হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৭০ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-12-18 11:31:12 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৭০ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ

- শাহীন বেডা! ভাবসাব বেশী ভালা মনে হইতাছে না।

- সমস্যা কি? কী হইছে ভাই?

- বেতাল বাজছে। খবর মনে অয় সুবিধার না।

- অসুবিধার কী হইলো?

- পিছের চাককায় সমস্যা। ডাইনের চাককাডা হুদাই লেকলেক করে।

লেকলেক করা মানে আঁকাবাঁকা হয়ে ঘোরা। মাঝেমধ্যে চাকার এলাইনমেন্ট নষ্ট হয়ে গেলে এমন হয়। বাঁকাত্যাড়া ভাবে ঘোরে। মাঝে মাঝে ঘ্যাটঘ্যাট শব্দও করে। আমাদের রিক্সায়ও এখন এমন হচ্ছে। ত্যাড়াবেড়া হয়ে ঘুরছে। তবে ঘ্যাটঘ্যাট শব্দটা করছে না। রিক্সাচালক মফিজ ভাই। খুব চেনাজানা মানুষ; ভাল মানুষ। ঘ্যাটঘ্যাট শব্দটা না হলেও তার কথায় গুরুত্ব না দেবার কোন কারণ নেই। বুঝতে পারছি, বিপদে পড়েছি। রিক্সা থামাতে হবে।

গফরগাঁয়ের খুব কাছাকাছি আলতাফ গোলন্দাজ সাহেবের বাড়ী বরাবর কাঁঠাল গাছটার তলায় রিক্সা থামালেন মফিজ ভাই। মুখে খুবই বিরক্তির ছাপ। লুঙ্গী দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বিড়বিড় করে আনমনে কী যেন বলছেন। মেজাজ গরম হলে লোকটা এমনই করেন। বিড়বিড় করেন। বিড়বিড় আমিও করছি। বিরক্তি আমারও। যাত্রাপথে এমন বিড়ম্বনা কার সহ্য হয়! যেমন তেমন যাত্রা নয়। জীবনের সবচেয়ে দামী পরীক্ষায় দামী পোষাক পড়ে প্রথম যাত্রা। একটু দেরী হলেই তো সব শেষ।

আমার রিক্সা থামতে দেখে আগেপরের সব রিক্সাও দাঁড়ালো। হুরহুর করে দাঁড়ালো। কারোটা সামনে, কারোটা পিছনে দাঁড়ালো। মল্লিকা, রীনারা, স্বপ্না, সেলিনা সবাই “হায় হায়! কী হইছে, কী হইছে” বলে চিৎকার করে উঠলো। নিকুঞ্জ, মোশাররফ, শফিকুল, রফিজরাও বাদ গেল না। ওদের গলা আরো চড়া। সবার এক কথা; বইয়া থাহুনের দরকারডা কি! কথাটি ঠিক। অপেক্ষা করা যাবে না। অপেক্ষা করে লাভ কি? রিক্সার তো অভাব নেই। একটায় উঠে পড়লেই হয়।

তবুও আমি ইতস্তত করছি। করারই কথা। পেন্ট পড়ে একা এক রিক্সায় নতুন বাবু সেজে যাচ্ছি। এক রিক্সায় একজন চড়ার একটা ভাব আছে! জীবনে ভাব দেখানোর এমন চান্স তো তেমন করে পাইনি। সারা জীবন অন্যের সাথে ভাগে ভাগাভাগি করে চড়েছি। পাতলা হলে যেমন তেমন, মোটা লোক পাশে বসলে নিজের পাছা রাখার জায়গাই থাকতো না। আর তিনজন হলে তো পাছার অর্ধেক বাইরে ঝুলতো।

ঝুলাঝুলির কথা না ভেবে শেষমেষ নিকুঞ্জ বিহারী বনিকের রিক্সায় উঠে পরীক্ষার হলের দিকে রওনা দিলাম। চাপাকষ্টে মেজাজটা গজগজ করছে। সকালটা শুরুই হলো কুফা দিয়ে। প্রথম দিনটা বেশ ভালই ছিল। কুফা ছিল না। ভাল দিন; ভাল পরীক্ষা। আজ ২য় পরীক্ষার দিন। ইংরেজী পরীক্ষা। একদিনে দুই পরীক্ষা। সকালে প্রথম পত্র আর বিকেলে ২য়। এমনিতেই ইংরেজী নিয়ে সবার ভয়। যারা ফেল করে সব ইংরেজীতেই করে। তার উপর আবার কুফা। রিক্সার চাকা লেকলেক হবার কুফা। জানি না কপালে কী আছে!

