হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩২ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-06-10 10:48:11 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩২ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ চুরি করার এই তেলেসমাতি শিখেছিলাম ভাইয়ার কাছ থেকে। বলা যায় বাহার ভাইয়ার কাছেই এ বিদ্যের হাতে খড়ি। বয়সের ব্যবধানে তিনি আমার চেয়ে খুব যে বেশী বড় তাও নন। আমাদের এই দুজনের মাঝে আরো এক ভাই আছেন। তিনি তার পিঠাপিঠি মাত্র। কিন্তু ভারীমাত্রায় বড়ত্ব দেখানো শুরু করেন সেই ছেলেবেলা থেকেই। বড়ত্ব মানে দুঃশাসন! শাসনের নামে জুলুম করা; কারনে অকারনে চড়থাপ্পর মারা। তার ভয়ে তটস্ত থাকতাম আমরা ছোট দুইজন। পান থেকে চুন খসলেই চটাং করে মাইর। বাইরে কারো সাথে দুষ্টামি কিংবা মারামারি করলে মাইর; দূপুরে রোদে বাইরে থাকলেও মাইর। সন্ধ্যার হারিকেন জ্বালাতে দেরী হলে মাইর; পড়তে বসতে দেরী করলেও মাইর; শুধু মাইর আর মাইর।।

বলা যায় ছেলেবেলার জীবনটাতে একটুও সুখ করতে পারি নাই এই মানুষটার জ্বালাতে। দুনিয়ার সব নীতিকথা শেখাতেন আমাদের দুইজনকে। নিজের বেলায় ঠিক উল্টো। বিড়ি খাওয়া শিখেছেন ক্লাশ এইট থেকেই। লুকিয়ে লুকিয়ে খেতেন যেন বাবা-মা না দেখেন। একদিন আমি ঠিকই দেখে ফেললাম। বাসার সামনের আতাফল গাছের ডালে চড়ে বিড়ি খাচ্ছেন আলম ভাইকে নিয়ে। সুযোগটি আমি ছাড়িনি। কায়দা করে আব্বাকে বলে বিশেষ মাইরের ব্যবস্থা করেছিলাম। মাইরের বদলে মাইর!

সাধারণত তিনি দুইনম্বরীতে বিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু সেদিন কেন ধরা খেলেন জানি না। বন্ধুদের নিয়ে থোক্কা বড়শি ফেলে মাছ চুরি কিংবা দেয়ালের চিপায় ফেলে মুরগী চুরিতে তার তুলনা হয় না। সকল সময় খুবই সচেতন এবং সতর্ক ছিলেন চুরিকর্মের চিহ্নকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলায়। চুরি করা মাছের আঁশ কিংবা মুরগীর পশম তিনি আশেপাশে ফেলতেন না। নমুনা সমূলে নিশ্চিহ্ন কল্পে তিনি ট্রেনের আশ্রয় নিতেন।

ঢাকা থেকে ফিফটি ফাইভআপ আসতো রাত নটার দিকে। রাতের অন্ধকারে ধলা স্টেশনে থেমে থাকা ট্রেনের ঠিক শেষ বগীর শেষ মাথায় থাকা লোহার আংটায় চটের ব্যাগ ঝুলিয়ে দিতেন। ব্যাগের ভেতরে থাকতো সদ্য কাটা মাছের আঁশ কিংবা মুরগীর পশম। বেহুলার লক্ষিন্দরকে ভেলায় ভাসিয়ে দেয়ার মত করে ওসব পরিত্যাজ্য হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতেন। যেন এক রাজের চোরামাল ঝুলে ঝুলে অন্য রাজ্যে যায়। ভাসতে ভাসতে যায়; চিহ্ন একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

