করোনা দিনের ডায়েরি...

প্রকাশের সময় : 2021-06-09 14:30:01 | প্রকাশক : Administration
করোনা দিনের ডায়েরি...

২০ তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

 

সঠিক লোক না হলে গুজবের গতি আলোর গতিকেও হার মানাবে। মোটামুটি জানা বিষয় নিয়েই বাংলাদেশে মিথ্যা গুজব ডানা মেলে। আর অজানা হলে তো কথাই নেই। কমবেশি সবাই হয়ে উঠে বিশেষজ্ঞ। দিতে থাকে বিশিষ্ট মতামত। বুনতে থাকে গল্পের জাল। ফলে দেখা যায়, খুব দ্রুতই অজানা বিষয়টি হয়ে উঠে মুখরোচক কল্পকাহিনী। আর এসব কল্পকাহিনীর ভেতর সবচেয়ে বেশি আবেদন সম্পন্ন কাহিনীটি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

করোনা এমনই একটি বিষয়। এখন পর্যন্ত অজানা এই ভাইরাস সম্পর্কে নিত্য নতুন তথ্য জানতে পারছে বিজ্ঞানীরা। একেক দিন একেক রকম তথ্য। অবাক করা তথ্য। তথ্য যতই পাচ্ছে, বিজ্ঞান ততই অবাক হচ্ছে। তবে তথ্যের চেয়েও বেশি ছড়াচ্ছে গুজব। যাচাই বাছাই করছে না। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ নিজের অজান্তে, কেউ বা বুঝে আর কেউ বা না বুঝেই ছড়াচ্ছে এসব গুজব।

এ ব্যাপারে মিডিয়াও খুব সহায়ক ভূমিকা নিচ্ছে না। কিছু কিছু মিডিয়া করোনায় মৃত্যু কিংবা করোনা ভীতি থেকে সৃষ্ট ভয়ংকর সব ঘটনা প্রকাশেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে দিন দিন করোনা একটা ভীতিকর চেহারা নিচ্ছে। মিডিয়াও খুব পোয়াবারো হয়, যখন বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তিত্ব এই রোগের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শুরু হয় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে চাছাছোলা বিশ্লেষণ। কিন্তু পেছনে পড়ে থাকে বৈজ্ঞানিক তথ্য।

করোনা নিয়ে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা রাতদিন কিভাবে ভাবছেন, কতটা দৌঁড়ঝাপ দিচ্ছেন এ নিয়ে মিডিয়ায় তেমন আলোচনা নেই। বিজ্ঞানীরা কতোটা কী আবিষ্কার করছেন, চিকিৎসা কতোটা ফলপ্রসূ হচ্ছে কিংবা এর প্রতিষেধক আবিষ্কারেরই বা কি অবস্থা, এ নিয়ে আলোচনায় কেউই খুব একটা আগ্রহী নয়। না আলোচকগণ আগ্রহী, না দর্শকগণ। ফলাফল হচ্ছে গুজব আর একরাশ অব্যবস্থাপনা। সবাই মেতে আছে কারও ঘাড়ে দোষ চাপাতে আর নয়তো গুজব ছড়াতে।

এসব দেখতে দেখতে বড়ই ক্লান্ত আমি। দূর্বলচিত্তের মানুষদের এই এক অসুবিধে। কথায় কথায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভর করে। ইদানীং এক অদ্ভুত কান্ড হচ্ছে। চোখের পাতা বোজার আগেই নাকডাকা শুরু হয়। গড়গড় করে নাকডাকা। প্রথম প্রথম শোনিম খুব অবাক হতো। এখন আর হয় না। দেখতে দেখতে এবং শুনতে শুনতে অভ্যাস হয়ে গেছে।

