হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৮ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-09-13 11:16:24 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৩৮ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ এমনই দুরন্তপনা নিয়েই কেটে গেছে সময়; আর উঠে গেছি ক্লাশ এইটে। ফার্স্ট হয়েই উঠেছি। বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রত্যাশিত হয়েই উঠেছিল সবার কাছে। ফার্স্ট হয়ে ওঠা নিয়ে বাসার কারো কোন বিশেষ উৎফুলতা তখন আর অবশিষ্ট নেই। ফার্স্ট হবোই, এটা যেন অতি সাধারণ একটি রেওয়াজ হয়ে গেছে। ক্লাশ ওয়ান থেকে দেখতে দেখতে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বিষয়টিকে আর নতুন মনে হতো না কারো কাছে। শুনে কেউ আনন্দে লাফিয়ে উঠতো না, অবাক হতো না।

তবে আমি একটি বিষয়ে বরাবরই অবাক হতাম। শামীম ভাইয়া; আমার মেঝো ভাই। খুব মেধাবী ছিলেন। যেমন মেধাবী, তেমন কিপটে। বলা যায় হাড় কিপটে। তবে আশা দেবার ক্ষেত্রে কোনদিন কিপটেমি করেননি। প্রতি ক্লাশের ফাইনাল এলেই রাজ্যের আশা দিয়ে বলতেন, এইবার ফার্স্ট হলেই বিশেষ পুরষ্কার। ফার্স্ট হতে দেরী হবে, পুরষ্কার দিতে দেরী হবে না। আমি বিশ্বাস করতাম এবং ঐ আশাতে বরাবরই ফার্স্ট হতাম। ফার্স্ট হতাম আর অবাক হতাম। অবাক হতাম হাড় কিপটের কিপটেমি দেখে।

এক্ষেত্রে আব্বা ঠিক উল্টো। একদিন ঢাকা থেকে হঠাৎ চলে আসলেন। আসার সময় ব্যাগ ভরে অনেক কিছু কিনে আনলেন। খুশী হলাম বটে। তবে তারচেয়েও অবাক হলাম আব্বার কথা শুনে। আব্বা এসেছেন আমাদেরকে নিয়ে যেতে। একা একা ঢাকায় আর কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। তাই আর ধলায় থাকা হবে না। গাট্টিবোস্কা বাঁধা হচ্ছে। চির জীবনের তরে বাসার সবাই ময়মনসিংহের ধলা ছেড়ে গাজীপুরে চলে যাবো। আনন্দ এবং বেদনা একসংগে কাজ করছে। মন আমার কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। বড় প্রিয় ধলা হাই স্কুল আর সমসাময়িক বন্ধুদের ছেড়ে স্বর্গে যেতেও ইচ্ছে হচ্ছে না।

কিন্তু যেতে হবে। অবশেষে প্রাণের ভূমি ছেড়ে গাজীপুরের পূবাইলে চলে আসলাম আমরা। পূবাইল, আমার বাপ-দাদার বাড়ী নয়। তবে জন্মভূমি! আমার জন্মভূমি! খুব একটা মন্দ নয়, বাবার কেনা জায়গায় শান বাঁধানো ঘাট না থাকলেও বড় পুকুর আছে। আছে ধানী জমিসহ বসত বাড়ীঘর। এসবের কারণে নাড়ীর টান থাকলেও মায়ার টান ছিলনা। ঘাটতি ছিল। খুব একটা বেশী থাকা হয়নি বলে মায়াটা জন্ম নেয়নি। তাই মনমরা হয়েই দিন কাটছে।

আনন্দ যেটুকু তা কেবলই পড়াশুনা না থাকার কারণে। ভাল স্কুলে ভর্তি হতে হবে ভাবতে ভাবতেই কয়েক সপ্তাহ চলে যায়। এ কারণে স্কুলও নেই, পড়াশুনাও নেই। কী মজা! এই বয়সে পড়াশুনা না থাকার মত সাংঘাতিক মজার জিনিস আর হয় না! হোমওয়ার্কও নেই, রুটিন করে পড়াশুনার ঝামেলাও নেই। রোজ রাতে ঘুমুতে যাই এই আনন্দে যে, কাল সকালে স্কুলও নেই, ঘুম থেকে উঠবার তাড়াও নেই।

কেবল তিনচারটে স্কুল না যাওয়া দুষ্টু বন্ধু ফুলটাইম খাড়া ছিল। ছিল আমার সেবায় নিবেদিত প্রাণ। ওদের সাথে সারাদিন টিংটিং করে নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়াই। গাছে চড়ি। এর গাছের লিচু, ওর গাছের চাল্তে চুরি করে খাই। তবে ঘরের কাজও করি। মাঝেমধ্যে মাকে হেল্প করি। বাজারঘাট করি; জংলা সাফ করে লাকড়ি কেটে মাথায় করে আনি। বই হাতে করে স্কুলে যাবার চেয়ে লাকড়ি মাথায় করে বাসায় আনা অনেক তৃপ্তির; অনেক শান্তির।