কপালে ছিল ম্যাজিস্ট্রেট। মাঝবয়সী রাসভারী টাইপের কড়া ম্যাজিস্ট্রেট। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিটের মাঝেই রুমে হাজির। এত্ত এত্ত রুম থাকতে বেছে বেছে আমার রুমে; সরাসরি আমার কাছে। দাঁড়াও বলেই সারা দেহ চেক শুরু করে দিলেন। উপর নীচের সব পকেটেই হাত। সর্বনাশ! করে কি লোকটা! দুহাত দুদিকে সরিয়ে শরীরে চাপ দিয়ে দিয়ে নকল খুঁজছেন।

কপাল ভাল বেজায়গায়, মানে উল্টাপাল্টা জায়গায় চাপ দেননি। তবে খাতা খুলে উল্টেপাল্টে দেখলেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। ততক্ষণে গ্রামার এবং ট্রান্সলেশন লেখা আমার কমপ্লিট। ৩০ মিনিটে ৪৫ নম্বর এর উত্তর কমপ্লিট দেখে তিনি বেশ অবাক হলেন। বিস্মিত হলেন এবং বিস্ময়ভরা চোখে “বাহ! অনেক কিছুই তো লিখে ফেলেছো। হাতের লেখাও ভারী সুন্দর তো! ক্লাশে রোল কত তোমার!” বলেই পাশে বসে পড়লেন। ভাবসাব দেখে মনে হলো না তিনি আজকে আর কোথায়ও যাবেন।

এদিকে বাইরের পরিবেশ বেজায় থমথমে। শতশত লোক গফরগাঁও ইসলামিয়া হাই স্কুলের চারপাশে জমা হয়েছে। যেন পরীক্ষা নয়, মেলা জমেছে স্কুলে। তখনকার জমানাটাই এমন ছিল। বাইরে শতশত মানুষ, কয়েক ডজন পুলিশ আর ভেতরে একজন ম্যাজিস্ট্রেট। ভেতরে গরমও। পরিবেশ মারাত্মক গরম। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ইতিমধ্যেই ১৯জনকে বহিস্কার করেছেন। শুধু ছেলে নয়; মেয়েদেরও করেছেন। কান্নাকাটি করে কিংবা হাতপা ধরেও রক্ষে পায়নি কেউ।

আমাদের পাশের রুমে একটি মেয়ে হাতেনাতে নকলসহ ধরা পড়লো। বারান্দায় ম্যাজিস্ট্রেটের পায়ে ধরে সে কি কান্না। তাতেও তার মন একটুও গলেনি। ভীষণ কড়া ম্যাজিস্ট্রেট। পা ছাড়িয়ে হন হন করে সামনে এগুলেন। তার দৃষ্টি যতনা বাইরে, তার চেয়ে ঢের ভিতরে বেশী। তবে বাইরের অবস্থান ভিন্ন। বাইরে মোড়ে মোড়ে নকল সাপ্লাইয়ের দল জটলা করে ভিতরে সাপ্লাইয়ের চেষ্টায় রত। স্কুল ভবনের পেছনের জানালা দিয়ে যে যার লোককে নকল পৌঁছে দেবার আপ্রাণ চেষ্টায় নিমগ্ন। কিন্তু পারছে না। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের জন্যেই পারছে না।

পরীক্ষার অর্ধেক সময় পার হয়ে গেছে। কেমন করে যেন আমাদের স্কুলের আবদুল হাই স্যার জেনে গেছেন ইংরেজী ২য় পত্রে রচনা এবং এপ্লিকেশন আমার কমন পড়েনি। স্যারের ডিউটি ছিল অন্য রুমে। ভড়কে যাবার মত খবরটা শুনে স্যারের তো মাথা খারাপ। শুধু আবদুল হাই স্যার নন, অনেকেরই মাথা খারাপ। খবরটা বাইরেও পৌঁছে গেল। বিষয়টি কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। অবাক বিস্ময় নিয়েই সবাই বলাবলি করছিল।

