ফাগুনের আগুন ঝরা স্বাধীনতার মাস!!!

প্রকাশের সময় : 2024-03-31 10:55:06 | প্রকাশক :
ফাগুনের আগুন ঝরা স্বাধীনতার মাস!!!

সরদার মোঃ শাহীন

 

সময়টা এখন চৈত্র মাসের ঠিক মাঝামাঝি। বসন্ত যায় যায় করছে। বসন্ত যদিও নির্মল হাওয়ায় দোলানো একটা মিষ্টি রোমান্টিক আবহের মাস; কিন্তু চৈত্রের খরতাপে এসে সেই আবহ কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে যায় এই বাংলায়। তাই মানুষ চৈত্রকে বিদায়ে উন্মুখ হয়ে ওঠে। মেতে ওঠে বৈশাখকে বরণ করার উৎসবী আমেজে। নববর্ষকে আলিঙ্গন করার এক উষ্ণ উম্মাদনায়। ভুলে যায় বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসা ফাগুনের প্রথম দিনটির কথা। হলুদের রঙে চারদিক রাঙিয়ে দেবার কথা।

আমার সেই দুষ্ট বন্ধুটি চারদিক রাঙিয়ে দিতে না পারলেও ভোলেনি প্রথম দিনটির কথা। ভোলেনি ফাগুনের হলুদ রঙ নিয়ে দুষ্টামি করতেও। সেদিনের আড্ডায় মন খারাপের ভান ধরে এক কোণে চুপচাপ বসে আছে সে। এটা যে ভান; বোঝার উপায় নেই। ওর ভান ধরা ভাব বোঝা বড় কঠিন। মনটা আসলেই খারাপ, নাকি খারাপ দেখানোর চেষ্টা, নিজে থেকে না বললে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া মুশকিল। ফাগুনের আগুন ঝরা হাসি ওর মুখে না দেখতে পেয়ে জানতে চাইলাম, “মুখটা এমন পেঁচার মত করে রেখেছিস কেন? সমস্যা কি তোর?”

সমস্যা আর কিছু না, দোস্ত। মধ্যবিত্তের সমস্যা। বলে, একটু দম নিল যেন। পরক্ষণেই মুখটা আরো কিছুটা গম্ভীর করে বললো, “মধ্যবিত্তের তো আজকাল খেয়েপড়ে বেঁচে থাকাটাই বড় সমস্যা। এর মধ্যেই ফাগুন এলো। বড় ঝামেলার ফাগুন। ফাগুন তো ক্যালেন্ডারের দাস। বছর ঘুরে সময় মত ঠিক ঠিক আসবেই। দেশের বাজারের মূল্যস্ফীতি দেখে তো আর আসবে না। আসবে না বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দাভাব বিবেচনা করেও।

আমরা সবাই ওর কথায় মনোযোগী হবার চেষ্টা করলাম। ব্যপারটা ও বুঝতে পেরে আরো একটু ভাব নিয়ে বললো, “কিন্তু ঘরের পোলাপাইন তো এসব বোঝে না। ওরা বোঝে আনন্দ। বোঝে বিনোদন। ফাগুনীয় বিনোদন। ফাগুন আসবে, বসন্ত আসবে; আর হলুদ রঙের পোশাক গায়ে চড়িয়ে ওরা হাঁটবে না, হাসবে না; তা কি হয়! ওসব কিনে দিতে দিতে আমার তো রফা দফা হয়ে গেছে দোস্ত। কী যে দিন পড়লো! আগে তো এসব ছিল না। এখন অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, ফাগুনেও ঈদের মত কেনাকাটা। হলুদ পোশাক কেনার হিরিক। ফাগুনের এসব কেনাকাটা এখন মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে নেই। মধ্যবিত্ত চাইলেই এখন আর হলুদ রঙের ছোঁয়া পাবে না। বরং দুদিন পানি কম খেয়ে পহেলা ফাগুনে হলুদ পিশু করে যদি ছোঁয়া পায়!!”

ফাজিলটা সব সময়ই এমন করে মজা করে। তবে একেবারে মন্দ বলেনি। ফাগুন এখন কেনাকাটার মাস। উৎসব আর ইমোশনের মাস। ফাগুন তথা বসন্ত নিয়ে আমাদের সবার মাঝে অনেক ইমোশন থাকলেও স্বাধীনতার মাস নিয়ে ইমোশন নেই বললেই চলে। অথচ এই বসন্তেই আমরা ভাষার স্বাধীনতা পেয়েছি। পেয়েছি রাষ্ট্রের স্বাধীনতাও। কিন্তু নতুন প্রজন্ম দিনকে দিন এসবের ইতিহাস ভুলতে বসেছে। নতুন করে জানার আগ্রহ তো নেইই। যারা কিছুটা জানতো, তারাও আজকাল এসবে আর আগ্রহ পায় না। আগ্রহ দেখায়ও না। এমনকি এটাও জানে না, মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতা যুদ্ধের পার্থক্য কি?

