ধোলাইখালে শিল্প বিপ্লব

প্রকাশের সময় : 2018-06-27 18:24:25 | প্রকাশক : Admin

সিমেক ডেস্কঃ পুরান ঢাকার ধোলাইখালে ঘটেছে এক শৈল্পিক বিপ্ল−ব। এখানে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এরই মধ্যে এলাকাটি পরিণত হয়েছে মিনি মোটর ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে। এখানকার কারিগর ও উদ্যোক্তারা প্রায় ৩৮ হাজার রকমের যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি করছেন। জানা গেছে, এসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ শিল্প গৃহস্থালি, কৃষি, বৈদ্যুতিক, যানবাহন, খেলনা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এছাড়া এখানে উৎপাদিত কাগজ ও সিমেন্ট কারখানার যন্ত্রাংশ, বাইসাইকেল, ফ্যান্সি লাইট ফিটিংস্, নির্মাণযন্ত্র, ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার, আয়রন চেইন, কার্বন রড, অটোমোবাইল পার্টস, বৈদ্যুতিক ও স্টেনলেস স্টিল ওয়্যার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। ধোলাইখালে তৈরি সামগ্রীর মধ্যে আছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মডেলের গাড়ির পার্টস, লাইনার, বিয়ারিং, ব্রেকড্রাম, ইঞ্জিন, কার্টিজ, সকেট, জগ, জাম্পার, স্প্রিং, হ্যামার, ম্যাকেল জয়েন্ট, বল জয়েন্ট, ট্রাক, লরি, অটোরিকশা, মেডিকেল বেড, ডায়নামো, এসি, ফ্রিজ, নিনিয়াম, প্যাড ড্রাম, ব্রেক সিলিন্ডার, বাম্পার ব্রাকেট, পিস্টন ও পাম্পসহ নানা সামগ্রীর খুচরা যন্ত্রপাতি। পাশাপাশি আস্ত গাড়ি, গাড়ির ইঞ্জিন, লঞ্চের ইঞ্জিনও তৈরি হচ্ছে। এছাড়া মোটরগাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, শ্যালো পাম্পের ইঞ্জিন ব্যবহার করে টেম্পো, ট্রাক্টর, ইট ভাঙার যন্ত্রসহ পাওয়ার লুমের মেশিনও তৈরি হচ্ছে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, শুধু গাড়ির ইঞ্জিন মেরামতই নয়, জাহাজ, পাওয়ার প্ল্যান্ট, জেনারেটরসহ ইঞ্জিনচালিত সব ধরনের যন্ত্রের সমস্যার সমাধান ছাড়াও রেলের ইঞ্জিন ও বগির খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয় ধোলাইখালে। ছোট ছোট কারখানায় দক্ষ কারিগররা এগুলো তৈরি করে সারা দেশে সরবরাহের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও এগুলো সংযোজন করে দিচ্ছেন। পুরনো গাড়ি বা ইঞ্জিনকে মেরামত করে একদম নতুনের মতো করে দিতেও তাদের জুড়ি নেই।

