বিয়েশাদীর কালচার এবং সামাজিক আলসার

বিয়েশাদীর কালচার এবং সামাজিক আলসার

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ নিজের বিয়ের দিন তারিখের কথা ভুলে গেছি বললে শোনিমের আম্মু  খবর করে ছাড়বে। তবে প্রায় ভুলতে বসেছি এটা বলা যায়। কয়েক বছর হলো দিনটির কথা নোটবুকে লিখে না রাখলে মনে রাখতে পারিনা। বেমালুম ভুলে যাই। ভোলার তো কথাই। দিন তো আর কম হলো না। দিনে দিনে এত দিন হয়েছে যে এখন আর দিন দিয়ে বলা যায় না। বছর দিয়েও না। বলতে হয় সাল দিয়ে। অনেকদিন বা বেশীদিন বোঝানোর জন্যে সাল দিয়ে বলাটাই উত্তম। দশক আর যুগ পেরিয়ে সময় যেভাবে খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে তাতে এর বিকল্পও তেমন নেই।

তবে আমাদের দু’জনার বোঝার জন্যে শোনিমই যথেষ্ঠ। দিনে দিনে আমার শোনিম বড় হয়, সাথে বড় হয় আমাদের বিয়ের বয়সও। অথচ মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। সব কিছু চোখের সামনে স্পষ্ট ভাসে। শত আয়োজন, শত প্রয়োজন; শত কথা, শত কোলাহল। এসবে আনন্দ যেমনি কম ছিলো না, কষ্টও ছিলো সীমাহীন। অনুষ্ঠানে সামান্য বিষয় নিয়ে দু’পক্ষ  মারামারি প্রায় বাঁধিয়েই বসেছিল। দুঃখ-সুখের সে সব হাজারো স্মৃতি আজো মানসপটে জ্বলজ্বল করে। বেশী জ্বলজ্বল করে ছবির অ্যালবাম। ছোট বেলায় বিয়ের অ্যালবামের ছবি নিয়ে শোনিমের খুব দুঃখ ছিলো। অ্যালবাম দেখলেই কান্না জুড়ে দিত। এত্ত এত্ত ছবির মাঝে কোথাও ওর ছবি নেই। এই দুঃখে কান্না। কঠিন কান্না!

কান্না বিষয়টি বাংলাদেশের বিয়ের কালচারের অন্যতম একটি অনানুষ্ঠানিক অলংকার। কমবেশী এটা হয়েই আসছে। যদিও বিয়ে ব্যাপারটাই আনন্দের; তবুও কান্না থাকবেই। কান্না ছাড়া কোন বিয়েই যেন সম্পন্ন হয় না। বেশ কয়েকটি স্তরে ধাপে ধাপে কান্না পর্বটি সম্পন্ন হয়। যেদিন বিয়ের বিষয়টি পুরোপুরি পাকাপাকি হয়ে যায় সেদিন থেকে এর শুরু। সেদিন কাঁদে কেবল মা-মেয়ে; চুপিচুপি কাঁদে। এটা আবেগী কান্না। তেমন কেউ দেখেও না। এরপর কাঁদে একেবারেই কাছের আত্মীয়রা। যাদের অধিকার এবং অভিমানবোধ বেশী; কিন্তু ঠিকমত মুল্যায়িত হন না। জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে বাদ পড়ে যান বিবাহ বিষয়ক পুরো প্রক্রিয়া থেকে। পারলো! আমাকে না বলে থাকতে কিংবা ডাকতে!! ধরনের গুনগুনানী করেতারা অল্পবিস্তর কাঁদেন।

