পেঁয়াজের সাত কাহন

প্রকাশের সময় : 2019-12-04 10:35:00 | প্রকাশক : Administration

সিমেক ডেস্কঃ পেঁয়াছের ঝাঁজ নিয়ে লিখেছেন অনেকেই। আমরা তিনটি লেখার সংকলিত অংশ প্রকাশ করলাম।

সাব্বির আহমেদঃ পেঁয়াজ নিয়ে প্রতিক্রিয়ায় আমরা যে হিউমার দেখিয়েছি তাতে বাঙালি জাতির প্রতি আমার শ্রদ্ধা বহুগুণ বেড়ে গেছে। পত্রিকায় দেখলাম ধামরাইয়ে এক জামাই মিষ্টির বদলে এক বাক্স পেঁয়াজ নিয়ে শশুর বাড়ি বেড়াতে গেছে; খবর পেয়ে এলাকাবাসী তাকে দেখতে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন কেবল পেঁয়াজ আর পেঁয়াজ। বেশিরভাগই উঁচু শ্রেণির হিউমার। একজন দেখলাম এনগেজমেন্ট রিং এর ছবি দিয়েছেন, সেখানে ডায়মন্ডের বদলে পেঁয়াজ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের রফারেন্স দিয়ে একজন পোস্ট দিয়েছেন, পেঁয়াজ-রসুন খেলে চিত্তের চাঞ্চল্য বাড়ে; মানুষ হিসেবে পরিশুদ্ধ থাকতে চাইলে তাই পেঁয়াজ না খাওয়াই ভালো। আইসক্রিমের বাক্সে পেঁয়াজ খোঁজা আর পেঁয়াজের বাক্সে আইসক্রীম এ স্টোরিটাও দারুণ হিট হয়েছে।

পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে নিজেও হিউমারের খপ্পরে পড়েছি। পেঁয়াজের দাম ২৫০ টাকা শুনে ৫০০ গ্রাম কিনবো নাকি ২৫০ গ্রাম তা নিয়ে ছেলের সঙ্গে পরামর্শ করছিলাম। দোকানি বললো, ‘স্যার এক কেজি নেন। তাইলে মনে থাকবে যে আড়াইশ টাকা কেজি পেঁয়াজও খাইছিলেন।’ দোকানি মজা পাচ্ছে। জয়তু বাঙালি!

পেঁয়াজ নিয়ে আমরা দুঃখ পাওয়ার বদলে আনন্দ পাচ্ছি। বিষয়টা খুব বিভ্রান্তিকর। পেঁয়াজ বস্তুটাই মনে হয় বিভ্রান্তির ভান্ডার। পেঁয়াজ কি মশলা, নাকি  ভেজিটেবল- এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিভ্রান্তি। পেঁয়াজের দাম বাড়ার পেছনে কতোটা অর্থনীতি দায়ী, আর কতোটা অনৈতিকতা, তা নিয়ে বিভ্রান্তি। পাইকার-দোকানদারদের ধর-পাকড়- জরিমানা করলে পেঁয়াজের দাম কমে, নাকি আরো বাড়ে তা নিয়েও অনেকের বিভ্রান্তি।

ভারতে এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম ৪০ রুপি থেকে ১০০ রুপিতে উঠেছে। মালদ্বীপে কেজি প্রতি ০.৭০ ডলার থেকে একলাফে দাম উঠে গিয়েছিল ৩.১২ ডলারে। নেপাল আর শ্রীলংকাতেও পেঁয়াজের দাম বেশ অস্থিরতা দেখাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় কয়েক মাস আগেও দাম ছিল কেজি প্রতি ১ ডলার; তা ৩.৫০ ডলারে উঠেছে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে পেঁয়াজের বড় উৎপাদক অঞ্চল ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রে গেল সিজনে উৎপাদন কম হয়েছে।

বলা যায়, পেঁয়াজ রপ্তানিকারক দেশ ভারতে এবার পেঁয়াজের ঘাটতি হচ্ছে। ঘাটতির আশংকাতেই ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। শুধু তাই নয়, এক লক্ষ টন পেঁয়াজ আমদানিও করছে। পেঁয়াজের আরেক রপ্তানিকারক দেশ চীনেও ২০১৯ সালে ফলন কম হয়েছে। তা অবশ্য আবহাওয়ার কারণে নয়; অর্থনৈতিক কারণে। গত বছর বাম্পার ফলন হওয়ায় কৃষক ঠিকমতো দাম পায়নি ফলে চীনের অনেক কৃষক এবার পেঁয়াজ চাষ করেনি। যার কারণে এ বছর উৎপাদন কমেছে।

ভারত আর চীন থেকেই মূলত পেঁয়াজ আসে। ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়লে তার ঢেউ সাথে সাথে বাংলাদেশে লাগে। ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় আর চীনে উৎপাদন কম হওয়ায় বাংলাদেশ বেশ সমস্যায় পড়েছে। আমদানির জন্য মিশর, তুরস্ক, পাকিস্তান বা মিয়ানমারের দিকে তাকাতে হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো, মিশর- তুরস্ক-ইরানের রপ্তানিযোগ্য সরবরাহ সীমিত। আবার বৈশ্বিক উৎপাদন কম হওয়ায় ভারত, মালয়েশিয়াসহ আরও অনেকে পেঁয়াজের জন্য এসব দেশের দিকে নজর দিচ্ছে। তারাও তাই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। আশার কথা, এ মাসের শেষ থেকে বাংলাদেশ ও ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন অল্প অল্প করে শুরু হবে। তখন দাম কিছুটা কমে আসবে।

