সবুজের সমারোহে মুক্তোর হাসি

প্রকাশের সময় : 2018-05-24 22:45:41 | প্রকাশক : Admin
�সবুজের সমারোহে মুক্তোর হাসি

অজয় দাশগুপ্ত: ময়মনসিংহ শহরের কাছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন এক হাজার ২০০ একর বা তিন হাজার ৬০০ বিঘা। রীতিমতো একটি গ্রাম। পাশেই পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ। সূর্য যখন অস্তাচলে, এ নদের তীরে গিয়ে দেখি, পর্যটকের জন্য মাঝিরা যেসব নৌকা নিয়ে বসে আছেন, তার একটির পাল যেন অবিকল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজের সমারোহে হারিয়ে যেতে যেতেও মনে হয়েছে- নয়নাভিরাম এ অঙ্গন যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের আয়তন ৩০ একরের মতো। বাংলাদেশসহ কত দেশের কত যে উদ্ভিদের সমারোহ। মাত্র পাঁচ হাজারের মতো ছাত্রছাত্রী এ প্রতিষ্ঠানে। ৫৭ বছরে পা দেওয়া প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত যে ২৭ হাজারের মতো শিক্ষার্থী স্মাাতক ডিগ্রি অর্জন করেছে, তারা এ গার্ডেনসহ আরও অনেক সুবিধার কারণে নিজেদের জানার সীমা বাড়িয়ে নিতে পেরেছে।

গার্ডেনটি ঘুরে দেখার সময় সঙ্গী দুই শিক্ষার্থী জানালেন, তারা এখানে এসে হাতে-কলমে শিক্ষা গ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য এলাকার টেস্ট প্ল−টে ধান চাষ করেন; কলা, আনারস ও অন্যান্য ফল চাষ করেন। গবাদিপশু পালন ও চিকিৎসা বিষয়ে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করেন। এ ধরনের সুবিধা বাংলাদেশে কৃষি শিক্ষার যত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার কোনোটিতেই নেই। নতুন করে সেসব সুবিধা চালুর প্রয়োজনও নেই; বরং বিদ্যমান সুবিধার পরিকল্পিত ব্যবহার করে অনেকেই লাভবান হতে পারে।

কৃষি বিষয়ে যারা পড়তে চায়, তাদের প্রথম পছন্দ ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে কেবল বাংলাদেশের নয়, বিশ্বমানের শিক্ষক ও গবেষক রয়েছেন। বাংলাদেশে যারা আধুনিক কৃষি খামার, মৎস্য চাষের প্রকল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, গবাদিপশুর খামার এবং এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে চান, তারা উপদেষ্টা-পরামর্শক হিসেবে বেছে নেন এ প্রতিষ্ঠানের গবেষক ও শিক্ষকদের।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনকালে বিজ্ঞানী শমশের আলী আস্থার সঙ্গে বলছিলেন, 'আগামী ১০ বছর পর বাংলাদেশের মানুষকে আর মোটা চাল খেতে হবে না। সবার কাছে পৌঁছানো যাবে চিকন চালের বীজ। তিনি বলেন, ধান পাকলে পাতা আর সবুজ থাকে না, বরং শুকিয়ে হলুদ হয়ে যায়। এর ফলে কান্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এখন এমন জাত উদ্ভাবন করছেন, যাতে ধান পাকবে, কিন্তু পাতা থেকে যাবে সবুজ। আবার ফলনও বেশি মিলবে।'

