আমার বোন

প্রকাশের সময় : 2019-10-09 18:43:06 | প্রকাশক : Administration
আমার বোন

আমার পৃথিবীর সবচেয়ে আপনজন, আমার ভরসাস্থল; আমার একমাত্র বোন! যে কিনা আমি আঘাত পেলে ব্যথা পায়! আমার সন্তানদের কিছু হলে আমার চেয়ে বেশি ব্যথা পায়।

জন্মের পর থেকে জমজ বোনের মতো আমরা বড় হয়েছি। আমার জীবনে পুরোটাই ওর অবদান। ছোটবেলা থেকেই আমি নাকি খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম আর আমার বোনটি ছিল আমার বিপরীত। যদিও সে আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট কিন্তু সবাই তাকেই বড় ভাবতো। আমাকে সে এত্তো বেশি যত্ন নিত, এত্তো বেশি বেশি করতো যে তার জন্য আমার বন্ধু- বান্ধব, আত্নীয় স্বজন, প্রতিবেশী, শুভাকাঙ্খী সবার কাছেই আমাকে বকা খেতে হতো।

আমি নাকি ওর আদরে মাথায় উঠে যাচ্ছি। আমি কী করবো? আমি  টেবিলে খেতে বসলে ও যে পর্যন্ত পানি ঢেলে না দিতো হাতটি ধোয়ার জন্য বসে থাকতাম, খাবারের ঢাকনা খোলে না দিলে বসেই থাকতাম। আর বোনটি আমাকে এমন অলস বানিয়েছে যে তার জন্য এখন পর্যস্ত মশারী টানানো শিখতে পারিনি। ওকে ছাড়া কোথাও একা যেতে পারিনা, রাস্তা পার হতে পারি না। ডাক্তার দেখাতে গিয়ে রক্ত পরীক্ষার জন্য রক্ত দিতে হলে আমার আগেই সে উহ্ করে উঠে।

বলুনতো এরকম বোন কারো আছে? আমার যতগুলো চাকুরীর আবেদন সবগুলো তারই করা। এখনকার মতো ডিজিটাল পদ্ধতি ছিল না; একেকটা আবেদন অনেক কষ্ট করে করা হতো। ব্যাঙ্ক ড্রাফট/ চালান কত কষ্ট করে যে করা হতো! অবশ্য এসব কষ্টের কোনটাই আমি টের পাইনি। আমি এখনও জানিনা কিভাবে ব্যাংক ড্রাফট করতে হয়, কোথায় কুরিয়ার করতে হয়! আমি যখন বিসিএসে আবেদন করি তখন তার অনার্স কমপ্লিট হয়। আমার জন্য যখন ফরম নিয়ে আসে তখন ওর জন্যও নিয়ে এসে বলল, আপু আমিও করি! কি বলো!!" আমি বললাম, আরে এত সহজ না বিসিএস। তোমার করার দরকার নাই। সে হাসি দিয়ে বলে, "তোমাকে পড়াইতে গিয়েই আমার প্রস্তুতি হয়ে যাবে।"

আবেদন করলো আর আমার মাথাটা নষ্ট করলো। যেখানেই যাই সে আমার পিছনে পিছনে গাইড নিয়ে দৌঁড়ায়। টিভি দেখতে বসি সেখানে বসে পেট পেট শুরু করে। ঘুমাতে যাই মাথার কাছে বসে বলে, "আপু প্লি−জ বকা দিওনা! আমি পড়ি, তুমি শুনতে শুনতে ঘুমাও।"

যাই হোক ২৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি দিলাম। দুই বোনই উত্তীর্ণ হলাম। প্রশ্ন ফাঁসের জন্য পরীক্ষা বাতিল হলো। আবার প্রিলি হলো; আবারো দুই বোন টিকে গেলাম। লিখিত পরীক্ষা হলো দুবোনই উত্তীর্ণ হলাম। কত্তো আনন্দ আকাশে বাতাসে! মৌখিক পরীক্ষার বোর্ড গঠিত হলো। দুর্ভাগ্যক্রমে দুবোনই পড়লাম সেই যে অতি পরিচিত --------- র বোর্ডে। (নাম নাই প্রকাশ করলাম) যার বোর্ডে কিনা টাকা ছাড়া চাকুরী খুবই কম।

