হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৭১ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2020-01-01 12:53:18 | প্রকাশক : Administration
হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৭১ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ

এসএসসি’র শেষ পরীক্ষা দিয়ে চরম মজা করবো ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম ঘুমুবো না; বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিয়ে পুরো রাতটাকে স্মরণীয় করে রাখবো। এমনি সুযোগ ইহ জিন্দিগীতেও জোটেনি কখনো। আজকে জোটবে। উফ্! ভাবতেই অন্য রকম লাগছে। জীবনের সবচেয়ে দামী পরীক্ষা শেষ। মানে, অভিভাবকদের শাসন এবং কড়াকড়িও সাময়িকভাবে শেষ। আর শেষ, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার তাড়া। কিন্তু হলো না। স্মরণীয় করাও হলো না; মজা করাও হলো না।

মজা করবো কিভাবে! মজা করার পরিবেশই তো নেই। চেনাজানা ধলা বাজারটা বড্ড অচেনা হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পরপর দোকানের ঝাপ ফেলার হিড়িক পড়ে গেছে। বাতি নিভিয়ে, ঝাপে তালা ঝুলিয়ে সবাই বাজার ছাড়ছে। চোখেমুখে সকলের কেবলই আতঙ্ক। সবাই কান পেতে এরওর কথা শোনে; রেডিও শুনে। তাও জোরে জোরে নয়। আস্তে আস্তে শোনে। ঢাকায় কী হচ্ছে, কী হতে পারে এই নিয়ে সবখানেই শুধু জল্পনা কল্পনা। কল্পনা এরশাদকে নিয়ে; আর জল্পনায় সাত্তার। কেউ বলছে প্রেসিডেন্ট সাত্তার গ্রেফতার। কেউ বলছে বিদেশে ভেগে গেছেন। শুধু গুজব আর গুজব। চারদিকে গুজবের হাওয়া।

আমার বন্ধুরাও সব হাওয়া। সব ভীতুর ডিম। সন্ধ্যার আগেই যার যার ঘরে ঘাপটি মেরেছে। অগত্যা আমিও মেরেছি। নিঃসঙ্গ একাকী আমি মনে মনে কিছুটা রেগে আমার ছোট্ট ঘরের ছোট্ট বিছানায় শুয়ে আছি। রেগে আছি এরশাদ সাহেবের উপর। বেচারা ক্ষমতা নেবার আর দিনক্ষণ পেলেন না। আজকের সব পরিকল্পনা তিনি এলোমেলো করে দিয়েছেন। কী আর করা! অগত্যা মনোরাজ্যের হাজারো স্বপ্ন আর চোখে ক্লান্তির প্রচন্ড ঘুম নিয়েই বিছানায় এলাম।

কিন্তু মন ঘুমুতে চাইছে না; কেবলই অস্থিরতায় ভুগছে। সদ্য গত হওয়া অতীত আর অনাগত ভবিষ্যতের ভাবনায় মনের অস্থিরতা কমছেই না। মনের অবস্থান মাঝামাঝিতে। ভাল এবং মন্দ লাগার ঠিক মাঝামঝিতে মন অবস্থান করছে । আর কষ্ট দিচ্ছে। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কষ্ট দিচ্ছে। এলাকা ছেড়ে চিরতরে চলে যাবার কষ্ট। পাশাপাশি পেছনের দিনগুলোর স্মৃতিও কষ্ট দিচ্ছে। কে জানে আর কোনদিন দেখা হবে কিনা শৈশব এবং কৈশোরের এইসব হরিহর আত্মার খেলার সাথী এবং বন্ধুদের! কে জানে চিরচেনা এই মাটিতে আর ফিরে আসা হবে কিনা! শেষ বিদায়ের সময় যে ঘনিয়ে এলো! নিজের মাটি নয়, মানুষও নয়। তাতে কি! জন্মের প্রথম ১৫ বছরের ভাললাগা মধুময় স্মৃতির মাটি ও মানুষ তো ওঁরা। চাইলেই কি ভোলা যায়!

