খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) জীবনের অজানা কাহিনী

প্রকাশের সময় : 2018-09-13 11:20:23 | প্রকাশক : Admin
�খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রহঃ)  জীবনের অজানা কাহিনী

মাহমুদুন্নবী: আখেরী নবী মোহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলাম আবির্ভাবের পর হতে বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব যেন অর্পিত হয় আধ্যাতিক সাধক, পীর, আউলিয়া, কামেলদের উপর। এছাড়া অধিকাংশ অমুসলিম এলাকায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এসকল আধ্যাত্বিক মানবদের ত্যাগের বিনিময়ে। নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার সহ্য করা ছাড়া ইসলাম প্রচার পেয়েছে খুব অল্প স্থানেই। তবে দমন করা যায়নি ইসলাম প্রচার। যুদ্ধ করে দেশ জয় করা গেছে হয়তো, কিন্তু ইসলাম এসেছে এসব আধ্যাতিক সাধকদের হাত ধরেই। আল্লাহর দয়া আর সাহায্যে যেখানেই আস্তানা গড়েছেন এসকল কামেল বুজুর্গ পুরুষ, সেখানেই দলে দলে অমুসলিমরা এসেছে শান্তির ধর্ম ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। তবে এজন্য কম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়নি তাঁদের। এমনি এক ব্যক্তি শরীয়তের স্তম্ভ, তরীকতের নিদর্শন, মা’রেফতের জ্বলন্ত শিক্ষা, হাকীকতের আয়না হযরত খাজা মইনুদ্দীন হাসান চিশতী (রাঃ)। হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন পারস্যে গোলযোগপূর্ণ নগর সঞ্জবের অন্তর্গত সিস্তান নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হযরত সৈয়দ গিয়াসুদ্দীন হাসান সঞ্জরী, মাতা সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা। শৈশব ও বাল্যকাল তিনি এ গ্রামেই অতিবাহিত করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এতিম হন মইনুদ্দিন। প্রথমে মারা যান পিতা পরে মাতা। মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে আঙ্গুর বাগানসহ বেশ সম্পত্তির মালিক হন তিনি।

একদিন খাজা ইব্রাহিম কান্দুযি (রহঃ) মুঈনুদ্দীনের খেজুর বাগানে প্রবেশ করলেন। তিনি ইব্রাহিমের প্রতি আন্তরিক ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করার পর একগুচ্ছ তাজা আঙ্গুর তাঁর খেদমতে পেশ করেন। হযরত খাজা ইব্রাহিম অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে আঙ্গুর ভক্ষণ করেন এবং দীর্ঘ সময় আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দোয়া করেন। অতপর নিজ ব্যাগ হতে এক টুকরো রুটি চিবিয়ে খাজা মইনুদ্দিনকে খেতে দেন। রুটি খাওয়ার পর পরই তাঁর অর্ন্তদৃষ্টি খুলে যায় এবং দুনিয়ার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন।

এরপর তিনি সমস্ত সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় দান করে সত্যের সন্ধানে স্বীয় জন্মভূমি ত্যাগ করে বোখারায় চলে যান। সে সময় বোখারা ছিল জ্ঞানার্জনের কেন্দ্রস্থল। ৫৪৪ হিজরী থেকে ৫৫০ হিজরী পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কোরান শরীফ মুখস্ত করেন এবং জাহেরী বিদ্যায় বুৎপত্তি লাভ করেন। এছাড়া তিনি ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পর উচ্চ শিক্ষার জন্য ইরাকের নিশাপুরে গমন করেন। এই নিশাপুরের অদূরে হারূন নামক স্থানে তখনকার প্রখ্যাত কামেল বুজুর্গ হযরত খাজা ওসমান হারুনী কুদ্দেসা ছিররুহুল বারী (রহঃ) বাস করতেন। হযরত মুঈনুদ্দীন এই কামেল বুজুর্গের হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং আড়াই বছর স্বীয় পীরের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন।

এই সময়ে তিনি ১২টির বেশী দেশ তাঁর মুর্শেদের সাথে ভ্রমণ করেন। প্রতিটি ভ্রমণই ছিল পায়ে হেঁটে এবং প্রত্যেক ভ্রমণের সময় স্বীয় মূর্শেদের প্রয়োজনীয় মালপত্র স্বীয় মস্তকে বহন করতেন। ওসমান হারুনী (রহঃ) এর নিকট খেলাফত ও খিরকা লাভ করে তিনি সেখান থেকে বিদায় গ্রহণ করেন চলে যান খোরাসানে। খোরাসনে কিছুদিন অবস্থানের পর রওয়ানা দিলেন ইরাকের দিকে। তখন হিজরী ৫৫০ সাল। বাগদাদে এসে সাক্ষাত পান হজরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এর। হযরত বড়পীর (রহঃ) যথার্থই চিনলেন হযরত মইনুদ্দিনকে। তাঁর সম্পর্কে এরশাদ করলেন “এই ব্যক্তি তাঁর সময়ে শ্রেষ্ঠ আউলিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। অসংখ্য মানুষ উপকৃত হবেন তাঁর মাধ্যমে।” অনেক দিন সেখানে অবস্থানের পর বিদায় বেলায় বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) নির্দেশ প্রদান করেন, হে মইনুদ্দিন তুমি হিন্দুস্থান সফর করবে। পথে পথে দিন কাটে মইনুদ্দিনের আর রাত কাটে কবরস্থানে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মইনুদ্দিনের সুখ্যাতি। যেখানেই যান প্রচন্ড ভীড় জমে যায় মানুষের।

