বিশে বিষ (বিশ) ছিল; একুশে তো বিশ (বিষ) নেই!!

প্রকাশের সময় : 2021-01-07 11:45:19 | প্রকাশক : Administration
বিশে বিষ (বিশ) ছিল; একুশে তো বিশ (বিষ) নেই!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

খুব খারাপ গেল বছরটা। খুবই খারাপ। যেনতেন খারাপ নয়। খারাপের চরম পর্যায়ের খারাপ। সাধারণত যখন কেউ জানতে চায়, কেমন আছেন? মনের অজান্তেই তখন মুখফুটে বলি, আছি; ভাল আছি। প্রায় সময়ই ভাল না থেকেও বলি ভাল আছি। এই ভালটা সব সময় ভালকিছু মিন করে বলা হয় না। প্রায় সময় খারাপও হয়। খারাপ থেকেও সৌজন্যতার খাতিরে জোরাতালি মার্কা ভাল বলে চালিয়ে দেই। ঠিক তেমনি, খারাপ আছি কথাটাও তেমন খারাপ থাকাকে বুঝায় না। মোটামুটি হালকা খারাপ থাকাকেই খারাপ বলে চালিয়ে দেই।

কিন্তু এ বছরের খারাপকে খারাপ না বলে উপায় নেই। এ বছরের খারাপ যাওয়াটা সত্যি সত্যি খারাপ। খারাপের চাইতেও খারাপ। মহা খারাপ। বছর শুরুতে বুঝিইনি কতটা খারাপ অপেক্ষা করছিল সারা বিশ্ববাসীর জন্যে। তাই কোনরূপ না বুঝেই হৈহৈ রৈরৈ করে নববর্ষকে বরণ করে নিয়েছিলাম। নববর্ষের আংকিক চেহারায়ও পুলকিত ছিলাম। মজা করেই বলতাম; টুয়েন্টি টুয়েন্টির নতুন সাল, টি টুয়েন্টি (২০২০)। একবারও খেয়াল করিনি বিশে বিশ সাল। বিশে যে বিষ (বিশ) ছিল, মজা করেও সেটা লক্ষ্য করিনি।

আমার মজা করাই উচিত ছিল। কেননা সংখ্যা তত্ত্বে আমিও কমবেশি বিশ্বাসী। বলতে হয়, পুরো জীবনটাই সংখ্যার যোগ বিয়োগ দিয়েই কাটিয়ে দিলাম। সংখ্যা একটা পেলেই হলো। এটা আমার জন্যে ভাল, না খারাপ; বিচারে বসে যেতাম। কেমন করে যেন সেই ছেলেবেলা থেকেই আমার বিশ্বাস জন্মালো, লাকি সেভেন আর সবার যেমন তেমন; অন্তত আমার জন্যে লাকি সংখ্যা না। আমার সংখ্যা ঠিক উল্টো। সবার আনলাকি থার্টিনই আমার লাকি থার্টিন।

২০২০ সালে সেই লাকি অথবা আনলাকি সেভেন কিংবা থার্টিন কোনকিছুই কাজে আসেনি। করোনা এসে সব কিছুকে গুলিয়ে একাকার করে দিয়েছে। সমস্ত পৃথিবীকে একসাথে থামিয়ে দিয়েছে। সদা প্রাণচঞ্চল পৃথিবীকে শুনশান নিস্তব্দতায় মৃতপুরী বানিয়েছে। বাংলাদেশকেও বানিয়েছিল। তবে বেশিদিনের জন্যে নয়। তেমন কাবুও করতে পারেনি বাংলাদেশকে। রাষ্ট্রবিরোধী এবং সরকারবিরোধী নানা পক্ষ মিলে দেশকে কাবু করার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিল। চেষ্টাও কম করেনি। তবে পারেনি। ওদের ভয়াবহ গুজব থেরাপীও তেমন কাজে লাগেনি।

বছর প্রায় শেষ হতে চললো। তবে গুজব বানানোর প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। চলছে। গুজবপ্রিয় জাতি আমরা। গুজব এখানে শেষ হবার নয়। শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই গুজবে কান পাতি। বিশ্বাস করি। গেল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য এবং মেট্রোরেল কেন্দ্রিক একটি ছবি ছড়ানো হয়েছে স্যোসাল মিডিয়ায়। এবং বলা হচ্ছে উন্নয়ন আমাদের চেতনাকে ধ্বংস করছে।

