হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৮ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-11-21 12:34:17 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৬৮ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ভালবাসা জটিল জিনিস। জনগণের ভালবাসা পেয়েও ডঃ কামাল কিছু করতে পারেননি। তিনি গু হারা হারলেন। গু হারা শব্দটি আধুনিক বাংলা ভাষার একটি বিশ্রী সংযোজন। গু হারা হারার বিষয়টা বাংলা ভাষায় আজকাল খুব ব্যবহৃতও হয়। যত্রতত্র হয়। এত্ত এত্ত ভাল শব্দ থাকতে এই শব্দটি কিভাবে বাংলা ভাষায় এলো, কেমন করে এলো কিংবা কারা আনলো ঠিক জানি না। কিন্তু তাঁর হারার বিষয়টি জানি। তিনি খুব বাজে ভাবেই হারলেন। অবশ্য যেভাবে ভোট হয়েছে তাতে ভালভাবে হারা এবং বাজে ভাবে হারার মাঝে কোন পার্থক্যও ছিল না। ভোটার নিজেই জানতো না তার ভোট কে দিয়েছে। তবে এটা জানতো যে তিনি হারবেনই।

সেভাবেই হেরেছেন। আর জিতেছেন সাত্তার সাহেব। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিতে বিচারপতি সাত্তার অস্থায়ী থেকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন। গেল ছয়টা মাস অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি কথাটি রেডিওতে শুনতে শুনতে কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম। সময়টা তখন সাত্তার সাহেবেরই। মাত্র কয়েক বছর আগের একেবারেই অখ্যাত এক আইনজীবি থেকে হুট করে প্রথমে হাইকোর্টের বিচারপতি; তার পরপরই বঙ্গভবনের ডাকে উপরাষ্ট্রপতি হয়ে যান। আর জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডে এক ধাক্কায় রাষ্ট্রপতি।  

একেই বলে কপাল। এক্ষেত্রে কামাল সাহেবের পোড়া কপাল। রাজনৈতিক জনমটাই তাঁর পোড়া। সেই যে বঙ্গবন্ধু কোর্ট থেকে আদর করে ডেকে এনে খুবই তরুণ বয়সে তাকে মন্ত্রী বানালেন, আর কখনই ওই ধারায় ফিরতে পারেননি। চেষ্টা করেও পারেননি। রাজনীতিতে জীবনভর তিনি এত চালাকী করেছেন, এত পন্ডিতি দেখিয়েছেন যে বঙ্গবন্ধু বিহীন বাংলায় তাঁর ভাগ্যে আর কিছুই জুটেনি।

বঙ্গবন্ধু থাকলেও আর জুটতো কিনা সন্দেহ! তাঁর অতি চালাকীও বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে একটা বিশেষ ইতিহাস। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে অনেক বিতর্ক, অনেক প্রশ্ন থাকলেও ডঃ কামাল বিচারপতি সাত্তারের সাথে গু হারা হার সহজভাবে মেনে নিলেন। আওয়ামীলীগের নীতির সাথে বিরোধিতা করেই মেনে নিলেন। এবং মানার দু’দিন পরে আবারও কেটে পড়লেন। ফ্লাই করে বরাবরের মত সোজা লন্ডন গিয়ে উঠলেন। বাংলাদেশে একমাত্র রাজনীতিবিদ উনি, যাকে নিয়ে পত্রিকায় বহুবার নিউজ হয়েছে ঠিক এই টাইটেলে, ‘ডঃ কামাল চলে গেলেন!'।

সময়টা তখন খুব খারাপ বাংলাদেশের। কেউ থাকতে চায় না দেশে। কামালের মত সবাই শুধু দেশ ছেড়ে চলে যায়। তবে ওই সময়টায় ডঃ কামালদের ছাড়া বাংলা চললেও, লান্ডির মাল ছাড়া দেশ চলতো না। লান্ডির মালে পুরো দেশ তথা ধলা বাজার তখন টইটুম্বর। শীত পড়েছে বেজায়। গ্রাম বাংলা কাঁপছে প্রচন্ড শীতে। এ অবস্থায় একমাত্র ভরসা লান্ডির মাল। সাত সকালে বাইরে আগুন জ্বালিয়ে কিংবা রাতে লেপকাঁথা মুড়ি দিয়েও শীত সামাল দেয়া যেত না।

