বিয়েশাদীর কালচার এবং সামাজিক আলসার- ২

প্রকাশের সময় : 2019-12-18 11:14:06 | প্রকাশক : Administration
বিয়েশাদীর কালচার এবং সামাজিক আলসার- ২

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ পুরোনো দিনগুলোর বড় সুন্দর ভাষা আর সুন্দর কথামালার কার্ড এখন আর নেই! মন খুলে দাওয়াত কার্ড লেখার দিনও নেই। যেমনি নেই মন ভরে দাওয়াত দেবার দিনও। কার্ডের বিষয়টি এখন আর আন্তরিকতায় নেই। অনেকটাই দেখানোর বিষয় হয়েছে। হয়েছে ধরণে আধুনিক এবং গড়নে অপরূপ। দেখতে রঙচঙা এবং খরচে দামী। কেবল নেই এর ভিতরকার প্রাণময় আবেদন আর মনোময় আকুতি। এসবে আর মানুষের নজর নেই। মানুষ নজর দিয়েছে কার্ডের আঙিকে।

অবশ্য এসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায় মানুষদের। ওসব এখন করে ভাড়াটে ইভেন্ট কোম্পানী। ভাবনাগুলো সব ওদেরই। যাদের বিয়ে তাদের ভাবনা অন্য বিষয় নিয়ে। নানা ধরণের ভাবনা। এবং ভাবনার অন্যতম বিষয় হলো বিয়ের উপহার। কী দেবো আর কী পাবো এটা যেমনি ভাবনার বিষয়; তেমনি অনুষ্ঠানে কী কী উপহার পাবো এটাও। দাওয়াতী দাওয়াত দিয়েই হিসেব মেলাতে বসেন। মূল হিসেব একটাই। অনুষ্ঠানে দাওয়াতী আসবে কম; তুলনায় উপহার আসবে বেশী। বিয়ের খরচের একটা মোটা অংশ এখান থেকে তুলে আনতে হবে।

যেন বিয়ের আয়োজন নয়; মেলায় স্টল নিয়ে সিজনাল ব্যবসার আয়োজন। এই ব্যবসার ইনকামের একমাত্র আইটেম হলো তথাকথিত উপহার। আর সংগ্রহ করতে হবে দাওয়াতী মেহমানদের কাছ থেকে। আগের দিনে উপহার হিসেবে ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিষাদিই ছিল একমাত্র উপহারপণ্য। এখন সময় বদলেছে। তালিকায় নানা পণ্য যোগ হচ্ছে। বিশেষ করে যোগ হয়েছে ক্যাশ অথবা গোল্ড। মেহমানের হাতে র‌্যাপিং পেপারে মোড়ানো বড় বড় গিফটবক্স দেখলে আয়োজক এখন আর খুশী হন না। ছোট প্যাকেট খোঁজেন। ছোট প্যাকেট আশা করেন।

আশাটা এ রকম যে বিয়ের খরচাটা মোটামুটি যেন উঠে। একদিকে আনন্দও করা গেল, আবার সমাজও রক্ষা হলো। সর্বোপরি জাতে উঠতে তেমন খরচা লাগলো না। বিয়ে নিয়ে এমন বিশ্রী কালচার গড়ে ওঠার মূল কারণটাই এখানে। তথাকথিত এই জাত রক্ষার মনোভাবই আমাদেরকে পিছিয়ে দিচ্ছে দিনকে দিন। ছোটবেলায়ও জাত নিয়ে ভেদাভেদ দেখতাম। ওটা ছিল হিন্দু মুসলমানের জাত। হাটে মাঠে কিংবা ঘাটে, এরা সব কাজ একত্রে বসে করতে পারতো। কেবল পারতো না এক জায়গায় বসে একত্রে চারটে খেতে।

