কিংবদন্তী বাঙালি ডঃ ফজলুর রহমান খান

প্রকাশের সময় : 2020-01-29 14:33:31 | প্রকাশক : Administration
কিংবদন্তী বাঙালি ডঃ ফজলুর রহমান খান

মোজাম্মেল খানঃ বাঙালির মতভেদ আর বিভাজনময়তার সুযোগে বাংলা শাসিত হয়েছে পরদেশীদের দ্বারা হাজার বছরের বেশি সময় ধরে। বাঙালীর জাতীয় চরিত্রের চিরন্তন এ রীতির প্রথম ব্যতিক্রম ঘটেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে-বাঙালির ইতিহাস উল্টানো একতার মধ্যদিয়ে। বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে দু’হাজার বছরেরও বেশি সময়ে ক্রান্তিলগ্নএসেছে বহুবার, কিন্তু স্বর্ণ অধ্যায় আসেনি বারবার। এ দুইয়ের সংমিশ্রণ হয়েছে শুধু একবারই- আর সেটা ঘটেছে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। আমাদের ইতিহাসের এটাই একমাত্র গৌরবময় কাহিনী। এ কাহিনীর স্মৃতিচারণ তাই ঘটবে বারবার; হয়তবা অনাদিকাল ধরে। যতদিন না আর এক গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা ঘটে, যেটা কিনা এটাকে ম্লান করে দেয়ার শক্তি রাখে।

আর এ ব্যতিক্রম ঘটানোর অসাধ্য কাজটি সংঘটিত করার সিংহভাগ কৃতিত্ব যে মহান বাঙালি সন্তানের প্রাপ্য তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের ইতিহাসের রাখাল রাজা- শেখ মুজিবুর রহমান। আজকের এ নিবন্ধের স্বল্প পরিসরে আমি এমন একজন বাঙালির একাত্তরের ভূমিকার কথা কিঞ্চিত উল্লেখ করব যিনি বিশ্বসভায় তাঁর কৃতিত্বের দ্বারা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। তিনি ছিলেন প্রকৌশলী ডঃ ফজলুর রহমান খান, এফ আর খান নামে যিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন।

তিনি ছিলেন শিকাগোর বাসিন্দা এবং স্কিডমোর, ওয়িং এবং মেরিল নামক বিশ্বখ্যাত স্থাপত্য এবং প্রকৌশল কোম্পানির অংশীদার এবং প্রধান স্থপতি। পরবর্তীতে এক বিশেষ স্ট্রাকচারাল পদ্ধতির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তৎকালীন বিশ্বের সর্বোচ্চ বিল্ডিং শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের নির্মাতা হিসেবে  তিনি বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেন। কয়েক বছর আগে কায়রোতে মুসলিম বিশ্বকে উদ্দেশ্য করে দেয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উল্লেখ করেছিলেন, ‘একজন আমেরিকান মুসলমানই নির্মাণ করেছেন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ টাওয়ারটি।’  একাত্তরে ২৬ মার্চ মিলিটারি ক্রাকডাউন শুরু হবার পরপরই ড. এফ আর খান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের অনুভূতি আর শক্তিকে সংগঠিত করার নেতৃত্ব প্রদান করেন। প্রখ্যাত কিছু আমেরিকানের সহায়তায় তিনি ইমার্জেন্সী ওয়েলফেয়ার আপীল নামে একটা ফান্ড গঠন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ ডিফেন্স লীগও গঠন করেন। নিজের পেশার শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি এ দুটো প্রতিষ্ঠানেরই চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তানের ওয়াশিংটন দূতাবাসে এবং জাতিসংঘ মিশনে তখন বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ বাঙালি কর্মকর্তা মিলে একযোগে আগস্ট মাসে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার কথা ভাবছিলেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাঙালি সক্রিয়রা এবং মুজিবনগর সরকারের তরফ থেকে তাদেরকে অতি শীঘ্র আনুগত্য প্রকাশের জন্য চাপ এবং তাগাদা দেয়া হচ্ছিল। ড. এফ আর খান তখন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মিশন অতি শীঘ্র খোলার ব্যাপারে ভীষণভাবে আগ্রহী ছিলেন এবং সে উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আনুগত্য প্রকাশে আগ্রহী সমস্ত বাঙালি কূটনীতিকদের সঙ্গে একযোগে মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত না হওয়া অবধি তিনি তাদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর দৃঢ় প্রতিশ্র“তি ব্যক্ত করেন এবং নিউইয়র্ক এবং ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস খোলা হলে তার সমস্ত ব্যয়ভার বহনের প্রতিশ্র“তি প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রথম সরকারের শাসনে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়।

সত্তর দশকের প্রথম দিকে বিশাল হৃদয়ের বাঙালির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনিও আমার মতো ফরিদপুরের অধিবাসী ছিলেন বিধায় আমাকে তিনি আর একটু বেশি আদর করতেন। আমারও নামের শেষে খান থাকাতে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের অনেক পুরনো অধ্যাপক জানতে চাইতেন আমরা একই পরিবার থেকে এসেছি কিনা। সে সময়ে তিনি Tall Building Designনামে একটা কোর্স পড়াতেন আমাদের ক্যাম্পাস থেকে আশি মাইল দূরে স্প্রিংফিল্ড শহরে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর একটি ক্যাম্পাসে। আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র না হয়েও ঐ বিভাগে অধ্যয়নরত আমার ভারতীয় রুমমেটের সঙ্গে ঐ কোর্সটা এটেন্ড করতাম। তৎকালীন বিশ্বের সর্বোচ্চ বিল্ডিং শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ারের নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত হওয়ার পর  তিনি আরও কয়েকটি বিখ্যাত বিল্ডিং ডিজাইন করেন যার মধ্যে রয়েছে জন হ্যানকক টাওয়ার এবং জেদ্দার হজ্ব টার্মিনাল।

ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের যে ১৭ জন প্রাক্তন ছাত্র নবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের সবাইকে ডিঙ্গিয়ে ড. এফ আর খানকে `Notable Alumni’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। উপরন্তু তাকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আইনস্টাইন হিসেবে এবং বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এ বিরল সম্মান আর কোন বাঙালির ভাগ্যে জুটেছে বলে আমার জানা নেই। 

আমাদের তথা বিশ্বের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর চরম দুর্ভাগ্য যে ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এ কিংবদন্তি মানুষটি আকস্মিকভাবে চিরবিদায় নেন। -লেখক : ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং বর্তমানে কানাডা প্রবাসী অধ্যাপক

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com