হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৬ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-10-24 12:48:07 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৬ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ নানাভাইয়ের মৃত্যুতে মনের মধ্যে একটা অপরাধী  অপরাধী ভাব বিরাজ করতে লাগলো। কঠিন অপরাধী মনে হলো নিজেকে। একটা মনস্তাত্বিক চাপের মধ্যে পড়ে গেলাম। সারাক্ষণই চোর চোর ভাব। সময়টা খারাপ যাচ্ছিল। খুব খারাপ। মানষিকভাবে আমি যেমনি ভালো ছিলাম না, তেমনি দেশও ভালো ছিল না। একটা বিতিকিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে পড়ে দেশ আর ভালো থাকতে পারেনি। অবশ্য দেশ ভালো না থাকার কারণ আমার নানাভাই নয়। কারণটা স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতি।

অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান হঠাৎ করে নিহত হবার প্রেক্ষাপটে পুরো দেশ তথা কারফিউ মার্কা বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাজনীতি কঠিন একটা ধাক্কা খায়। বলা চলে নড়েচড়ে উঠে। তাঁর শাসনকালের পুরোটাই ঢাকা শহরে রাত ১১টার পর কারফিউ জারী থাকতো। ভোর ছয়টা পর্যন্ত থাকতো। বছরের পর বছর একটা দেশের রাজধানী শহর কেন সারারাত কারফিউতে ঢেকে থাকতো সেটা অন্য ইতিহাস।

আমরা ইতিহাস বুঝতাম না। শুধু বুঝতাম নির্বাচন এসে গেছে দেশে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কী রেডিও, কী পত্রিকার পাতা; সব জায়গাই কেবল নির্বাচন আর নির্বাচন। চারিদিকে নির্বাচনের গরম হাওয়া। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে সারা বাংলায়। সাংঘাতিক তোড়জোড়। আমাদের  দেশে নির্বাচনে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। সার্বজনীন উৎসব। নির্বাচন মানেই গণজাগরণ, নির্বাচন মানেই আনন্দ।

নির্বাচন হবে ১৫ই নভেম্বর, ১৯৮১। আমাদের টেস্ট পরীক্ষার সপ্তাহ দুই পরপরই নির্বাচন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার সরকার দলীয় (বিএনপি) প্রার্থী হয়েছেন। তিনি দলেরও প্রধান। খালেদা জিয়াকে অনেক চেষ্টা করেও প্রার্থী করা যায়নি। দলেও নেয়া যায়নি। সদ্য স্বামীহারা কঠিন শোকে কাতর খালেদা জিয়াকে কেউই রাজী করাতে পারেননি। রথী মহারথী সবাই চেষ্টা করেছেন। অগত্যা রাষ্টের উপরাষ্ট্রপতিকেই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয় দল। ধানের শীষ প্রতীকে তাঁর নির্বাচনী পোস্টারে ছেয়ে যায় পুরো দেশ; পুরো ধলার আশপাশ।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডঃ কামাল হোসেন। নৌকা প্রতীকে তিনি প্রার্থী  হয়েছেন। বয়সে তরুণ এবং অনেকটা রাজপুত্রের মত দেখতে ডঃ কামাল আওয়ামী লীগের খুবই দুঃসময়ে শেখ হাসিনার নমিনেশন পেয়েছেন। এটা তাঁর ভাগ্য। দলের  বাঘাবাঘা সিনিয়ররা মনোক্ষুন্ন হলেও মেনে নিয়েছেন। ফলত সারা বাংলায় পরিচিতি পাবার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেলেন তরুণ আইনজীবি কামাল হোসেন। বয়সে শেখ হাসিনাও তরুণ এবং ছোট। এতটুকুন বয়সে আওয়ামী লীগের মত দলের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে দেশে ফিরেছেন মাত্র।

