তোমাকে হারায়ে খুঁজি!!

তোমাকে হারায়ে খুঁজি!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বাড়ীর কাছেই কোলকাতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী। বহু পুরোনো শহর। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সময়কার ভারতবর্ষের রাজধানী শহর। ঢাকার এত্ত কাছে; অথচ যাই যাই করেও যাওয়া হয়নি কখনো। অনেক প্লান করেছি; প্রোগ্রাম করেছি। তারপরও যেতে পারিনি। বাড়ীর কাছের এই শহরে না যাবার কথাটি কাউকে বিশ্বাসও করাতে পারিনি। বিশ্বাস না হবারই কথা। প্রবাসীদের এই এক বিড়ম্বনা। বহু দূর দেশে যাওয়া হয় বারবার। বাড়ীর পাশের দেশে যাওয়া হয়না একবারও।

কোলকাতায় যাবার ইচ্ছেটা একেবারেই ভিন্ন। আব্বার কাছ থেকে শহরটির গল্প এত্ত শুনেছি যে, যাবার ইচ্ছেটা ভীষন প্রবল ছিল। কখনো না গেলেও মনে হতো সবই চেনা; সবই দেখেছি। আব্বা সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতেন। চাচা, ফুফু আর আব্বাকে নিয়ে কোলকাতায় দাদা-দাদুর সুখের সংসারের গল্প; সেসব গল্পই করতেন। দাদা এবং আব্বা দুজনেই সরকারী চাকুরী করতেন সেই ব্রিটিশ আমলে। টাকাকড়ির অভাব ছিল না মোটেও। ব্যয়ের চেয়ে দুজনের আয় ছিল ঢের বেশী। 

অনেক গল্পের মাঝে কোলকাতা শহরে বয়ে যাওয়া পদ্মা নদীর উপর পিলার ছাড়া হাওড়ার ব্রীজ অন্যতম। যতই শোনতাম, রোমাঞ্চিত হতাম। এও কি সম্ভব! দুইপাড়ের দুই টানা পিলারের উপর টেনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে হাওড়ার ব্রীজ। মাঝখানে কোন পিলার নেই। অবাক বিষ্ময়ে সব শুনতাম। এছাড়া ছিল বোটানিক্যাল গার্ডেনের গল্প। অগণিত দূর্লভ বৃক্ষে সমৃদ্ধ পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত কোলকাতা বোটানিক্যাল গার্ডেন। বিশেষত গার্ডেনে থাকা তিনশত বছরের পূরনো পৃথিবীর একমাত্র বটবৃক্ষ। যার শিকড়ের সংখ্যাই এখন সাত হাজারের উপরে। সব শিকড়ই কান্ড থেকে মাটিতে এসে মিশেছে। কেউ বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই, কোনটি গাছের গোড়া আর কোনটি শিকড়।

বলা যায়, এসব গল্পই আমাকে উদ্ভুদ্ধ করেছে। উৎসাহিত করেছে বাপ-দাদার স্মৃতি বিজড়িত শহরে যাবার জন্যে। সব ঘুরে ঘুরে দেখার জন্যে। তাই ফুরসৎ খুঁজতাম সকল সময়। গেল বছর সুযোগটা হয়েও গেল। এবং অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুবার গেলামও। আমার শোনিমকে সাথে করেই গেলাম। স্বপ্নের শহর; বাবার কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের শুরুর দিককার স্মৃতিময় কোলকাতা শহর। ভীষন একটা একসাইটেশন নিয়ে যাওয়া। বলা যায় বাবাকে হারিয়ে বাবারই স্মৃতি বিজড়িত জায়গায় বাবাকেই খুঁজতে যাওয়া!

মাঝে মাঝে ভাবি, আমি ঠিক আছি তো! নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাসই কমে যাচ্ছে। কিছুটা পাগল টাইপের মানুষ আমি সেই জন্মকাল থেকেই। তারপরও আবেগ মাঝেমাঝে এত বেশী ভর করে যে সামাল দিতে পারি না। আর ভর করবেই না কেন? আফটার অল বাবা-মা; জন্মদাতা।

তাঁদের কথা দিনে বহুবার মনে পড়বেই। শত ঝামেলায় থাকলেও মনে পড়ে। মনে পড়ে হাজারো কথা; হাজারো স্মৃতি।

