হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (২৮ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-04-12 17:21:33 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (২৮ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ  বিদ্রোহী কবির চিরবিদায়ে পুরো দেশ ও জাতি শোকে মুহ্যমান। জাতীয় কবির চিরতরে চলে যাওয়ায় মনমর্জি ভাল নেই কারোরই। সবখানেই কেমন যেন প্রাণহীন পরিবেশ, হৃদয়হীন নিরবতা। কোথায়ও আনন্দ নেই, উচ্ছাস নেই। আছে কেবলই বেদনার স্তুতি। রেডিওতেও সব সময় গজল, হামদ্ আর নাত। সবই নজরুলের লেখা। লোকজন, বিশেষ করে বড়রা রেডিওর পাশে জড়ো হয়ে শুনে। প্রিয়জন হারানোর কষ্ট মনেই শোনে। আমরা ছোট মানুষ; আমাদের মনে তেমন কষ্ট নেই। আচরনেও নেই। আমরা সুযোগ পেলেই আমাদের মতই আনন্দ করি, দলবেঁধে খেলা করি।

খেলা করতে করতে মাঝেমধ্যে আশেপাশের বাড়ীতে গিয়েও ঢুঁ মারি। জমিদার বাড়ীর দক্ষিণ পশ্চিম কোনে মোজাফফর মৌলভীর বাড়ী। নামি মানুষের দামী বাড়ী। বড় উঠোনের বড় বাড়ী। বাড়ীটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো উঠোন কোণে থাকা বিশাল আকৃতির বড়ই গাছ। পুরো গাছ জুড়ে বড়ই ধরতো। একেকটা বড় বড় সাইজের খুবই মিষ্টি বড়ই। বড়ই যেমনি গাছে থাকতো, তেমনি নীচেও থাকতো। ঝরা বড়ই। পাকা, আধাপাকা লাল হলুদ বড়ইয়ে গাছতলা ভরে থাকতো।

এই বড়ই খাওয়াই ছিল মাঝেমধ্যে ওই বাড়ীতে ঢুঁ মারার অন্যতম কারণ। তাঁর মেয়ে আমার সাথে একই ক্লাশে পড়তো বলে অন্যান্য ফলের মৌসুমেও ঢুঁ মারতাম। তবে বাড়ীটির প্রবেশ খুব একটা সহজ ছিল না। ওই বাড়ীতে সহজে প্রবেশাধিকার ছিল না কারো। যেতাম চুপিচুপি, যেন মৌলভী সাহেবের চোখে না পড়ি। পড়লেই বিপদ। একবার গাছতলার বড়ই কুড়িয়ে কেবল বাসায় ফেরা ধরেছি, অমনি তাঁর সামনে পড়লাম। আর যাই কোথায়! “পাইছি!” বলেই খপ করে ধরে ফেলল। দু’হাত একত্রে করে এবার বাঁধার জন্যে রশি খুঁজছেন। মৌলভী সাহেবের শক্ত হাত! ছোটার জোঁ নেই। মোচড়ামুচড়ি করছি, কিন্তু পারছি না। তিনি জোর গলায় ভেতর বাড়ীতে ডাকছেন, রওশন, ওই রওশন। রশি লইয়া আয়। চোর ধরছি।

জানালা খুলে আমায় দেখতে পেয়ে “ওরে আল্লাহ” বলে রওশনের চিৎকার। এক চিৎকারেই কাজ হলো। মৌলভী সাহেব ছেড়ে দিলেন আমায়। বন্ধু আমার! আমাদের বোন ছিলনা, তাই আদর করতো। সেদিনের পর আদর আরো বেড়ে গেল। নিয়মিত স্কুলে বড়ই নিয়ে আসতে লাগলো আমার জন্যে। গোটা গোটা লাল লাল বড়ই। তবে বিষয়টি বেশীদিন চলেনি। একদিন হঠাৎ করেই ওর বিয়ে হয়ে যায়। খুবই ফুটফুটে ছিল বলেই পড়াশুনার মাঝপথেই বিয়ে হয়। তবে নিজের পড়াশুনায় কমতি থাকলে কী হবে! সন্তানের পড়াশুনায় কোন কমতি রাখেনি। একজন গর্বিত মা হিসেবে নিজের দুটো মেয়েকে ঠিকই ডাক্তার বানিয়েছে। নিজের স্বপ্নকে মেয়েদের দিয়ে পূরণ করেছে।

