শিশিরে ভোরের আলো; তুষারে অগ্নিশিখা!!!

প্রকাশের সময় : 2018-12-19 10:33:03 | প্রকাশক : Admin
�শিশিরে ভোরের আলো; তুষারে অগ্নিশিখা!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বহু বছর পর! কমবেশী বিশ বছর তো হবেই। হাঁড় কাঁপানো শীতের দেশে আবার যাওয়া। খুব বেশী না ঠেকলে অমন কঠিন শীতের দেশে আর যাবো না বলে মনস্থির করেছিলাম। করলে কী হবে! মনকে মনের জায়গায় স্থির রাখতে পারিনি। সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হয়েছিলাম। ঠেকলে ছাগলও যেমনি পানিতে নামে, ঠিক আমিও তেমনি নেমেছিলাম। খুব বেশী ঠেকেছিলাম বলেই নেমেছিলাম।

তবে আমার শোনিমের মাথায় এভাবে নামানামি নিয়ে কোন টেনশান নেই। ও খুব একসাইটেট। তুষার দেখবে, বরফ দেখবে। শীতের দেশে কনকনে শীতের কোন এক তুষারপাতের বিকেলে ওর জন্ম হলেও বোঝার মত বয়স হবার পর তুষারপাত দেখার সুযোগ হয়নি তেমন। হলেও স্মৃতিতে তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। যা কিছু আছে, সবই ছবির এ্যালবামে। তাই বারবার তুষারপাত দেখতে চাইতো। খুব করে চাইতো। আর নেই নেই করে আমারও নেয়া হয়নি ওকে। তাই এবার একটু অন্য রকমের অনুভূতি নিয়েই শোনিমের যাত্রা শুরু।

তবে তখনও শীতের শুরু হয়নি; তেমন করে শীত নামেনি শীতপ্রধান এই দেশে। শুরু হয়নি তুষারপাতও। সাধারণত নভেম্বরের শুরুতে এটা হয়ও না। হয় বাতাস; হীমশীতল ঠান্ডা বাতাস। এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতেই অমন বাতাসের ধাক্কা টের পেলাম। এই ঝিরঝিরে বাতাসই জানান দিল শীতের আগমনী বার্তা। বলছিল সাবধান! শীত আসছে; কনকনে শীত। ফিরে আসার আগের রাতে তাপমাত্রা মাইনাস ৬ এ নেমেছিল। ওখানে বসবাসকারীদের জন্যে এটা তেমন কিছুই না। যারা খুব শীঘ্রই মাইনাস ৪০ এর অপেক্ষায় তাদের জন্যে মাইনাস ৬ তো কিছুই না।   

কথাটি আমার নয়; ইউসুফ ভাইয়ের। মোহাম্মাদ ইউসুফ শেখ; কানাডার টরোন্ট প্রবাসী। দীর্ঘদিনের বসবাসে এদেশের সব মানিয়ে নিয়েছেন। আর নিজের ক্যারিয়ার গড়ে নিয়েছেন বেশ সফলভাবেই। অনেক প্রবাসীর মতই সহজ সরল পথে যেনতেনভাবে ক্যারিয়ার না গড়ে নিজের প্রফেশনেই থেকেছেন। বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ার হলেও কানাডাতেও দমে থাকেননি। ওখান থেকেও ইঞ্জিনিয়ারিং এ র্কোস করে প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং করছেন। সরকারী জব এ আছেন বেশ সুনামের সাথে এবং যথেষ্ট সন্তুষ্টির সাথেই উপভোগ করছেন প্রবাস জীবনের একেকটি দিন।

পাশাপাশি ব্যবসাও করছেন। রিয়েলষ্ট্যাটের ব্যবসা। মন্দ হচ্ছে না। ব্যবসা ভাল হলে ভাল, লাভ হয় বেশ। আবার ভাল না হলেও অসুবিধা নেই; লস হয় না। ঝামেলা যেমনি কম, টেনশানও কম। এই দেশে একটু বুদ্ধি থাকলেই হলো। অর্থ উপার্জনের জন্যে খুব বেশী পরিশ্রম করতে হয় না। ব্যবসায় এখানে নেই কোন নগ্ন প্রতিযোগীতা। নেই চাঁদাবাজির উৎপাতও। থাকবে কিভাবে! পাতি  নেতা থাকলে না উৎপাত থাকবে। এখানে ওরাও নেই; ওদের খাইখাই করা চোখও নেই।     

নেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও। আমাদের দেশটা তো শেষ হলো কেবল এই একটি জটিলতায়। যে দেশের পাবলিক নয়, বছরজুড়ে ভিআইপি মর্যাদা পায় শুধুমাত্র আমলা নামধারী পাবলিক সার্ভেন্টরা; সেই দেশের মঙ্গল কোনকালেও হবার কথা নয়। কানাডা সরকার আমলাদের কামলা বানিয়ে রেখেছেন। জনগণের কামলা। আর সরকারকে প্রস্তুত করেছে টোটালি নাগরিক বান্ধব হিসেবে। সরকারের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো সকল স্তরের জনগণকে অধিকতর স্বস্তিদায়ক নাগরিক সুবিধা প্রদান করা।

আইনের উছিলায় কথায় কথায় জনগনের ভোগান্তি না বাড়িয়ে বরং ভোগান্তি কমানো। আইনের মারপ্যাচে জনগণ তথা ব্যবসায়ীদের ফাঁপরে ফেলে না সরকার। আইন করাই হয় ব্যবসায়ীদের ফাঁপরমুক্ত রাখার জন্যে। আমাদের দেশের মত ফাঁপরযুক্ত নয়। সরকারের কাজই হলো জনগণকে শান্তিময় জীবনের গ্যারান্টি দেয়া। সুশাসন নিশ্চিত করে দেশের জনগণকে পুরো জীবনের জন্যে ভাবনাহীন করা। বিষয়টি এমন যে জীবনটি আপনার, সংসারটি আপনাদের; কিন্তু ভাবনা যা কিছু আছে সবই সরকারের।

তাইতো মানুষের স্রোত তথা স্রোতের  à¦¢à¦² নেমেছে ওদেশে যাবার। ওদেরও দরকার। বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক অনেক কর্মঠ মানুষ ওদের দরকার। বিশাল এদেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে যেতে প্লেনেই লাগে ৬ ঘন্টা। দুই প্রান্তের সময়ের পার্থক্যও ৪ ঘন্টা। অথচ লোকসংখ্যা মোটে ৩ কোটি ৬৯ লাখ। আরো দশগুণ কেন, বিশগুণ হলেও তো সমস্যা নেই। হাজার হাজার বর্গমাইল জায়গা পতিত পরে আছে। চাষাবাদ তো ভাল, বসবাসেরও কেউ নেই। তাই   সকল সময় সাদরে আমন্ত্রন জানায় অভিবাসীদের।

ইউসুফ ভাইও অভিবাসী হিসেবেই গিয়েছেন। ১৪ বছর আগে স্বপরিবারে গিয়েছেন মেধার জোরে। মানুষটি মানুষ হিসেবে যেমনি মেধাবী, তেমনি অমায়িকও। হাসি তাঁর ঠোঁটের ফাঁকে সর্বদা লেগেই থাকে। সংস্কৃতিমনা এই মানুষটি অত্যন্ত   বন্ধুবৎসল এবং অতিথি পরায়ণও। গাটের টাকা খরচ করে অতিথি আপ্যায়ন করেন। নতুন কোন বাংলাদেশী পেলে কথা নেই। মনপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেন তাদেরকে সহযোগীতা করার।

সুঠাম দেহের এই মানুষটির সাহসের কথাও না বললেই নয়। শীতকে যেমনি ভয় পান না; তেমনি দ্রুতবেগে ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ী চালাতেও কেয়ার করেন না। এমনি সাহসী মানুষটি একদিন আমাদেরকে নায়াগ্রা ফলস্ দেখাতে নিয়ে গেলেন। ছেলেবেলায় জানতাম পৃথিবীর ৭টি আশ্চর্য্যরে একটি এই নায়াগ্রা জলধারা। তাই দেখতে যাবার লোভ সামাল দিতে পারিনি। সৃষ্টিকর্তা এক অপরূপ রূপে সাজিয়েছেন নায়াগ্রাকে। সমুদ্রসম বিশাল এক আমেরিকান লেকের টনকে টন পানি ঝরণা দিয়ে ঝরে কানাডার লেকে পড়ে। দিনরাত অবিরত পড়ছেই।

নায়াগ্রার এখানে সেখানে ঘুরছি। পাতাঝরার মৌসুম এখন। শীতের আগমনে পাতার রং বদলে যাচ্ছে। কোনটা হলুদ, কোনটা লাল। বিশেষ করে কানাডার গর্ব ম্যাপল লিফ; কানাডার জাতীয় পতাকায় শোভা পাওয়া ম্যাপল পাতা। টকটকে লাল রং ধারন করেছে। কদিন বাদেই ঝরে পড়বে। দেখতে খুবই সুন্দর লাগা এসব দৃশ্য আরো সুন্দরতম লাগে আকাশ থেকে দেখতে। তাই তেমন ভাবনা চিন্তার সময় না নিয়েই কপ্টারে চড়ে বসেছি সবাই।

