দৃষ্টিকটু কাজকাম! বলতে হবে থাম থাম!!

প্রকাশের সময় : 2020-10-14 15:37:02 | প্রকাশক : Administration
দৃষ্টিকটু কাজকাম! বলতে হবে থাম থাম!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ভরদূপুরে অপেক্ষায় আছি। বাসের অপেক্ষায়। গাবতলী থেকে বাসে করে ফার্মগেট যাবো। তখন বাসে চড়ারই বয়স। বেশী ভীড় থাকলে ঝুলে ঝুলেও যেতে পারি। বয়সটাই তো এমন। কতই বা হবে। আজকের আমার শোনিমের চেয়ে একটু বেশী হয়ত। লেগুনার মত দেখতে টেম্পুও ছিল তখন। তবে টেম্পুর চেয়ে বাসে চড়াই নিরাপদ। টেম্পুতে উঠলে ভাড়া না দিয়ে উপায় নেই। পিচ্চি কন্ডাকটর খুবই তেদর। দেয়াই লাগে। বাসে সেরকম না। একটু নিস্তার আছে। স্টুডেন্ট পাস আছে। দেয়া লাগলে হাফ ভাড়াতেই ওকে। আর না দিতে পারলে কে দেয়!

ভাড়া ফাঁকি দেবার সুযোগ সম্পন্ন তেমন বাস এর আসতে একটু দেরী দেখে ভাবলাম কাজটা সেরেই নেই। এদিক ওদিক তাকালাম। সুবিধাজনক জায়গা খুঁজছি। তখনকার দিনে ঢাকার শহর বড়ই নাগরিকবান্ধব(!) ছিল। নাগরিককে এসব বিষয় নিয়ে বিপদে পড়া লাগতো না। ভাবতে হতো না। আশেপাশে সুবিধাজনক জায়গার কোনই কমতি ছিল না। একটা না একটা পেয়েই যেতাম। আজকেও পেয়ে গেলাম। বাসস্ট্যান্ডের খুব কাছাকাছিই পেয়ে গেলাম। ব্যস্ত রাস্তার ধারে ভেজাভেজা মাটি, দেয়ালের গড়ন এবং বর্ণ দেখে নিশ্চিত হলাম এটাই পাবলিক টয়লেট। ঢাকা শহরে যত্রতত্র এমনি পাবলিক টয়লেটের ছড়াছড়ি তখন।

জায়গামত পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। পজিশনে দুটো বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয়। এক, নিজেকে ঠিকঠাক মত আবডালে রাখা। আর দুই, পদযুগল সামলানো। সবচেয়ে রিস্ক এই পদ দুখানি। নির্গত জলে ভিজে যাবার কঠিন সম্ভাবনা থাকে রাস্তায় দাঁড়ালে। তবে এমনি এমনি তো আর কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়ায় না। প্রকৃতি বেটাইমে ডাকলে তার ডাকে সারা দিতেই দাঁড়ায়। আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির ডাকে সারা দিচ্ছি। প্রথমে খেয়াল করিনি সামনে ছোটখাট একটা বালির ঢিবি। বালির উপর শরীর নির্গত দূষিত জল পড়ার জায়গাটা জল পড়ার কারনেই ক্রমান্বয়ে পরিস্কার হচ্ছিল। বালি সরে সরেই পরিস্কার হচ্ছিল। এক পর্যায়ে হঠাৎ চোখ গেল সামনের দিকে। ছোট একটা সাইনবোর্ড বেরিয়ে এলো বালির নীচ থেকে। যেখানে জ্বলজ্বল করে লেখা, এখানে প্রস্রাব করিবেন না; করিলে ১০০ বার কান ধরিয়া উঠবস করানো হইবে।

আমার তো আক্কেলগুরুম অবস্থা। শরীরে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ওঠার মত দশা। দুপা একসংগে কাঁপছে। নিজের অজান্তেই কাজকাম বন্ধ রেখে দাঁড়িয়ে গেলাম। এটা ইচ্ছেকৃত না। পরিস্থিতির ধাক্কায় সব থেমে গেছে। প্রকৃতির ডাকে আর সারা দিব কি? কাজকাম আধা রেখেই পালাবার পথ খুঁজছি। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। হঠাৎ কেউ একজন পেছন থেকে জামার কলার ধরে ফেলেছে। প্রকৃতি না, তরে আমার স্যারে ডাকে; বলে টেনে হেচ‍রে পাশের অফিস ঘরে নিয়ে গেল।