প্রকাশ্যের কান্নাটা হয় কোরাস টাইপের। মেয়ের বিদায় বেলার অবধারিত দলীয় কান্না। এখানে মেয়ে কাঁদে, মা কাঁদে। কাঁদে বাবা কিংবা মাঝেমধ্যে ভাইরাও। মজার বিষয় হলো এই কান্নায় কখনোই ছেলেপক্ষের অংশগ্রহন থাকে না। তারা পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেয়েপক্ষের কান্না দেখে মাত্র। দলবেঁধে কাঁদে কেবল মেয়ে পক্ষ। পুরো বিয়ের প্রক্রিয়ায় ছেলেপক্ষের কান্না আদৌ আছে বলে কেউ মনেও করে না। বিষয়টির তেমন গুরুত্বও নেই। অথচ এখানেও কান্না থাকে। খুবই নীরব কান্না। কাঁদে ছেলের মা। একা একা কাঁদে। পেটের নাড়িছেড়া ধন পর হয়ে যাচ্ছে ভেবেই মায়ের নীরব কান্না, নীরব অশ্রুজল।

তবে এসব অশ্রুজল কিংবা কান্না যত না কষ্ট মিশ্রিত তারচেয়ে ঢের আনন্দে মাখা। সমস্যায় মাখা নয়। সমস্যা থাকে অন্য জায়গায়। নানান সমস্যা। এর মাঝে প্রধান সমস্যা হলো মেহমানদের দাওয়াত করা। এ এক জগাখিচুরী মার্কা কর্মযজ্ঞ। এর মত ঝামেলার জিনিস আর হয় না। জনে জনে দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। ছাপানো কার্ডের দাওয়াত। তবে যেনতেন বা যাকে তাকে দিয়ে নয়; জায়গা বুঝে মেহমানের ওজন মেপে লোক পাঠাতে হবে। আবার সব জায়গায় লোক মারফত পাঠালেই হবে না। বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলোতে পরিবারের স্বয়ং কর্তাবাবুকেও যেতে হবে।

এখানেই শেষ নয়। এর সাথে আছে বিশেষ অনুরোধের বা সাধাসাধির পর্ব। সাধাসাধির সংলাপটাও মোটামুটি একই রকম; আপনাকে যেতেই হবে, না গেলে চলবেই না; আপনি না গেলে বিয়েই হবে না। দরকার হলে তারিখ পেছাবো, তবুও আপনাকে যেতেই হবে। এখানে শেষ হলেও চলতো। কিন্তু শেষ হয় না। কিছু বাকী থাকে। বাকী থাকে ফোন পর্ব। বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন পর্যন্ত ফোন করতে হয়। না হলে বলা  যায় না, কোন না কোন ছুঁতোনাতায় কিংবা উছিলায় দাওয়াতী অনুপস্থিত থাকবে।

এমনি তেলেসমাতিতে ভরা “বিয়ের দাওয়াতের প্রচলন” বাংলাদেশে কোন আমলে কার বুদ্ধিতে হয়েছে তা কেবলই আল্লাহ মালুম। অনলাইন বা মোবাইলের যুগ  আসার পরেও কেমন করে এখনো এত   উদ্ভট, অযৌক্তিক কিংবা অসামাজিক দাওয়াত পর্ব থাকতে পারে, আমার বুঝে আসে না। একটা সাধারণ এসএমএস করে দিলেই যেখানে দাওয়াত পর্ব সারা যায়, সেখানে দাওয়াত নিয়ে এত কর্মযজ্ঞের কোন মানে হয়!

মানে হয় না। আবার এত তোষামোদি করে আপনি দাওয়াত দিতে বাধ্য; কিন্তু দাওয়াতী মোটেই আসতে বাধ্য নয়। এমনকি সে আদৌ আসবে কি আসবে না তা আগেভাগে আপনাকে কনফার্মও করবে না। টোটাল দাওয়াত পর্ব সেরে আপনি জনে জনের হিসেব কষে কিছু লোক বাড়তি ধরে রান্না করে বসে থাকবেন; কিংবা বসে থাকতে বাধ্য থাকবেন। কিন্তু দাওয়াতী আসতে মোটেই বাধ্য থাকবে না। আবার আসলেও এক পরিবার থেকে মোট কয়জন আসবে, সেটাও আগেভাগে বলবে না। ইচ্ছে হলে দু’জন আসবে, ইচ্ছে হলে পাঁচ জন। এটা তাদের মর্জি।

