তারাভরা রাতের ধ্রুবতারা!!!

তারাভরা রাতের ধ্রুবতারা!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ করোনার শুরুর দিককার কথা। শোনিমকে দেখতে আমি কেবল পৌঁছেছি কানাডায়। মার্চ মাসের কনকনে কানাডা। ঠান্ডায় একাকার চারিদিক। প্রচন্ড শীতে জমে যাচ্ছে পুরোদেশ। মাঝেমধ্যেই তুষারপাতে দুধের মত সাদা হয়ে যায় প্রকৃতি। এক ভয়াবহ দৃশ্য। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নীচে। এমন দেশে আমি আসতে না আসতেই করোনা জাঁকিয়ে বসেছে। একেকটা দিন যায় আর বাড়ে আক্রান্ত; বাড়ে মৃত্যুর সংখ্যা। পাশের আমেরিকার অবস্থা আরো খারাপ। দিনশেষে আসে শতশত মানুষের মৃত্যু সংবাদ।

টিভিতে চোখ মেলে এসব সংবাদই দেখছি। না দেখে উপায়ও নেই। প্রবাসের বন্দি জীবনে কাজ বলতে কিছু নেই। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের তুষারপাত দেখা আর টিভির পর্দায় সারাক্ষণ চোখ রাখা। চোখ শোনিমের দিকেও রাখি। আড়াল হতে দিতে ইচ্ছে করে না মোটেও। বেশী বেশী কাছে কাছে রাখি। গায়ে গা মাখিয়ে শুয়েবসে থাকি। দূরে সরাতে মন সায় দেয় না। আতঙ্কিত মনে ভয় কাজ করে। প্রচন্ড ভয়। করোনার ভয়। ভয় ভয় মনে প্রায়শই শোনিমকে কোলে নিয়ে রাতভর বসে থাকি।

কোলে নিয়ে বসে থাকার বয়স শোনিমের অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তবুও প্রায়শই বসে থাকি। মনের নিভৃতকোণে জমে থাকা পরস্পরকে হারানোর ভয় বাপ-বেটা দুজনকেই পেয়ে বসেছে। কারোরই রাতে ঘুম হয় না। এবং এভাবেই প্রতিটি নির্ঘুম রাত কেটে ভোর হয়। হয় সুবেহ্ সাদিক। মোবাইলে ফজরের আযানও হয়। বাইরে সব সাদা। রাস্তাঘাট, বাড়ীর ছাদ সব সাদা। সাদাশুভ্র তুষারপাতে সব একাকার। একটা দারুণ রোমান্টিক আমেজ। এমনি আমেজেও কেউ ভাল নেই কানাডায়।

কেবল কানাডা নয়; সারা পৃথিবীর কেউই মোটেও ভাল নেই। অদৃশ্য করোনার ভয়তে সবাই কাবু হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীকেই লন্ডভন্ড করে দিয়েছে এই করোনা। চারিদিকেই আতঙ্ক; কেবলই আতঙ্ক। মৃত্যুর মহাআতঙ্ক আর বিশাল লাশের মিছিল। তাই লড়ছে সবাই। প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে অবিরত। দৃশ্যমান মানুষেরা সব শক্তি দিয়ে লড়ছে অদৃশ্যমান ভয়াবহ শক্তির বিরুদ্ধে। এ এক যুদ্ধ; কঠিন যুদ্ধ। ২য় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ যুদ্ধ।

২য় বিশ্বযুদ্ধের কথা শুনেছি আব্বার মুখে। ১৯৪৫ সন। পরিবারের সাথে আব্বা তখন কোলকাতায়। বৃটিশ আমল। বাপ-বেটা দুজনেই কলকাতায় চাকুরী করেন। সরকারী চাকুরী। দাদা ভাই পোস্টাল আর আব্বা সমাজ কল্যাণে। বৃটিশ রাজত্বে ভারতীয়দের কাছে জাপান-জার্মান শত্রুপক্ষ। কোলকাতায় জাপানী জঙ্গী বিমানের আক্রমণ হয় মাঝেমধ্যে। বার্মার বর্ডার থেকে আক্রমণ চালায়। ইতিমধ্যেই বার্মা ওদের করায়ত্বে। ওখান থেকে হুট করে ঢুকে পড়ে ভারতের আকাশে। একটা দুটা না; জঙ্গী বিমানের বহর ঢোকে।

