হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪৪ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-12-06 15:09:26 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪৪ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ এইরূপ পাকনা বুদ্ধি নিয়ে শৈশবে কম করিনি। হেন দুষ্টামি নেই যা করিনি। একাকী থাকলে এমনিতেও দুষ্টামি একটু বেশীই করা হয়। তাও আবার এই বয়সে! তবে একাকী থাকলেও আমি আর যাই করতাম কোনদিন পড়াশুনায় গাফিলতি করিনি। অন্তত ক্লাশ এইট পর্যন্ত করিনি। ভুলেও করিনি। তবে এবার ব্যতিক্রম হওয়া শুরু হলো। নাইনে উঠতে না উঠতেই একটু বেলাইনে চলা শুরু করলাম। নিজেকে বড় ভাবা শুরু করলাম; স্বাধীন ভাবা শুরু করলাম।

বড় বেসময়ে স্বাধীন ভাবার বিষয়টা আমার ক্ষতি করলো। বেশ ক্ষতি করলো। ক্ষতিটা আস্তে আস্তে করলো বিধায় প্রথমে টের পাইনি। বুঝতেও পারিনি। বোঝার বয়সও তো তেমন ছিল না আমার। মাত্র কৈশোরে পা দিয়েছি। উত্তাল মন আমার। কত কিছু চায় এই মন। মুক্ত বিহঙ্গের মত কেবলই উড়াল দিতে চায়। উড়ালটা বাড়িয়ে দিলেও, কমিয়ে দিলাম কেবল পড়াশুনাটা। পড়াশুনা ভাল লাগতো না। ভাল লাগতো সিনেমা দেখতে।

মন খুবই চাইতো রোজ সিনেমা দেখি। খুব টানতো। সে সময় দক্ষিণে গফরগাঁয়ের সাথী সিনেমা আর উত্তরে বালিপাড়ার চিত্রপুরী আমাকে কঠিনভাবে টানতো। দিনের বেলা এই দুটি হলের পাবলিসিটির জন্যে দুটো রিক্সা সারাদিন আমাদের এলাকায় মাইকিং করতো। রিক্সার দুপাশে চলতি সিনেমার বড় বড় দুটি পোষ্টার লাগানো থাকতো। আমি সুযোগ পেলেই রিক্সার কাছে এসে দাঁড়াতাম এবং মাঝে মাঝে পোষ্টারে বড় করে ছাপা নায়ক নায়িকাদের ছবির উপর হাত বুলাতাম। মনের সব অনুভূতি দিয়ে বুলাতাম। সে এক মহা শান্তির ব্যাপার; লিখে বোঝানো যাবে না।

কোথায়ও সিনেমার পোষ্টার দেখলেই দাঁড়িয়ে যেতাম। ধলা স্টেশনের মুখেই শচীন্দ্র কাকার চমৎকার একটি চায়ের স্টল ছিল। রেস্টুরেন্টও বলা যায়। সারাক্ষন গমগম করতো লোকজনে। এই রেস্টুরেন্টের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই ছিল এর দেয়ালে সাঁটানো সিনেমার পোষ্টার। এমন কোন সিনেমা ছিল না যার পোষ্টার শচীন্দ্র কাকার রেস্টুরেন্টে থাকতো না। তাই কারণে অকারণে কাকার দোকানে যেতে মন চাইতো এবং যেতামও। কাকাও বুঝতেন; তবে বুঝতে দিতেন না। হাসি দিয়ে কেবল বলতেন, পড়াশুনার খবর কি? ঠিক মত লেহাপড়া না করলে খবর আছে।

একদিন যেয়ে দেখি অঞ্জন স্যার বসে চা খাচ্ছেন ওখানে। ভারী মজার মানুষ অঞ্জন স্যার। আরো দু’তিনজন স্যারকে নিয়ে বসে ছিলেন। আমাকে দেখেই ডাকলেন এবং বললেন, তুমি বেশী বেশী পোষ্টার দেখ সেটা ঠিক আছে। তবে বেশী বেশী সিনেমা দেখবা না। সিনেমা খুব খারাপ জিনিস। যেই ঘরে ঢুকলে দরজা বন্ধ করে বাতি নিভায়া দেয় সেই সিনেমা ঘর আবার ভাল হয় কেমনে? বোঝবার পারছো?  স্যার গম্ভীর মুখে কথাগুলো বলছেন কিন্তু একটুও হাসছেন না; তবে আশেপাশের সবাই হেসে কুটিকুটি। স্যারের কথায় কলা গাছও হাসতো বলে আমরা বিশ্বাস করতাম।

