আরিফের রেকর্ড ভাঙার গল্প

প্রকাশের সময় : 2020-01-29 14:59:47 | প্রকাশক : Administration
আরিফের রেকর্ড ভাঙার গল্প

কাজল ঘোষঃ আরিফের রেকর্ড গড়ার মধ্যেই রয়েছে রেকর্ড ভাঙার গল্প। এ এক বিরল ইতিহাস। জাপানের একষট্টি বছরের ইতিহাস বদলে দেয়ার কাহিনী। বাংলাদেশি আরিফ জাপানিদের টপকে ছিনিয়ে নিয়েছেন সে দেশের সেরা গবেষকের তকমা। কিন্তু কীভাবে সম্ভব? আরিফ বাংলাদেশের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান। বাবা ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মা নিপট গৃহিণী। ১১ ভাইবোন নিয়ে বড় সংসার। টানাপড়েনে দিন চালিয়েছেন তার বাবা। তবু পিতামাতার স্বপ্ন সবাইকে মানুষের মতো করে গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যেই চলে লড়াই। ধীরে ধীরে স্বপ্নের বুনন। মা চাইতেন ছেলে ডাক্তার হোক। ধাপে ধাপে ছেলে সেদিকেই এগুলেন।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর ভাটিয়াপাড়ায় জন্ম তার।  স্থানীয় স্কুলেই দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এরপর ঢাকায় পা রাখেন। মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। সেখান থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। ডাক্তারি পাশ। অর্থাৎ এমবিবিএস। কিন্তু মায়ের স্বপ্ন পুরালেও ইচ্ছেটা বদলে যেতে থাকে নেপথ্যের দিকে। বলছিলাম আরিফের স্বপ্ন বদলের কথা। পুরো নাম আরিফ হোসেন। তিনি গবেষণা করছেন রোগ নয়, রোগের কারণ কী, তা নিয়ে। বেশিরভাগ মানুষ রোগ হলেই ছুটে যায় ডাক্তারের কাছে। কিন্তু রোগের কারণ নিয়ে ভাবেন না। আর এ বিষয়টিই ভাবায় আরিফকে। তিনি জানতে চান জেনেটিক কী কারণে মানুষের শরীরে রোগ বাসা বাঁধে। মানুষ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হন। শুধু মানুষের চিকিৎসা না করে তার রোগের জন্মরহস্যের কারণ অন্বেষণ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন আরিফ।

রাজশাহী থেকে এমবিবিএস করে আরিফ শিশু বিভাগে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করেন। পরে জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানেই থামেননি। তার নিরন্তর কৌতূহল ও আগ্রহ বাড়তে থাকে উচ্চতর গবেষণায়। সেই আগ্রহের কারণে এই স্থান থেকে শিশু নিউরো মেটাবলিক রোগের উপর ক্লিনিক্যাল ফেলোশিপ করেন। ওই রোগের উপর উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে জাপানের সিনিয়র গবেষক বিশেষজ্ঞ হিসেবে নতুন মাত্রা যুক্ত করেন। তার গবেষণাপত্র স্বীকৃতি পায় চলতি বছর জাপানের সেরা গবেষণাপত্র হিসেবে। আর সেরা তরুণ বিজ্ঞানীর মর্যাদা লাভ করেন আরিফ হোসেন। এর মাধ্যমে জাপানের ৬১ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন তিনি। জন্ম দিলেন বিরলতম ঘটনার। বিগত বছরগুলোতে জাপানিরাই এ পুরস্কার জয় করেছেন। লাইসোসোমাল রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা উদ্ভাবনের জন্য এ বছর তাকে এই বিরল স্বীকৃতির সনদ তুলে দেয় জাপানিজ সোসাইটি ফর ইনহ্যারিটেড মেটাবলিক ডিজিজ তাদের ৬১তম বার্ষিক সম্মেলনে।আমি একজন গতানুগতিক চিকিৎসকই বটে। উন্নত বিশ্বে প্রায় প্রত্যেক চিকিৎসকেরই নিজস্ব গবেষণা থাকে। বলা যায়, প্রায় সকলেই ফিজিশিয়ান কাম রিসার্চার। আমি একজন শিশু নিউরো-মেটাবলিক রোগ বিশেষজ্ঞ। এ রোগ সাধারণত জেনেটিক কারণে হয়। অর্থাৎ, মায়ের পেট থেকে জিন Defect নিয়ে বের হয়। পরবর্তীতে ব্রেন, লিভার, কিডনি, হার্টসহ নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এই রোগীদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, কিন্তু এদের নিয়ে গবেষণা খুব কম হয়েছে। তাই আমি সেগুলো নিয়ে গবেষণা করে আনন্দবোধ করি।