প্রিয় পাঠক, আপনি জানেন তো? মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধ কথাটির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর। বিশেষ করে হত্যাকান্ডের প্রধান বেনেফিসিয়ারী তার আমলে অতীব কুমতলব নিয়ে অত্যন্ত কুকৌশলে শব্দটি চালু করে দিয়ে যান। স্বাধীনতা তথা মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা চিরতরে মুছে ফেলার জন্য কুকৌশলটি নেন তিনি। বলা যায় বাঙালীকে স্বাধীনতা নিয়ে, স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তিতে ফেলে ধোঁকা দেবার প্রথম প্রচেষ্টা।

মুক্তিযুদ্ধের পাশে অনেকটা সমার্থক শব্দ হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধ শব্দটিকে এনে জাতিকে গোলকধাঁধায় ফেলা হয়েছে। দু’টো যুদ্ধকে এক করে ফেলা হয়েছে। অথচ দু’টো যুদ্ধ শুরু হয়েছে দুই সময়ে। প্রথমটি ৫২তে, আর ২য়টি ৭১ এ। দু’টোরই নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তাই তো তিনি জাতির জনক। আর জাতি হিসেবে আমরা কতটা অসচেতন! এসব নিয়ে সামান্য ভাবার চেষ্টা করার মানুষও এই জাতিতে নেই।

মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা বললে, সেটার শুরু হয় ৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে। আর মুক্তিযুদ্ধ বললে, শুরু করতে হয় বাঙালী জাতির মুক্তির আন্দোলন থেকে। পাকিস্তান আমলে যার গোড়াপত্তন হয় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। ৫২ সালেরও কিছুটা আগে থেকে। যার সমাপ্তি হয় ৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাঙালী জাতির মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সকল অর্জনকে খাটো করে তাঁর পরিবর্তে অন্য বিশেষ একজনাকে দাঁড় করাবার ঘৃণ্য চক্রান্ত থেকেই এর শুরু। পাকিস্তানের দোসররা তাদেরই চক্রান্তে বাংলার ইতিহাসের অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার সফল রূপকার এবং দেশকে স্বাধীন করার মহান কারিগর বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে দেবার নিমিত্তেই এই অপকর্মটি করে। তাই একেবারেই অযৌক্তিক ভাবেই একজন স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারীকে স্বাধীনতার তথাকথিত ঘোষক সাজায়, যেন নতুন প্রজন্মকে ধাপ্পাটা দেয়া যায়। যেন বোঝানো যায়, তারই ডাকে এবং নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয় এবং নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশ হয় স্বাধীন।

কী কঠিন এবং ঘৃণ্য চক্রান্ত! কোনভাবেই স্বাধীনতা যুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ কোনদিনই এক হতে পারে না। স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস মাত্র নয় মাসের। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘ ২৪ বছরের। পাকিস্তান গঠনের পর থেকেই। দীর্ঘ ২৩ বছরের সফল আন্দোলনের শেষ ভাগে এসে উদ্ভুত পরিস্থিতির সুযোগে বঙ্গবন্ধু অতীব সুকৌশলে স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের বিশাল ময়দানে দশ লক্ষাধিক লোকের উপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বজ্রকণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!!”

৭ই মার্চের ভাষণকে মুছে ফেলার কম চেষ্টা করেননি সেই কুমতলবী মানুষটি। বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতায় এসে প্রথমেই ব্লাকআউট করবার চেষ্টা করলেন ভাষণটিকে। মিডিয়াতে নিষিদ্ধ করলেন তাঁর নাম নেওয়াটাও। তার ক্ষমতার প্রায় পুরো আমলেই বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর ভাষণটি নিষিদ্ধ ছিল বাংলার জমিনে। নিষিদ্ধ ছিল স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রাণের শ্লোগান জয়বাংলাও। কিন্তু পারেননি তারা। তাদের কোন চক্রান্তই শেষমেষ সফল হয়নি শুধুমাত্র ৭ই মার্চের অডিও ভিডিও ক্লিপটির জন্যে। ভাষণটির অডিও ভিডিও ক্লিপটিই বাঁচিয়ে রেখেছে বঙ্গবন্ধুকে। হারিয়ে যেতে দেয়নি বাঙালীর মন থেকে।

বাঙালী তথা বাংলার সবচেয়ে দামী এই সম্পদ কোনভাবেই হারাবার নয়। যতদিন বাংলাদেশ আছে, বঙ্গবন্ধু ঠিক ততদিন বাংলায় থাকবেন। বাংলার মানুষের মণিকোঠায় থাকবেন। যতদিন তিনি থাকবেন, স্বাধীনতার চেতনা প্রকৃত বাঙালীর মনে ততদিন থাকবে। বরং মুখোশধারী চক্রান্তকারীদের প্রধান নিজেই জাতির স্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবেন। পৃথিবীতে প্রকৃত নেতারাই সব সময় আলোচনায় থাকেন, টিকে থাকেন। চক্রান্তকারী কোন তথাকথিত নেতা আলোচনায়ও থাকেন না, টিকেও থাকেন না। টিকে থাকার অন্তত একটি নজিরও পৃথিবীর কোন দেশে নেই।

চক্রান্তকারীরা কখনোই স্বাধীনতার চেতনার ধারক তথা মুক্তিযোদ্ধা হতে পারে না। এমনকি মাঠে নেমে যুদ্ধ করলেও না। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হবার প্রশ্নই ওঠে না তাদের। সময় এসেছে যথেষ্ট কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষের শক্তিকে আলাদা করার। তাদেরকে ভাল করে চেনার। এবং নতুন প্রজন্মকে ভাল করে চেনাবার। নতুবা মুখোশধারী এবং বর্ণচোরা সত্যিকারের স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি দেশের স্বাধীনতার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। স্বাধীনতার ঘোষক দাবীদাররা সুযোগ পেলে স্বয়ং স্বাধীনতা শব্দটির শোষক হতে সময় নেবে না এক মিনিটও!!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশক: সরদার মোঃ শাহীন
উপদেষ্টা সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম সুজন
বার্তা সম্পাদক: ফোয়ারা ইয়াছমিন
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: আবু মুসা
সহ: সম্পাদক: মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিস: ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
বার্তা বিভাগ: বাড়ি # ৩৩, রোড # ১৫, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন: ০১৮৯৬০৫৭৯৯৯
Email: simecnews@gmail.com