করোনা আমাকেও কিছু বাজে কাজে অভ্যস্ত করেছে। ঘুম ভাঙার পর প্রথম কাজই হলো মোবাইলটায় হাত দেয়া। হাতে নিয়ে মিটমিট চোখে পিটপিট করে মোবাইল দেখি। বালিশে মাথা রেখেই দেখি। প্রথমেই দেখি টাইম। কয়’টা বাজলো! দেরি হয়ে গেলে ‘হায় আল্লাহ্’ বলে ধড়ফড় করে উঠে জোহর পড়ি। জোহরের সময় পর্যাপ্ত থাকলে উঠি না। বিছানা ছাড়ি না। আলসেমী করি। আলসেমী উপভোগের সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গা হলো বিছানা। বিছানায় শুয়েই জমে থাকা ম্যাসেজগুলো আগে চেক করি। ম্যাসেজের কি শেষ আছে! কত্ত ম্যাসেজ! ম্যাসেজের পাহাড় জমে যায়। নানা ধরণের ম্যাসেজ।

 ম্যাসেজ কেবল আমার একার নয়, শোনিমেরও আসে। এক বালিশে মাথা রেখে বাপবেটা দু’জনে পাশাপাশি শুয়ে যার যার ম্যাসেজ পড়ি। শোনিম মনে মনে পড়লেও হাসে খিটখিট করে। খিটখিট করে আমিও হাসি। তবে সব সময় না। হাসার মত ম্যাসেজ আসলেই কেবল হাসি। আজও হেসেছি একজনের ম্যাসেজে, করোনা নিয়ে আপনার লেখা আমার ভাল লাগে। কেবল ভাল লাগে না আপনার ইয়াং সাজার চেষ্টাটা। কি দরকার মাথায় কালি মাখার। বুইড়া হইছেন, বুইড়ার মতই থাকেন।

অস্বীকার করবো না; কলিজায় কচ্ করে কামড় পড়েছে। একটু বেশিই পড়েছে আজ। দিনে দিনে তো আর কম বেলা হলো না। ম্যাসেজ প্রেরক আমাকে সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছে। তবে প্রশংসাও করেছে অনেক। কেবল সে নয়; ইদানীং অনেকেই প্রশংসাসমেত উৎসাহমূলক ম্যাসেজ পাঠাচ্ছে। শব্দচয়নে ভিন্নতা থাকলেও ম্যাসেজের মূলভাবে কোন পার্থক্য নেই। সবাই সিমেক ফাউন্ডেশনের কাজের খুব প্রশংসা করছে। আগেও করতো। তবে এতটা না। এখন বেশি বেশি করছে।

করোনার কঠিন দিনে সিমেক নিত্যদিন অসহায়দের দুয়ারে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে; কাউকে দিচ্ছে কাঁচা সামগ্রী, কাউকে রান্না। নগদ টাকাও দিচ্ছে। এসবে সবাই পুলকিত, আনন্দিত। সবার ভাল লাগছে। দূরদেশে বসে এসব দেখতে আমারও ভাল লাগে। আমি নিজেও এসব কাজে বেশি সময় দিচ্ছি। মূহুর্তে মূহুর্তে সব কিছুর খবরাখবর রাখছি। রাখতে ভাল লাগে, তাই রাখছি। ভাল আমার বরাবরই লাগে। ইদানীং বেশি ভাল লাগে সিমেক ইন্সটিটিউটের ভাইস প্রিন্সিপাল শরীফের সাহসীপনায়। ভীষণ নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। আল্লাহ্ রাস্তায় জানপ্রাণ সপে দেয়া একজন সত্যিকারের কর্মী।

শুকরিয়া আল্লাহ্ পাকের দরবারে! শুধু শরীফ নয়, সিমেক গ্রুপটাই এমনি সত্যিকারের নিবেদিত কর্মীতে ভরপুর। যার যার নিজ নিজ জায়গা থেকে যে যতটুকু পারছে প্রাণ উজাড় করে দিচ্ছে সিমেকের জন্যে। লকডাউন সিমেককে থামাতে পারেনি। লকডাউনের আগে গ্রুপের হাসপাতালটি ছাড়া আর সব ইউনিট দিনে কাজ করতো, রাতে ঘুমাতো। এখন কেউ ঘুমায় না। দিনেও ঘুমায় না, রাতেও না।