কেবল দেশে ফেরা নয়, অনাকাঙ্খিত ভাবে দেশের রাজনীতি বুঝে ওঠার আগেই নির্বাচনী মাঠেও নামতে হয়েছে। বলা যায় পরিস্থিতি নামতে বাধ্য করেছে। অগত্যা ডঃ কামালকে সঙ্গে করে সারা বাংলা চষে বেড়ালেন শেখ হাসিনা। নিজ হাতে ধরে ধরে খুব ভাল করে চেনালেন দেশবাসীকে। পরিচয় করিয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহাধন্য প্রার্থীরূপে কামালকে। সবাই খুব কাছ থেকে তাঁকে জানার সুযোগ পেল; চেনার সুযোগ পেল। এদিকে পুরো বাংলাও শেখ হাসিনার বড় চেনা। বাবার মত হাটেমাঠেঘাটে ঘুরে না বেরুলেও এ তো জীবনানন্দের রুপসী বাংলা। তাঁর বাবার রেখে যাওয়া স্বপ্নের সোনার বাংলা।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জোয়ারে সোনার বাংলা এখন উত্তাল। না হয়ে উপায় কি! ৭৯ জন প্রার্থী। যা তা ব্যাপার তো আর নয়। দেশের ইতিহাসে এটা একটা রেকর্ড। এবং এই রেকর্ড আজো কেউ ভাঙতে পারেনি। আর পারবে বলেও মনে হয় না। হেভীওয়েট প্রার্থী থেকে শুরু করে চায়ের দোকানদারও দাঁড়িয়েছেন নির্বাচনে। সিলেটের ছক্কু মিয়া এর মাঝে অন্যতম। তবে হুট করে নির্বাচন তথা রাজনীতিতে এসে বেশী আলোড়ন তুলেছিলেন খেলাফত আন্দোলনের হাফেজ্জী হুজুর।

ধলা রেল ষ্টেশনে গভীর রাতে দাঁড়িয়ে থেকেছি তাঁকে এক নজর দেখার জন্যে। শুধু আমি নই, অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলাম সেদিন। তিনি জানালা দিয়ে মাথা বের করে সামান্য কিছু বললেন। বসে যাওয়া গলায় দেয়া বক্তৃতা ততটা বুঝতেও পারলাম না। বুঝতে পারিনি ডঃ কামালের বক্তৃতাও। তিনিও একদিন শেখ হাসিনাকে নিয়ে মাঝরাতে জানালা দিয়ে মাথা বের করলেন। ভাঙ্গা গলায় কিছু বললেন। আমরা সেসব শুনিনি। কেবল তাকিয়ে ছিলাম। হাজারো মানুষ তাঁকে এবং শেখ হাসিনাকে দেখার জন্যে হা হয়ে তাকিয়ে ছিলাম। জোৎস্না রাতের হালকা আলোয় দেখা তাঁদের মুখ দুটি দেখার জন্যেই তাকিয়ে ছিলাম।

সারা ধলা এবং এর আশপাশ তাকিয়ে থাকে আর কান পেতে শোনে নির্বাচনী মাইকিং এর মজার মজার ভাষ্য। রিকশায় করা মাইকিং এ ফেটে পড়েছে সারা এলাকা। মঞ্জু ভাই ডঃ কামালের পক্ষে সারাদিন মাইকিং করেন। শ্লোগানে শ্লোগানে এলাকা ফাটিয়ে ফেলেন। নিজেই শ্লোগান বানান; সাংঘাতিক মজাদার শ্লোগান। শুনে বিএনপি ক্ষেপে যায়। রেগে যায়। কিন্তু হেকিম মঞ্জু ভাইয়ের মত মজার মানুষের সাথে রাগ করে থাকতে পারেনা।

তখনকার রাজনীতি এখনকার মত এতটা রাগারাগির ছিল না। যথেষ্ঠ মিলমিশ ছিল। দলে ভেদাভেদ ছিল। কিন্তু সামাজিকতায় তার সামান্য প্রভাব ছিল না। ক্লাশের বন্ধুদের মাঝেও মার্কা নিয়ে ভেদাভেদ ছিল। কিন্তু ঝগড়া ছিল না। স্কুলে নির্বাচনী আমেজেই আমরা আসতাম। আমার ভাই, তোমার ভাই জাতীয় কথাবার্তায় মশগুল থাকতাম। অন্য কিছু করতে   ভাল্লাগতো না। ক্লাশও না।

তিড়িং বিড়িংটাও বেড়ে গেল। ভুলে গেলাম আমরা বিদায়ী স্টুডেন্ট। স্কুলের মোষ্ট সিনিয়র। আমাদের আচরণে তিড়িংবিড়িংটা যায় না। একদিন চতুর্থ ক্লাশ চলছে; টিফিন পিরিয়ডের ঠিক আগের ক্লাশ। বিশেষ কোন কারণে পিছনের বেঞ্চে বসতে হয়েছে। শুধু বসেই আছি; কোন কামকাজ নেই। আমার বরাবর ঠিক সামনের সিটে বসেছে রোকন; চারিপাড়ার রোকনুজ্জামান। সাদা ধবধবা ফুলহাতার শার্ট গায়ে বসেছে।