সেপ্টেম্বর এলেই খুব বেশী মনে পড়ে আব্বাকে। বিশেষ করে মনে পড়ে তাঁকে শেষ দেখার দিনটির কথা। সকাল থেকেই আনন্দের বন্যা নেমেছে বাসায়। কদিন ধরে চলে আসা আনন্দের ধারা আজ বন্যায় রূপ নিয়েছে। কাছের কিছু মেহমানও এসেছে। সবাই বিদায় দিতে এসেছে। আমি পড়াশুনা করতে বিদেশ যাচ্ছি, তাই ঘটা করে বিদায়ের এত আয়োজন। বিদায় সাধারণত কষ্টের হয়। কিন্তু আমার বিদায়টি আনন্দ এবং খুশীর। সবচেয়ে খুশী আম্মা। বহুদিন পর নিজের হাতে রান্না চড়িয়েছেন। তাতেই ভীষন ব্যস্ত তিনি। পাকঘরে মোটামুটি হৈহুল্লোর বাঁধিয়ে দিয়েছেন।

এত হৈহুল্লোরেও কেবল একজন মানুষ নির্বিকার। খুবই নির্বিকার। আনমনে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। সকালের পত্রিকা নিয়ে বসেছিলেন অনেকক্ষণ। কিন্তু তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই পড়েছেন বলে মনে হয় না। নাস্তাও করেননি। টেবিলে বসেছিলেন। কিন্তু মুখে তেমন দিতে পারেননি। আমি কাছে গিয়ে বসলাম। আরো কাছে টেনে নিলেন। আমার মাথাটি তাঁর বুকে টেনে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে রাখলেন। অসুস্থ মানুষ, দূর্বল শরীর। তারপরেও ধরে রাখলেন। কাঁপা কাঁপা হাতে শক্ত করে ধরে রাখলেন।

দূপুরে একসাথে খেতে বসলাম। নিজের প্লেটে থাকা মুরগীর মাংশের বড় টুকরোটি আমার প্লেটে উঠিয়ে দিলেন। ঠিক ছোট বেলায় যেমনটি করে দিতেন। কোন কথা বললেন না। মাথা নীচু করে খেয়ে গেলেন। বেশী কিছু খাননি। বরাবর আব্বা সময় নিয়ে খান, খুব মজা করে খান। আজকে তেমন কিছুই করলেন না। চুপচাপ খেয়ে উঠে  পড়লেন। আব্বাকে কখনো এতটা নির্বিকার দেখিনি। আজ কেমন যেন! অবশ্য এদিকে কারো নজর নেই। সারা ঘরের এত্তসব আনন্দের মাঝে আব্বার নির্বিকার নির্লিপ্ততা কারো নজরেই পড়লো না।

ভরা বর্ষাকালের বিকেলে সিংগাপুর  এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট। জীবনের প্রথম ফ্লাইট। খাবারের পরপরই রেডী হয়ে বাসা থেকে বের হবো। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শেষে গেলাম আব্বার কাছে। চেয়ারে বসা আব্বাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে যাবো। অমনি পা থেকে আমায় টেনে তুলে আব্বা দাঁড়ালেন। বুকের মধ্যে নিয়ে সদাশান্ত বাবা আমার হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। ডুকরে কাঁদছেন। কাঁদছি আমি; কাঁদছেন আব্বা। এবার বাসার পরিবেশ বদলে গেল। ভারী হয়ে উঠলো বিদায়ের ক্ষণ। একটি কঠিন এবং জটিল বিদায়ের ক্ষণ। অবশেষে আমার ঠোঁটের কোনে কম্পিত ঠোঁটে স্নেহের চুম্বন দিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করো, বাবা! না হলে গ্যাষ্ট্রিক বেড়ে যাবে!! কষ্ট হবে তোমার!!!

কে জানতো এটাই শেষ চুম্বন; শেষ বাণী! এটাই বাবার মুখ থেকে গভীর আদরে শেষবারের মত শোনা বাবা ডাক! আমি ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। কিছুটা অসুস্থ বলে তিনি এয়ারপোর্টে যাবেন না। আম্মা যাবেন। সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে নীচে নামছিলাম আর বারবার পেছন ফিরে ফিরে আব্বাকে দেখছিলাম। দোতলার সিঁড়িঘর থেকে তিনি আমায় দেখছিলেন আর চোখ মুছছিলেন। বাড়ীর সামনের খোলা চত্বরে নামার পরে আব্বাকে আর ভাল করে দেখিনি। মুষলধারে বৃষ্টির ঝাপটায় চারপাশ কুয়াশা ঢাকা চাদরের মত আফছা অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ায় ভাল করে শেষবারের মত আর ওই মুখটি দেখতে পাইনি! দেখতে পাইনি জলে ভরা চোখ দুটোও। প্রকৃতির অঝোরধারা আব্বার অশ্রুধারার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে সেদিন।

