হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৭ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-08-29 21:17:16 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৭ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ মানসম্মান বোধ ক্লাশ সেভেনে থাকতেও হয়নি আমার। থাকলে রমজানের তারাবীতে যেতে পারতাম না। সারাদিন রোজা থাকতে কষ্ট হলেও তারাবীতে যেতে কোন কষ্ট ছিল না। ব্যাপারটা এমন যে, রোজা না রাখতে পাড়লেও তারাবী মিস্ দেয়া যাবে না। তাই মাঝেমধ্যে এক-আধটা রোজা ছুটে গেলেও তারাবী ছুটতো না। রোজা না রাখলেও তারাবী পড়তাম। সুরা তারাবী নয়, খতম তারাবী।

তারাবীতে যাবার প্রস্তুতি নিতাম সকাল থেকেই। প্রস্তুতি বলতে বন্ধুরা গোল হয়ে একসাথে বসে গেল রাতের সেহ্রীর গল্প করা। খুব সাবধানী আমরা রোজাদার সকল। সামান্য কোন ভুলে রোজা ছুটে যেতে পারে। তাই একটু পর পর মুখের থুথু ছিটাতাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে মুখের সাদা থুথু ছিটিয়ে চারপাশ সাদা ছোপছোপ দাগে ভরিয়ে ফেলতাম। মুখের থুথু খেলেও রোজা থাকবে না, এই ভয়েই ছিটাতাম। ভয় দিত হুজুরগণ। দেখতাম, সারাদিন তারা হাঁটতেন আর এদিক ওদিক থুথু ফেলতেন। দেখাদেখি আমরাও ফেলতাম। ইচ্ছেমত ফেলতাম।

ইচ্ছেমত তারাবীও পড়তাম। তখনকার দিনে গাঁওগেরামে খতম তারাবী পড়াটা খুব সহজ ছিল না। হাফেজ পাওয়াই দুষ্কর ছিল। তাই অধিকাংশ মসজিদের ইমাম সাহেব তার মত করেই কোরআনের শেষ দশটি সূরা দিয়েই ২০ রাকাত তারাবী শেষ করতেন। তবে আমাদের ধলা বাজারের মসজিদটি ভিন্ন। এর ঈমাম সাহেব নিজেই হাফেজ ছিলেন বলে খতম তারাবীই হতো। কিন্তু মুসুল্লী হতো কম।

তারাবীর প্রথম কাতারে প্রথমে আমরাই বসতাম। আস্তে আস্তে এলাকার মুরুব্বীগণ আসতেন আর আমরা পেছনে যেতে থাকতাম। এভাবে পেছাতে পেছাতে একেবারে শেষ কাতারে পারমানেন্ট জায়গা হতো। মুরুব্বীগণ কখনোই বাচ্চাদেরকে সামনের কিংবা মাঝের কাতারে বসতে দিতেন না। মসজিদে ঢুকেই মুরুব্বীরা বলতেন, যাও, যাও! আন্ডাবাচ্চারা সব পেছনে যাও। পোলাপাইন সামনে থাকলে নামাজ শেষ।

বড় ভুল ছিল তাদের বিশ্বাসে। আসলে পেছনের কাতারে থাকাতেই আমরা নামাজে মনোযোগী ছিলাম না। মানুষ গোপনে স্বাধীনতা পেলে যেমনি যা ইচ্ছে  তাই করে, আমরা পোলাপানের দলও তেমনি স্বাধীনতা পেয়ে নামাজের পেছনের কাতারে বসে খোঁচাখুচি করতাম; মারামারি করতাম। নতুন রাকাত শুরুর পরও আমরা বসে থাকতাম। ইমাম সাহেব সূরা ফাতিহা শেষ করে দ্রুতলয়ে লম্বা কোন সূরা শুরু করেছেন। মোটামুটি আন্দাজ করতে পারতাম সূরা শেষ হবে কখন।