সেকালে চুরিকর্মে ট্রেন বা মালগাড়ীর ভূমিকা বলাবাহুল্য। বিশেষ করে মালগাড়ী। চাল, গম কিংবা চিনিভর্তি মালগাড়ী এসে দু’তিন দিনের জন্যে পড়ে থাকতো ধলা ষ্টেশনে। গোডাউনে মাল খালাসের জন্যেই পড়ে থাকতো। সুযোগটি নিত আশেপাশের প্রফেশনাল চোরের দল। লুঙ্গী পেতে দলবেঁধে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করতো ওসব খাদ্য। লোহার বিশেষ খুঁচি বানিয়ে বের করতো। খোঁচা দিলেই গাড়ীর ভিতর থেকে তরতর করে চাল, গম কিংবা চিনি বেরিয়ে আসতো। ওসব দেখে লুঙ্গী পরে আমরা ননপ্রফেশনালরাও আসতাম। আমরাও খোঁচাতাম। বাঁশের ছোট চেড়া দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চিনি দিয়ে লুঙ্গী ভরে ফেলতাম।

তবে বাসায় নিতে পারতাম না। ওখানে নিলে সর্বনাশ হবে। তাই বাইরে বন্ধুরা বসে খেয়ে সাবাড় করতাম। মুখে চিনি পুরে কচকচ করে চাবাতাম। এটা এক ধরনের বিনোদন ছিল; চুরি বিনোদন। কেবল চুরিবিনোদন নয়, ট্রেনের বিশেষ ভূমিকা শুধু বিনোদনেও ছিল। থেমে থাকা ট্রেন ছাড়লেই লাফিয়ে উঠে পড়তাম। দরজায় ঝুলতাম। আস্তে আস্তে স্পিড বেড়ে সিগন্যালে যেতেই আবার নেমে পড়তাম। এভাবে একটু চড়া, আবার নেমে পড়া। চলন্ত ট্রেন থেকে সামনে পা ফেলে লাফ দিয়ে নেমে পড়া।

একদিন আখতার স্যারের সামনে পড়ে গেলাম। জটিল জিনিস তিনি। ধরা খেলে আর রক্ষে নেই। তুলাকে যেভাবে ধূনা করে, ঠিক সেভাবেই আমাদের ধূনা করতেন। আজকে আমার ধূনার পালা। প্রথমে চোখ লাল করে কষে একখানা ধমক দিয়ে আমাকে দূর্বল করে ফেললেন। এবং চিনিসহ ধরে স্কুলবোর্ডিং এ নিয়ে গেলেন। শফিকুল স্যার সহ কয়েকজন স্যার ওখানেই থাকতেন। তাদের আদালতে বিচার বসলো। যেন হাইকোর্টের আদালত। বিচারকগণ মিলে কঠিন রায় দিলেন। শাস্তি বড় জটিল। গণিমতের মাল হিসেবে চিনি জব্দ করলেন। নিজেরা চা বানিয়ে খাবেন বলে জব্দ করলেন। আর আমার ঘাড়ে হুকুম চাপালেন পরের দিন অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানে “সমবেদনা” কবিতাটি মাইকে আবৃতি করে শোনাবার।   আখতার স্যার নাছোড়বান্দা। মন যা চায়, তা করিয়েই ছাড়েন। রায় বাস্তবায়ন না করে তিনি ছাড়ার পাত্র নন। পরদিন বন্ধ চোখে থরথর বক্ষে হাটু কাঁপুনি দিয়ে আমি কবিতাটি মাঠের দক্ষিণপাশে থাকা ধারাভাষ্য প্যান্ডেল থেকে মাইকে আবৃতি করেছি। চুরির মামলার অপরাধী হিসেবে আবৃতি না করে উপায়ও নেই। তবে ফল হলো উল্টো। তিনি আমায় পেয়ে বসলেন। ক’দিন বাদে আবার আবদার। মামা বাড়ীর আবদার। এবার আর কবিতা আবৃতি নয়, বক্তৃতা করতে হবে। 

আমি এড়িয়ে চলছি। কিন্তু তিনি কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ছেন না। জীবনে মোট একটি ছোট কবিতা আবৃতি করার যার অভিজ্ঞতা, সেই কিনা হাজার শিক্ষার্থীর সামনে বক্তৃতা করবে; এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের বিদায়ী বক্তৃতা। আমি কেবল পালিয়ে বেড়াই। পারতপক্ষে স্যারের সামনে পড়ি না। আমাকে পেলেই স্যার অভয় দেন। কোলে বসিয়ে পকেটে রাখা ক্যান্ডি বের করে খাওয়ান। দামী ক্যান্ডি; চারআনা দিয়ে একপিস কিনতে হয়। মুখে দিয়ে একটু চোষা দিলেই মুখ রসে ভরে যায়। সেই রসও আমার কাছে তিতা লাগে, যখন স্যার বলেন, ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো লিখে দেবো। তুই শুধু মুখস্ত করবি!

