সত্যি করে বলুন! আসলে কী চাই!!

সত্যি করে বলুন! আসলে কী চাই!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ৭৫ পূর্ববর্তী সময়ের কথা। মেজর জলিল আর  আসম রবের নব্য গঠিত জাসদের দাপটে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের ব্যাড়াছ্যাড়া অবস্থা। সরকার পুরোপুরি হাঁপিয়ে ওঠেছে। শুধু পাগল হতে বাকী। কেবল বঙ্গবন্ধুর সরকার নয়; পুরো দেশও পাগল প্রায়। কোথায়ও স্বস্তি নেই। তরুণরা বিভ্রান্ত এবং দিশেহারা। এমনি গতিহারা এবং দিশেহারা তরুণদের উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে দলে দলে জাসদে ভেড়াচ্ছে রব-জলিলের জুটি।

ফলে যা হবার তাই হলো। সদ্য স্বাধীন দেশ বিনির্মাণে একেবারে নব্য কিন্তু শক্তিশালী জাসদের বিতর্কিত সকল কর্মকান্ড সাংঘাতিক ভাবে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টিকে সাথে নিয়ে গুপ্ত হামলা চালিয়ে একটার পর একটা মিল কারখানা, রেলস্টেশন জ্বালিয়ে দিতে লাগলো। অধিকতর ম্যাসাকার করে দিল পাকিদের হাতে বিধ্বস্ত হওয়া সদ্য স্বাধীন বাংলাকে। নয় মাসের যুদ্ধে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া বিধ্বস্ত বাংলা নিয়ে ওদের কোন মাথা ব্যথা নেই। অর্জিত স্বাধীনতা নিয়েও ওদের কোন সন্তুষ্টি নেই; তৃপ্তি নেই। কোন কিছুই বুঝতে নারাজ। ওদের একটাই কথা। “স্বাধীনতা লাগবে না; ভাত দে হারামজাদা!!”

দেয়ালে দেয়ালে লিখে রাখতো এসব অশ্লীল শ্লোগান। ভাবনার স্পর্ধা আর ভাষার রুচিবোধ দেখানোর বিশ্রী শ্লোগান। এতে তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের প্রবক্তাদের রুচিবোধ প্রকাশ পেত। সদ্য স্বাধীন দেশের ত্রিশ হাজার তরুণের বিপথগামী তথা জীবন বিনাশকারী এমনি রুচিবোধ সম্পন্ন মেজর জলিল আর নেই। তিনি গত হয়েছেন অনেক আগেই। কিন্তু আসম রব এখনো আছেন। রুচিবোধ বদলে না গেলেও কেবল সুরটা বদলে গেছে তাঁর। এখন বলার জায়গা পেলেই নতুন সুরে গলা ফাটান; উন্নয়ন লাগবোনা! খ্যাতা পুরি উন্নয়নের। দরকার পড়লে না খেয়ে থাকবো। পেটে গামছা বাঁধবো। তবুও গণতন্ত্র লাগবো।

লক্ষ্য করুন! মানুষ একই আছেন; কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দাবীটি ঠিক উল্টো হয়ে গেছে। কেবল রব সাহেব নয়, জাসদ ভেঙে বাসদ হওয়া দলের নেতা মান্নার সুরও ভিন্ন। তিনিও উন্নয়ন চান না। এমনকি বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নের কথা মানতেও চাননা। একেবারে ভঙ্গুর অর্থনীতির বর্তমান পাকিস্তান নিয়ে মান্নার হাস্যকর মন্তব্যেই বিষয়টি পরিস্কার হবে। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে ঢের উন্নত। যদিও স্বয়ং পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কথাটি স্বীকার করেন না। তিনি এ পর্যন্ত পাঁচবার বলেছেন বর্তমান বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় উন্নয়নের কথা।

