তালিকায় অসঙ্গতি; চেতনায় অস্বস্তি

প্রকাশের সময় : 2020-01-01 13:01:46 | প্রকাশক : Administration
তালিকায় অসঙ্গতি; চেতনায় অস্বস্তি

সিমেক ডেস্কঃ ক্ষমা তিনি চাইতেই পারেন। দুঃখ প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্তু তাতেই কি সবকিছু মিটে যায়? মন্ত্রীত্বের চেয়ারে বসে যিনি বলতে পারেন, নিজে কিছুই করেননি; কেবল পাকিস্তানীদের রেখে যাওয়া তালিকা হুবহু প্রকাশ করেছেন। সেই তিনি ক্ষমা চাইলেই কি আর না চাইলেই কি? দিন তারিখ ঠিক করে মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারীভাবে রাজাকার বললেন, আবার ভুল বুঝতে পেরে গাইগুই করলেন। ব্যাস! এতেই হয়ে গেল? মুক্তিযোদ্ধাদের মনে কষ্ট দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী হিসেবে বহাল তবিয়তে থাকার নৈতিক অধিকার এখনো আপনার আছে তো?

পাকিস্তানীরা বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কবরে লিখে রেখেছিল গাদ্দার। পাকিস্তানীদের করা গাদ্দারদের তালিকা দেখে জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকেও আপনি গাদ্দার বলে চালিয়ে দেবেন? পাকিস্তানিদের করা তালিকা যে সঠিক তা আপনি নিশ্চিত হলেন কেমন করে? ওটাতে যে রাজাকাররা হাত দেয়নি তার গ্যারান্টি আছে তো? যে দেশে রাজাকাররা ক্ষমতায় থেকে গেছে স্বাধীনতা প্রাপ্তির অর্ধেকেরও বেশী সময়, সেই দেশে রাজাকারদের তালিকা তারা অবিকল অবিকৃত রেখে গেছে এটা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী হিসেবে আপনি ভাবতে পারলেন?

আপনি নিজেও তো মুক্তিযোদ্ধা । ওই তালিকায় আপনার নাম রাজাকার হিসেবে থাকলেও কি মেনে নেবেন? আপনার দেয়া যুক্তি অন্তত তাই বলে। বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পর রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করলেন। ইতিহাসের পাতায় নাম লেখবার একটা মোক্ষম সুযোগ আপনার এসেছিল । অবহেলায় সেটা হাতছাড়া করেছেন। আর কাঁদিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে। এখন দায়িত্ব তো আপনাকে নিতেই হবে।

কেননা নানা অসঙ্গতি থাকায় এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে সরকারি দলকে। প্রচন্ড রকমের বিব্রত হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। এবং তিনি তৎক্ষনাৎ তালিকা বাতিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তালিকা প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। বিশেষ করে যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন- তাদের নাম এই তালিকায় থাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও চরম অস্বস্তিতে পড়েছিল।

অন্যদিকে তালিকায় ছিল না বিপুল সংখ্যক চিহ্নিত রাজাকারের নাম। এর ফলে দেশব্যাপী অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করেছে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসীদের মনে। এনিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন খোদ আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের ধারণা, মুজিববর্ষের আগে রাজাকারদের এমন বিতর্কিত তালিকা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলেছে। পাশাপাশি রাজাকারের তালিকার এই অসঙ্গতি স্বাধীনতার পক্ষের তৃতীয় প্রজন্মের মাঝে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বলেও আশঙ্কা করেছেন তারা।

এ বিষয়ে কলামিস্ট অজয় দাশগুপ্ত বলেছেন, যখনই আওয়ামী লীগ শাসনে থাকে আর কোন বড় কাজ করে  বা কাজে হাত দেয় তখনই দেখি ঝামেলা পাকায়। ‘ষড়যন্ত্র’, ‘ষড়যন্ত্র’- বলে আমরা তা অন্যের কাঁধে চাপানোর চেষ্টা করলেও আসলে কোথায় যে ঘাপলা বোঝা মুশকিল। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। বড় আশা নিয়ে বাঙালি বুক বেঁধেছিল এতকাল পরে হলেও রাজাকরদের একটা তালিকা তো বের হলো। কিন্তু বের হতে না হতেই কি দেখলাম আমরা? মুক্তিযোদ্ধাদের নাম চলে এসেছে সে তালিকায়।

চলছে বাহাস। কিন্তু ফাঁকতালে কী হচ্ছে? যেখানে দেশের এক বিরাট অংশে মুক্তিযুদ্ধ মূলত স্মৃতি কিংবা অতীত যে বিশাল অংশ বিভ্রান্ত তারা জানলো রাজাকারদের তালিকাও ভুলে ভরা। যার মানে সামনে আপনি শুদ্ধ তালিকা করে আনলেও সংশয়ের ওপরে যেতে পারবেন না। কে দায়ী?  কারা আছে এর পেছনে? এটাতো মানতেই হবে এর মতো জরুরী কাজ দুটো নাই। একজন মানুষকে সারাজীবনের জন্য দেশদ্রোহী ঘোষণার আগে আপনি তথ্য যাচাই করবেন না? দুনিয়ার অনেক দেশের জাদুঘরে এমন তালিকা আছে। তারা যাচাই-বাছাই করে জনগণকে জানিয়ে দিয়েছে কারা তাদের মুক্তি ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। সেটা খাঁটি তালিকা বলেই তারদের ইতিহাসে কূটতর্ক নাই। তিনি আরো বলেছেন, আমাদের বিতর্ক জীবনেও শেষ হবে না। মাত্র আটচল্লিশ বছর লাগলো একটা তালিকা করতে।

মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ পরপর তিনবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও রাজাকারের তালিকায় বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার নাম কীভাবে এলো তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এতে হতাশার পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। সেই মুক্তিযোদ্ধাদের ঘৃণিত স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা নয়, গোটা জাতির অপমান। এই ধরনের অপরাধের জন্য কারা দায়ী তা তদন্ত করতে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে।

সংশ্লি−ষ্টরা বলছেন, এই তালিকা তৈরির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করে এমন গবেষক ও সংগঠনের কারো সঙ্গে কথা বলা হয়নি। শুধু জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) তথ্যের ওপর নির্ভর করে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। অথচ যারা তালিকা তৈরি করেছেন তাদের অনেকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেননি। তাদের মতে রাজাকারদের তালিকা তৈরির কাজটি আমলা বা জেলা প্রশাসকদের ওপর ন্যস্ত করা ঠিক হয়নি।

এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবদুল আহাদ চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে এ ধরনের একটি বড় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল আরো বেশি সতর্ক হওয়া। তালিকা তৈরির কাজে আমলাদের প্রাধান্য না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা বীরদের সার্বক্ষণিকভাবে সংযুক্ত করা হলে এ সংকট তৈরি হতো না।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com