জীবনকর্ম ও আদর্শ গর্বিত করেছে সবাইকে

প্রকাশের সময় : 2020-09-03 16:52:23 | প্রকাশক : Administration
জীবনকর্ম ও আদর্শ গর্বিত করেছে সবাইকে

কামাল লোহানীঃ ওয়াহিদুল হক। বাঙালি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ, লেখক-সাংবাদিক। সংস্কৃতিপ্রেম আর দেশ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় ওয়াহিদুল হক ছিলেন সবার প্রিয়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিকামী সাংস্কৃতিক দল নিয়ে জাগ্রত রেখেছেন মুক্তিসেনাদের। দেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও রবীন্দ্র-গবেষণায়ও অন্যতম পুরোধা পুরুষ ছিলেন তিনি। রাজনীতি, সংস্কৃতি, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, চিত্রকলাসহ অনেক বিষয়ে তার উৎসাহ সমান ছিল। এ উৎসাহের মধ্য দিয়ে নিজেকে যেমন বিকশিত করতে চেয়েছিলেন, অন্যকেও করে গেছেন উদ্বুদ্ধ।

ওয়াহিদ ভাই কেবল সঙ্গীতজ্ঞ কিংবা সাংবাদিক ছিলেন না। পণ্ডিত ছিলেন দর্শনে, ইতিহাসে, উদ্ভিদবিদ্যায়। ইংরেজিতে ছিলেন প্রাজ্ঞ। বাংলা ভাষাজ্ঞান তো অনুমানই করতে পেরেছেন সবাই বিভিন্ন পত্রিকার লেখা থেকেই। আবৃত্তি চর্চার প্রসারেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য, শিক্ষক হিসেবে, শুদ্ধ উচ্চারণেও। কিন্তু তিনি যে খেলোয়াড় ছিলেন, সে কথা কি জানি? তিনি ক্রীড়াজগতেও সংগঠক হিসেবে দারুণ ভূমিকা পালন করেছেন।

এছাড়া আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে যারা পড়তেন তাদের খেলায় পারদর্শিতা শিক্ষাজীবনের প্রথম থেকেই ছিল। নানা ধরনের খেলাধুলার আয়োজন ছিল আরমানিটোলায়। প্রতিষ্ঠান এমনকি কতৃপক্ষও বেশ নজর রাখতেন এ দিকটায়। সে কারণে এই স্কুলের খেলাধুলায় সুখ্যাতি ছিল প্রচুর। ওয়াহিদুল হক এবং তার ভাই রেজাউল হক বাচ্চু তাঁরা আরমানিটোলার ছাত্র ছিলেন এবং সেই ছোটকাল থেকেই যেহেতু খেলাধুলার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, তাই তারাও অন্যদের মতন লালিত হয়েছিলেন এই আরমানিটোলা স্কুল মাঠেই।

আরমানিটোলা স্কুল মাঠের সেই শিক্ষা একদিন কাজে লাগিয়ে পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকেই বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব’। সেখানে তারা নীতিনির্ধারণ করেছিলেন যে, কেবলমাত্র ছাত্ররাই এই ক্লাবে খেলবে। তরুণদের এই প্রতিষ্ঠান ও তারুণ্যদীপ্ত ফুটবল খেলুড়ে ছাত্ররা দল গঠন করলেও দ্বিতীয় বিভাগে খেলত আজাদ স্পোর্টিং। ওয়াহিদ ভাই নিয়মিত খেলতেন। যেবার লিগ চ্যাম্পিয়ন হলো সেই ১৯৫৮ সালে, এরপর আর খেলেননি ওয়াহিদ ভাই। তার অবশ্য আরো একটি কারণ ছিল। তা হলো, চোখে তার চশমা পরতে হয়েছিল।

ওয়াহিদ ভাই স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকায় যোগ দেন পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে না হলেও মাঝামাঝি তো বটেই। তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। সম্ভবত একই সময় ক্রীড়া সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেছিলেন। আর এমনি ক্রীড়ামনস্ক মানুষটি এদেশের ক্রীড়া বিষয়ের ওপর লেখালেখি করে এবং সংগঠন নির্মাণ ও পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিভা অন্বেষণ ও উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন।

