করোনা দিনের ডায়েরি...

প্রকাশের সময় : 2021-03-18 12:10:03 | প্রকাশক : Administration
করোনা দিনের ডায়েরি...

১৫তম পর্ব

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন

ধ্যুত্তুরি! এই অবেলায়ও কেউ ফোন করে! প্রথমে আমার মোবাইল এ। পরে শোনিমের আম্মুরটায়। থামাথামি নেই; পুটপুট করে বেজেই চলছে। আমিও তো কম তেঁদর না। ফোনটা না ধরে চুপ করে শুয়েই আছি। যেমন তেমন শোয়া না। ঘুমের ঘোরে বেহুশ হয়ে শুয়ে থাকা। সিগারেটের শেষটানটা যেমন সুখটান; ঘুমের শেষ অংশটুকুও তেমনি সুখঘুম। এই ঘুমে ফোন তো ভাল, স্বর্গের অপ্সরি এলেও চোখ মেলা দায়। (এই কথাটি হয়ত ঠিক বলি নাই। স্বর্গের অপ্সরি তো ভাল...)

বলছিলাম দু’দিন আগের কথা। ঘুমিয়েছিলাম বড্ড দেরী করে। রাতভর জেগে রোজ ঘুমাই সকাল আটটার মধ্যে। আজ ঘুমুতে ঘুমুতে বেলা ১১টা বেজে গেছে। না বেজে উপায়ও ছিল না। বড্ড পেরেশানিতে ছিলাম। করোনার এই দুর্দিনে সিমেক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কিভাবে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকা যায়, কিছু না কিছু খাদ্যসামগ্রী কিভাবে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া যায় সেই নিয়ে পেরেশানি। বন্যা কিংবা ঘুর্নিঝড় উত্তর এসব নিয়ে বের হওয়া সহজ। করোনায় এত সহজ নয়।

তবে এ যাত্রায় ভাগ্য ভীষণ ভাল। ২০জন প্রশিক্ষিত কর্মী পেয়ে গেলাম। সিমেক ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রিন্সিপাল শরীফ উর রহমানের কারণেই পেয়ে গেলাম। বেচারা শরীফ! সকল কাজের কাজী। নিজের ঘর আর অন্যের ঘরের মধ্যে কোন তফাৎ নেই তার। ফোনে কথা বলতে দেরী। রাজী হতে দেরী হলো না। কর্মীবাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। দুপুর থেকেই শুরু করে দেবে বলে আমায় আশ্বস্তও করলো।   

একটা কাজের কাজ হলো। এবার খুশীমনে ঘুমানো যায়। পর্দা টেনে কম্বল এ পুরো মাথা ঢেকে নাক ডাকা শুরু করলাম। সবাই ঘুমের পরে নাক ডাকে। আমি আগেই শুরু করলাম। করোনায় দুনিয়াটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। দিন হয়েছে রাত। রাত হয়েছে দিন। অতএব, নাক ডাকার বিষয়টা উল্টে গেলে প্রব্লেম কি? নাক ডাকতে লাগলাম। বাঁধ সাধলো শোনিমের আম্মু। তার এই এক সমস্যা। আমার সকল সৃষ্টিশীল কাজে বাঁধা। তার কড়া নির্দেশ, এক বিছানায় থেকে এভাবে ঘ্যাতর ঘ্যাতর করা যাবে না।

ঘ্যাতর ঘ্যাতর করা ছাড়াও সুন্দরভাবে নাক ডাকার আর কোন ওয়ে আছে কিনা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছি। বেহুশের মত ঘুম। ঘন্টা চারেক পরেই ফোন। কান ফাটিয়ে ফেলা ফোন। একটার পর একটা নাম্বার পাল্টিয়েও কোন ফোনে না পেয়ে অগত্যা বাসার ল্যান্ডফোনে কল দিলেন। ভাবলাম বিপদ অত্যাসন্ন। বিপদ বড় হলেও ইউসুফ ভাই এভাবে কল দিতে পারেন না। একটা আতঙ্ক নিয়ে হুরমুর করে ওঠে কলটা রিসিভ করলাম। টের পেয়েও আগে যে তাঁর কল ধরিনি এটা এতটুকুও বুঝতে দিলাম না।

“স্যরি! ঘুমে ডির্স্টাব করার জন্যে বড়ই স্যরি! কষ্ট করে একটু ওঠেন। বাহির দরজাটা খুলে দেখেন। কিছু প্যাকেট রেখে এসেছি। খাবারের প্যাকেট। এতক্ষণ বাহিরে থাকলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে বিধায় কল দিলাম। প্যাকেটে জিলাপি আছে, খুরমা আছে। কলা-মুড়িও আছে। এতদিন দিতেও পারি নাই। আপনারাও খেতে পারেন নাই। আজ ইফতারীতে শোনিমকে নিয়ে খাবেন।”বলেই ফোনটা রেখে দিলেন।

আমি থ খেয়ে  গেলাম। স্বপ্ন  দেখছি না  তো! যা শুনেছি, মানে নিজ কানে শুনছি; ঠিক শুনছি  তো! মূহুর্তেই রাজ্যের ঘুম হাওয়া হয়ে গেল আমার। এ আমি কী শুনলাম! করোনার দুর্দিনে খুরমা, গরম জিলাপি আর কড়কড়া মুড়ি দিয়ে ইফতার করবো! এটাও কি সম্ভব? ইউসুফ ভাইকে পরোপকারী মানুষ জানি। সবার সাহায্যে সদা প্রস্তুত। তাই বলে করোনার এই ভয়াবহ দিনেও! এমনি দিনেও নিজের জীবনের মায়াকে উপেক্ষা করে প্রমাণ করে  দেবেন মানুষ মানুষেরই জন্যে!!!

