ধনবাড়ী নওয়াব বাড়ি

প্রকাশের সময় : 2019-10-09 18:48:24 | প্রকাশক : Administration
ধনবাড়ী নওয়াব বাড়ি

টাঙ্গাইল ভ্রমণের যাত্রা শুরু করে ঢাকার জ্যামে এক একটা মিনিট নষ্ট হচ্ছিল, আর আমি ভাবছিলাম, ট্রেনটা না জানি মিসই করি! শেষ মুহূর্তে দৌঁড়ে স্টেশনে গিয়ে দেখি, ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে গেছে মিনিট পাঁচেক আগেই। কত শখ ছিল, ট্রেন স্লো মোশনে চলবে, আর আমি সিনেমাটিক স্টাইলে দৌড়ে উঠব; তা আর হলো না! হতাশ হয়ে ধপ করে বসে পড়লাম প্লাটফর্মেই। পরের ট্রেন ঘণ্টা দুয়েক পরে। মিসড ট্রেনটা পাঁচটা মিনিট লেট না করলে কী হবে, পরের ট্রেন ছাড়তে আধা ঘণ্টা লেট করল। টাঙ্গাইল স্টেশনে যখন এসে পৌঁছেছি, তখন রাত আটটা বাজে। কেয়াকে দেখতে পেয়েই জাপটে ধরলাম। পাঁচ বছর পর দেখা! উচ্ছ্বাস যেন কমেই না! সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল বকবকানি। এই কথা, সেই কথা, কত কথা!

স্টেশন থেকে বেশ দূরেই কেয়াদের বাড়ি। শহরের বাইরে। জনশূন্য নীরব রাস্তা ধরে সিএনজি ছুটে চলছে। আমি মাথা বের করে সামনের রাস্তায় তাকিয়ে আছি। সিএনজির হেডলাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে অনেকখানি। হালকা বৃষ্টিতে ভিজে থাকা পিচঢালা রাস্তাটা চকচকে দেখাচ্ছে। রাস্তার দুপাশে বড়বড় গাছ; সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। নতুন জায়গা। নীরব পরিবেশ। আমার শরীরটা যেন ছমছম করে উঠল।

টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের কাছে ধনবাড়ী উপজেলাটি। এক সময় ধনপতি সিংহ নামে একজন নৃপতি এখানে রাজত্ব করতেন বলে এলাকার নাম হয়েছে ধনবাড়ী। মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাপতি ইস্কান্দার খান এবং তার ভাই মনোয়ার খান এই এলাকার জমিদার ছিলেন। জমিদার ইস্কান্দার খান ও তার ভাই মনোয়ার খানের কবর এবং তাদের নির্মিত মসজিদ এখনও এখানে রয়েছে।

অবশ্য ধনবাড়ীর জমিদারি প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরেক মতবাদ আছে। পাঠানদের পতনের যুগে সেলযুক তুর্কিদের জমিদারি ছিল ধনবাড়িতে। এ বংশের উত্তরপুরুষ ছিলেন রাজা আলী খাঁ। তিনি বিয়ে করেছিলেন শাহ সৈয়দ খোদা বক্সের কন্যা সৈয়দা তালিবুন্নেসা চৌধুরীকে। রাজা আলী খাঁ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তার স্ত্রী তালিবুন্নেসা খোদাবক্সকে ধনবাড়ী জমিদারিতে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তিনিই মালিক হন আলী খাঁর বিশাল জমিদারির।

