বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম নারী!

প্রকাশের সময় : 2020-02-12 13:02:35 | প্রকাশক : Administration
বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম নারী!

সিমেক ডেস্কঃ বেগম রোকেয়াকে এই আধুনিক কালে এসেও- ১৯ শতকে লড়াই করতে হয়েছে মুসলিম নারীদের শিক্ষার অধিকারের জন্য। এতে তিনি কত রকমের যে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের দিক থেকে তার কোনো হিসেব নেই। অথচ বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন একজন মুসলিম নারী!

ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালির বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১০৮৮ সালে। তারও প্রায় একশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আল-আজহারেরও অনেক আগে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে ১১শ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মরক্কোর কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়। ইউনেস্কো এবং গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ডের রেকর্ড অনুযায়ী এটিই হচ্ছে বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিগ্রী প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যা এখন পর্যন্ত একটানা চালু আছে। আর এই ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী! যার নাম ফাতিমা আল-ফিহরি। ফাতিমা আল-ফিহরির জন্ম আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে, বর্তমানকালের তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে। তার পুরো নাম ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-ফিহরিয়া আল-কুরাইশিয়া। তাদের পারিবারিক নামের কুরাইশিয়া অংশ থেকে ধারণা করা হয় তারা ছিলেন আরবের মক্কার কুরাইশ বংশের মানুষ।

তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরটির গোড়াপত্তন হয়েছিল উমাইয়া শাসকদের হাতে, ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে। নবম শতকের শুরুর দিকে শহরটি হয়ে উঠেছিল ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সামরিক দিক থেকেও শহরটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। কিন্তু তা স্বত্ত্ওে এই শহরে বসবাসরত আল-ফিহরি পরিবারসহ অনেকেই ছিল আর্থিকভাবে অসচ্ছল। ফলে ফাতিমার জন্মের কয়েক বছর পর নবম শতকের শুরুর দিকে কাইরাওয়ান শহরের বেশ কয়েকটি পরিবার একত্রে শহরটি ছেড়ে ভাগ্যের অন্বেষণে পাড়ি জমায় ইসলামিক মাগরেবের প্রসিদ্ধ শহর, মরক্কোর ফেজের উদ্দেশ্যে।

ফেজ ছিল তখন ক্রমবর্ধমান কসমোপলিটন শহর। নানা দেশ থেকে নানা ধর্ম, বর্ণ ও পেশার মানুষ সেখানে এসে বসতি স্থাপন করছিল। সে সময় ফেজের শাসক ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় ইদ্রিস। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক। বিদেশ থেকে আগত অভিবাসীদেরকে তিনি ফেজ নদীর তীরের ঢালু জমিতে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দেন। কাইরাওয়ান থেকে আসার কারণে ফেজে বসতি গড়া এই অভিবাসীদের পরিচয় হয় কারাউইন, তথা কাইরাওয়ানের অধিবাসী নামে।

ফেজে এসে মোহাম্মদ আল-ফিহরির ভাগ্য খুলে যায়। প্রচণ্ড পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার সন্তানদের জন্য তিনি সুশিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি ক্লাসিকাল আরবি ভাষা, ইসলামিক ফিক্হ এবং হাদিস শাস্ত্রের উপর পড়াশোনা করেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এই ফেজ শহরেই ফাতিমার বাবা তাকে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছরের মাথায়ই ফাতিমাদের পরিবারে দুর্যোগ নেমে আসে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার বাবা, ভাই এবং স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। রয়ে যান কেবল এতিম দুই বোন ফাতিমা এবং মারিয়াম। বাবার রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন তারা।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পিতার কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি ব্যয় করার ক্ষেত্রে কন্যারা কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য না। ফাতিমা এবং মারিয়ামও চাইলে এই সম্পত্তি যেকোনো ভাবে ব্যয় করতে পারতেন। কিন্তু কোন বিলাসিতার পেছনে ব্যয় না করে তারা সিদ্ধান্ত নেন, এই অর্থ তারা ব্যয় করবেন ধর্মের জন্য, মানবতার কল্যাণের জন্য। সাজসজ্জার কিংবা বিলাসিতার পণ্য ক্রয় না করে সিদ্ধান্ত নেন, তারা ক্রয় করবেন জনগণের ভবিষ্যত।

ফেজের খ্যাতি তখন দিনে দিনে বেড়েই চলছিল। দেশ-বিদেশ থেকে মুসলিমরা এসে শহরটিতে বসবাস করতে শুরু করছিল। ফাতিমা এবং মারিয়াম লক্ষ্য করেন, ফেজের কেন্দ্রীয় মসজিদটি শহরের ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদেরকে আর স্থান দিতে পারছে না। ফলে তারা সিদ্ধান্ত নেন, বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দিয়ে তারা পৃথক দুটি মসজিদ নির্মাণ করবেন। প্রায় কাছাকাছি সময় দুই বোন কাছাকাছি এলাকায় দুটি পৃথক মসজিদ নির্মাণ করেন। মারিয়াম নির্মাণ করেন আন্দালুস মসজিদ, আর ফাতিমা নির্মাণ করেন কারাউইন মসজিদ।

ফাতিমা প্রথমে তার মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি ক্রয় করতে শুরু করেন এবং এরপর ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের ৩ তারিখে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সেটা ছিল পবিত্র রমজান মাসের এক শনিবার। ফাতিমা শুধু মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থ দান করেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি নিজে সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থেকে এর নির্মাণকাজ তদারকি করেছিলেন। এবং শুরুর দিন থেকে শুরু করে নির্মাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি দিন তিনি রোযা রেখেছিলেন।

মসজিদটির নির্মাণ সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল ১৮ বছর। যেদিন নির্মাণ শেষ হয়, সেদিন তিনি নিজের নির্মিত মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করেন এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জন্মভূমি কাইরাওয়ানের নামানুসারে তিনি মসজিদটির নাম রাখেন কারাউইন মসজিদ।

মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর ফাতিমা মসজিদের বর্ধিতাংশে একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই সেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাকরণ, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন, ভূগোলসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়। বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় বিষয়ের উপর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য ডিগ্রী প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই এটিই প্রাচীনতম, যা এখনও টিকে আছে এবং গত সাড়ে এগারোশ বছর ধরে একটানা শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে আলোকিত করে আসছে।

ফাতিমার প্রতিষ্ঠিত কারাউইন মসজিদ এবং কারাউইন ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে ফেজ হয়ে উঠতে থাকে আফ্রিকার ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। শুধু মুসলমান না, মধ্যযুগের অনেক খ্যাতিমান ইহুদি এবং খ্রিস্টান মনীষীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। এর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা লাভ করে সেই জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং ইউরোপীয়দেরকে প্রথম শূন্যের (০) ধারণার সাথে পরিচিত করেছিলেন।

কারাউইন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিটিকেও বিশ্বের প্রাচীনতম লাইব্রেরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আগুনে পুড়ে বিপুল সংখ্যক পাণ্ডুলিপি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও এখনও এতে প্রায় ৪,০০০ প্রাচীন এবং দুর্লভ পাণ্ডুলিপি আছে। ফাতিমা আল-ফিহরি ইন্তেকাল করেন ৮৮০ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত কারাউইন মসজিদ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং লাইব্রেরি আজও দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। তার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিগত হাজার বছরে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী জ্ঞানার্জন করে বেরিয়েছে। - সূত্রঃ কালের কন্ঠ

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com