আর ঘরে তো শান্তির প্রতিক মা আমার আছেনই। মহা শান্তির প্রতিক। একবার কায়দা মত একটা কাজ না করতে পারার জন্যে খুবই অশান্তিতে ছিলাম। কাজ তেমন কিছু না। বন্ধুরা মাথায় কুবুদ্ধি চাপিয়ে দিয়েছে। ঘরের ধান চুরি করে বাজারে বিক্রি করবো। ফুরসত পাচ্ছিলাম না। চোখের সামনে ধান আর ধান। নতুন ধানের গন্ধে সারা বাড়ি মৌ মৌ করছে। উঠান ভর্তি ধান উঠেছে। বৈশাখী বোরো ধান। মা লোকজন নিয়ে মহাব্যস্ত ধান সিদ্ধ করা আর মুড়ি বানাবার কাজে। অথচ আমি সুযোগ পাচ্ছি না।

উঠোন কোনে সারি সারি মাটির পাতিলে বালি গরম করে মুড়ি ভাজার কাজ চলছে। মা নিজেই ভাজছেন। মায়ের আত্ম বিশ্বাস, এই কাজে তাঁর হাত খুব পাকা। মুড়ি খুব গোটাগোটা বড় সাইজের হয়। আমার মুড়িতে মন নেই। মন খুবই ছটফট করছে বাজারে যাবার জন্যে। শনি-মঙ্গল বারের হাটের বাজার। দূপুর দূপুর না গেলে হাটও শেষ; আশাও শেষ। মায়ের পাশে ঘুরে ঘুরে ঘেনর ঘেনর করতে লাগলাম।

অবশেষে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে মা সের পাঁচেক ধান বেচার অনুমতি দিলেন। সাথে শর্ত দিলেন কাজটা অতি গোপনে করতে হবে। আব্বাকে জানানো যাবেনা। পাঁচসের মানে পাঁচকেজির কাছাকাছি। বিশাল পাওয়া। আবার শর্তও খুব সহজ। খুশীতে গদগদ হয়ে একলাফে উঠোন কোনে স্তুপ হয়ে পড়ে থাকা ধান থেকে নিজ হাতে প্রথমে পাঁচসের মাপলাম। পরে এদিক ওদিক তাকিয়ে অতিরিক্ত আরো পাঁচসের মেপে চুপচাপ ছালায় ভরে নিলাম। এমনভাবে নিলাম যেন মা তো ভাল, আশেপাশের কাকপক্ষীও না বোঝে। তবে আমি ভালভাবেই বুঝলাম। মাত্র তের বছর বয়সে দশসের ধান মাথায় করে দেড় মাইল পথ হেঁটে হাটে পৌঁছতে পৌঁছতে আমার ঘাড়ও শেষ; জানও শেষ।

এই আমার মা! কিছু চাইলে পারতপক্ষে কোনদিনও না করেনি! প্রথমে একটুআধটু গাইগুই করলেও শেষমেষ ঠিকই দিয়ে দিতেন। নিজের গাটে টাকা আছে অথচ আমাকে বের করে দেননি, এমনটি ঘটেনি কোন কালে। একটা সময় আমাদেরকে খুব হিসেব করে চলতে হতো। আব্বা বেশ হিমশিম খেয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কোনভাবে মাস পার করতেই খুব কষ্ট হয়। মাসের শেষে হাতে কিছু থাকতো না বললেই চলে। এর মাঝেও কখনো সংসারের খরচ এদিক ওদিক করে বাঁচিয়ে হয়ত সামান্য কিছু জমিয়ে হাতে রেখেছেন মা; বিশেষ কোন কাজে খরচ করবেন এই কারণে।

সেটুকুও দিয়ে দিতেন যদি আমি চাইতাম মায়ের কাছে। খুব হাসিমুখেই দিতেন। এমনভাবে দিতেন যেন আমার জন্যেই জমিয়ে রেখেছেন। কোনভাবেই নিজের কষ্টের কথা বুঝতে দিতেন না। দেবার সময় টেনে বুকের কাছে নিয়ে আদর করতেন। পাইপাই করে জমানো অতি কষ্টের টাকাও দিতেন সদা হাস্যোজ্জল মুখে। লুকিয়ে রাখতেন সকল দুঃখ। আমাকে না বললেও বুঝতাম, সাংঘাতিক ভরসা আর বিশ্বাস করতেন আমাকে।

বিশ্বাস করতেন, একদিন বড় হয়ে আমি তাঁর সকল দুঃখ ঘুচিয়ে দেবো। চোখ ছলছল হাসিমাখা মুখেই বিশ্বাস করতেন। মৃত্যুর দিন অবধি বিশ্বাস করতেন। আমি মন থেকেই জানি, মা এটা করতেন। কেবল অভাগা এই আমি জানি না, তাঁর বিশ্বাস টুকুর মর্যাদা আমি আদৌ রাখতে পেরেছি কি না! জানি না বিশ্বাস ভংগের কষ্ট বুকে চেপে তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন কি না!! কিন্তু জানতে বড় ইচ্ছে করে! বড় ইচ্ছে!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com