গাবতলী খালেক মটরস এর অফিস। অফিস ঘরে চেয়ারে বসা কর্তাবাবুর সামনে দাঁড় করালো আমায়। বাবুর কঠিন জিজ্ঞাসা, লজ্জা শরম নাই? যেইখানে সেইখানে খাড়াইয়া পড়স। বেডা মুতাখবিশ! তুই তোকারি করাতে একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললাম, জি স্যার, আমার মাও এটা বলেন। তবে আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল, অনেকক্ষণ ধরে চেপে রেখেছিলাম। আর পারছিলাম না, তাই দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভবিষ্যতে এমন আর হবে না। যেইখানে সেইখানে আর দাঁড়িয়ে পড়বোনা।

মুতাখবিশদের বিশ্বাস নাই। আবারও করবি না, তার গ্যারান্টি আছে? এমনি এমনি ছাইড়া দিলে তুই আবারো খাড়াইয়া পড়বি। জায়গা একটা পাইলেই খাড়াবি। তাই কিছু একটা শাস্তি তোর প্রাপ্য। দুইটা অপশন দিলাম। হয় ১০০ বার কানে ধরে উঠবস, না হয় ১০টা ডান্ডার বাড়ি। Select one please; মুখে ভেংচি কেটে গড়গড় করে কথাগুলো বললেন কর্তাবাবু। লোকটার মুখে ইংরেজী শুনে আমার মনে হচ্ছিল প্রকৃতি আবার ডাকলে এবং কখনো সুযোগ পেলে বালির ঢিবি নয়, এই বেটার মুখেই ...। সেটাতো আর হবার জোঁ নেই। তাই সুবোধ বালকের মত ডান্ডার বাড়ি খাবার চেয়ে কান ধরে উঠবস করাকেই বেটার মনে করলাম। এবং নিশ্চিন্তে ও বিনা সংকোচে গোণা শুরু করলাম এক, দুই, তিন...

এরূপ এক, দুই কিংবা তিন না। গাবতলী আর মিরপুরও না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মূত্রত্যাগের এমন জায়গা ঢাকা শহরে ছিল শতশত; যত্রতত্র । বনানী, গুলশানও বাদ ছিল না। এখন দিন বদলছে। এখন এতটা নেই। কিছুটা কমেছে। তবে শেষ হয়ে যায়নি। এখনো এখানে সেখানে বেশ চোখে পড়ে। চোখে পড়ে সড়ক-ফুটপাথে মলমূত্রের ছড়াছড়ি। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সংসদ ভবন, উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণ, বিশ্ববিদ্যালয়, রেলস্টেশন, উদ্যান, বিমানবন্দর এলাকা, বাস টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগের কারণে। যা সরাসরি নগরীর সার্বিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সংক্রমিত হচ্ছে রোগবালাই।

যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগের কারণে পরিবেশ দূষণ হয়। পাশাপাশি পানি ও ধূলোর সঙ্গে মলমূত্র মিশে মানবদেহে নানা ধরনের রোগ হয়ে থাকে। মলমূত্রের মতো মানববর্জ্য হলো রোগ জীবাণুর আধার। ঢাকায় পাঁচটি রোগের অন্যতম কারণ মানব বর্জ্য। খোলা বর্জ্য শুকিয়ে ধূলো অথবা খাবারের সঙ্গে কিংবা পানিতে মিশে মানবদেহে প্রবেশ করে। এতে টাইফয়েড, জন্ডিস, আমাশয়, ডায়রিয়া ও ক্রিমিরোগ হতে পারে। এ কারণে এসব রোগ রাজধানীর মানুষের সারা বছর লেগে থাকে।