পুরো বিষয়টি এতটাই ফানি যেন গোটা সমাজটাই মগের মুল্লুক! ছেলে বা মেয়ের গার্ডিয়ান হিসেবে আপনি এতটাই ঠেকায় পড়েছেন যেন তথাকথিত সমাজ রক্ষার নামে আপনাকে সবার নাচের পুতুল হতেই হবে। যেভাবে নাচাবে সমাজ, সেভাবেই নাচতে হবে। কিচ্ছু বলার থাকবে না। আপনার পরিবারের বিয়ে, তাই সব ঠেকা আপনারই। এটাই কালচার। যুগ যুগ ধরে আবহমান বাংলায় প্রচলিত একটা ফালতু কালচার। তথাকথিত এই ভোগাস কালচারের নামে এদেশে যা হচ্ছে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে কালচারের একটি বললে একটুও ভুল হবে না।

ঠিক বাজে কালচার না হলেও বিয়ের দাওয়াত কার্ডের ধরণ নিয়ে গত কয়েক বছর যাবৎ মানুষের বিশেষ করে তথাকথিত এলিট শ্রেণীর বাড়াবাড়িটা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বলা নেই কওয়া নেই, তারা কার্ডের ভাষাকে বদলে ফেলেছে। নিজেদেরকে জাতে তোলার জন্যে বাংলাকে পরিত্যাগ করে ইংরেজী ভাষায় কার্ড ছাপাচ্ছে। ভাবখানা এমন যে বাংলা হলো বাঙ্গালের ভাষা; নীচু জাতের ভাষা। তাই এই শ্রেণীর মানুষেরা তাদের কার্ডটিকে আলাদা রকমের উচ্চমানের করার নামে যা করছে তা এক কথায় মহা বিরক্তিকর। 

এদেশে যা কিছু বিরক্তিকর কালচার তা সব সময় শুরু করে ঐ উচ্চবিত্ত। এবং আস্তে আস্তে সেটা মধ্যবিত্তে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকটা রশির এক মাথায় আগুন লাগিয়ে দেয়ার মত। মধ্যবিত্তের কোন দোষ নেই এখানে। সারা পৃথিবীতে মধ্যবিত্ত জন্মগতভাবেই কেবল উচ্চবিত্তকে ফলো করে। বুঝে হোক, না বুঝে হোক অসহায়ের মত ফলো করে। অথচ এই উচ্চবিত্তের হাত দিয়ে অনুকরণীয় কোন ভাল কালচার চালু হয়েছে বলে একটি নজিরও নেই।

উল্টোটি আছে হাজারো। গুনে গুনে দশ-বিশটার কথা এখনি বলে দেয়া যাবে। তবে সংখ্যা যাই হোক, এদেশের প্রতিষ্ঠিত (ভাল কিংবা মন্দ) কোন কালচারের পেছনে কোন ভাবনা চিন্তা কখনোই ছিল না। কেউ কখনো ভেবেচিন্তে কোন কিছু এদেশে চালু করেনি। যা কিছুই চালু করেছে কিংবা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এমনি এমনি পেয়েছে। আর তাই বাস্তবতাবর্জিত একেবারেই অর্থহীন বহু কালচার দাঁড়িয়ে গেছে পুরো সমাজে। দূর্ভাগ্যক্রমে যা কিছু ভাল, তার অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে খারাপের ভীড়ে।

এমনই স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে ক’বছর আগের বাংলায় করা বিয়ের কার্ডও। কত চমৎকার ছিল সে সব কার্ড; আর কার্ডের আঙ্গিক। দেখতে সাধারণ। অথচ অভিব্যক্তি প্রকাশে কঠিন অসাধারণ! প্রাণ জুড়িয়ে যাবার মত কথামালায় সাজানো সে সব বিয়ের কার্ড! বড় সুন্দর তার ভাষা! সুন্দর তার কথা; অতীব আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় একমাত্র কন্যার বিবাহের দিনক্ষণ ধার্য্য হয়েছে।.... ....” (পরবর্তী সংখ্যায় সমাপ্য)

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com