খোদাবক্সের ছেলে সৈয়দ মাহমুদ খাঁ। (যার মাজার ধনবাড়ীতে আছে) সৈয়দ মাহমুদ খাঁর একমাত্র ছেলে সৈয়দ জনাব আলী মারা যান খুব অল্প বয়সে। তার দুই সন্তান ছেলে সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী এবং কন্যা সৈয়দা সায়েরা খাতুন। সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী বিয়ে করেন বগুড়ার নবাব আব্দুস সোবহান সাহেবের কন্যা আলতাফুন্নাহারকে। আলতাফুন্নাহার নিঃসন্তান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর নবাব আলী বিয়ে করেন ঈশা খাঁর শেষ বংশধর সৈয়দা আখতার খাতুনকে। সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরীর ওয়াকফনামায় নবাব আলী চৌধুরীর তৃতীয় স্ত্রী সাকিনা খাতুনের একমাত্র ছেলে সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী এবং মেয়ে উম্মে ফাতেমা হুমায়রা খাতুনের কথা লেখা আছে, যিনি পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী নির্বাচিত হন। দুই বাংলার প্রথম মুসলিম মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার একমাত্র সন্তান সৈয়দা আশিকা আকবর ১৯৮১ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন নওয়াব আলী চৌধুরী। সিলেটেও নওয়াব আলী চৌধুরী ভবন রয়েছে।

১০০ বছরেরও পুরনো ধনবাড়ী নওয়াব প্যালেসটি রয়েছে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে। খান বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রথম প্রস্তাবক এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রথম মুসলিম মন্ত্রী। তাঁরই অমর কীর্তি এই ধনবাড়ি জমিদার বাড়ি বা নওয়াব প্যালেস।

বংশাই ও বৈরান নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন জমিদার বাড়িটি অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী এবং কারুকার্যে সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এটা দৈর্ঘ্যে এতই লম্বা যে সামনের দিকেই আঠারোটারও বেশি প্রবেশদ্বার রয়েছে। বিশালাকার ছাদটা অসম্ভব সুন্দর কারুকার্যময়। ছাদে ওঠার খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু তালা লাগানো থাকায়, সেটা আর সম্ভব হয়নি।

তবে আমি বলছি আরোও বছর তিনেক আগের কথা। আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন ছিলো ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস। বর্তমানে সৈয়দ নওয়াব নবাব আলী চৌধুরীর জমিদারি ‘নবাব আলী হাসান আলী রয়েল রিসোর্ট সেন্টার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। যে কেউ এখানে এসে বেড়াতে পারেন। পারেন রাত্রি যাপন  করতেও। রিসোর্ট তৈরির পর নবাব প্যালেসে বেড়েছে চাকচিক্য এবং আধুনিকতা।

চার গম্বুজবিশিষ্ট অপূর্ব মোগল স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই শতাব্দী প্রাচীন নবাব প্যালেস। পুরো নবাব মঞ্জিলটি প্রাচীরে ঘেরা। প্রাসাদটি দক্ষিণমুখী এবং দীর্ঘ বারান্দা সংবলিত। ভবনের পূর্বদিকে বড় একটি তোরণ রয়েছে। তোরণের দুই পাশে প্রহরীদের জন্য রয়েছে দুটি কক্ষ। তোরণটি জমিদার নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ গভর্নরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নির্মাণ করেন। প্রাচীরঘেরা চত্বর অংশে আবাসিক ভবন দুটি ছাড়া আরো আছে ফুলের বাগান, চিড়িয়াখানা, বৈঠকখানা, নায়েবঘর, কাচারিঘর, পাইকপেয়াদা বসতি এবং দাস-দাসি চত্বর; যা এখনো দেখা যায় চাইলে।

দর্শনার্থীদের জন্য প্রাসাদের ভেতরের বেশ কয়েকটি কামরা ঘুরে দেখার সুযোগ আছে। তাছাড়া বারান্দাতেও শোভা পাচ্ছে মোঘল আমলের নবাবি সামগ্রী, সেগুলো ছুঁয়ে দেখতে পারেন। মোঘল আমলের আসবাবপত্র আপনাকে মুগ্ধ করবে। তা ছাড়া নবাবি কায়দায় পুরো রিসোর্ট ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা। ইচ্ছে হলে দেখতে পারেন গারোদের সংস্কৃতি ও নাচ। এজন্য আগেই জানিয়ে রাখতে হবে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে। তাছাড়া এখানে আরো দেখতে পাবেন বিলুপ্তপ্রায় লাঠিখেলা। ফিচার ইমেজ: Biddut Khoshnobish

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com