দুই কোটির বেশি মানুষের এই শহরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক টয়লেট নেই। যা একজন নাগরিকের পথচলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা। অথচ উন্নত শহরগুলোতে রাস্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্থায়ী, এমনকি মোবাইল টয়লেটও রাখা হয়। ভাসমান মানুষদের জন্য বিনামূল্যে টয়লেটের ব্যবস্থা থাকে। রাজধানী শহরে এরকম সুবিধা পর্যাপ্ত না হওয়ায় মানব বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও সাধারণ মানুষ টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ পান না। তাই খেয়াল খুশিমতো বর্জ্য ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

অবিশ্বাস্য হলো, দুই কোটি অধিবাসীর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মোট পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে মাত্র ৬৫। এটা ভাবা যায়? ভাবা যায় না বলেই এখনও নগরজুড়ে দৃষ্টিকটু চিত্রের শেষ নেই। হরহামেশাই এমন চিত্র। কান্ডজ্ঞানহীন এমন কায়কারবারে সচেতন নগরীর মানুষ তথা বিদেশীদের কাছে বিষয়টি প্রচন্ড রকমের দৃষ্টিকটু। আবার কেবল দৃষ্টিকটুই নয়; চরম অস্বস্তিজনক ও মহাবিব্রতকরও। অথচ সতর্ক হয়ে একটু উদ্যোগ নিলেই এরকম দৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকা সম্ভব।

উদ্যোগটা কে নেবেন? ভুক্তভোগী জনগণ? নাকি করপোরেশন? নাকি কমিশন, মানে নির্বাচন কমিশন। বলতে দ্বিধা নেই, এখানে জনগণের করণীয় বলতে কিছুই নেই। এটা প্রকৃতিগত। চাঁপ আসলে তাঁকে ডিসপোজ করতেই হবে। এটা প্রথমত সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। করপোরেশনের লোকজনের প্রথম দায়িত্ব হবে তার নাগরিকদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এই বেসিক ডিমান্ডের যাবতীয় ব্যবস্থা করা। রাস্তার কিছু বাতি কম লাগিয়ে কিংবা রাস্তা মেরামত কম করে হলেও পাবলিক টয়লেট করা জরুরী। এটা নাগরিকদের জীবন মরণের প্রশ্ন। রাস্তাঘাটের তথাকথিত সৌন্দর্য্য বর্ধনের চেয়ে এটা অনেক অনেক বেশী জরুরী।

এই কাজে সবচেয়ে ফলপ্রসু ভূমিকা রাখতে পারে নাগরিকদের সেবা দিয়ে শহরকে বাগান বানাবার দাবীদার নির্বাচনে নামা তথাকথিত সমাজ সেবকগণ। প্রতি পাঁচ বছর পরপর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রতিটি প্রার্থী নির্বাচিত হলে আসলেই কেমন সেবা দেবে তার নমুনাস্বরূপ প্রত্যেকেই নিজ এলাকার সরকারী জায়গায় একটি করে টয়লেট করে দেবে। নির্বাচনে প্রার্থী হবার আগেই করে দেবে। নির্বাচনে তো আর কম খরচ করেন না। কিন্তু তাতে তো নগরবাসীর কোন উপকার হয় না। টয়লেট করে দিলে উপকার হবে। এটা সম্ভব হলে করপোরেশনের খরচ ছাড়াই প্রতি নির্বাচনে শহরবাসী পাবে কমপক্ষে তিন শতাধিক পাবলিক টয়লেট। মাত্র দশ বছরেই ঢাকা শহর হাজারখানেক পাবলিক টয়লেটের শহর হয়ে উঠবে।

আর এই কাজে সহযোগীতা করতে পারে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে মনোয়নপত্র দাখিলের শর্তে প্রত্যেক প্রার্থীকে নিজের করা পাবলিক টয়লেটের প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করলেই লেটা চুকে যায়। নগরবাসী পায় টয়লেট অর বাঁচে যত্রতত্র মলমূত্রের দুর্গন্ধ থেকে। নির্বাচন কমিশনের কাজের অনেক আলোচনা সমালোচনা সব সময়ই শুনি। স্বাধীনতার পর থেকেই শুনি। কিন্তু এই কাজটি করলে তারা প্রশংসা ছাড়া আর কিছু পাবে বলে মনে হয় না। শুধুই প্রশংসা। প্রশংসায় ভাসবে সারাদেশ। ভাসাবে দেশবাসী।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com