আমরা জানি, ষাটের দশকের শুরুতে দেশের কৃষি শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল পরনির্ভরতা থেকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ প্রতিষ্ঠান একের পর এক বিষ্ময়কর সাফল্য উপহার দিয়েছে। আমাদের ধান গবেষণা কেন্দ্রেও বিজ্ঞানীরা একের পর এক সফলতা ছিনিয়ে আনছেন। বাংলাদেশ এখন খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। মাছের উৎপাদনও বেড়ে চলেছে। শাকসবজি উৎপাদনেও মিলছে সফলতা। দশকের পর দশক আমরা ছিলাম খাদ্যে পরনির্ভর।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, বিশ্বব্যাংক- কত দেশ ও সংস্থার কাছে ছিল আমাদের নত হয়ে থাকার ঘটনা। এটাও নিশ্চিত করে বলতে পারি, খাদ্যে পরনির্ভর থাকলে আমরা নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের দুঃসাহস দেখাতে পারতাম না। খাদ্যে সামান্য ঘাটতি হলেই কী ভয়ানক বিপদ নেমে আসতে পারে, সেটা আমরা গত বছর হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ হাওরাঞ্চলের অকাল বন্যায় মাত্র ১২ থেকে ১৫ লাখ টনের মতো চাল উৎপাদন কম হয়।

সরকার কৃষকদের ওপর নির্ভরতা বাড়ালে, তাদের সাহায্য-সহযোগিতা বাড়িয়ে দিলে তাদের কাছ থেকে যে অনেক বেশি রিটার্ন মেলে, তার প্রমাণ অনেকবার মিলেছে। একইভাবে বলা যায়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানকেও প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা দেওয়া হলে মিলবে বহুমুখী সুবিধা।

এ প্রতিষ্ঠান মৎস্য চাষ প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মিলে আমাদের মিঠাপানির মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এনে দিয়েছে। ফলের উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনকে লাভজনক পেশায় পরিণত করেছে। তাদের কাছ থেকে আরও অনেক কিছু পাওয়ার রয়েছে। এ জন্য চাই বিনিয়োগ। কৃষির জন্য বিশ্বমানের মানবসম্পদ পাওয়ার যে অনন্য সুযোগ আমাদের হাতের নাগালে, তা থেকে সেরাটা পেতেই হবে। এ বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে অধ্যয়নরত পাঁচ হাজারের মতো শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান কেন হবে, এটা তো জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং তার সুবিধা যেন কৃষি বিষয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় আগ্রহী সবার জন্য নিশ্চিত হয়, তার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে-কলমে শিক্ষাদানের বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখার সময় নজরে এলো 'মুক্তা চাষ' প্রকল্পের সাইনবোর্ড। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা- লাগোয়া এ প্রতিষ্ঠানে ঝিনুক থেকে মুক্তা তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডঃ মোহসেনা বেগম তনু ও ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অরুণ চন্দ্র বর্মণ আমাদের গবেষণাগার পরিদর্শনে নিয়ে যান। তারা বলেন, বাংলাদেশে প্রচুর প্রাকৃতিক জলাশয় রয়েছে। এখানে মাছের পাশাপাশি মুক্তা চাষ সম্ভব। এ চাষ স্বল্প ব্যয়েই করা সম্ভব। কাজটি কঠিনও নয়। সর্বোপরি, এটি হচ্ছে নারীবান্ধব উদ্যোগ। আমাদের পোশাকশিল্প যেমন ৩৫ থেকে ৪০ লাখ নারীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে, তেমনি মুক্তা চাষও নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য দূর করায় অবদান রাখতে পারে।

কীভাবে মুক্তার জন্য পুকুর ও জলাশয়ে ঝিনুকের চাষ করতে হয়, সে জন্য 'মুক্তা চাষের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন' নামে একটি বুকলেট তারা তৈরি করেছেন। তাদের আরেকটি প্রকাশনার নাম 'স্বাদুপানিতে ঝিনুক ইমেজ মুক্তা উৎপাদন কলাকৌশল'। এ কাজে আগ্রহীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও তারা দিয়ে থাকেন। আমাদের পরিদর্শনকালে তারা মুক্তা চাষ প্রকল্পে উৎপাদিত মুক্তা ও ইমেজ মুক্তা দেখালেন। এখন তাদের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ- মুক্তার সাইজ বড় করা। এ জন্য প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য চেষ্টা চলছে। তারা সফল হবেন, এটাই প্রত্যাশা। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিও বাড়িয়ে দিতে হবে সহযোগিতার হাত। তবেই তো হাসবে বাংলাদেশ।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com