বলতে তিনি বাধ্য। তিনি তো আর মান্নার মত উন্নয়ন কানা না। তবে উন্নয়ন কানা মান্না একা নন, আরো অনেকেই আছেন। তাদের দলটা অনেক ভারী। বর্তমান উন্নয়নকে তারা চরম হেলাফেলা করে দেখেন। কোনভাবেই পজেটিভ বিবেচনায় আনতে চান না।  ভাবখানা এমন করেন যেন বাংলাদেশের জন্যে উন্নয়ন বিষয়টি খুবই কম গুরুত্বপূর্ণ সাদামাটা একটি বিষয়। গুরুত্ব কম দেখান, কারণ বিষয়টি হচ্ছে শেখ হাসিনার হাত ধরে। এলার্জিটা এখানেই। মালয়শিয়ার উন্নয়ন মাহাথীর মোহাম্মদ করলে বাপের ব্যাটা হন। আর বাংলাদেশের উন্নয়ন শেখ হাসিনা করলে হন ভারতের দালাল। 

আপনি কথায় কথায় মাহাথীরের উদাহরণ টানবেন আর দেশে তাঁর মত একজন মাহাথীর চাইবেন। কিন্তু তাঁকে ফলো করবেন না, তাতো হবে না। মাহাথীরের এই দীর্ঘ সাফল্যের রহস্যটা কি? এটা কি এমন যে, মাহাথীর এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন! আজ্ঞে না। মাহাথীরের সময়ে মালয়শিয়ার এই ধারাবাহিক উন্নতির পেছনে মূল কারণ ছিল নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। আজকের সিঙ্গাপুরও তাই। গণতন্ত্রের নামে দেশের ক্ষতি হয় এমন কোন কিছুই সিঙ্গাপুরের গণতান্ত্রিক সরকার কোনকালেও বরদাস্ত করতো না; এখনো করে না। ৯২ বছর বয়সে পুনরায় মালয়শিয়ার ক্ষমতায় এসে মাহাথীর মোহাম্মদও করেন না।

১৯৮০তে মাহাথীর যখন ক্ষমতায় আসেন, মালয়শিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক কথায় ছিলো টোটাল ক্যাওস। হরতাল, মিছিল, মিটিং লেগেই থাকত। ফ্রিডম অফ স্পিচের নামে মানুষ কাজ কাম বাদ দিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকত পলিটিক্যাল তর্কাতর্কিতে। মাহাথীর বিশ্বাস করতেন, নানা ধর্মের, নানা মতের মালয়শিয়াকে একটি স্টেবল মালয়শিয়া বানাতে হলে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই। তিনি সেটাই চালু করে দিলেন মালয়শিয়ায়।

ক্ষোভে ফেটে পড়ল বিরোধী দল এবং মিডিয়াগুলো। মাহাথীর চেপে ধরলেন মিডিয়াকে। প্রতিটি নিউজ পেপারে সেন্সর জারি করা হলো। নির্দেশ জারি হলো, জাতীয় পর্যায়ে ঝামেলার সৃষ্টি হয় এমন কোন নিউজ করা যাবেনা। হিউম্যান রাইটস গ্রুপগুলো আক্রমণাত্নক প্রশ্ন করতে শুরু করলো মাহাথীরকে। মালয়শিয়ার মানুষের মানবাধিকার নাই, ফ্রিডম অফ স্পিচ নাই,  গণতন্ত্র নাই, ইত্যাদি বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছে।

কিন্তু মাহাথীর মোহাম্মদ তার লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উন্নত মালয়শিয়া। ক্ষমতা গ্রহনের প্রথম দশবছরে মাহাথীর মোহাম্মদকে ভুল বুঝেছিল দেশের মানুষও। হিউম্যান রাইটস, ফ্রিডম অফ স্পিচের ধুয়াতে বিশ্বাস করেছিল অনেকেই। কিন্তু মাহাথীরের লং টাইম প্ল্যানিংই শেষ পর্যন্ত সফল হলো। নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রই মালয় জাতিকে মুক্তি দিল।

মাহাথীর হাতেকলমে প্রমাণ করে দিয়েছেন অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে উন্নয়নের জন্যে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র অধিকতর প্রয়োজন। হরতাল, ধর্মঘট, জ্বালাও পোড়াও এর চেয়ে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র জাতির কাছে অনেক বেশী গ্রহণযোগ্যতা পায়। রাজনৈতিক ক্যাওয়াসে অতিষ্ঠ জাতি গণতন্ত্রের চেয়েও অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদ পেতে চায়। জাতি উন্নত হতে চায়।

এমনি নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রকে তবুও গণতন্ত্র বলা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে কি কোনদিন কোনকালে বলার মত সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র আদৌ ছিল? গণতন্ত্র কি কেবল পাঁচ বছরে মোটে তিনচারটা দিনের জন্যে জনগণের ভোটাধিকারের ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেয়া? প্রকৃত গণতন্ত্রের সংজ্ঞার সাথে যায় এমন গণতন্ত্রের স্বাদ কি আমরা কোনকালেও পেয়েছিলাম? গণতন্ত্রের প্র্যাকটিস ঘরে কিংবা বাইরে, সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে, অথবা রাজনৈতিক দলের চর্চায় কোথায়ও কি ছিল?