সে সব জঙ্গী বিমানের শব্দ আগেভাগেই বহু দূর থেকে শোনা যায়। শহরজুড়ে বিকট শব্দের সাইরেনও বেজে ওঠে। বোমারু বিমান আসার সংকেতবাহী সাইরেন। শুনে যে যার মত লুকোবার ব্যবস্থা নেয়। বাংকার কিংবা গর্তে ঢুকে নিজেদের নিরাপদে রাখে। দাদা-দাদু লুকোতেন না। স্বীয় রাজপুত্রর আমার আব্বাকে কোলের মধ্যে নিয়ে বিছানায় বসে দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করতেন। ১৮ বছরের সরকারী চাকুরে কলিজার টুকরোকে এভাবেই আগলে রাখতেন আমার দাদা।

৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দাদা ছিলেন না। ছিলেন আব্বা; পিতৃহারা আমার আব্বা। আর ছিলাম আমি; পিতার স্নেহাধন্য পুত্র। তাঁর কোলজুড়েই ছিলাম। কোলকাতায় নয়, ছিলাম বাংলাদেশের অখ্যাত এক গ্রামে। ময়মনসিংহ থেকে মাত্র ১৮ মাইল দক্ষিণে ধলা গ্রাম। জেলা শহরের কাছাকাছি রেলপথে যাওয়া আসার গ্রাম। কথায় কথায় এক বগীর ট্রেন নিয়ে পাক আর্মি চলে আসতো সেই গ্রামে। জমিদার বাড়ীর আব্বার সরকারী বাসা থেকে দিব্বি দেখা যেত রেলস্টেশন। খাকী পোশাকের মিলিটারী নামছে। এদিক ওদিক হাঁটাহাটি করছে।

বন্ধ জানালার ফাঁক গলে চোখ ফেলে সাংঘাতিক ভয়ানক পাকমিলিটারী দেখতেন আব্বা আর আমাকে আগলে রাখতেন। মুখ চেপে ধরতেন যেন শব্দ না করি। ভয়ে কাঁপুনী ধরে যেত বাসার সবার। আম্মা হায় হায় করে উঠতেন। ভেঙে পড়তেন। আব্বা পড়তেন না। চুপিচুপি পা ফেলে রান্না ঘরে রাখা সদ্য সিদ্ধ করা ডিমের কেটলি দেখতেন। বড় কেটলির এক কেটলি ডিম। মিলিটারী এসে পড়লে পেছন দরজা দিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাবার সময় আব্বা শুধু ডিমের কেটলিটা নিয়ে বের হতেন। কঠিন দুঃসময়েও যেন পরিবারের সবার মুখে কিছু একটু দিতে পারেন এ জন্যেই এমনটি করতেন। যেন আমি ক্ষুধার কথা মুখে আনতেই নিজহাতে সিদ্ধডিম ছুলে আমাকে দিতে পারেন। যুদ্ধের দুঃসময়ের স্মৃতি বড় কঠিন এবং কষ্টময়। কখন কোথায় যেতে হবে, কোথায় থাকা হবে কিংবা কপালে কী খাবার জুটবে; কেউ বলতে পারে না। তাই বাবা আমার সদা সচেষ্ট থাকতেন। হাতছাড়া করতেন না কিছুতেই।

হাতছাড়া করতেন না ডিমের কেটলিও। বাজার থেকে আর কিছু না আনতে পারুন, চাল ডালের সাথে খাঁচাভরা ডিম আনবেনই। এমনিতেও ডিম আব্বার ভীষন পছন্দের। রোজ সকালে দুটো সিদ্ধডিম তাঁর চাইই চাই। ডায়বেটিস হবার পরে ডিমের উপর কড়াকড়ি করা হলো। ভীষন কষ্ট পেলেন আব্বা। একটা ডিম খেতে দেয়া হয় তাঁকে। তাও কুসুম ছাড়া। এতে মানুষটার পেটও ভরে না; মনও ভরে না।

তাই ভিন্ন পথ নেন। মসজিদে ফজর শেষে বাসায় ঢোকার আগে মহল্লার কোন রেস্টুরেন্টে দুটো ডিম সিদ্ধ করিয়ে খেয়ে আসেন। এমন ভাবে আসেন যেন মুখ দেখে কেউ বুঝতে না পারে, তিনি খেয়ে এসেছেন। বেশীদিন পারেননি। বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। তবে বেশী নয়, সামান্য লজ্জা পেয়েছিলেন আব্বা। ডায়বেটিস মানুষের লজ্জাবোধও কমিয়ে দেয়। কমিয়ে দেয় মানসিক শক্তি কিংবা সাহস।