স্বপ্ন সবারই থাকে। ছেলেবেলায় আমাদের বড় ভাইদের স্বপ্ন ছিল মুরগী চুরি করে পিকনিক করা। সারা বছরে কয়েকবার কাজটি না করলে পেটের ভাত হজম হতো না তাদের। এই কাজের গুরু ছিলেন প্রণয়দা। প্রণয় কুমার চক্রবর্তী। কাউকে মানতেন না; অসীম সাহসী ছিলেন। তার দলটিও মোটামুটি ছোট ছিল না। বাহার ভাইয়া ছিলেন দলের অন্যতম সদস্য। সদস্য সচিব পর্যায়ের। আলম ভাই, খোকন ভাইসহ আরো কয়েকজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। কয়েকদিন আগে থেকেই রেকি করে টার্গেট মোটামুটি ফাইনাল করা থাকতো। দিনক্ষণ ঠিক করে টার্গেট করা সবচেয়ে রিষ্টপুষ্ট মুরগীটি গোপনে ধরে এনে নির্জনে রান্না চড়াতেন ।

নিজেদের বাসা থেকে চুরি করে আনা মশলাপাতি দিয়ে খুবই গোপনে রান্না কর্মটি সমাধান করতেন প্রণয়দার বড়দিদি। আর ডলিদিদি ছিলেন হেলপার। মুরগীর চামড়া বাছার হেলপার। অন্ধকার ঘরের নিকষকালোর আলোতে অনুমান করে করে পশম তুলতেন। জমিদার বাড়ীতে নির্জন ঘরের অভাব ছিল না। নিরিবিলি কোন ঘরের দরজা লাগিয়েই এসব করা হতো। বাইরে থেকে বোঝার উপায় ছিল না ভেতরে কী হচ্ছে। বাইরে আমাকে বসিয়ে রাখা হতো। বিশিষ্ট পাহারাদার হিসেবে আমারও সুনাম ছিল। সাংঘাতিক দায়িত্ববান ছিলাম। দায়িত্ব পালনে কোনদিন অবহেলা করেছি বলে মনে পড়ে না।

মনে পড়ে বনবিড়ালের কথাও। আমাদের বাসার ঠিক পেছনের লাকড়ির ঘরে একদিন আবিষ্কার হলো লুকিয়ে থাকা বনবিড়ালের। কেউ বলে বন বিড়াল, কেউ বলে খাডাশ। নানান মুখরোচক কথাবার্তা চলছে খাডাশকে নিয়ে। চারদিকে রব পড়ে গেছে। যেন খাডাশ নয়, বাঘ পেয়েছে। যেমন করেই হোক ধরতেই হবে। একদিন সাত সকালে লোকে লোকারণ্য। লাঠিসোটা নিয়ে সবাই হাজির। বনবিড়াল ধরার মহোৎসব হচ্ছে। কে কোথায় দাঁড়াবে তা ঠিকঠাক হচ্ছে। তবে ছোটদেরকে কাছে ঘেষতে দেয়া হচ্ছে না। বনবিড়ালের পিকনিক হয়েছিল মধ্যহিস্যার ছাদের উপর। আমাদের বাসা বরাবর ছাদে। কেউ বলছিল এর মাংস হারাম, কেউ বলছিল হালাল। মাস্লা- মাসায়েলে হালালের পাল্লা ভারী থাকাতে শেষমেশ পিকনিক করতে অসুবিধে হয়নি। হাঁড়িপাতিল জোগাড় হয়ে গেল এরওর বাসা থেকে। মশ্লাপাতিও আসলো। এসবই করানো হচ্ছিল ছোটদেরকে দিয়ে। আমরা ছোটরাও মহাউল্লাসে কাজ করছি। রান্না শেষে লাইন ধরে বসিয়ে খেতে দিল। ভাগে খাডাশের মাংস পেয়েছিলাম কিনা মনে নেই। কিন্তু স্মৃতির পাতায় আজো জ্বলজ্বল করছে মাংসের পাতলা ঝোল আর গোডা আলুর কথা।