সচেতনতার সাথে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় ফটোগ্রাফারের কঠিন চতুরতা। মূলত, এই ছবিকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী একটি সেন্টিমেন্টকে নাড়া দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে পুরো বছরই নানাকিছু নিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। পারুক বা না পারুক একটার পর একটা গুজব ছাড়া হয়েছে বাজারে। নিঃসন্দেহে গুজবকান্ডের হোতারা প্রচন্ড মেধাবী। তবে তাদের মেধা এদেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। মগজে শয়তানি নিয়ে অসভ্য গুজবকারী হওয়া গেলেও বুদ্ধিজীবী হওয়া যায় না।

এদেশ হলো বুদ্ধিজীবীর ডিব্বা। নানান কিসিমের বুদ্ধিজীবী আছে। পাশাপাশি দেশেবিদেশে অত্যন্ত স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবীও আছেন। ডঃ ইউনুস তেমনি একজন। তিনি কেবল বুদ্ধিজীবি নন। আরো অনেক অনেক কিছু। তাঁর সকল পরিচয়ের মাঝে বুদ্ধিজীবীটা হলো সবচেয়ে ছোট পরিচয়। কিন্তু হলে কি হবে? করোনাকালীন কোন সময়ে কিংবা আজ অবধি ডঃ ইউনুসকে এদেশের জনগণ তাদের পাশে পায়নি। নিদেনপক্ষে বুদ্ধি কিংবা বিবৃতিতেও পায়নি। বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্যে তাঁর কোন উদ্যোগও দেশবাসী আজো দেখেনি। না দেখেছে কাউকে ত্রাণ দিতে, না ভ্যাকসিন আনার ব্যাপারে কোন উদ্যোগে।

উদ্যোগ তাঁর কোনকিছুতেই ছিল না। ছিল না ঘূর্নিঝড় আম্ফান এর তান্ডবের পরও। কী তান্ডবটাই না করলো আম্ফান বেটা! সবকিছু বেড়াছ্যাড়া লাগিয়ে দিল দেশের। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে করোনার দিনেও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করলো। চারদিকে হায় হায় রব উঠলো। কিন্তু কিছুই টের পাননি ইউনুস সাহেব। শান্তিতে নোবেল পাওয়া এই মানুষটি দেশবাসীর অশান্তিতে দিব্বি ঘুমিয়েছেন। ঘুমিয়েছেন দেশের আনাচে কানাচে দলবেঁধে দলীয় নির্দলীয় ধর্ষকদের উৎপাতের পরও।

গেল বছর আজাইরা উৎপাত করার লোকের অভাব ছিল না। শোবিজের উৎপাতেও বছরটা খারাপ গেছে। বেশী উৎপাত করেছে খ্যাতদের চেয়ে অখ্যাতরা। মিথিলা তাদের একজন। দেশীয় মিডিয়ায় তার কন্ট্রিবিউশন সামান্য হলেও নানা কেলেংকারীতে বছরজুড়েই তিনি থেকেছেন সংবাদের শীর্ষে। একের পর এক অবৈধপ্রেম, পরকীয়া এবং ছাড়াছাড়ি শেষে বিয়ে করলেন ধর্মান্তরিত না হওয়া চতুর্থ প্রেমিক ভারতীয় সৃজিত বাবুকে। যার ৭টা প্রেমিকার স্বীকৃতি তিনি নিজেই দিয়ে থাকেন প্রকাশ্যে।

প্রকাশ্যে তারা যা মনে চায় তাই করে বেড়াচ্ছেন। মিথিলা মুসলিম হয়ে হিন্দুকে বিয়ে করে কোলকাতার দুর্গামন্ডপে প্রকাশ্যে পুজো দিয়ে বেড়িয়েছেন। আবার সেই ভিডিও নেটেও ছেড়ে দিয়েছেন। এতে করে কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বেড়েছে? বাড়াবাড়িরও একটা সীমা থাকে। তিনি সীমা লংঘন করেছেন। তবে খারাপ লেগেছে এমনি একজন সীমা লংঘনকারীকে নিয়ে মিডিয়ার অতিরিক্ত রকমের মাতামাতিতে। দাগীদাগী খারাপ গুণাবলী নিয়েও যে সেলিব্রেটি হওয়া যায়, মিডিয়ার প্রমোটিং পাওয়া যায়; এটা মিথিলা আর মিডিয়া মিলিমিশে করে দেখিয়েছে আমাদের।

মিলেমিশে ঘূর্নিঝড় আম্ফান আর বন্যাও এসেছিল গেল বছর। করোনা মহামারীর সাথে এই দুই মরণ দূর্যোগ। এরচেয়ে খারাপের আর কী হতে পারে? বিস্তীর্ন অঞ্চল বানের পানিতে ভাসিয়েছে। ভেঙেছে বাঁধ, ডুবিয়েছে ফসল আর বাড়ীঘর। এক সময় মনে হচ্ছিল এবারের বন্যা হয়ত ৯৮ কেও ছাড়িয়ে যাবে। শেষমেষ তা হয়নি। তবে ক্ষতি হয়েছে সীমাহীন। যদিও স্থায়ীত্ব বেশীদিন হয়নি। বিদায় নিয়েছে প্রত্যাশার চেয়েও তাড়াতাড়িই।