আসলেই সুন্দর লাগছিল আকাশ থেকে পাখির চোখে লালহলুদের বাগান ঘেরা কলকল জলরাশির ছলছল নায়াগ্রা ঝর্ণাধারা দেখতে। ১৫ মিনিটের রাইড। হেলিকপ্টারখানি ছ’জন যাত্রী নিয়ে হেলেদুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব দেখাচ্ছিল। শোনিমের তো কঠিন অবস্থা। আনন্দের সীমা পরিসীমা নেই। মুভি ক্যামেরায় তুলে নিচ্ছে সকল দৃশ্য। কেবল বেগতিক   অবস্থা ওর আম্মু এবং অসীম সাহসী ইউসুফ ভাইয়ের। মানুষটির চোখমুখ লাল হয় হয় করছে। ঠোঁটের ফাঁকে এখন আর দাঁত দেখা যায় না। ভয়ে একবার সামনের সিট আঁকড়ে ধরেন, আবার চোখ বন্ধ করেন। পাইলটও তেদর কম না। মাঝেমাঝে কপ্টারখানি এদিক ওদিক একটু কাত করেন। অমনি শুরু হয় ইউসুফ ভাইয়ের ঠোঁট কাঁপা।

মানুষটি কানাডার জনপ্রিয় বাংলাদেশী টিভি (এনআরবি টিভি) পরিচালনার সাথেও আছেন। টিভি ছাড়াও দেশী পত্রিকাও আছে। আছে বাংলাদেশী কমিউিনিটি। এ যেন তুষারে ছোট্ট এক বাংলাদেশ। এখানে সব হয়। হয় মিলনমেলা, পিকনিক, আনন্দানুষ্ঠান, বই কিংবা বৈশাখী মেলা। ওয়াজ মাহফিলও বাদ থাকে না। বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলোও পালিত হয় বেশ ঘটা করেই। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা কিংবা শহীদ দিবস। এসবই হয় তুষার পড়া বরফ ঢাকা কানাডায়। শহীদ দিবস হবে কিন্তু তুষারে অগ্নিশিখা জ¦à¦²à¦¬à§‡à¦¨à¦¾, তা হতেই পারে না।

কেবল এসবই নয়; দেশীয় রাজনীতিও আছে এদেশে। এতকিছু থাকবে আর রাজনীতি নিয়ে আলোচনা থাকবে না, তা কি হয়! বাঙালীর প্রিয় আলোচনার বিষয় হলো রাজনীতি এবং সেক্স। আঁতকে ওঠার কিছু নেই। এই মত আমার নয়, যায়যায়দিন খ্যাত শফিক রেহমানের। তিনি রাজনীতি এবং সেক্সের (পরকীয়া) মিশেল দিয়ে সাপ্তাহিক যায়যায়দিনকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করেছিলেন। আর যুবাশ্রেণীদের করেছিলেন পথভ্রুষ্ট।

এসব করেও তিনি বিখ্যাত; সম্মানিত। ভালবাসা দিবসের নামে লজ্জায় ঢাকা ভালবাসাকে প্রকাশ্যে এনে শরমহীন করেছেন। হাজার বছরের বাঙালী সামাজিক রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙুলী দেখিয়ে ভালবাসাবাসীকে রাস্তায় নামিয়েছেন। এরপরেও তিনি বিশিষ্ট একজন ব্যক্তি। বড় অদ্ভুত আমাদের এই দেশ। সব সম্ভবের দেশ। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পদও বাগিয়েছেন। তাদের মত মানুষদের চাহিদা সবখানে। এবারের আসন্ন নির্বাচনে তাদের মত অনেকেই ভোটপ্রার্থী। অনেকেই নির্বাচিতও হবেন। দেশ চালাবেন।

ক্ষতি ছিল না যদি এত কিছুর পরেও তারা কানাডিয়ান পলিটিশিয়ানদের মত দেশপ্রেমিক হতেন। তাদের বদান্যতায় নিশ্চিত পাল্টে যেত রীতি; বদলে যেত দেশ। আসন্ন নির্বাচনে আমরা এমনি দেশ বদলের প্রত্যাশায় আছি। এটাই আমাদের আশা। এতটুকুন আশা আমরা করতেই পারি। তবে খুব একটা লাভ নেই। গুয়ের মাঝে যেমনি দই খুঁজে লাভ নেই; তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মাঝেও কানাডিয়ান রাজনীতিক খোঁজার কোন মানে হয় না।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com