আরেকটি কথা বলাই হয়নি। আমার লক্ষী বোনটি কিন্তু খুবই মেধাবী ছিলো এক সময়। (১ম শ্রেণি থেকে কোন ক্লাশে ফার্স্ট বাদে সেকেন্ড হয়নি। ক্লাশ ফাইভে ও এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি প্রাপ্ত। এসএসসিতে ৮০০ র উপরে মার্কস প্রাপ্ত।) যা বলছিলাম ওর ভাইবা চমৎকার হয়েছে। দুদিন পর আমার ভাইবা। ভাইবা শেষে যখন বের হয়ে আসি তখন আবার আমাকে ডাকা হয়। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন দুদিন আগে কি তোমার আরেক বোন ভাইবা দিয়েছে? আমি বললাম, জ্বী স্যার। উনি বললেন, এই কার্ডটা নাও। কন্টাক্ট করবে এই নাম্বারে। কেউ যেন না জানে। ভাইবা বোর্ডে উনার পাশের জন বললেন, খুব সাবধান। যাও এবার।

আমি খুব ভয়ে ভয়ে ভাইবা বোর্ডের চৌকাঠ পেরুলাম। মনে হচ্ছে কেউ যদি দেখে ফেলে তাহলেই আমার সর্বনাশ। বাসায় আসলাম, আব্বা আম্মার সাথে, আমার শুভাকাঙ্খী শিক্ষকদের সাথে এই কথা বললাম। সবাই শুনে বললেন, কোন দরকার নাই কন্টাক্ট করার। তোমাদের ভাইবা ভাল হয়েছে এবং রিটেনে ভালো নাম্বার আছে বলেই এটা করা হয়েছে। আর আমার বাবা! কত্তো সৎ মানুষ! আমার হাত থেকে কার্ডটা নিয়ে নিলেন।

যাক! সব কিছু বলা ঠিক হবে না। ২৪ এর রেজাল্ট হলো। আমারটা হলো; বোনটির হলো না! যোগাযোগ করলে হয়তো দুজনেরটাই হতো। যাক! সেতো মহাখুশি। বলে, "আমি সব সময় চেয়েছি আপুরটা যেন হয়।" আসলে ভাগ্য এমনই। কপালের লিখন, না যায় খন্ডন। বোন আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক। আমার দোষেই সে প্রাইমারীতে আছে। আমার বন্ধু বান্ধব সবাই জানে ও কত্তো মেধাবী। আমার এক বান্ধবীর বড় বোন প্রাইমারিতে পরীক্ষা দিবে। সারকুলার হয়েছে। ওর বড় ভাইসহ আমাদের বাসায় এসেছে নাদিরার কাগজগুলো নিতে। আমি বললাম, না সে তো প্রাইমারিতে পরীক্ষা দেবে না। আমার বান্ধবী বললো, আরে বোকা। আপু পরীক্ষা দিবে তো; তাই আপুকে হেল্প করার জন্য একটু নাদিরাকে দেওয়াবো। ওর কাগজগুলো একটু দে। ফটোকপি করে এখনি দিয়ে যাবো।

পরীক্ষার দিন আমরা কিন্তু জানিই না যে আজকে প্রাইমারী পরীক্ষা। সকাল ৯টায় আমার বান্ধবীর বড় ভাই মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির নাদিরাকে নিয়ে যেতে। রেজাল্ট হলো। দুইজনেরই চাকুরী হলো। আব্বাতো শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। তোমাকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। জয়েন করার কোন দরকার নেই।

আব্বা আম্মা বাড়িতে  থাকেন। আমরা থাকি বাসায় ময়মনসিংহে। আমার বোন বললো, আপু প্লিজ আব্বা আম্মাকে জানাবে না। চাকরীটা করতে থাকি; সমস্যা কী? আমাদের নিজেদের হাত খরচটাতো হয়ে যাবে। চাকরীতে যোগদান করলো তো নিজের ক্যারিয়ারটা শেষ করলো। সে তো আবার বড্ড ভালো মানুষ। কোন ফাঁকিবাজি তার মধ্যে নেই। যেখানেই যায় দায়িত্বটা ঠিকমতো পালন করে। সেই  দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এখন ও প্রাইমারিতে প্রধান শিক্ষক পদেই ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছে।

তার উদারতার কথা সারাজীবন লিখেও শেষ করা যাবে না। এত সাদা মনের, নিরহংকারী, পরোপকারী  মানুষ আমার একজনই। পৃথিবীতে এমন বোন আর দ্বিতীয়টি নেই। সবার কাছে আমার কলিজার টুকরা বোনটির জন্য দোয়া চাই।

নাহিদ আলম, আনন্দ মোহন কলেজ

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com