সাহসহীন বাবাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, একদিন মানুষটি আসলেই সাহসী ছিলেন। অন্ধকারকে ভয় পেতেন না। পাক মিলিটারী দেখে আমাদের নিয়ে রাতের অন্ধকারে দৌঁড়ে চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ীতে পৌঁছে যেতেন। জমিদার বাড়ীর অনেক পিছনে চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ী। মিলিটারীর দৌঁড় খেয়ে আপাত আস্তানা এখানেই। শুধু আমরা নই। জমিদার বাড়ীর বাকীরাও পরিজন নিয়ে এখানেই উঠেছেন। এক হুলস্থুল কান্ড।

সবার খাবার জোগাড়ে বাড়ীর সব মহিলারা পাকঘরে রান্নায় সামিল হয়েছেন। মহাব্যস্ত সবাই। ব্যস্ত তোফাজ্জল চেয়ারম্যান সাহেব নিজেও। কাকে কোথায় বসাবেন, শোয়াবেন এসবেই ব্যস্ত। আব্বা ব্যস্ত আমাকে নিয়ে। রান্নার অনেক দেরী বলে কেটলি নিয়ে বারান্দায় বসেছেন। সেই ডিমের কেটলি। আমাকে ডিম ছিলে খাওয়াচ্ছেন আর সন্তর্পনে দূরে চোখ মেলে দেখছেন মিলিটারী দেখা যায় কিনা!

২০২০ সালের করোনা যুদ্ধের আমলে সে সুযোগ নেই। করোনাকে দেখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের পাক মিলিটারী খালি চোখে দেখা গেলেও জঙ্গি করোনাকে খালি চোখে দেখা যায় না। কোন শব্দ নেই, টুটা রা নেই। কখন আসে কিংবা কোথায় ভাসে; বোঝার উপায় নেই। লুকিয়ে থাকলেও লাভ নেই, করোনা ঠিকই খুঁজে বের করে। ইচ্ছেমত যখন তখন যাকে তাকে ধরে। যাকে ধরে আটঘাট বেঁধেই ধরে। আমি আগলে ধরে রাখি শোনিমকে। আমার শোনিম শাহীনকে।

করোনার শুরুতে শোনিমকে নিয়ে গ্রোসারিতে গেলাম। চারদিকে খাবার কিনে মজুদ করার হিড়িক পড়েছে। প্রথমে পাত্তা না দিলেও এক সময় বুঝতে পারলাম। মানুষের ভীড়ে একাকার বিশাল গ্রোসারি শপ। ওর মায়ের দিকে তাকানো যায় না। রাজ্যের বিভীষিকা ভর করেছে চোখেমুখে। সামনে যেটা পাচ্ছে সেটাই ঝুড়িতে তুলে নিচ্ছে। সবার মধ্যে ঝুড়িতে তোলার প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে। সেলফে অনেক আইটেম। কিন্তু ধরার আগেই অন্যজন ধরে ফেলে। এসবে আমি নেই। চোখ আমার শুধু ডিমের খাঁচার দিকে। আব্বার মত করেই ডিম খুঁজছি। মনে আমার কেবল দুটো আব্বা। একজন আছে, আমার সাথেই আছে। অন্যজন নেই; তামাম দুনিয়ার কোথায়ও নেই!

তবে এখনো করোনা আছে; শেষ হয়ে যায়নি। শেষ হয়ে যাইনি আমিও। এখনো বেঁচে আছি। শোনিমকে কোলে নিয়ে বিভীষিকার মুখেও ঠাঁয় বসে আছি। বসে বসে আকাশ দেখছি। গভীর রাতের আকাশ। মহামারীর এই কালরাতে আমাকে কোলে নিয়ে আকাশ দেখার কেউ নেই এই ধরায়! কেউ নেই আকাশের তারা দেখাবার। থাকবে কিভাবে! নিজেই তো আকাশের তারা হয়ে আছেন। তারাদের মাঝেই মিলেমিশে একাকার হয়ে চিকচিক করে জ্বলছেন। সেখান থেকেই দেখছেন আমাকে! আমার শোনিমকে! কেবল দেখছি না আমি তাঁকে!! বারবার চোখ মুছেও দেখতে পাচ্ছি না!!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com