অন্য কেউ নয়; কেবল নিজে বদলালেই বদলে যাবে দেশ!!!!

প্রকাশের সময় : 2020-02-26 10:45:38 | প্রকাশক : Administration
অন্য কেউ নয়; কেবল নিজে বদলালেই বদলে যাবে দেশ!!!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আছাদা সান। আমার জাপানীজ বন্ধু। বড় কাছের বন্ধু। ব্যবসায়িক, পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত এমন কোন বিষয় নেই আমার যেখানে তার উপস্থিতি নেই। তিনি সবখানেই আছেন। পরিচয় খুব বেশী দিনের না হলেও দেখতে দেখতে তিন বছর পেরিয়ে গেছে। বয়সে বছর চারেকের বড় হবেন আমার। তবে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতায় বয়সের পার্থক্য হারিয়েছে বেশ আগেই। মিশেছেন তার পুরো পরিবার নিয়ে আমার পরিবারের সাথে। শোনিমকে খুব আপন করে নিয়েছেন। বেজায় স্নেহ করেন। আমার শোনিমেরও পছন্দের মানুষ তিনি।

সেই তিনি অনেকটা চুপেচাপে একটা মহাকান্ড করে ফেললেন। যে কাজ সহজে কেউ পারে না, সেই কাজই তিনি অতি সহজে করে ফেললেন। অফিসিয়াল কাজে গেল তিন বছর আগে বাংলাদেশে প্রথমবারের মত এসে দিন চারেক থেকে জাপানে ফিরে গিয়েই কান্ডটি করলেন। যেনতেন কান্ড নয়; দীর্ঘ ৩৫ বছরের সিগারেট খাবার অভ্যাসটি তিনি পুরোপুরি ত্যাগ করলেন। সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন ফিরতি পথে প্লেনে বসে থেকেই। যেই কথা সেই কাজ। প্লেন থেকে নেমেই ব্যাগে থাকা সিগারেটের কয়েকটি প্যাকেট ছুঁড়ে মারলেন ডাষ্টবিনে।

হুট করে এমন করার পেছনেও গল্প আছে। কান্ডটি তিনি করেছেন তারই সতীর্থদের উপর বেজায় রাগ এবং অভিমান করেই। বাংলাদেশে এসেছিলেন ৩৫ জন জাপানীজ ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের একজন হয়ে। ঘুরেছেন ঢাকার আশপাশ, অলিগলি। হেঁটেছেন ফুটপাত এবং এখানে সেখানে। সন্দেহ নেই ঢাকা ময়লার শহর; আবর্জনার শহর। তিনি জেনে শুনেই এসেছেন। তবে এতটা অপরিস্কার সেটা অনুমান করতে পারেননি।

সঙ্গের সতীর্থ জাপানীজরাও নিশ্চয়ই পারেননি। না পারারই কথা। কিন্তু তারা আরো একটা কাজ পারেননি। জাপানীজ সাধারণ ম্যানারিজম কিংবা ভদ্রতাটুকু বজায় রাখতে পারেননি। রাস্তাঘাটের ময়লা আবর্জনা দেখে তারা বাংলাদেশীদের মত এখানে সেখানে নিজেদের খাওয়া সিগারেটের শেষ অংশটুকু অবলীলায় ফেলে দিয়েছেন। বিষয়টি আছাদা সানকে খুব আঘাত করেছে। তিনি মনে খুবই কষ্ট পেয়েছেন বাংলাদেশে এসে জাপানীজদেরকে হুট করে বদলে যেতে দেখে।

জাপানে ফেরার পথে প্লেনে বসে বিষয়টি নিয়ে তিনি ভেবেছেন এবং মোটামুটি একটা যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন জাপানীজরা অন্য কোন কিছু এখানে সেখানে ফেলেননি। যতক্ষণ না ডাস্টবিন বা ময়লা ফেলার উপযুক্ত জায়গা পেয়েছেন, ততক্ষণ ওসব হাতে রেখেছেন। কেবল হাতে বয়ে বেড়াতে পারেননি সিগারেটের শেষ অংশটুকু। তার বিশ্বাস জন্মেছে সিগারেট খাবার এই বদ অভ্যাসটাই বাংলাদেশে এসে জাপানীজদের অভদ্র করেছে। ভীষনভাবে অভদ্র করেছে। তাই জাপানীজদের উচিত সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেয়া। এবং কাজটা এখনই শুরু করা।