যায় না! চাইলেই ওদেরকে ভোলাও যায় না; পেছনে ফেলে সামনেও আগানো যায় না! চোখ ঝাপসা লাগে। আজ ঝাপসা চোখেই দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছি ভাঙা বাঁশের ভাঙা সিলিং এর দিকে। আর ভাবছি এমনই এলোমেলো ভাবনাগুলো। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে চমকিত হলাম। মিলিটারী আসলো না তো! আজ শুধু মিলিটারীর ভয়। ভয়ে ভয়েই দরজায় তাকালাম। মিলিটারী নয়; রফিজ এসেছে। সাথে খোকাও। দেখতে বেশ বড় সাইজের কয়েকটা ডাব নিয়ে এসেছে। সদ্য গাছ থেকে পারা ডাব।

বুঝতে একটুও কষ্ট হয়নি আমার। বড় চেনা গাছের চেনা ডাব। মন ভাল না হয়ে পারে! একলাফে বিছানা থেকে দরজায়। দা নিয়ে এসেছে খোকা। ডাব কাটার দা। একহাতে ডাব ধরে পাকা কাটুরির মত করে কাটছে। ঘরের মেঝে মাখামাখি করে ফেলছে ডাবের ছোলায়। তাতে কি! চুরি করা ডাব বলতে কথা। ঘর তো একআধটু নোংরা হবেই। এক চুমুকে প্রথম ডাবটার অর্ধেকটা শেষ করেছি কেবল। অমনি মহসিন এসে হাজির।

এই এক যন্ত্রণা। মোঃ মহসিন নামের যন্ত্রণায় জীবনেও চুরির মাল খেয়ে শান্তি পাইনি। কোথা থেকে খবর পেত কে জানে। সময় মত ঠিকই চলে আসতো এবং এসেই ভাগ বসাতো। ভাবখানা এমন যে বেশীক্ষণ থাকবো না; খেয়েই চলে যাবো। স্কুলে মহসিন আমার দু’ক্লাশ জুনিয়র হলেও সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পারিবারিকভাবেও খুব কাছের। অনেকের চেয়েও কাছের ছিল। আজো আছে। ঠিক একই রকম আছে। মনে হয় না এই জনমে কোনদিন দূরের হবে।

সেই মহসিনকে নিয়ে ডাব এবং ডাবের লেই খেয়ে চোখ থেকে ঘুম হাওয়া। ওরা চলে যাবার পরেও সারারাত আর ঘুম আসলো না। সুযোগটা কাজে লাগালাম। একটা ছক একে ফেললাম। কঠিন ছক। আবার মিলিত হবার ছক। প্রতিবছর মিলবো। ধুমধাম করে মিলন মেলা করবো। স্কুলের বন্ধুরা যে যেখানেই থাকি কাউকে হারাতে দেবো না। বছরে একটা দিন এক জায়গায় হবো। ধলা স্কুলের আঙিনা মাতিয়ে তুলবো। এমন তো নয় যে বিষয়টি অসম্ভব কিছু। শহরে তো অনেক স্কুলেই এমন হয়। ধলা স্কুলে হবে না কেন? চাইলেই হবে।

একটা জমজমট পূণর্মিলনী হবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী না হোক, একটা মিলনমেলা হবে। মিলনের দিনটাতে ভোর থেকেই সবার মনের মাঝে সাজ সাজ রব পড়ে যাবে। বিশালাকার মাঠটিও সাজবে বর্ণিল সাজে। মুখরিত হবে সবার প্রাণের আঙিনা; জমবে পুরোনোদেরকে নতুন করে পাবার জম্পেস মেলা। এমন মিলনমেলা যা ঘটেনি আমদের স্কুলে কোনদিন। দিনটি হবে হারিয়ে যাবার দিন; পুরোনোকে ফিরে পাবার দিন।

পুরোনো সেই দিনের কথা শোনার জন্যে, চোখের দেখা পাবার জন্যে সবার সাংঘাতিক আগ্রহ থাকবে। আয়োজন হবে অতীব মনোমুগ্ধকর। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীসহ তরুণ প্রজন্মের কেউই বাদ যাবে না। দল বেঁধে ঢল নামবে মানুষের আগমনী স্রোতধারার। দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার পরে সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক পর্বে এলাকাশুদ্ধ নারী পুরুষের উপস্থিতি নামবে। বিশাল মাঠটি ভরে উঠবে কানায় কানায়।