তাহলেই জাত যায় যায় করতো। তাই বিয়ে বাড়ীতে হিন্দু মুসলমানের জন্যে আলাদা প্যান্ডেল, আলাদা টেবিল। এবং অবশ্যই আলাদা ম্যানু। শহর এলাকায় এখন আলাদা প্যান্ডেল, টেবিল কিংবা ম্যানুর কোন বালাই নেই। এক সাথে বসেই খাওয়া দাওয়াটা করতে পারে। আলাদা বসার চিন্তাও কেউ করে না। কোথাও কোন সমস্যাও হয় না। কেবল গরুর আইটেম নিয়ে আয়োজক একটু সতর্ক থাকলেই যথেষ্ঠ। ধর্মীয় জাত নিয়ে সমস্যাটা শহর এলাকায় নেই। তবে শহর কিংবা গ্রাম, সব জায়গায় অর্থনৈতিক বৈষম্যের জাতভেদ এখন প্রকট। সাধারণ অতিথি আর ভিআইপির জন্যে আলাদা ব্যবস্থা। টেবিল, ম্যানু সব আলাদা।

আলাদা খাবারের পরিমাণেও। যাকে বলে কঠিন অসামাজিকতা। আয়োজকদের সামান্য সেন্সও এখানে কাজ করে না। লোক বুঝে বেশীকম দেয়। কাউকে একটা রোস্ট কাউকে আবার দু’টো। একই টেবিলে ৮ জনকে একই মাপে আপ্যায়ন করে না। নির্লজ্জের মত কাউকে কাউকে বেশী সম্মান দেয়; দেয় বেশী খাবার। ইচ্ছেমত ঢেলে দেয়। একাধিক রোষ্ট দেয়। মুরগীর একটা বাড়তি ঠ্যাং দিয়ে সম্মান জানানোর এই অদ্ভুত রীতি বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোথায়ও নেই। আজকাল আমাকেও দেয়। পাশে তিনজন বেয়ারা দাঁড় করিয়ে রাখে। আগে রাখতোওনা; দিতও না।

আগে মানে অনেক অনেক আগে। তখন দিত মেপে মেপে। হিসেব কষে। পারলে না দিয়ে ছাড়তো। মুরগীর রান দেবে দূরের কথা; দিত বুকের খাঁচা। ভাঙা, আধা ভাঙা। মাংশের চেয়ে হাড্ডি বেশী। এখন ভরে দেয়; দু’টো রান দিয়ে প্লেটের এ মাথা ও মাথা ভরে দেয়। আস্ত মুরগীও দেয়। খেতে পারিনা; তবুও জোর করে দেয়। পাশে বড় প্লেটে আরো দু’টো রেখেও দেয়। বিব্রত হই, অসহ্য লাগে। লজ্জাও লাগে। এসবে কারো নজর নেই। জোরাজুরি চলতেই থাকে। পাশের টেবিলে কোন জোরাজুরি নেই। মাপা খাবার বেয়ারা রেখে দিয়ে চলে যায়। অনেকটা অবজ্ঞা ভরেই চলে যায়। কেউ খবরও রাখে না। যায় ও না ওদের টেবিলের দিকে।

ছেলেবেলায়ও আমার কাছে কেউ কোনদিন আসেনি। পোলাপানের আবার খবর কি? ওদের এত কী লাগে! তাই খবরও কম; পোলাও মাংশও কম। শুধু পোলাপান নয়; গরীব দুঃখীদেরও একই অবস্থা। আমরা তাও ঘরের ভিতরে চকিতে বসে খেতে পারতাম। ওরা বসতো বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে। ওদের প্রতি আচরণটাই ছিল অবহেলার। একবার ধলা বাজারে খেতে বসেছি আমরা ঘরে বাইরে মিলিয়ে। বাজারে বড়বড় মালামাল কাঁধে করে টানার একমাত্র মানুষ কাছুর বাপ। সেও বসেছে।

চলছে খাবার পর্ব। বেচারা বেশ খেতে পারতো। একটু যাতে বেশী খেতে পারে, যাতে বেশী ভাগে পায় সেজন্যে চেষ্টাও করতো সব সময়। চোখ রাখতো ভিতর ঘরে সমাজের বড়রা কে কি করে, কে কিভাবে খায়। ওইদিন একটা বিষয় তার কাছে বেশ স্পষ্ট হলো। ভিতর ঘরে সমাজের মাথাদের যখনই খাবার নিয়ে সাধাসাধি করা হয়, সব সময় তারা “না, না, লাগবে না, লাগবে না” করে। তারা যত না, না করে আয়োজকগণ ততই তাদের প্লেট ভরে দেয়।