ঝোল মজা হতো গোপন পিকনিকে। গোপনে চুরি করে রান্নার স্বাদ এবং মজাই আলাদা। তবে বেশী মজা ছিল কর্তাবাড়ীর ফল চুরি। এসব তেমন গুরুতর চুরি নয়। হালকা পাতলা চুরি। বলা যায় ছেচড়া চুরি। জমিদার বাড়ীর একেবারে উত্তরের বড়হিস্যাকেই কর্তাবাড়ী বলা হতো। কর্তাবাড়ীর পাহাড়াদার হিসেবে ডিউটিতে থাকতেন ওয়ার্দার কাকারা। ওয়ার্দার একটি সরকারী পোষ্ট। সরকারী ওয়ার্দার হিসেবে পাহাড়ায় নিয়োজিত এইসব কাকাদের জ¦ালায় মনের মত করে চুরি করতে পারতাম না। কাকারা দেখলেই খেক, খেক করে উঠতেন। 

এই কর্তাবাড়ীতেই মুন্নীরা থাকতো। মান্নান কাকার ছোটমেয়ে মুন্নী। আমার সাথেই পড়তো। কাকার অকাল মৃত্যু ওদেরকে বড়ই অভাগা করে দেয়। পতিব্রতা খালাম্মা সুযোগ হলেই কাকার জন্যে দোয়া পড়াতেন, মিলাদের আয়োজন করতেন। দূপুরের পর থেকেই ওদের বাসার আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম আমরা পোলাপানের দল। মিলাদ বলতে কথা! যেন ঈদের দিন। বাজার থেকে লালজিলাপী কিংবা খটখটা খাজা আসবে। মিলাদ শেষে ধাক্কাধাক্কি হুড়াহুড়ির মাঝে হাত পেতে যতটুকুনই পেতাম, স্বর্গীয় মনে হত। মন ভরে সময় নিয়ে আস্তে আস্তে সেসব অমৃত খেতাম।

মনের বয়সটাই তখন এমন। ক্লাশ ফাইভের মন। প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদ। বর্ষার উত্তাল জলে খরস্রোতা নদ থৈ থৈ করছে। চর এলাকা ডুবে একাকার। একটি দুটি চর নয়, সব চর ডুবে গেছে। যতদূর চোখ যায়, কেবল পানি আর পানি। চরের মানুষজন বাড়ীঘর ভেঙে এপারে নিয়ে এসেছে। ধলা হাই স্কুল, ইউনিয়ন অফিসে ঠাঁই নিয়েছে। বিশাল খেলার মাঠও ভরে গেছে অস্থায়ী ঘরবাড়ীতে। একদিন টিফিন পিরিয়ডে প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র দেখতে গেলাম ক্লাশের বন্ধুরা দলবেঁধে। গুনটানা বিরাট আকৃতির অনেকগুলো নৌকা বাঁধা ঘাটে। ঢেউয়ের তালে ছলাৎ ছলাৎ পানি এসে নৌকায় লাগছে। নৌকা একবার ডানে যাচ্ছে, একবার বামে।

ভারী মজার এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন টিফিন পিরিয়ড শেষ হয়ে গেছে টের পাইনি! দৌঁড়ে ফিরলাম স্কুলে। ততক্ষণে ঘন্টা পড়ে গেছে। ক্লাশে কঠিন ক্ষ্যাপামুখ করে বসে আছেন কোব্বাত স্যার। বেজায় কঠিন মুখ। তিনি ক্লাশে ঢুকতে দিলেন না। স্কুলের মোষ্ট সিনিয়র ছাত্রদের বড় কড়া শাস্তির আদেশ দিলেন। কড়া মানুষ; কড়া আদেশ। লাইন ধরে নীলডাউন দিয়ে ক্লাশে ঢুকতে বললেন। ক্লাশের বারান্দা দিয়ে শুরু করলে হবে না। শুরু করতে হবে একেবারে মাঠের বাইরের সদর রাস্তা থেকে। খালেক প্রফেসার সাহেবের বাসা যেখান থেকে শুরু, ঠিক সেখান থেকে।

সবচেয়ে খাটো হবার কারনে লাইনে সবার আগে আমাকে বসালেন। আর সবশেষে লম্বু সিরাজ। আদেশ মত কাজ শুরু করলাম। আমরা নীল ডাউন দিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর একটু একটু এগুচ্ছি। কিচ্ছু করার নেই। স্যারের আদেশ! শিরোধার্য্য!! হাঁটুতে ব্যাথা পাচ্ছি, মনেও পাচ্ছি। তবুও এগুচ্ছি। কোব্বাত স্যারকে চুপচাপ আনমনে বকতে বকতে দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদীর মত করেই এগুচ্ছি। চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com