লান্ডির মাল লাগতোই। লান্ডির মাল হলো বস্তায় বস্তায় বিদেশ থেকে চেয়ে আনা বিদেশীদের ব্যবহার করা পুরোনো কাপড়। বেশী আসতো শীতকালের গরম কাপড়। পুরো জাতিকে বাঁচানোর জন্যে এর কোন বিকল্পও ছিল না। সোয়েটার, জাম্পার, প্যান্ট, ভারী কাপড়ের জামাসহ কত কি! বেশী আসতো উলের জাম্পার। একেকটা একেক সাইজের। কোনটা বিশাল বড়; কোনটা বেজায় ছোট। বেসাইজের জাম্পার হলে উল খুলে ঘরে ঘরে মা-বোনেরা শলার কাঠি দিয়ে নতুন জাম্পার বানিয়ে নিত।

ধলা বাজারে অন্তত দুই জায়গায় লান্ডির মাল বেঁচাকেনা হতো। যেদিন ঢাকা থেকে ধলায় কাপড়ের লট আসতো, সেদিন একটা খুশী খুশী ভাব থাকতো সবার মনে। খোলার সময় সবাই ঘিরে ধরতো। কেউ কিনুক বা না কিনুক, দেখার তৃপ্তি থেকে কেউই বাদ যেত না। শুধু দেখা নয়, ধরেও দেখতো। আমিও দেখতাম। ধরে ধরে দেখতাম, গায়ে দিয়ে মিলাতাম। ঘ্রাণ নিতাম। খুব পছন্দ ছিল হাতাকাটা সোয়েটার। দু’একটা ভারী পছন্দও হতো। কিন্তু কিনতে পারতাম না। এখনকার মত তখনকার দিনে চাইলেই সব কেনা যেত না।

তবে অন্য একটা বিশেষ কাজ বেশ ভালভাবেই করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। কাজটা ভাল না হলেও করার আনন্দটা বেজায় অন্য রকম। টেস্ট পরীক্ষার পরপরই স্যারদের বিশেষ পরামর্শে বেশ কিছু শিক্ষার্থীর দল স্কুল নয়; ধলা বাজারে এসে বাসা করে থাকা শুরু করলো। এজন্যেই এমনটা করলো যেন স্যাররা দিনরাত সব সময় সবাইকে অনেক বেশী গাইড করতে পারেন। অনেক বেশী নজর দিতে পারেন।

স্যারদের নজরে আমি তিন বছর আগ থেকেই ছিলাম। একা একাই ছিলাম। এবার আমার পোয়া বারো হলো। অনেকগুলো সঙ্গী জুটলো। মোশাররফ, শফিকুল, আজিজুল উঠলো আমার ঘরের সামনেই খোকন মোড়লের ঘরে। তিনি ওদের আপন চাচা। তাঁর কাপড়ের ঘর। ওখানেই ওদের পড়া আর থাকার ব্যবস্থা হলো। খাবার আসে বাড়ী থেকে। ওরা বাড়ীর খাবার খায় আর দিনরাত শুধু পড়ে আর পড়ে।

ওদের পড়ার আওয়াজ আমার ঘর থেকে শোনা যায়। সন্ধ্যের পর শুরু হলে আর থামে না। ওদের মাঝে আজিজুল একটু ব্যতিক্রম। পড়ে আধাঘণ্টা আর ঘুমায় একঘন্টা। নাক ডেকে ঘুম। বসে বসেই ঘুমায়। তবে শফিক-আজিজুল যেমন তেমন; মেশাররফ সিরিয়াস। কোন কিছুতে কোন ফাঁকি নেই। টানটান উত্তেজনা নিয়েই পড়তে বসে। না বসে উপায়ও নেই। ওর বাবা তফাজ্জল চেয়ারম্যান সাহেবের জন্যেই সিরিয়াস। তিনি বেজায় কড়া।

এবং ত্যাড়া। তার হাতে পড়লে খবর করে ছাড়েন। আমি ওদের বুঝাই। এত পড়া দিয়ে কী হবে? মরলে কি পড়া সঙ্গে যাবে? যাবে না! বড়ই ক্ষুদ্র জীবন। পড়ার পাশাপাশি একটু ফুর্তিটুর্তিও তো দরকার। শুনে ওরা মাথা নাড়ায়; সম্মতি দেয়। আবার ভয় পায়। একদিন ওদেরকে সব খুলে বললাম। বললাম, পড়াশুনা যা করার রাত বারোটার মাঝেই শেষ করো। মিশন আছে; মিশনে যেতে হবে। জীবনটাকে উপভোগ করার এখনই সময়। যা করার তা এই সুযোগেই করতে হবে।