আমি যে নিউরো-মেটাবলিক রোগ নিয়ে কাজ করে এই অ্যাওয়ার্ডটা পেয়েছি তার নাম হল  Krabbe disease. এই রোগে শিশু সাধারণত মায়ের পেট থেকে জিন Defect নিয়ে বের হয়, পরবর্তীতে মারাত্মকভাবে ব্রেন  Affected হয়। যেমন বাচ্চা প্রচন্ড কান্নাকাটি করে, খিচুনি হয়, হাত-পা প্যারালাইজড হয় ইত্যাদি। এই রোগের ডায়াগনোসিস খুবই কঠিন। আমার গবেষণার বিষয় ছিল, সহজেই কীভাবে রোগটা ডায়াগনোসিস করা যায়। এটা ছিল আমার প্রথম প্রজেক্ট। ওই প্রজেক্টে আমি সফল হয়েছি। সফল হওয়ার পর এটা আমি Gene জার্নালে পাবলিশ করেছি ২০১৪ সালে। সেটা ছিল আমার পিএইচডির থিসিস। পরবর্তীতে এই রোগের চিকিৎসার সহজলভ্য উপায় খুঁজছিলাম।

আমিই হলাম পৃথিবীতে প্রথম ব্যক্তি যে এই গবেষণায় সফলতা অর্জন করেছি। পরবর্তী সময়ে আমার গবেষণা বিজ্ঞানীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। যার ফলে Journal of Human Genetics এর বিশেষজ্ঞ প্যানেল আমাকে ২০১৭ সালে সেরা বিজ্ঞানী নির্বাচিত করে। আমি গত বছরে তিনটি পুরস্কার পেয়েছি। এর মধ্যে একটি হাইলাইটেড হয়েছে। জাপান সোসাইটিতে জাপানের গবেষকদের মধ্যে একটা গবেষণা প্রতিযোগিতা ছিল। সেখানে শুধুই আমাকে পুরস্কৃত করা হয়। আরেকটা ছিল এশিয়ার বিজ্ঞানীদের মধ্যে। সেখানে যৌথভাবে পুরস্কার পেয়েছিলাম।

এখনই হয়তো ফেরা হবে না। তবে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ইচ্ছ রয়েছে। বিগত দশ-পনেরো বছর সার্জিক্যাল লাইনেও বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। অগ্রগতির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কিছু ব্যাকওয়ার্ড বিষয় তো থাকেই। এর একটা হলো গবেষণা। একটা দেশে যখন গবেষণা থাকে না তখন সে দেশের ভবিষ্যৎ থাকে না। সেটা মেডিকেল লাইনে হোক অথবা প্রকৌশল লাইনে হোক। যেকোনো ক্ষেত্রে যদি গবেষণা না থাকে সে জ্ঞানের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আমি বর্তমানে যেখানে কর্মরত আছি সেখানে আমরা এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে Collaborative কাজ করি, বিনামূল্যে নিউরো- মেটাবলিক রোগ ডায়াগনোসিস করে দিই। এক্ষেত্রে দেশের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি আমার সহযোগিতা চায় আমি সহযোগিতা করবো।

গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। একজন ডাক্তার যখন  গবেষণায় যুক্ত থাকবে না তখন তার জন্য যে চিকিৎসা দিচ্ছে, রোগী আসছে, প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে, রোগ ভালো হচ্ছে অথবা ভালো হচ্ছে না, কারণ কী? এগুলো বুঝতেও অসুবিধা হবে। সারা জীবনই কী অন্যের গবেষণার ওপর নির্ভর করবেন? যে রোগগুলো ডায়াগনোসিস হচ্ছে না, রোগীকে বাইরের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, তাদের ডায়াগনোসিসের দায়িত্ব কী আমরা কোনদিনও নেব না?

জাপানের সেরা তরুণ বিজ্ঞানীর স্বীকৃতি মিললেও একটি দুঃখ তিনি সারা জীবন বয়ে বেড়াবেন। সেটি হচ্ছে যখন পিএইচডির চূড়ান্ত পরীক্ষা দেবেন তখনই খবর পান মা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। জাপান থেকে মায়ের কাছে আসতে চাইলেও মা বার্তা পাঠান, ‘তোমার পরীক্ষা দেয়া শেষ কর। আমি সুস্থ হয়ে যাব।’ আমি পরীক্ষা দিয়েছি। সফলও হয়েছি। আজ সেরা বিজ্ঞানীর স্বীকৃতিও মিলেছে। কিন্তু সেই খবর মাকে জানানো হয়নি। শেষদিনগুলোতে মায়ের পাশে থাকতে পারিনি। এই দুঃখ সব সময় ভারাক্রান্ত করে রাখে।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com