প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে টোকিও এয়ারপোর্টে বিশালাকার থাই এয়ারওয়েজের প্লেনটি ল্যান্ড করতে না করতেই কাজটি তিনি নিজে থেকেই শুরু করলেন। গুরুত্ব অনুধাবনের বিবেচনায়ই শুরু করলেন। নিজে শুরু না করে অন্যেরা শুরু করবে এই আশায় বসে থাকলেন না। এই স্বভাবটা আমাদের। সব সময় অন্য কেউ শুরু করবে এই আশায় আমরা বুক বাঁধি। না শুরু হলে অন্যকে দোষী। নিজের দোষটা দেখি না। নিজে থেকে শুরু করিনা। আছাদা সান নিজ থেকেই শুরু করলেন কেবলই এই ভাবনায়- “যে সিগারেট আমার ভদ্রতাবোধ নষ্ট করে, পুরো জাতিকে কলঙ্কিত করে তা না খেলে কী হয়?”

কেবল সিগারেট নয়; বাংলাদেশ নোংরা হয়, অসুন্দর হয় এখানে সেখানে ঝুলানো রাজনৈতিক পোষ্টারের কারণে। সারা বছরব্যাপী এসব ঝুলে। বেশী ঝুলে নির্বাচন এলে। কেবল জাতীয় নির্বাচন নয়; নির্বাচন একটা হলেই ঝুলে। ক’দিন আগে ঢাকা শহরের মাথায় মাথায় ঝুলে ছিল লক্ষকোটি পোষ্টার। পুরো ঢাকা শহর ঢেকে গিয়েছিল সিটি করপোরেশন নির্বাচনী পোষ্টারে। পৃথিবীর এমন একটি সভ্য দেশ নেই, যেখানে নির্বাচনে পোষ্টার লাগিয়ে কোনো শহরকে নোংরা করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষুরধার লেখক প্রভাষ আমিন লিখেছিলেন বড় সুন্দর করে। তিনি লিখেছেন, সবাই আধুনিক আর স্মার্ট ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কিন্তু তাদের প্রচারণায় তার কোনো ছোঁয়া নেই। এমনিতেই ঢাকার আকাশ দেখা যায় না। যেটুকু দেখা যেতো, তাও ঢেকে গেছে পোষ্টারে। নির্বাচিত হলে যারা জলাবদ্ধতা দূর করবেন, বর্জ্য পরিষ্কার করবেন, তারাই পোষ্টার করেছেন পলিথিনে মোড়ানো বা লেমিনেটেড। শুধু এই পোষ্টারের কারণে নির্বাচনের পর ঢাকার অনেক ড্রেন বন্ধ হয়ে যাবে, জলাবদ্ধতা বাড়বে।

তিনি আরো লিখেছেন; “নীরব পোষ্টারের অত্যাচার না হয় মানা গেলো, কিন্তু সারাক্ষণ কান ঝালাপালা করা ক্যাম্পেইনের জ্বালায় ঢাকায় থাকাই মুশকিল। উচ্চ শব্দের মাইকে সারাক্ষণ নিম্নরুচির প্যারোডি আর ভাঁড়ামি, অসহ্য হয়ে গেছে। যাদের প্রচারণায় কোনো সংবেদনশীলতা নেই, স্মার্টনেস নেই, তারা গড়বেন স্মার্ট ঢাকা! আমার চাওয়াও অতো বেশি নয়। আমার চাওয়া চারশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী শহরটি অন্তত বাসযোগ্য থাকুক।”

কলামিস্ট কামরুল হাসান মামুনও লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, “পৃথিবীর এমন একটি সভ্য দেশ দেখান যেখানে নির্বাচনে পোস্টার লাগিয়ে একটি শহরকে নোংরা করে। এবার তো কেবল নোংরাই করা হচ্ছে না নতুন আরেকটি জিনিস যোগ হয়েছে। সেটি হলো প্লাস্টিকের পোস্টার যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শহর নোংরা করে শহরের জঞ্জাল দূর করার প্রতিশ্রুতি কি হাস্যকর নয়? জনগণকে কতো বড় বলদ ভাবলে এই লেবেলের বলদামি করে?”

