ মিঃ দুর বাজারে গোশ্ত কিনতে। না পেয়ে ১২ কিঃ মিঃ দূরে টঙ্গী গেলেন হেঁটে হেঁটে। সেখানেও এ বাজার সে বাজার ঘুরে গোশ্ত পেলেন না। কোরবানীর ঈদ বলে সেদিন কোন কসাইয়ের দোকান খোলেনি। অগত্যা ক্লান্ত, শ্রান্ত বাবা আমার প্রচন্ড ব্যথিত মনে বাড়ীর দিকে আবার হাঁটা দিলেন।

এদিকে দূপুর গড়িয়ে বিকেল, ঈদের দিন যায় যায় করছে; তবুও আব্বা ফেরেন না! শুধু সেমাই খেয়ে বসে আছি আমরা; আব্বা এলে গোশ্ত রান্না হবে! আম্মা চিন্তিত, তার মন খুবই খারাপ; গোশ্ত খেতে না পারায় আমাদের ছোট দুটি ভাইয়েরও মন খারাপ! ঠিক এই মূহুর্তে আব্বা এসে দাঁড়ালেন উঠোন কোণে। আমি খুশীতে চিৎকার করে উঠলাম। আম্মা দৌঁড়ে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। আমরা সবাই খুশী; কিন্তু আব্বা কথা বলছেন না, ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন; তাঁর দুহাতে দুটি ছোট সাইজের বোয়াল মাছ! আর দু’চোখ ভর্তি জল!!

এই হলো আমার বাবা! শুধু আমার বাবাই নয়, সব বাবারাই এমন হয়; এমনি করেই সব বাবারা সন্তানদের জন্যে কাঁদতে পারেন, মাইলের পর মাইল হাঁটতে পারেন! অথচ সব সন্তানেরা বাবাদের জন্যে হাঁটতে পারে না; হাঁটে না!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com