হিজরী ৫৮৩ সালে হযরত খাজা মইনুদ্দিন পবিত্র হজ্ব পালন করেন। আশেকে রসুল, নবী প্রেমে দেওয়ানা হযরত খাজাকে আল্লাহর রসুল (সাঃ) নির্দেশ প্রদান করেন হিন্দুস্থান গমণ করার জন্য। সেখানকার বেলায়েত প্রদান করা হয় তাঁকে। নির্দেশ পাওয়ার পর একদিন চিন্তিত অবস্থায় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন মইনুদ্দিন। সেই অবস্থায় দেখলেন, হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) তাঁর হাতে আজমীর শহরের দৃশ্য দেখিয়ে দিলেন সাথে দিলেন দিক নির্দেশনা। এরপর দয়াল নবী (সাঃ) দিলেন একটি সুমিষ্ট আনার। হিন্দুস্থানের দিকে রওয়ানা দিলেন মইনুদ্দিন সাথে কুতুবুদ্দিন। প্রথমে লাহোর, লাহোর থেকে দিল্লী হয়ে মইনুদ্দিন আসেন আজমীর শহরে।

তৎকালীন ভারতবর্ষের শাসক ছিলেন শক্তিশালী পৃথ্বীরাজ। সেসময় ভারতবর্ষে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল অতি নগন্য। যাঁরা ছিলেন তাঁরাও আবার নানা প্রতিকুলতার মধ্যে দিনাতিপাত করতেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দিন (রহঃ) প্রথমে হিন্দুস্থানে প্রবেশ করে লাহোরের দাতা গঞ্জেবক্স (রহঃ) এর মাজারে চল্লিশ দিন অবস্থান করেন। অতপর তিনি আসেন দিল্লীতে। দিল্লীর শাসক ছিলেন পৃথ্বীরাজের ভাই খান্ডেরাও। সেখানে অবস্থানকালে তিনি ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন এবং বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ইসলামের ছায়াতলে আসার আহবান জানান। কিন্তু হিন্দুদের মাঝে এ প্রস্তাব মানা দু:সাধ্য হয়ে দেখা দেয়। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে বিফল হয়। দলে দলে বিধর্মীরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। অত:পর কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকীকে দিল্লীর দায়িত্ব প্রদান করে খাজা মইনুদ্দিন (রহঃ) আসেন তাঁর জন্য নির্ধারিত স্থান আজমীরে।

আজমীরে আনা সাগর নামে বিশাল এক হৃদ আছে। সেই হৃদের কাছে ছোট্ট একটি টিলায় সঙ্গীদের নিয়ে অবস্থানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন মাইনুদ্দিন (রহঃ)। আনা সাগরে আশে পাশেই রয়েছে অসংখ্য মন্দির। সন্ধ্যায় মন্দিরের শত শত মুর্তি পুজার ঘন্টার আওয়াজের সাথেই উচ্চারিত হয় আজানের ধ্বনি। আর তাতেই ম্লান হয়ে যায় পুজার ঘন্টার আওয়াজ। স্থানটি ছিল রাজকীয় প্রাসাদের প্রায় পাদদেশে।

এদিকে আজমীরে আসার সময় হযরত খাজা রাজা পৃথ্বীরাজের উটের বিশ্রামের ঘরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে গিয়েছিলেন একটু বিশ্রামের জন্য। কিন্তু রাজ কর্মচারীরা বলে, এখান থেকে চলে যেতে; এখানে উট বিশ্রাম নিবে। খাজা শুধু বললেন ঠিক আছে তোমাদের উটই বিশ্রাম করুক। পরের দিন সকালে দেখা যায়, উটগুলো একটিও আর উঠছে না, সব শুয়ে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। একথা রাজার কানে গেলে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। কারণ, জোতিষ শাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী রাজমাতা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এক মুসলমান ফকিরের অভিসম্পাতেই পৃথ্বীরাজের রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কথাটি মনে হতেই তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। উটের কাহিনী শুনে বলেন, যাও তার কাছে মাফ চেয়ে আসো। কথামতো কর্মচারীরা খাজার কাছে মাফ চাওয়ার পর দেখলো উটগুলি যথারীতি উঠে দাঁড়িয়েছে এবং স্বাভাবিক আচরণ করছে। চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com