“কৌশলটা তো বেশ” ভেবে কাছুর বাপ নিজেই কাজে লাগাবার চেষ্টা করলো। বল ভর্তি মাংশ নিয়ে কেউ যখন তাকে দিতে আসলো, খাবার প্লেটে দেবার আগেই সে “না, না, লাগবে না, লাগবে না” বলা শুরু করলো। ফল হলো উল্টো। না করাতে লোকটি সামান্য খাবারও কাছুর বাপকে না দিয়ে পরের জনার কাছে চলে গেল। বোকা বনে গেল কাছুর বাপ। পরিস্থিতির মোকাবেলায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেউ কাছে আসছে না। কেউ তাকিয়েও দেখছে না। কষ্টে দুঃখে এক পর্যায়ে চিৎকার করে কাছুর বাপ কেঁদে উঠলো। হাতের প্লেটখানা দূরে নিক্ষেপ করে শুধু বললো, “হায়রে না! তর এত্ত রূপ! লাগবো না, লাগবো না কথাগুলাইন খালি বড়লোক মাইনষের। আমরার মত গরীব ফহিন্নীর না।”

আসলেই বিয়ে বিষয়টির আনুষ্ঠানিকতা মধ্যবিত্তের জন্যে নয় মোটেও। যাদেরকে হিসেব কষে কষে সংসার চালাতে হয়, বিয়ে নামক অনুষ্ঠানের কালচারটা তাদের জন্যে হতে পারে না। ছোটবেলায় যে মাসে আমাদের একটা বিয়ের দাওয়াত থাকতো, সে মাসের শেষ সাতদিন বাসার খাবারের ধরণ বদলে যেত। মাংশ দূরের কথা; গুড়া মাছ খাওয়া লাগতো। তাও আবার প্রতিদিন নয়। মাঝে সবজি-ডাল কিংবা ডাল-ভর্তা দিয়েও দূপুর, রাত পার করতে হতো।

সাংসারিক এমন দূর্বিপাকে পড়তে হতো কেবল ঐ তথাকথিত উপহার কালচার থাকার কারণে। আজো ভেবে পাইনা উপহারের নামে উপহারের এমনি উদ্ভট এই কালচারটা এখনো এদেশে আছে কী করে! যদি রাখতেই হয়, সেটা বিয়েতে কেন? বিয়ে বিষয়টাই তো আনন্দের। যার বিয়ে বা যে বাড়ীর বিয়ে, বিষয়টি তাদের জন্যে টোটালি আনন্দের। এখানে তাদেরকে আরো আনন্দ দিতে যেয়ে দাওয়াতীদের কষ্ট মোকাবেলা করার কী মানে হয়!

কষ্টের সময় মানুষের উপকার প্রয়োজন হয়; আনন্দের সময় নয়। উপহার দিয়ে উপকার যদি করতেই হয়, তাহলে মানুষের কষ্টের দিনে কেন নয়? কেন উপহার কালচারটি মৃতের কুলখানি অথবা চল্লিশাতে চালু হয়নি! কেন বিয়ে বাড়ীতে যায় হাতে উপহারের প্যাকেট নিয়ে আর মৃতের বাড়ীতে খালি হাতে! উপহার নিয়ে মানুষ হাসপাতালে রুগী দেখতে যেতে পারে। দলবেঁধে হরলিকস্ নিয়ে যাবার তো প্রয়োজন নেই।

কালচারটি হওয়া উচিত “উপহারে উপকার”। “উপহারে উপবাস” নিশ্চয়ই নয়। এমনি উপবাসের এই চলমান প্রক্রিয়াটি সামাজিক কালচারে ইতিমধ্যেই আলসারের ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ছোটখাটো ক্ষত নয়; গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। যার অবসান হওয়া দরকার। দরকার বিয়ের অনুষ্ঠান নামক কালচারের আলসার নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা। খুব তাড়াতাড়ি শুরু করা দরকার। আর খুব দ্রুত দরকার এর ঔষধ আবিষ্কারের! খুবই কার্যকরী ঔষধ!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com