আরও জানা গেছে, ধোলাইখালের আদলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে ৪০ হাজারের বেশি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা। এগুলো বছরে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করে থাকে। এর মধ্যে বিদেশে রপ্তানি হয় প্রায় শতকোটি টাকার পণ্য। পাশাপাশি দেশে বাজারজাত হওয়া পণ্যগুলো বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করছে। ফলে আমদানি বিকল্প যন্ত্রাংশের শেষ ভরসা এখন এই ধোলাইখাল।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ধোলাইখালে উৎপাদিত পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনিক্যাল সেন্টার এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী নিউ মিলবার্ট ইন্টারন্যাশনাল ১৫ হাজার ডলারের বাম্পার ব্রাকেট, রাবার ব্রাশ ও সাসপেনশন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে সেই চুক্তি অনুযায়ী রপ্তানি শুরু না হলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও আজারবাইজানসহ বিশ্বের বহুদেশে রপ্তানি হচ্ছে ধোলাইখালের তৈরি মেশিনারিজ পণ্য।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে দেশি-বিদেশি যে কোনো মডেলের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ দেখালেই তার অনুরূপ আরেকটি তৈরি করে ফেলেন কারিগররা। দেশের কোথাও যেসব যন্ত্রাংশ পাওয়া যাবে না, সেগুলোর খোঁজ মিলবে ধোলাইখালে। বক্স ওয়াগন গাড়ি এবং এর যন্ত্রাংশ এখন আর তৈরি হয় না। তবে এগুলোর যন্ত্রাংশ ধোলাইখালে পাওয়া যায়। এছাড়া অচল গাড়ি সচল করা, গাড়ির নকশা পরিবর্তন এবং মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ সহজেই মিলবে। এখানকার উৎপাদিত গাড়ির যন্ত্রাংশগুলো সাধারণভাবে প্যাকেটজাত করে স্থানীয় বাজারে ছাড়া হয়। কিন্তু বিদেশ থেকে আমদানি করা একই যন্ত্রাংশ উন্নত প্যাকেটে বাজারজাত করা হয়। ফলে ক্রেতারা বেশি দামে বিদেশি যন্ত্রাংশ কেনেন। এখানে বিভিন্ন মডেলের ও ক্ষমতার ইঞ্জিন পাওয়া যায়। মান ও ক্ষমতাভেদে এগুলোর দামও হয় ভিন্ন ভিন্ন।

পুরনো গাড়ির যন্ত্রাংশ কোথাও না পেলে শেষ ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ায় ধোলাইখাল। এখানে পাওয়া না গেলে একটু বাড়তি খরচে তৈরি করে নেওয়া সম্ভব। শফিউল ইসলাম সানি নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তার দোকানে মূলত লেগুনা, টেম্পো ইত্যাদির যন্ত্রাংশ মেরামত করা হয়। তারা কোনো গাড়িকে একেবারে নতুন করেও বানিয়ে নিতে পারেন। পর্যাপ্ত টাকা থাকলে তারা বিদেশি যে কোনো মডেলের গাড়ি তৈরি করে দিতে পারবেন। অন্য উদ্যোক্তারা জানান, তাদের আইনি কাঠামো ও আধুনিক যন্ত্রপাতি দিলে এর সঙ্গে বিদেশের নামিদামি কোম্পানিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিলে- দেশীয় ব্র্যান্ডেই তারা নতুন নতুন আধুনিক প্রযুক্তির পণ্য তৈরি করে দিতে পারবেন।

আর এখানে যেসব উদ্যোক্তা আছেন তাদের ব্র্যান্ডিং করার সক্ষমতা নেই, এবং অর্থেরও অভাব রয়েছে। যে কারণে তারা নিজস্ব উদ্যোগে শিল্প বিস্তারে এগুতে পারছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ধোলাইখালে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩ হাজার দোকান রয়েছে। মূল মার্কেটগুলোর সামনে ফুটপাতেও বিক্রি হয় নানা ধরনের যন্ত্রাংশ। সব মিলে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে এই যন্ত্রপাড়াটিতে। মোটর পার্টসের দোকান ছাড়াও এখানে রয়েছে ড্রামশিট, লেদ মেশিন, পুরনো লোহা-লক্কড়ের দোকান।

হালকা প্রকৌশল শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, সরকার একটু সহযোগিতা করলেই আমরা উঠে দাঁড়াতে পারি। আমাদের পণ্য ব্র্যান্ড করার সুযোগ দিলে ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের দেশীয় ব্র্যান্ড তৈরি হতো। তখন ক্রেতারা ব্র্যান্ড দেখে পণ্য কিনতে পারতেন। এখন ক্রেতারা বিদেশি ব্র্যান্ড দেখে পণ্য কেনেন। দেশি ব্র্যান্ড থাকলে পণ্যের মান খারাপ হলে তা পরে বদলিয়ে নেওয়ারও সুযোগ থাকত। এ শিল্পের বড় অবদান হচ্ছে, পুরো খাতটি আমদানির বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। -সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com