তারই স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিক ও লেখকদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাকে সম্মাননা প্রদান করেছিল। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর ২ জুলাই দেশবরেণ্য ক্রীড়ালেখক-সাংবাদিক সম্মাননা দিয়ে আসছে ইন্টারন্যাশনাল স্পোর্টস প্রেস এসোসিয়েশনের অধিভুক্ত সদস্য এই প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ক্রীড়া সংগঠনের প্রতিনিধি সংস্থা হিসেবে এই বাংলার দায়িত্ব পালন করে আসছে।

বেশিদিন অবজার্ভারে থাকেননি। কয়েক মাস পরেই তিনি ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ ছেড়ে ‘ডেইলি মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় চলে যান। অবশ্য সেখানেও স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবেই। বেশ কিছুদিন লেগে থাকলেও আবার তিনি সাব-এডিটর হিসেবে ডাক পেলেন অবজার্ভারে। রিপোর্টিংয়ের পালা শেষ হলো বটে, কিন্তু তিনি নিয়মিত নবীন রিপোর্টারদের সহযোগিতা করতেন, রিপোর্ট লেখার টেকনিক বুঝিয়ে দিয়ে।

শব্দ চয়ন আর বাক্য বিন্যাস, ভাষা প্রয়োগ এবং পাংচুয়েশন শিখিয়ে নতুনদের গড়েপিটে মানুষ করে নেয়া তখন যে সিনিয়রদের দায়িত্বই ছিল। আর তার যুবককাল থেকেই তাঁর এই দায়িত্ববোধ ছিল প্রখর। সঙ্গীতে-সঙ্গতে যেমন তেমনি বেশ কিছুদিন খেলা আর লেখাতেও ছিলেন পারঙ্গম। এই পর্যায় অতিক্রম করে তিনি যখন টেবিলে বসে সংবাদ সম্পাদনার দায়িত্ব পেলেন, তখনো কর্তব্যবোধ আরো প্রখর হয়ে উঠেছিল।

যখন তিনি ছিলেন স্পোর্টস রিপোর্টার, তখন তার খেলার পাতা প্রতিদিন লেখা দিয়ে ভরে মনোগ্রাহী করে সাজাতেও হতো। তারপরও খেলা দেখতে এবং রিপোর্ট করতে মাঠেও যেতেন। প্রচণ্ড দায়িত্বশীল ছিলেন বলেই সরেজমিন উপস্থিত থেকে লিখতেন তিনি। ওয়াহিদ ভাইয়ের গ্রামের বাড়ি ছিল কেরানীগঞ্জ থানার ভাওয়াল মনোহরিয়ায়।

সে  গ্রামে তাঁদের পরিবারের সকলে মিলে একটি বিদ্যানিকেতন গড়ে তুলেছিলেন। বিশাল এলাকাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যায়তনের মাঠটি ছিল বিস্তৃত। এই খেলার মাঠে আয়োজন করতেন ফুটবল প্রতিযোগিতার এবং এর মৌল ব্যক্তিত্ব ছিলেন ওয়াহিদ ভাই নিজে। তিনি সংগঠক-আয়োজক হিসেবে সফলতার দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন বলে শুনেছি। এই প্রতিযোগিতার কারণে আশপাশের দূরে ও কাছের গ্রামগুলোতেও বেশ সাড়া পড়ে গিয়েছিল। এমন দক্ষ ও সফল সংগঠক পরবর্তীকালে নিজের ক্রীড়া পারদর্শিতা দেখানো ছাড়াও টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, হকি খেলতেন নিয়মিত।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রথম পাঠ যার সেই কৈশোরে তিনি পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন খুবই কঠোর রেওয়াজ রীতি এবং বিনম্র শ্রোতা হিসেবে। আর সেখানেই গড়ে তুলেছিলেন নিজ গর্বিত সঙ্গীতাঙ্গন। সেই থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত এসেছিল তাঁর জীবনে সাধনার বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে। আমৃত্যু তাই তিনি বিশুদ্ধতার সঙ্গে বিতরণ করে গেছেন তাঁরই শিষ্য-শিষ্যাদের। এই যে নবপ্রতিভার প্রতি তার আগ্রহ, এ তার খেলার জগৎকেও আলোকিত করেছে। গুণের বিচিত্র গতি ওয়াহিদুল হককে বিশালত্ব দিয়েছে। এমন জীবনকর্ম ও আদর্শ আমাদের গর্বিত করেছে। তিনি আজ প্রয়াত কিন্তু তাঁর কীর্তি আমাদের আরো উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাক- এই কামনা করি। - ভোরের কাগজ

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com