বিদেশে আসার ঠিক ৭৫তম দিনে ১৯৯৫ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর, আব্বা না ফেরার দেশে চলে যান। এয়ারপোর্টে যাবার পথে কিছুতেই বুঝতে পারিনি, ফিরে এসে ওই মুখটি আর দেখতে পাবো না! কত আশা নিয়ে প্রথমবারের মত প্লেনে চেপে বসলাম। কতটা উত্তেজিত ছিলাম প্রথম ভ্রমণে। যা দেখছি, সবই নতুন লাগছে। যাত্রী সকল, বিমানবালা, পাইলট। এক অদ্ভুত অনুভূতি। গায়ে চিমটি কেটে দেখছি, স্বপ্ন দেখছি না তো! সিটে বসে একবার বাইরে দেখি, একবার ভিতর। কোন কিছুতেই মন বসছে না। মন আমার পড়ে আছে এয়ারপোর্টে। চিৎকার করে কান্নারত আমার গর্ভধারীনি মা আর বাড়ীর দোতলায় ভেজা চোখে একাকী একমনে দাঁড়িয়ে থাকা বাবা! আমার জন্মদাতা বাবা!! মনে হচ্ছিল বিমানে দাঁড়িয়েও আমার মাথাটি তাঁর বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে ধরে রেখেছেন!!!

বলছিলাম বটবৃক্ষের কথা। বিকেলের হালকা রোদে কোলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনে সেই বৃহৎ বটবৃক্ষটির সামনে শোনিমকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। অবিকল ঠিক সেইভাবে বুকের মধ্যে টেনে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি। শোনিমের সেদিকে খেয়াল নেই। ও বুকে থাকতে চায় না। বুক থেকে নিজকে সরিয়ে নিয়ে ছোটাছুটি শুরু করেছে। ওর মাকে নিয়ে এদিক ওদিক দেখছে। সত্যি এক অদ্ভুত বৃক্ষ। মন জুড়িয়ে যায়। অবশ্য আমার সেদিকে খেয়াল নেই। আমি খুবই আনমনে হারিয়ে গেছি আমার বাবার ছোট্টবেলায়। গল্পে শোনা বাবার দেখা সেই বৃক্ষ, সেই বটবৃক্ষের তলায়! কেবল নেই সেই মানুষেরা!! আমার সকল আপন মানুষেরা!!! 

ঝাপসা চোখে সবাইকে অনুভব করার চেষ্টা করলাম। আমার চোখ জলে ভর্তি। গার্ডেনের ঠিক ধার ঘেষে ধীরে বয়ে যাওয়া গঙ্গার স্রোতেরধারাও যেন হার মানছে। মনে হলো শোনিম বুঝতে পেরেছে। কখন এসে আমার হাতটি ধরেছে টের পাইনি। টের পাইনি কখন আমার খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। ও এখন একটু একটু বাবার ফিলিংস্ বুঝতে শিখেছে। বাবার হাতে হাত রেখে বৃক্ষটি দেখার চেষ্টা করছে।

শোনিম ভাগ্যবান; বাবার হাতটি ধরে বটবৃক্ষটি দেখতে পারছে। দূর্ভাগা এই আমি পারিনি! অনেকটা অকালেই চিরতরে চলে যাওয়াতে বাবার হাতটি ধরে বটবৃক্ষটি দেখতে পারিনি। খুব ইচ্ছে ছিল বাবাকে নিয়ে কোলকাতায় বেড়াবো। তাঁর হাতটি ধরে তাঁরই হারানো শৈশবের বটবৃক্ষের তলায় হাঁটবো। ঠিক আমার শোনিমের মত করে স্মৃতিমাখা বটতলায় তাঁকে বসিয়ে খাইয়ে দেবো। পারিনি! কোন কিছুই পারিনি!! বড় ছোট্ট ক্ষণস্থায়ী আমাদের এই জীবনে আমরা অনেক কিছুই পারিনা!!! 

 

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
সম্পাদকঃ তারেক মিন্টু,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা।

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ নিউ সার্কুলার রোড,
মতিঝিল, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও বাড়ি-৬৩, রাস্তা-১৩,
সেক্টর-১৩, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com