গ্রামের মা বোনেরা কেউ সেই সন্ধ্যায় ঘরে থাকবে না। সরকারের মন্ত্রী, এলাকার সাংসদ, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কেউই বাদ যাবে না। অপরূপ সাজে সাজাবো প্যান্ডেল। সুউচ্চ মঞ্চ, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম; সব থাকবে। দিনব্যাপী অনেক বছর পরে পুরোনোরা একে অন্যকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে আলিঙ্গন কিংবা হাতে হাত ধরে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বেড়াবে। কেউই তার বয়সের সীমানায় নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।

আয়োজন হবে বিশাল; উৎসুক হবে জনতা। উৎসব মুখরতায় গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়বে মহা মিলনের গান। পর্দা উঠবে মঞ্চে; হবে আলোকিত। আলো ঝলমল মঞ্চে এক এক করে উঠে আসবে পুরোনো দিনের চেনা সে সব মানুষগুলো। তুমুল করতালিতে ফেটে পড়বে দর্শকসারি। আর হালকা মেজাজে পিয়ানোর সুরে বাজবে বড় সুমধুর আবেগমাখা সেই গান, “পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়! ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়!!”

আসলেই ভোলা যায় না। শৈশব এবং কৈশোরের   স্মৃতিকথা কখনোই ভোলা যায় না। তাই তো পুরোনোদের পেয়ে, পুরোনো দিনের কথা শুনে সবাই কেমন যেন হয়ে উঠবে। একটা কঠিন ঘোরের মধ্যে চলে যাবে। আর হবে আপ্লুত ঘোরমাখা গভীর আবেগে পিনপতন নীরবতায় হালকা ভাবে মাথা দোলাবে। পাশে থাকা একে জড়িয়ে ধরবে; ওকে জড়িয়ে ধরবে। অন্যদিকে বন্ধ হবে না গান; বাজতেই থাকবে; “মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি দোলেছি দোলায়, বাজিয়ে বাঁশি গান গেয়েছি বকুলের তলায়।”

বকুল তলা! বড় স্মৃতিময় সেই বকুল তলা! কবি লিখেছেন চমৎকার। চমৎকার সুরে চমৎকার সব কথা! প্রত্যেকের মনের গভীরের কথা! চকিতে বুক ধক করে উঠবে সবার। সব স্মৃতি ভেসে উঠবে মনে। হাসি আনন্দ আর দুঃখ কষ্টের স্মৃতি। থাকবে আকুতি। ব্যাকুল করা হৃদয়ের আকুল আকুতি। হৃদয়ের সকল ভালবাসা নিংড়ানো, কঠিন আকুতি; “মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি গেলেম কে কোথায়! আবার দেখা যদি হলো সখা প্রাণের মাঝে আয়!”

প্রাণের মাঝে আসার জন্যেই প্রতিবছর আয়োজন হবে; প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী না হোক, অন্তত পূনর্মিলনী হবে। হতেই হবে। কী এমন ক্ষতি হবে বছরে অন্তত একটি দিন এক জায়গায় হলে! এ ধরায় মানুষ বাঁচেই বা কয় দিন! অন্তত একটি দিন তো পুরোনো সেই দিনে হারিয়ে যাওয়াই যায়! হারানো শৈশবকে কুড়ানোর জন্যে এর তো কোন বিকল্পও নেই।

আমি না পারি, আমরা না পারি; এমনি মহা ভাল একটি উদ্যোগ নেয়ার মত কেউ না কেউ নিশ্চয় থাকবে। আর আমরা থাকবো অপেক্ষায়! আশায় বুক বেঁধে পূনর্মিলনের অপেক্ষায়! আমি নিশ্চিত কেউ না কেউ একদিন আমাদের ডাকবে। মনের সব জীর্ণতা ফেলে, বিদ্বেষ ভুলে দু’হাত বাড়িয়ে হৃদয় দিয়ে বলবে, “আয় আরেকটিবার আয়রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়! মোরা সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়!! - পরবর্তী সংখ্যায় সমাপ্য.....

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com