সবাই জিতলো, হারলো না কেউ!!!

প্রকাশের সময় : 2018-08-29 21:03:39 | প্রকাশক : Admin

সিমেক ডেস্কঃ অবশেষে সমগ্র জাতির সীমাহীণ উৎকন্ঠার পর শেষ হাসি হাসলো বাংলাদেশ। জয় হলো একেবারেই ব্যতিক্রমধর্মী একটি আন্দোলনের, আর জয় হলো বাঙালীর। দীর্ঘ সপ্তাহব্যাপী অভূতপূর্ব অস্থিরতার পর পুরো জাতি মুত্তি পেল একটি কঠিন অচলাবস্থা থেকে। আর অবলোকন করলো রাজনীতির এক নতুন ধারা। যে ধারায় হারায় না নীতিবোধ; হারে না সুপ্ত ক্রোধ। যে ধারায় হেরে যায় রাজনীতি; যত্ত সব পচা দূগন্ধযুক্ত অপরাজনীতি!!

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জুলাই দূপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে প্রতিদিনের মতো বাসস্ট্যান্ডে  বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল শিক্ষার্থীসহ অন্যরা। এ সময় পাল্লাপাল্লি করে বেশি যাত্রীর আশায় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। আহত হয় অন্তত ১৫ শিক্ষার্থী। এমন ঘটনার রেশ ধরে ছয় দিন ধরে সারাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে। তাতে একাত্মতা পোষণ করেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ।

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করেও ছাত্রছাত্রীদের রাজপথ থেকে ফেরানো যায়নি। অঝোর বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা রাজপথ নিয়ন্ত্রণ করেছে। অনেকে পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে সকালে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে এসেছে বাসা থেকে। শুধু রাজধানীতে নয়, সারা দেশের সব নগর বন্দরে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে আসে রাজপথে। বাসচাপায় রাজধানীতে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ-প্রতিবাদ আর রাজপথে নেমে আসার যে নজির স্থাপিত হলো তা এ দেশে স্মরণাতীতকালে কেউ দেখেছি কি না তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।

রাজধানীসহ সারা দেশের শিক্ষার্থীদের এভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসার পেছনে শুধু বাসচাপায় দুইজন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখতে রাজি নন অনেকে। বরং এর পেছনে কাজ করছে দীর্ঘ দিনের জমে থাকা ক্ষোভ। বাসচাপায় নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের এক সুরে প্রতিবাদকে জমে থাকা সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন অনেকে।

রাজধানীতে পরিবহন বিড়ম্বনা অনেক আগেই অসহনীয় অবস্থায় চলে গেছে। রাজধানীবাসীর নিত্যদিনের সমস্যা, বিড়ম্বনা আর হয়রানির নাম পরিবহন খাত। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ও শিশুদের জন্য একেবারেই অনুকূল নয় রাজধানীর পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থা। এক দিকে রাস্তার চরম দুরবস্থা আরেক দিকে পরিবহনক্ষেত্রে নৈরাজ্য। পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের শিকার সারা দেশের শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ।

আন্দোলনের শুরু থেকেই সরকার সমব্যাথি ছিল আন্দোলনকারীদের প্রতি। সমবেদনা জানানো, ক্ষমা চাওয়া, নিহতদের বাসায় যাওয়া, আর্থিক সহযোগীতা দেয়া; সবই ছিল শুরু থেকেই। পঞ্চম দিনেই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বানও জানান তিনি। শিক্ষার্থীরা যে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে, এর সবগুলোই যৌক্তিক এবং সবগুলোই বাস্তবায়নের জন্য তিনি নির্দেশ দেন।

দেশের প্রত্যেকটি স্কুলসংলগ্ন রাস্তায় স্পিড ব্রেকার নির্মাণ করা হচ্ছে। স্কুলের পাশে বিশেষ ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিহত দুজনের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জাবালে নূরের রুট পারমিট বাতিল এবং অবিলম্বে^ ফিটনেসবিহীন সকল পরিবহনের রুট পারমিট বাতিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জাবালে নূর পরিবহনের মালিক ও দায়ী চালককে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

ষষ্ঠ দিনে ব্যাপকভাবে আলোচনায় থাকা শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচটি নতুন বাস উপহার দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আনুষ্ঠানিকভাবে বাস পাঁচটি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের কষ্ট লাঘব করতেই বাসগুলো দেয়া হয়। এ ছাড়া মাত্র দুসপ্তাহের মাঝে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এ্যান্ড কলেজ সংলগ্ন বিমানবন্দর সড়কে পথচারী আন্ডারপাস প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এটি নির্মাণ করবে। এই আন্ডারপাস ছাড়াও ঢাকায় আরও তিনটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানান সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