প্রভাষ আমিন: পেঁয়াজও আমাদের অপরিহার্য সবজি নয় বলে সংকট যতোটা জটিল প্রভাব তেমন পড়েনি। পেঁয়াজ সংকটের তুলনায় গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হৈচৈ বেশি হয়েছে। তবে পেঁয়াজ সংকটের চেয়েও ভয়ংকর হলো সংকট সৃষ্টির সক্ষমতা। যারা বাজারে সরবরাহ কম থাকার সুযোগে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পেঁয়াজের দামে বিশ্বরেকর্ড করে ফেললো, এটা একটা টেস্ট কেস হতে পারে। তারা বুঝিয়ে দিলো চাইলে তারা সব কিছু নিয়েই এমন সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় শঙ্কার কথা হলো, এখন চালের বাজারে সংকটের হালকা সতর্ক বার্তা শোনা যাচ্ছে। আমরা কি পেঁয়াজ থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই চালের বাজারে সতর্ক হবো? আমার কিন্তু যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমাদের সবগুলো মন্ত্রণালয়ের আলাদা আলাদা দায়িত্ব আছে। কখন কোন ফসল চাষ হচ্ছে, কোথায় ঝড়ে কোন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কোথায় বন্যায় ফসল ডুবে যাচ্ছে, কোথায় বাড়তি সেচ লাগবে, সার লাগবে এটা অবশ্যই কৃষি মন্ত্রণালয়কে জানতেই হবে। এটাই তাদের কাজ।

খাদ্য মন্ত্রণালয়কে জানতেই হবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা, মজুদের অবস্থা। সে অনুযায়ী তারা সিদ্ধান্ত নেবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানতেই হবে কখন কোন পণ্য আমদানি করতে হবে। এমনকি একই পণ্য কখনো আমদানিতে উৎসাহ দিতে, কখনো বিমানে আমদানি করতে হয় আবার কখনো আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে হয়। এই টাইমিংটা ঠিক করাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ।

যেমন এখন যে পেঁয়াজ বিমানে করে আনতে হচ্ছে। ঠিক বিশ দিন পর কিন্তু আবার পেঁয়াজ আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ করতে হবে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই যখন নতুন দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসবে তখন আমদানিতে রাশ টানতে না পারলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন আবার কৃষকরা দাম না পেয়ে হাহাকার করবে। প্রতিবছরই একই ঘটনা ঘটে।

পেঁয়াজ সংকট যেটা হয়েছে, আগে থেকে সতর্ক থাকলে সেটা এড়ানো যেতো। এখন যে অবস্থা তাতে পাইপলাইনে থাকা পেঁয়াজ আসলে এবং নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসলে শিগগিরই এই সংকট কেটে যাবে। কিন্তু আমরা যেন পেঁয়াজের সংকট থেকে শিক্ষা নেই। যেন ভবিষ্যতে চাল, পেঁয়াজ, আটা, তেল- কোনো নিত্যপণ্য নিয়েই কোনো সংকট তৈরি না হয়। এই সংকট থেকে এই হোক আমাদের শিক্ষা।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানঃ আমদানি করা পেঁয়াজ যদি দেশের মানুষ ২৮০ টাকায় কিনতে পারে তাহলে দেশীয় পেঁয়াজ যা এ দেশের কৃষকেরা পরিশ্রম করে উৎপাদন করে তার ন্যায্য মূল্য কেন পাবে না। জনগণ ২৮০ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনতে পিছপা হয়নি। দেশে কোথাও এমন নজির সৃষ্টি হয়নি যে দেশের কোনো মানুষ ২৮০ টাকা কেজি প্রতি দর হওয়ার পরও পেঁয়াজ কিনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বা ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে বাদ-বিবাদ হয়েছে বা জনগণ প্রতিবাদে বাজারে কোনো প্রকার সংকট সৃষ্টি করেছে। তার মানে প্রতি কেজি পেঁয়াজের মূল্য ২৮০ টাকা দেশের মানুষের কাছে সহনীয়। অর্থাৎ পেঁয়াজের কেজিপ্রতি বিক্রয়যোগ্য মূল্য ২৮০ টাকা ।

হয়তো এর চেয়ে বেশি হলেও জনগণ মানতে রাজি। এই যখন পেঁয়াজের মূল্যবোধ বা ন্যায্য মূল্য বা দেশের মানুষের কাছে সহনীয় মূল্য তাহলে দেশের কৃষক উৎপাদন করে কেন কম মূল্যে কৃষকের উৎপাদিত পেঁয়াজ বিক্রি করতে কৃষককে রাষ্ট্র বাধ্য করবে? ২৮০ টাকা বিক্রয় মূল্য থেকে বাজারজাতকরণ খরচ প্রয়োজনে ২০ শতাংশ বাদ দিয়ে কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম ২২০-২৩০ টাকা নির্ধারণ করা হোক যাতে কৃষক পেঁয়াজ চাষ করতে উৎসাহিত হয়। -ফেসবুক থেকে

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com