স্যারের কথা মানার বয়স তখনও হয়নি আমার। তাই পড়াশুনায় ফাঁকি দিয়েই ইভিনিং শো ধরার জন্যে বালিপাড়া যেতাম; হেঁটে হেঁটেই যেতাম। রিক্সায় কারো সাথে শেয়ারে গেলে এক টাকা লাগতো। তখন এক টাকাই বা পাই কোথায়? তবে টাকার অভাবে চিত্রপুরীতে সব সময় ঢুকতে পারতাম না। তবুও যেতাম। দুটো কারনে যেতাম। এক, হলটি ছিল পুরোপুরি টিনের গোডাউন। ছবির শব্দ পুরোটাই বাইরে চলে আসতো। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবির ডায়লগ শুনতাম। আবার মাঝে মাঝে টিনের ফাঁক দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করতাম। চিত্রপুরীর টিনের বেড়ায় বেশ কয়েকটি বড় বড় ফুটা ছিল; যা দিয়ে কেবল আমি নই; আমার মত অনেকেই ছবি দেখতো।

জাভেদ ববিতার সাড়া জাগানো নিশান ছবিটি চলছে চিত্রপুরীতে। হল লোকে লোকারন্য। সবার মুখে মুখে সেই গান, চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে! জেনে যাবে কেউ জেনে যাবে! জাভেদের ডাবল মানে দ্বৈত অভিনয়। একটি চরিত্রের নাম কালা খাঁ। আমাদের মোখলেস বিকেলে খেলার মাঠে বল খেলে, দৌঁড়ায় আর সারাক্ষন কালা খাঁর ডায়ালগ ছাড়ে। ওর মুখে জসিম এবং আহমেদ শরীফের ডায়ালগও দারুন মানাতো।

টিনের ফুটো দিয়ে চুপি চুপি নিশান দেখছি গভীর আনমনে। কঠিন ছবি। চোখের পলক পড়ে না। হঠাৎ দেখায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে পেছন থেকে কার যেন শক্ত হাত এসে পড়লো আমার ঘাড়ে। ধমকের সুরে "কেডা রে" বলেই ঘুরে তাকালাম; দেখি আমাদের কার্তিক স্যার। "পকেটে একটা ফুডা পয়সাও নাই, আবার আইছে ফুডা দিয়া ছবি দেখতে!" বলেই আমাকে সমাদরের সাথে হলের মেশিন রুমে নিয়ে বসিয়ে দিলেন।

এরপর কী আরামে বসে সেদিন ছবিটি দেখেছিলাম তা বলাই বাহুল্য। স্যার বাদাম কিনে দিলেন। বললেন, ছবি দেখ্ আর বাদাম খা। তবে ভুলেও বাদামের বালি খাইস্ না। অন্ধকারে বাদাম দেইখ্যা দেইখ্যা খাইস্। ওসবে আমার কান নেই। ছবি শেষে স্যার আমার পকেটে দুই টাকা দিয়ে বললেন, এইবার বাড়ীত্ যা। রিক্সা নিয়া সোজা ধলা। আমি সোজা ধলাই ফিরেছিলাম তবে রিক্সায় নয়; হেঁটে হেঁটে। এবং খুব যত্ন করে টাকা দুটো রেখে দিয়েছিলাম সাথী সিনেমায় যেয়ে আমীর ফকির ছবিটি দেখার জন্যে।