শিক্ষার্থীদের মহৎ এই আন্দোলন সফল হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে জনসমর্থিত কোন আন্দোলনের এমন সুন্দর এবং সফল পরিসমাপ্তি দ্বিতীয়টি আর মনে পড়ে না। শিক্ষার্থীরা যে নাড়াটা দিতে চেয়েছে, তা পেরেছে। তারা সঠিক পথটা দেখিয়ে দিয়েছে। এখন বড়দের দায়িত্ব সেই পথে দেশকে পরিচালিত করা। গোটা জাতি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের দাবিগুলো এতটাই যৌক্তিক, কারো পক্ষেই এর বিরোধিতা করা সম্ভব হয়নি।

এভাবেই শিক্ষাথীদের এই আন্দোলনে সবাই জিতলো, হারলো না কেউ। এরপরও যারা শিক্ষার্থীদের রাজপথে রাখতে চেয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য শুভ ছিল না; ভয়াবহ ছিল। আন্দোলনের আগুনে আলু পুড়ে খেতে মাঠে নেমেছিল অনেকেই। নানা স্যাবোটাজের ভয়-শঙ্কা অনেকের মনে। ফেসবুকে নানা গুজব ছড়াচ্ছিল। সারাক্ষণ ভয়ে কুকড়ে থাকতাম। একটা কোনো অঘটন ঘটে গেলে তাদের কি রক্ষা করা যাবে?

দুটি বিষয় সব কিছু ওলট পালট করে দিল। যার প্রথমটি হলো মিডিয়ার একটি অংশ, যে সামাজিক আন্দোলন পরিবহন সেক্টরের পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে তাকে সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত করার কাজে নেমে পড়ল তারা। অন্যদিকে এই আন্দোলনের ভেতর ঢুকে গেল রাজনৈতিক একটি পক্ষ, এবং তাদের কর্মীরা। যার ফলে তৃতীয় দিন বিকেল থেকে শুরু হলো আন্দোলনের চরিত্র বদল। চতুর্থ দিন এর স্বতঃস্ফূর্ততার বদলে এল একটি পরিকল্পিত আইন হাতে তুলে নেয়ার রূপ। যার ছোঁয়া লাগলেই যে কোন সুন্দরের অপমৃত্যু ঘটে।

এবং ঘটলোও তাই। বড় ক্ষতি হলো আন্দোলনকারীদের। ওদের বিজয়টা হলেও শেষটা সুন্দর হলো না। অপরাজনীতির হাতে পড়ে আন্দোলন, ছিনতাই হয়ে গেল। এরই মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত গভীর রাতে কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে যখন কোনো রাজনৈতিক নৈশভোজে মিলিত হন তখন তার গাড়িতে হামলার অভিযোগ এই আন্দোলনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মাত্রা দেয়।

সেটি আর কিছুই নয় যে, এরকম একটি ডামাডোলে বা মার্কিন দূতাবাস কর্তৃক কথিত সহিংসতার মাঝে রাষ্ট্রদূত কোনো প্রকার নিরাপত্তা-সুরক্ষা ছাড়াই কী করে এরকম একটি নৈশভোজে যোগ দেন? এই নৈশভোজের গুরুত্ব কি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রাণের চেয়েও বেশি? এমনিকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ সে দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে বিভিন্ন সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে এবং বিশেষ করে এই আন্দোলন চলাকালে সকলকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তবেই চলাচলের জন্য আবেদন করার পরও মার্কিন রাষ্ট্রদূত এভাবে গোপন নৈশভোজে কী করে যান সে বিষয়টি মাথায় রেখেই হয়তো এই হামলার অভিযোগটি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা কোথাও শোনা যাচ্ছে না।

এমনকি কোনো বিদেশি গণমাধ্যমেও এই খবরটি বিশেষভাবে প্রকাশিত হয়েছে কিনা তা জানা যায় নি। যদিও আমরা জানি যে, মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য যে কোনো দেশে মার্কিন দূতাবাসের কোনো সাধারণ কর্মচারী/কর্মকর্তাও যদি হামলার শিকার হন তাহলে সেটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর হয়। কেন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলার পরও এ বিষয়টি নিয়ে আর কোনো দেশ না হোক খোদ্্ যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমেই কোনো আলোচনা নেই সে প্রশ্নের উত্তরের মাঝেই হয়তো নিহিত রয়েছে সদ্য শেষ হওয়া কোমলমতি আন্দোলনের নেপথ্যে অ-কোমলমতিদের উদ্দেশ্যটি। নিশ্চয়ই এ বিষয়ে সকল পক্ষ আরো বিস্তারিত আলোচনা করবেন, এবং অতি দ্রুত আমরা এ বিষয়ে আরো জানতে পারবো।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com