বিষয়টা ওদের আরো ভাল করে বুঝিয়ে বলে রফিজ, কবির আর মোখলেস। খোকাও বাদ থাকেনি। নেতৃত্ব রফিজের। তাই কোন চিন্তা নেই। যোগাড়যন্ত যা করার তা ওর নেতৃত্বেই হবে। শুধু তথ্য এনে দেবে খোকা। আর গাছে উঠবে কবির। চিকনা -চাকনা লম্বাচূড়া লুৎফুল কবির গাছে ওঠায় পটু। যেমনি দিনে ভাল উঠতে পারে, তেমনি রাতেও।

পাহারার কাজে নিয়োগ পেল মোখলেস আর টোকানোর কাজে আমি। অপারেশন শুরু হলো। প্রথম দিনের প্রথম স্পট হেডস্যারের বাসা। রাত বারোটার পরপরই ‘আমরা ৮জনা’ বেরিয়ে পড়লাম। হেডস্যারের বাসা পর্যন্ত যেতে হয় না; ধলা পোস্ট অফিসের পাশেই গাছটা। মাঝামাঝি লম্বা খেজুর গাছ। বিকেলে গাছি এসে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে গেছে। হাঁড়ি তেমন বড় না। তবে প্রথম কাটার রস। সেই রকম টেস্ট। বোর্ডিং এর পেছনে রাস্তার ঠিক উলটো পাশে বসে রস সাবার করলাম।

মোশাররফের খুশীতে আর ধরে না। ও তো দারুণ একসাইটেট। ঠিক হলো পরদিন ডাবের অপারেশন হবে। স্থান ঠিক করে ফেললাম। ওর চাচা; মানে, খোকন মোড়লের বাড়ীর ডাবই উত্তম হবে। গাছ ছোট কিন্তু ডাব বড় বড়। এরচেয়ে ভাল জায়গা আর কোথায়ও নেই। একটা জাম গাছের পাশ ঘেষে পুকুর ধারের ডাব গাছ। মোড়ল সাহেবের বাড়ীর একদম সামনেই।

জাম গাছ বেয়ে কবির উঠে গেছে ডাব গাছের একদম চূড়ায়। ছাগল বাঁধার মোটা রশিও উপর থেকে বেঁধে আমার হাতে আনা হয়েছে। ডাবের ছড়ি কাটবে আর রশিতে ছেড়ে দেবে। চিড়চিড় করতে করতে সব ডাব আমার হাতে আসবে। আমি দাঁড়িয়েছি পূর্বদিকের নীচু জমিতে। আজিজুল আমার সাথে। রফিজ, খোকা গাছের তলায় আর শফিকুল-মোশাররফ রাস্তা পাহারায়।

ওদের দু’ভাইয়ের তীক্ষ্ণ নজর খোকন চাচার ঘরের দিকে। বড় চেনাজানা ঘর ওদের। চেনাজানা ওদের চাচাকেও। রফিজের ইঙ্গিতে কবির ডাবের একটা ছড়া কেটে রশিতে ফেলেছে। ওয়াও! দারুণ। চিড়চিড় করে ডাব নীচে নেমে আসছে। কেমনে সেসব কাটবো আর খাবো আমি ভাবছি সেসব। হঠাৎ খোকন চাচার ঘরে আলো জ্বলে উঠলো। দরজা মেলে চাচা বের হলেন। হাতে তাঁর টর্চলাইট।

কবির তখনও গাছের চূড়ায়। থাকে থাকুক। ওসব ভেবে লাভ নেই। আমাকে দৌঁড়াতে হবে। কঠিন দৌঁড়। অন্ধকারের হালকা আলোয় মাটি মাড়িয়ে, কাঁদা ডিঙ্গিয়ে ধলা জমিদার বাড়ীর কবরস্থানের দিকে দৌঁড়াচ্ছি। দৌঁড়াচ্ছে আজিজুলও। ও বেজায় মোটা; দৌঁড়াতে কষ্ট হয়। তবুও থামাথামি নেই। দুনিয়া গোল্লায় যাক। জাহান্নামে যাক সদ্য কাটা ডাবের ছড়া। তবুও দৌঁড় থামানো যাবে না। চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com