এই চর্চা কি মান্না, রব কিংবা ডঃ কামালের দলে আছে? নেই! কোনদিন ছিলও না। জাতীয় পার্টির কথা বাদ দিলাম। বিএনপি আর আওয়ামী লীগের কথা বললেও পাঠক হাসবে। জনগণকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। জনগণ সব জানে। যে দেশে দলের মধ্যে গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্র অনুশীলনের লেশমাত্র নেই; সেই দেশে তাদের মুখেই গণতন্ত্রের মায়াকান্নার কোন মানে হয়? আবার তথাকথিত যে গণতন্ত্র কেবলমাত্র ক্ষমতাশীন দলের নেতাকর্মীদেরকে সীমাহীন ক্ষমতাবান করে, আর বিরোধীদলকে করে বাড়ী ছাড়া; আমলাতন্ত্র তথা প্রশাসনের কোন স্তরকেই নাগরিক বান্ধব করে না। কে বলে তাকে গণতন্ত্র? আর কী দরকার সেই গণতন্ত্রের?

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদগণের চমৎকার একটা বিষয় আছে। তা হলো, বিরোধী দলে থাকলেই কেবল গণতন্ত্র চান। ঠিক চাওয়া নয়, চাইবার ভান করেন। আসলে গণতন্ত্র নয়, কেবল ভোটের দিনটায় ঠিকঠাক মত ভোট চান। যেন কেবল নিজের পক্ষের ভোটাররা ভোটটা দিতে পারে। যেন সরকার বিরোধী ভোটগুলো তাদের বাক্সে ঠিকমত কাস্ট হয়। আর কিচ্ছু নয়। এদেশের জনগণকে তারা কোনভাবেই ক্ষমতা দিতে চান না, বা ক্ষমতাবান করতে চান না। মাত্র তিনচার দিন নিজের পক্ষের লোকদের ভোটাধিকার চান।

আর যদি কালক্রমে সেটা ঘটেই যায়; তাহলেই কেল্লা খতম। চারদিকে হৈহৈ পড়ে যায়। হাসতে হাসতে ক্ষমতায় যেয়েই প্রথমেই সেই ভোটারদের কথা বেমালুম ভুলে যান। ভুলে যান গণতন্ত্রের কথাও। কেবল মাথায় রাখেন আইনের প্রয়োগের নামে অপপ্রয়োগের কৌশল। নিজেদের ত্রিসীমানায় ভোটারদের আর ভীড়তে দেন না। দু’দিন আগের অসীম ক্ষমতাধর ভোটারদের প্রজা ভেবে নিজেদের রাজা বানাবার চেষ্টা শুরু করেন। কারো মতামতকে কেয়ার করেন না। বিরোধী দল তো ভাল, নিজের দলের অধস্তনদের কোন মতামতকেও পাত্তা দেন না।  

এমনি তথাকথিক গণতন্ত্রের জন্যে মান্না-রব সাহেবদের মত মানুষজনের মায়াকান্না দেখলে গা জ্বলে উঠে। মন উস্খুশ্ করে জানতে ইচ্ছে করে আসলে তারা কী চান? মুখে যাই বলুন, ক্ষমতা ছাড়া তারা যে আর কিচ্ছু চান না এটা তো স্পষ্ট। তাই বলতে দ্বীধা নেই, এমনি গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন ঢের ভাল। পুরো পাঁচ বছরে মাত্র তিনচার দিন ভোটের অধিকার প্রয়োগের তথাকথিত গণতন্ত্র উপভোগের চেয়ে পুরো পাঁচ বছর উন্নয়নের সুফল ভোগ করা জাতির কাছে অনেক অনেক বেশী মূল্যবান! মহা মূল্যবান!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com