সাথী সিনেমা অনেক দূর; হেঁটে যাওয়া যাবে না। রিক্সা ভাড়া বেশী। তবে ট্রেনে গেলে-আসলে টাকা লাগবে না। রেলে যে ভাড়া লাগে, সেটা সেই বয়সে মানতামই না। ভাবলাম ট্রেনে গেলে কার্তিক স্যারের দেয়া পুরো টাকাটাই ছবি দেখায় কাজে লাগানো যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। বন্ধু হান্নান ওরফে জনকে সাথে নিয়ে ট্রেনে চাপলাম। চাপাচাপি ট্রেন “ফরটি ফোর ডাউন”। যেমন মানুষ তেমন গরম।

গরম ছিল সাথী সিনেমাও। পাশের বেড়া ইটের দেয়ালের হলেও টিনের চালায় সিলিং ছিলনা। ঠাঠা রোদ্দুরে খাঁ খাঁ গরম পড়েছে। গায়ের জামা খুলে হাতে নিয়ে লুঙ্গী মোটামুটি কোমড়ে তুলে বসেছি; লেংটি দেয়া যাকে বলে। তাতেও টেকা দায়। গা বেয়ে কেবলই ঘাম আর ঘাম। একহাতে ঘাম মুছছি, অন্য হাতে গায়ের খোলা জামা দিয়ে বাতাস। এদিকে ছবি চলছে আমির ফকির। সাদাকালো ছবি; চোখ ফেরানো দায়। রাজ্জাক আছে, শাবানাও আছে। ফাটাফাটি ছবি। পর্দায় শাবানার নাচ। মনপ্রাণ দিয়ে নাচ্ছে। নাচের গানও চমৎকার; মনপ্রাণের। মন দিলাম, প্রাণ দিলাম আর কী দিবোরে! তুই আমার দিল জ্বালাইস্ নারে, তুই আমার মন পোড়াইস্ নারে!!!!

কৈশোরের এই আমাদের মনপ্রাণ এবং দিল জ্বলেপুড়ে একাকার। এখন ছবি ছাড়া আর কিছু বুঝিনা। আর কিছুই মাথায় আসে না। একদিন কয়েক বন্ধু মিলে সাথী সিনেমায় দি রেইন ছবিটি দেখতে গেছি। নাইট শো দেখবো। মানে শুরু হবে নয়টায় আর শেষ হবে রাত বারোটায়। নায়িকা অলিভিয়ার ছবি; হিট গান আর সুপার হিট কাহিনী। ছবিটি বিদেশেও  চলেছে। ঢাকা ছেড়ে প্রায় তিন মাস পরে গফরগাঁয়ে এসেছে। এটাতো মিস করা যায় না।

ধলা থেকে রওনা দেবার পর থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি আর ঝড়। আমরা ভিজে একাকার। রিক্সা আর এগোয় না। অনেক কষ্টে ঠেলে ধাক্কা দিয়ে অবশেষে পৌঁছে টিকিট কিনলাম। অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছি মাইকে বাজানো ছবির গান। হলের সামনের দোকানের পুরি খেয়ে রিক্সা ভাড়া ছাড়া পকেট অলরেডী খালি। কিন্তু ছবি আর শুরু হয় না। এক পর্যায়ে জানা গেল আজ আর ছবি দেখা হবে না।

টিকিটের টাকা ফেরত দিয়ে দিল। ঝড়ে প্রজেক্টারে সমস্যা হওয়ায় ছবি চালানো যাবে না। কী আর করা! কঠিন কষ্ট মনে নিয়ে ফিরতি রিক্সায় চেপে বসেছি। এখন বৃষ্টি নেই; আকাশ পরিস্কার। মরার ঝড় আর আসার টাইম পেলো না। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে সরু পাকা রাস্তা মাড়িয়ে রিক্সা ফিরছে নিজের গ্রামে। রিক্সাওয়ালার মনে দারুন ফূর্তি। গলা ছেড়ে গান ধরেছে।

কিন্তু আমার মনে কোন ফূর্তি নেই, আনন্দ নেই। দুঃখভরা মনে কেবলই মনে পড়ছে দেখতে না পারা দি রেইনের সেই জনপ্রিয় গান, “একা একা কেন ভাল লাগে না! কোন কাজে মন কেন বসে না!! আমার কী হতে কী হয়ে গেল, আমি নিজেই তো কিছুই বুঝি না!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com