শেষ হবার আগে আগে হাফেজ সাহেব লম্বা একটা টান দিতেন। অমনি আমরা তড়িঘড়ি করে দাঁড়িয়ে “ঈমামের যেই নিয়্যত আমারও সেই নিয়্যত” বলে তাকবীর দিয়ে হাত বাঁধতাম। নামাজে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই রুকুতে যাওয়া। কী মজা! বিনা পরিশ্রমে এক রাকাত শেষ। তবে সমস্যা হতো দ্বিতীয় রাকাত নিয়ে। দ্বিতীয় রাকাতে চালাকীর সুযোগ নেই। পুরো সূরাতেই দাঁড়িয়ে থাকা লাগতো। এরমধ্যেই দলের কেউ একটু হেসে দিয়েছে। অমনি বাকীদেরও হাসা শুরু। একবার শুরু হলেই সংক্রমিত হতো। থামতো না।

থামাথামি মারামারিতেও ছিল না। নামাজ রেখে মোটামুটি ঢিসুম ঢুসুম একআধটু হতোই। ফলাফলে ওযু ছুটে যেত। দৌঁড়ে বাইরের ঘাটে যেতাম ওযু করতে। ফিরে আসলে মহা বিপদ। একটু আগে নামাজে বিরক্ত করার কারনে মুরুব্বীরা মার্ক করে রাখতেন। অপেক্ষায় থাকতেন কখন হাতের নাগালে পাবেন। দু’রাকাত নামাজ শেষে সালাম ফিরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজতেন। সামনে পেলে রক্ষা নেই। যাকে পেত, শুরু হতো তাকেই চিপা মাইর। ঘাড়ে ধরে চিপা মাইর।

মাইরে আমার লজ্জা লাগতো না। সেই ছেলেবেলা থেকেই কিছু করতে যেমন লজ্জা পেতাম না; বলতেও না। মুখে আমার কথা আটকাতো না। আমার মা সর্বদাই সবাইকে বলতেন, শাহীনের মুখে কখনো কথা আটকায় না। কোনকালে আটকাবে বলেও মনে হয়না। কথাটা অনেকটাই সত্যি বলে আমার নিজেরও ধারনা। ঐ কালেও আটকাতো না। এই কালেও না। সোজাসাপটা কথা আমি সোজাভাবেই প্রকাশ করে ফেলি।

জাপানের ভার্সিটিতে পড়ার সময়কার কথা। একদিন এক সেমিনারের ফাঁকে জাপানীজ একজন প্রফেসর আমাকে বললেন, বাংলাদেশে দেখার মত এমন কী আছে? যেখানেই যাওয়া যাক না কেন কেবল কবর আর মাজার। এটা অমুকের কবর, তো ওটা তমুকের মাজার। এভাবে কি তোমাদের দেশে তোমরা ট্যুরিস্ট  টানতে পারবে? আমার ডান পাশে বসা ছিলেন আমার সুপারভাইজিং প্রফেসর। তিনি বুঝতে পারছিলেন এবার আমার মুখ খুলে যাবে। তিনি আমাকে থামাতে যাবেন; এর আগেই আমার মুখ খুলে গেল।

শ্যামন মাছের একটা টুকরা মুখে পুরতে পুরতে বললাম, আমাদের দেশে দেখার মত আর কিছু না থাক; যুদ্ধে হেরে যাবার ইতিহাস আমাদের নেই যা তোমাদের আছে। তোমরা ২য় বিশ্বযুদ্ধে হেরেছো, আর আমরা ৭১ এ জিতেছি। আমাদের দেশে যাবে বিজয়ী জাতিকে দেখতে; তারা কিভাবে জয়ী হয়েছে সেটা জানতে। পরাজিত জাতি হিসেবে জাপানীজদের এই ব্যাপারটা জানা খুবই জরুরী। সেদিন এভাবেই জাপানী ভদ্রলোককে ঠেসে ধরেছিলাম কথা দিয়ে।