প্রচন্ড তুখোড় ইংরেজীর শিক্ষক আখতার হোসেন মন্ডল স্যার এমনই। প্রতিভা না থাকুক; টেনে হেঁচড়ে হলেও প্রতিভা বের করে ছাড়বেন। তাঁর জ্বালায় জ্বলে জ্বলে অঙ্গার হলাম; কিন্তু মুক্তি পেলাম না। নিজের লেখা সাত কিংবা আট লাইনের একখানা বক্তৃতা স্যার আমাকে মুখস্ত করিয়ে ছাড়লেন। অনুষ্ঠানের আগের রাতে বাসায় এসে অঙ্গিভঙ্গি করে নিজেই বক্তৃতা করে দেখিয়ে দিলেন। মোটামুটি সব ঠিকঠাক। আমার মুখস্তও হয়েছে দারুন! সব দেখে স্যার নিশ্চিন্ত মনে বাসায় ফিরলেন।

সকালে বিশাল হল রুমে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে কেবল। শিক্ষার্থীতে পুরো মিলনায়তন গিজগিজ করছে। আমাকে রাখা হয়েছে বাইরে দাঁড় করিয়ে। স্যার নিজেই উপস্থাপক। ছোটখাট মঞ্চে উঠে শুরুতে কী কী যেন বলছেন। আমি ভয়তে অস্থির। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। জিহ্বা বের করে ঠোঁট ভিজাচ্ছি বার বার। তাতেও ঠোঁট ভিজছে না। হঠাৎ আমার নামের ঘোষনা এলো। ক্লাশ সেভেন এ পড়ুয়া আজকের আমার শোনিমের বয়সী এই আমি বিদায় অনুষ্ঠানের প্রথম বক্তা হিসেবে জীবনের প্রথম বক্তৃতা দিতে মঞ্চে দাঁড়িয়েছি।

সামনে রাশি রাশি মানুষের কালো চুল ভর্তি মাথা। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে। জীবনে এই প্রথম এত্ত মানুষ আমার দিকে একসাথে তাকিয়ে! অবস্থা বড়ই বেগতিক। প্রায় এক কেজি ওজনের মাউথপিস দুই হাতের মাঝে নিয়ে আমি শুরু করেছি। এত ভারী জিনিস হাতে ধরে রাখাই মুশকিল। মোটামুটি দুই লাইন শেষ করে তিন লাইনে পরেছি কেবল। ব্যাস! সব ভুলে গেছি; আর মনে আসছে না কিছুই। সামনে এত্ত এত্ত মানুষের কালো চুলওয়ালা মাথা দেখলে মুখস্ত কিছু মনে রাখার সাধ্য কার! কোতাকুতি করেও কিছুই মনে আনতে পারছি না। আবার প্রথম থেকেই শুরু করলাম। কিন্তু কোতাকুতি ছাড়া কিছুই পারলাম না!

দর্শক এবার হাসা শুরু করেছে। বিদায়ী অনুষ্ঠানে খিলখিল হাসির আমেজ ঠিক যায় না। পেছনে দাঁড়ানো আখতার স্যার এগিয়ে এলেন। ফিসফিস করে একটু একটু প্রম্পট করলেন আর আমিও একটু একটু করে বলতে লাগলাম। স্যার বলেন, আমি বলি; স্যার থামেন, আমিও থামি। এক পর্যায়ে শেষ হয় জীবনের প্রথম বক্তৃতা। মঞ্চেই আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন স্যার। আমার পরম পূঁজনীয় আখতার হোসেন মন্ডল স্যার! যিনি আমাকে হাতে কলমে ধরে ধরে ইংরেজী লিখতে এবং বলতে শিখিয়েছেন। চলবে....

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com