অথচ তারা তো এই লেবেলের মানুষ নন। যথেষ্ট উঁচু লেবেলের মানুষ। তাদের আরো উঁচুতে ওঠার কথা। পৃথিবীর সব উন্নত দেশের রাজধানী শহরের মেয়র অনেক সম্মানিত একজন মানুষ। সেসব মেয়রকে দেখা হয় ভবিষ্যত সরকার প্রধান হিসেবে। ক্ষমতাসীন সরকার প্রধানের পরপরই তার সামাজিক অবস্থান। এবং মেয়রশীপে তিনি ভাল করলে জনগণ অপেক্ষায় থাকেন কবে তিনি সরকার প্রধান হবার নির্বাচনী লড়াইয়ে নামবেন।

বাংলাদেশে এসব আশা করে লাভ নেই। আশা করবো কিভাবে? নির্বাচিত দুজনসহ পরাজিত প্রার্থীগণও মিলেমিশে নির্বাচনের সময় পোস্টার এবং ব্যানার লাগানোর নামে যেভাবে ঢাকা শহরকে অপরিচ্ছন্ন করেছেন তাতে তাদের নিয়ে আশা করার কোন কারণ থাকতে পারে না। তাদের উপর আস্থা রাখারও কোন উপায় নেই। যারা মেয়র হবার জন্যে মাসব্যাপী শহর নোংরা করতে পারেন, তারা গদি টিকিয়ে রাখার জন্যে মেয়রশীপের পুরোটা সময় শহরকে আরো নোংরা করবেন না তার নিশ্চয়তা কি?

আমাদের দূর্ভাগ্য এখানেই। জাতি গঠনে আমরা পারফেক্ট লিডারশীপ পাই না। একা প্রধানমন্ত্রী আর কত করবেন! আর কত সামলাবেন! আমাদের দরকার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ধাপে ধাপে যোগ্য নেতৃত্ব। এমন নেতৃত্ব, এমন লিডারশীপ; যারা আগে নিজেরা বদলাবেন। নিজেরা না বদলিয়ে আমজনতাকে কখনোই বদলাতে বলবেন না। দেশকে বদলাতে চাইবেন না। তাদেরকে সব সময় বুঝতে হবে, দেশকে বদলাতে চাইলে আগে নিজেকে বদলাতে হবে।

বিষয়টি বোঝার জন্যে ইউরোপের একটা ছোট্ট দেশের কথা ভাবুন। ইউক্রেন; সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নভুক্ত ইউরোপের একটি দেশ। বেশ পরিচিত দেশ। কিছুদিন আগে সেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হয়ে শপথ নেয়ার অনুষ্ঠানে তিনি শিশুর মতো সত্য কিন্তু দারুণ এক বিচক্ষণ কথা বললেন। “নিজের যোগ্যতায় কিন্তু প্রেসিডেন্ট হইনি। বরং প্রেসিডেন্ট হয়েছি- পূর্ববর্তী শাসকের অযোগ্যতায়।” এরপর তিনি সবাইকে বলেন- “একজন স্কুল প্রধান শিক্ষকের কাজ যেমন স্কুল পরিচালনা করা। আমারও তেমন কাজ- রাষ্ট্র পরিচালনা করা। কাজেই- আমি মূর্তিও না, প্রতিমাও না, আইকনও না। সুতরাং আমার ছবি অফিসের দেয়ালে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। আপনজনের ছবি লাগান। মন ভালো থাকলে কাজেও আনন্দ পাবেন।

আমি আমার অফিসে আমার শিশুর ছবি লাগাবো। আপনারাও আপনাদের অফিসে শিশুর ছবি লাগান। মাতা-পিতার ছবি লাগান। আর যে কোন কাজ করার আগে তাদের দিকে একবার তাকান। এসব মানুষের ছবি সামনে রেখে কেউ কোন বাজে কাজ করতে পারেনা। আপনার বাবা-মা যেমন আপনাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছেন; আপনারও শপথ হবে- আপনার শিশুকে আপনি আরো সুন্দর জায়গায় পৌঁছে দিবেন। আমি এক সময় ছবি পরিচালনা করেছিলাম। কিন্তু দেশতো আর ছবি নয়। তবে সবাই মিলে চাইলে আমরা দেশকে ছবির মতোই করতে পারি!”

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com