গেল বছর বিদায় নিয়েছে ট্রাম্পও। নির্বাচনে লাড্ডু হারা হেরেছে। বড়বড় খারাপ খবরের মাঝে এরচেয়ে ভাল খবর বিশ্ববাসীর জন্যে আর নেই। বছরের সেরা ভাল খবর। তবে বাংলাদেশের কিছু মানুষেরা বাড়াবাড়ি রকমের বাড়াবাড়ি ভাল খবরটিকেও হালকা করে দিয়েছে। ভারতে নরেন্দ্র মোদি জেতার পর এদেশে শেখ হাসিনার সরকারবিরোধী একটি অংশ বেজায় উল্লসিত হয়েছিল। যেন বিজয় তাদের ঘটেছে। তেমনি ট্রাম্পের বিদায়েও ওদের ডিসকো নাচ শুরু হয়েছে। কিন্তু কারণটা ট্রাম্প নয়। ওরা এ কারণে নাচছে না। ওরা শেখ হাসিনা বিরোধী। ওরা প্রচন্ড উল্লসিত ট্রাম্পের পরাজয়ে এবার শেখ হাসিনা কুপোকাত হবেন এই ভেবে।

ওরা যা ভাবছে তেমনটি নাও হতে পারে। বাংলাদেশ এখন আর আগের মত নেই। বিনিয়োগে প্রতাপশালীদের আগ্রহের সর্বোচ্চ দামী জায়গা এখন বাংলাদেশ। আবার দক্ষিণএশীয় রাজনীতিতে আমেরিকার ভূমিকার চেয়েও আঞ্চলিক দেশগুলোর ভূমিকা বেশি। এদেরকে ব্যালেন্স করে চলা আমেরিকাকে হুজুর হুজুর করার চেয়েও জরুরী। হয়ত হাসিনা সেটাই করছেন। চীনের সাথে ভারতকে নিয়ে ব্যালেন্স করে চলছেন।

আবার জাপান, কোরিয়াকেও শক্তভাবে হাতে রেখেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে অবিশ্বাস্য রকমের বড় বিনিয়োগে গেছেন। এত বড়বড় দেশগুলো তাদের বড় বড় বিনিয়োগ ঝুকির মুখে ফেলে ছেলেখেলা খেলে হাসিনাকে বিরক্ত করবে বলে মনে হয় না। বরং তারা এখানে বাণিজ্য করবে। মনে রাখা দরকার, বিশ্বরাজনীতি এখন রাজনীতিতে নেই, বাণিজ্যে গিয়ে ঠেকেছে।

কেবল আমরা এই বাঙালীরা বানিজ্যে যেতে পারিনি। এখনো গালিগালাজের মধ্যেই আছি। কত রকমের গালি যে জানি তা অনলাইনে গেলেই টের পাওয়া যায়। কী ছেলে, কী মেয়ে; একপক্ষ যে যার ইচ্ছেমত ফালতু কিংবা সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কথা লিখে দেয় যে কোন পেইজের কমেন্টে। অপরপক্ষ তখন কোমড়ে গামছা বেঁধে নামে। “চ” বর্গীয় ভাষায় যতগুলো খাচ্চইরা শব্দ আছে, সেসবের ব্যবহার করে মোটামুটি ভার্চুয়াল রেইপ করে ছাড়ে।

সভ্যতার কলঙ্ক এইসব অসভ্য বা মানসিক বিকৃত মানুষগুলো ঠিক এসব করেই বছরের প্রায় পুরোটা সময় করোনা মহামারীর মধ্যে কাটিয়ে দিল। করোনা এখনো যায়নি। তবে লক্ষণ ভাল। আশার আলো দেখা গেছে। ভ্যাকসিন এসে গেছে। মনে হচ্ছে বিশ সালের বিষ নামা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প নামক নোংরা বিষটাও বিদায় নিচ্ছে। দোয়া করি করোনাও যেন এমনি করে বিদায় নেয়। এমনি করেই যেন করোনামুক্ত নতুন বছরে নতুন ভোর আসে। বহুল আকাঙ্খিত স্বপ্নের ভোর। আমরাও যেন মন খুলে বলতে পারি, বিষ নয়! একুশ!! হ্যাপী নিউ ইয়ার, একুশ!!!  

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com