জাপানে বাস করার একটি বিশেষ সুবিধে হলো এখানে আমার একটি পরিচয় আছে; তা হলো আমি বাংলাদেশের নাগরিক। এই নির্ভেজাল আইডেন্টিটি আমাকে একটি নির্ভেজাল ঠিকানা দিয়েছে। আমার ঠিকানা বাংলাদেশ। কিন্তু বিপত্তি তখন বাঁধে, যখন আমি বাংলাদেশে থাকি। বাংলাদেশে আমার কোন নির্ধারিত আইডেন্টিটি নেই। অর্থাৎ আমি বাংলাদেশের কোন্ জেলার মানুষ তার কোন সামাজিক স্বীকৃতি নেই। বাবা দাদা এবং আম্মা নানার বাড়ী বরিশাল। তারা সবাই নিজ নিজ বাড়ীতেই চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। কিন্তু আমার জন্ম গাজীপুরে। এখানে জীবিতকালে বাবা জমিজমা কিনেছিলেন বলে একটা আধাস্থায়ী ঠিকানা এখানেও হয়ে যায় আমাদের। বাবার বদলির চাকুরীর সুবাদে ৪ বছর বয়সেই ময়মনসিংহের ধলা নামক গ্রামে মাইগ্রেশান। এখানে   একটানা ১১ বছর ছিলাম। এসএসসি শেষ করে ফিরে এলাম গাজীপুরে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ঢাকায়। গাজীপুর থেকে ঢাকা আসা যাওয়া করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করলাম। অবশেষে ১৪ বছর গাজীপুর কাটিয়ে আরো অধিকতর পড়াশুনা (এমএস) করতে গেলাম জাপান। সেই জাপানে আছি আজ ২৩ বছর। পাশাপাশি জীবিকার কারণে বাংলাদেশেও থাকতে হয় বলে এবার গাজীপুরে নয়, ঢাকাতেই স্থায়ী বাসাবাড়ী করতে হলো। যখন ঢাকা আসি তখন এখানেই উঠি।

এখন সমস্যা হলো ঢাকার স্থায়ী ঠিকানার আশপাশের মানুষেরা আমাকে মনে করে আমি গাজীপুরের লোক; গাজীপুরের মানুষেরা ভাবে আমার বাড়ী বরিশাল; আর বরিশালের আমার সকল নিকট আতœà§€à§Ÿà¦°à¦¾à¦“ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে আমি ময়মনসিংহের মানুষ। অবশ্য ময়মনসিংহের জনগণ আমাকে কোন্ এলাকার মানুষ ভাবে সেটা আমি নিজেও জানি না!!

জানার কথাও না। যাযাবরের আবার এলাকা কি? যে এলাকায় নৌকা ভিড়াই, সেই এলাকাই তো আমার এলাকা। তাই এই বয়সেও নিজেকে যাযাবরই মনে হয়। মানুষ হিসেবে আমি ঠিক কোন্ জেলার আমি নিজেও তা জানি না। কেবল এইটুকু জানি, বিশাল এই বাংলার পুরোটাই আমার ঠিকানা। পুরোটাই আমার দেশ, আমার গ্রাম! স্বপ্নের গ্রাম!

গ্রাম বলতে আমি আমার শৈশবের গ্রামকেই বুঝি। প্রাণের বন্ধু বলতে আমি শৈশবের বন্ধুদের বুঝি। তাই তো খুব মনে পড়ে ওদের। মনে পড়ে ওদের সাথের হাজারো স্মৃতি, হাজারো কথা। মধ্য বয়সের এই আমি কাজের ফাঁকে অবকাশ পেলে যখন চেয়ারে গা হেলিয়ে দেই; মানসপটে শৈশবের সব বন্ধুরা ঘুরঘুর শুরু করে। দিব্বি দেখতে পাই ওদের সেই মুখ, সেই চেহারা!

আনমনা মনে খুব করে ডাকতে ইচ্ছে করে ওদের। মন খুলে বলতে ইচ্ছে করে পুরনো সেই দিনের কথা। শুনতে ইচ্ছে করে ওদের কথকথা। কে জানে ওরা সবাই এখন কোথায় আছে! কেমন আছে! হয়ত ভাল আছে, হয়ত নেই! আসলে জীবনটাই এমন। এমন করেই হারিয়ে যায় অতীত; প্রতিটি মূহুর্তে হারিয়ে যায় বর্তমান। শুধু বেঁচে থাকে ভবিষ্যৎ! অনাবিল অনাগত ভবিষ্যৎ!!

বন্ধু তোরা ভাল থাকিস্, থাকিস্ শান্তি সুখে!

বন্ধু তোদের রেখে  দিছি চিরদিনই বুকে!!

বন্ধু আমার, প্রাণের বন্ধু; পড়ছে মনে বারে!!!

বন্ধু তোদের স্মৃতিগুলো ভুলতে কি মন পারে!!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com