আসলেই মানুষ মানুষের জন্যে। কেবল মানুষ নয়, রাজনীতিও মানুষের জন্যই। একমাত্র সঠিক রাজনীতিই পারে দেশকে বদলে দিতে। না পারার কোন কারণই নেই। রাজনীতি এক বিরাট শক্তি! শক্তিটাকে সবাই স্বীকার করেন। সমীহ্ করেন। কিন্তু একে দেশ ও মানুষের কাজে লাগানোর চ্যালেঞ্জ কেউ কেন যেন নিতে চান না। নেবার চেষ্টাও করেন না।

রাজনীতির ভেতরের, এমনকি বাইরের মানুষেরা এভাবেই এক প্রকার অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। হয়ত এজন্যেই রাজনীতি প্রায়শই দেশ ও জনমনের ইচ্ছেকে তুচ্ছ করার দুঃসাহস দেখায়। এ ধারার রাজনীতিতে অনুভূতিপ্রবণ মানবিক মানুষ হওয়ার স্বপ্ন, দেশবোধ, নাগরিক দায় আর মুখ্য থাকে না; থাকে ভন্ডামী। গৌন হয়ে যায় সবকিছু। কিন্তু একটু সচেতনভাবে, সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে এবং উদ্যোগী হলে এখনও অনেক ভাল কিছু করে দেখানো সম্ভব।

করোনার এই দুর্দিনে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা তাই করে দেখাচ্ছেন। রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা কৃষকের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে কাজ করছে। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাস্তে হাতে ধান কেটে কৃষকের উঠোন অবধি পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। দেশের সব এলাকায় দেখা যাচ্ছে অভূতপূর্ব এই দৃশ্য। প্রচলিত রাজনীতির বৃত্ত ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা তৃণমূলের নেতা কর্মীদের এমন চেষ্টা নতুন করে আশাবাদী করছে আমাদের।

এই তো রাজনীতি। রাজনীতির মত রাজনীতি। দেশের জন্য রাজনীতি। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা রাজনীতির শক্তিতে সংগঠিত হয়ে মানুষের জন্য কাজ করছেন। কাজ করার চেষ্টা করছেন। একটা সূচনা তো একে বলাই যায়। জয় হোক এমন রাজনীতির। করোনার মহামারীতে মহাবিপদে পড়েছিল বাংলার কৃষক। ৪০ লাখ কৃষি শ্রমিকের চাহিদা, যোগান, সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিলো। কৃষকের ধানের কী হবে, মানুষ খাবে কি; এসব ভাবনায় পড়েছিল পুরো জাতি। ধান সময়মতো কাটতে না পারলে দেশের খাদ্য সংকট অনিবার্য ছিলো। বড় ধরণের দুর্যোগের আশঙ্কা ছিলো।

মাত্র তিন সপ্তাহে সব আশঙ্কা কেটে গেলো। সম্ভব হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যেই। বরাবরের মতো তিনিই ছিলেন শেষ ভরসা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই তিনি কঠিন উদ্যোগ নেন। শত শত কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। কৃষি শ্রমিকের যোগান, সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে জেলা প্রশাসন, কৃষি মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ করতে থাকে, এর উপরে যোগ হয় রাজনৈতিক দলের তৎপরতা এবং এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফসল হচ্ছে এবারের কৃষি শ্রমিক সংকট প্রকট আকার ধারণ না করা।

অবশেষে বিশাল এক উৎসবমুখর কর্মযজ্ঞের মধ্যদিয়ে এবার সোনালি ধান ঘরে তুলেছেন হাওড়বাসী। এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এমন উৎসাহ উদ্দীপনায় হাওড়ে ধান কাটা দেশের ইতিহাসে আর কখনও দেশবাসী দেখেনি; দেখা যায়নি। সরকারের উদ্দীপনা সৃষ্টির কারণে দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষও কোমড় বেঁধে হাওড়ে নেমেছেন চাষীদের সারাবছরের একমাত্র ফসল ঘরে তুলে দিতে। ঠিক এ কারণেই বিয়ে বাড়ির মতো মহা ধুমধামেই এখন হাওড়ের চাষীরা তাদের মাঠের সোনালি ফসল ঘরে তুলছেন।

আর সোনালী ধানের মত মুখখানা সোনালী করে হাসি ছড়ানো এই দৃশ্য বড় সুন্দর; বড় শান্তির। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বড় শান্তিভরা বুকে ধান কাটার এই কর্মযজ্ঞটি প্রতিদিন সরাসরি মনিটর করেছেন। হয়ত তাঁর দুঃশ্চিন্তাও কেটে যাচ্ছে। এই তো আর মাত্র ক’টা দিন। ইনশাল্লাহ্ সব ধানকাটা শেষ হয়ে যাবে। সকল দুঃশ্চিন্তা কেটে সরকারের মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি স্বস্তি ফিরে আসবে। স্বস্তি ফিরবে জনগণের মধ্যেও। চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com