হাতটা পিড়পিড় শুরু করলো। মোক্ষম সুযোগ যায় যায় করছে। যেতে দিলাম না। ফাউন্টেইন কলমের পুরোটা কালি কাজে লাগালাম। কলমটা আস্তে আস্তে ছিটিয়ে ছিটিয়ে পুরো কালিতে ওর শার্টের পিঠের অংশ ভরিয়ে দিলাম। শান্তিমত কাজটি করলাম। সাদা জামাখানি নীল কালিতে একাকার হয়ে গেল। রোকন কিচ্ছু টের পায়নি। টের পেয়েছে ক্লাশ শেষে। ততক্ষণে আমি পগাড় পার। ভারী নিশ্চিন্তমনে করার মত একটা বড় কাজ করে টিফিন পিরিয়ডে বাসায় চলে গেলাম।

টিফিন শেষে মূসা স্যারের জীববিজ্ঞান ক্লাশ। ক্লাশ বসেছে কেবল। অমনি মইজউদ্দীন ভাই হাজির। ওনাকে দেখলে আমার সব সময়ই বুক ধরফর করে উঠতো। পড়তো কলিজায় কামড়। আজো পড়লো। এবং ভয়টা সত্যিই হলো। মূসা স্যারের অনুমতি নিয়ে ডেকে নিয়ে গেলেন আমাকে এবং রোকনকে। ডাক এসেছে হেডমাষ্টার স্যারের কাছ থেকে। সাক্ষাৎ আজরাইলের ডাক।

তৈয়্যব স্যারের রুম রাস্তার পাশ ঘেঁষে। জানালা খোলা থাকলে বাইরে থেকে সব দেখা যায়। ভর দুপুরে বাইরে নির্জন নিরিবিলি। ভাবলাম যা হবার হোক। কেউ না দেখলেই হলো। অবাক কান্ড; স্যার আমাকে ধরলেন না। প্রথমেই রোকনকে ধরলেন। চুলের মুঠি ধরে সন্দি বেত চালালেন ওর সারা শরীরে। যাকে বলে শালশা মাইর। গোটা দশেক বারী তো হবেই। স্যারের কথা একটাই, বন্ধুদের মাঝে এমন একটু হয়ই। তুই বিচার দিলি ক্যান?

রোকনকে ছেড়ে দিয়ে এবার আমার পালা। আজ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ বাঁচাতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে কপাল ভাল। চুলের মুঠি না ধরেই বেতের বারী সপাত সপাত করে পাছায় এবং পিঠে মারতে লাগলেন। বেতের বারী খাওয়ার জন্যে পাছা হলো উত্তম জায়গা। একেকটা বারীতে পাছা জ্বলে জ্বলে উঠছিল। আমি একবার পাছা এদিকে ঘুরাই; একবার ওদিকে। অনেকটা কোমর দুলিয়ে স্লো নৃত্যের মত। এর মধ্যেই চোখ গেল জানালা দিয়ে বাইরে।

হারেস জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আমার দুরবস্থা দেখে হাসছে। দাঁত বের করে হাসছে। হাবি খাঁ চাচার ছেলে হারেস আমার খেলার মাঠের সাথী। ইজ্জত আর রইল না। হেড স্যারের ধোলাই দেবার খবর সারা গ্রাম ছড়াতে আর কাউকে লাগবে না। বড়ই চিন্তার বিষয়। তারপরও শান্তনা আছে। আমার চুলের মুঠি তৈয়্যব স্যার ধরেন নাই। কোন চিহ্ন নেই মাথায়। যা যাবার সব রোকনের উপর দিয়ে গেছে। ওর চুল আউলা ঝাউলা হয়ে আছে। দেখলেই বোঝা যায়।  

আমারটা দেখলেও কেউ বুঝবে না। দেখার কোন সুযোগই নেই। মাইর যা গেছে সব লুঙ্গির নীচ দিয়ে গেছে। অতীব সংরক্ষিত এই নীচতলা ফাটলেই কি, আর রক্তগঙ্গা বইলেই বা কি! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com