এক সময় হাই স্যার আমার রুমে এলেন এবং খুব কাছে এসে কানে কানে বললেন, “ভাবিস নে। সাহস রাখ মনে। কিছু একটা লেখার চেষ্টা কর। যা পারিস তাই লেখ। তাতেই হবে। যদি লাগে পাশ থেকে দু’চার লাইন আমিও বলে দিতে পারবো। টেনশান করিস না।” স্যারকে অভয় দিলাম আমি। নিশ্চিত করলাম এই বলে যে, আমি সাধারণত রচনা আর এপ্লিকেশন মুখস্ত করিনা। টুকটাক যাই পারি নিজ থেকেই লিখি। আজও লিখবো। আত্মবিশ্বাস নিয়েই লিখবো।

২৪শে মার্চ; শেষ পরীক্ষার সকাল। গেল ২২টা দিন ভালই গেছে। খুব তাড়াতাড়িই গেছে। বলা যায় আনন্দ আর খুশীতেই গেছে। আজ জীববিজ্ঞান পরীক্ষা। আজকেরটা শেষ হলেই র্হুরে। হল থেকে বের হয়ে বারান্দা থেকে সবুজ ঘাষের মাঠে একটা লাফ দিব। বার্ষিক ক্রীড়ায় লাফ দিয়ে বেশী দূর যেতে পারিনি কোনদিন। ডাব্বা মেরেছি সর্বদা। আজ মারবো না। আজ নিশ্চিত পারবো। দারুণ ফুরফুরা মনে না পারার কোন কারণই নেই।

বাসার সামনে নিত্যদিন অপেক্ষায় থাকা রিক্সায় উঠতে যাবো। মফিজ ভাইকে দেখলাম না। আশপাশ তাকিয়েও দেখলাম না। সাধারণত এমনটা হয় না। অবশেষে দেখলাম রুহুল ডাক্তার সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। মফিজ ভাইয়ের মন বেশ ভার ভার মনে হলো। পরিবেশটাও যেন বেশ থমথমে। বিষয় কি? আশেপাশে তেমন লোকজন নেই। নিত্যদিনের মত সকালের বাজার গমগম করছে না। বাজার খালি খালি লাগছে। ঘটনা কি? জানতে চাইলাম তার কাছে।

মফিজ ভাই এদিক ওদিক তাকালো। আশেপাশে কেউ আছে কিনা ভাল করে দেখে নিল। এবং আমার কানের কাছে মুখ এনে খুব চিন্তিত মনে বললো, “ঘটনা খারাপ। বড়ই খারাপ শাহীন বেডা। ঢাকায় আর্মি নামছে। মিলিটারী অহন গেরামেও আইবো। মনে হয় গফরগাঁও আইয়া পরছে! চোরবাটপার একটারেও আস্তা রাখতো না। পিডাইয়া পেটের গু বাইর কইরালবো। নরম গু, শক্ত গু; সব গু। খালি গু না, হুতাইয়া মুতাইয়াও ছারবো।”

কিছুটা আঁৎকে উঠলাম আমি। মিলিটারী শব্দটা সেই ৭১ সাল থেকেই আঁৎকে ওঠার মত। খাকী পোশাক পড়ে রাইফেল কাঁধে ধলা রেলস্টেশনে বহুবার পাক মিলিটারী নামতে দেখেছি। আর আমরা ভয়ে দৌঁড়েছি মাইলের পর মাইল। মিলিটারীর হাতে পড়লে রক্ষে নেই। আজও মিলিটারীর কথা শুনে রিক্সায় না উঠে দৌঁড়ে সামছু ভাইয়ের ঘরে গেলাম। তাঁর রেডিও আছে। সামছু ভাই ভলিউম কমিয়ে গভীর মনোযোগে রেডিও শুনছেন।

ঘটনা আসলেই সত্যি। ঢাকায় ক্ষমতার পালা বদল হয়েছে। পতন হয়েছে সদ্য ভোটে পাশ করা রাষ্ট্রপতি সাত্তার সাহেবের। মার্শাল ল জারি হয়েছে। ক্ষমতায় এসেছেন এরশাদ। সেনাবাহিনী প্রধান হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ। চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com