রাতে না ঘুমিয়ে আজ একজন সিমেকিয়ান ম্যাসেজ দিয়েছে, স্যার! আপনি ঈদ বোনাসও দিলেন! এক বাসায় আমরা তিনজন থাকি। কাজ করি আলাদা অফিসে। ওরা দুজনার কেউ গেল দুমাস ধরে বেতনই পাচ্ছে না। আর আপনি নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি ঈদ বোনাসও দিলেন! আপনাকে কোনদিন দেখি নাই, স্যার! খুব দেখতে ইচ্ছে করে আপনাকে!

আমারও খুব দেখাতে ইচ্ছে করছে ম্যাসেজটি। আব্বা থাকলে ম্যাসেজটি দেখে খুব খুশি হতেন। সাধারণ চাকুরীজীবি বাবা আমার। সরকারি চাকুরী। এরশাদের আমলেই অবসরে যান। রাষ্ট্রপতি এরশাদের উপর আব্বা খুব খুশী ছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম এদেশে পে-স্কেল ঘোষণা দেন এবং সরকারি চাকুরীজীবিদের জন্যে ঈদ বোনাস চালু করেন। এর আগে মানুষ জানতো ঈদ কি জিনিস! কেবল জানতো না ঈদ বোনাস কি!

ঈদ বোনাস চালুর ঠিক আগের বছরের ঘটনা। টানাটানির সংসারের কর্তা হিসেবে আব্বা গেছেন ঈদবাজার করতে। চালের দোকানদারকে বাকী পাওনার বড় অংশ পরিশোধ করে নতুন বাকীতে পোলাওয়ের চালসহ সারামাসের চাল নিয়ে আসবেন। দোকানদার টাকা নিলো বটে! কিন্তু আব্বাকে চাল দিলো না। কিছুতেই দিল না। আব্বা খুব আকুতি মিনতি করলেন। ঈদের দোহাই দিলেন। দোকানদার নাছোড়বান্দা; দেবেই না।

কাল ঈদ! আব্বা ঈদসদাই করতে পারলেন না! খালি হাতে চোখ মুছতে মুছতে বাসায় ফিরলেন। আজ বেঁচে থাকলেও চোখ মুছতেন। তবে কাঁদতে কাঁদতে নয়! হাসতে হাসতে! সিমেকের সবাইকে বোনাস দেবার কথাটা শুনে খুব হাসতেন বাবা আমার! জল ছলছল চোখে হাসতে হাসতে বলতেন, বেশ করেছিস, বাবা! কাজের কাজ করেছিস! তুইই তো দিবি। এই ঈদে তুই দিবি না, তো কে দেবে! তোর তো সব আছে। তুই ছাড়া ওদের তো আর কেউ নেইরে, বাবা!!

আজ আমার হয়ত অনেক কিছুই আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্পদ, আমার আদর্শ; সেই বাবাই নেই! করোনার এই কঠিন দিনে তাঁকে খুব দরকার ছিল। তিনি বেশ বুঝতেন আমার সমস্যা। বুঝিয়ে বলতেও পারতেন করোনা সমস্যার কঠিন গভীরতা। বলতেন সারা পৃথিবী তথা দেশের জন্যে সমস্যার ভয়াবহতা। সিমেকের জন্যে তো বটেই। কিন্তু ভাবতে নিষেধ করতেন। বলতেন, সমস্যা যত আছে, সমাধানও আছে। সমাধানবিহীন কোন সমস্যা এই পৃথিবীবাসীকে আল্লাহ্ আজো দেননি। এবারও দেবেন না নিশ্চয়ই! এবারও বেঁচে যাবো ইনশাল্লাহ্! আসলেই তো; ভাবার কি আছে! আজকের এই দিনে করোনা আমার সমস্যা!! কিন্তু সিমেকের সবাই যে আমার সমাধান!!! চলবে..

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com