মঞ্জুর এলাহীর বিশ্বজয়ের গল্প

প্রকাশের সময় : 2018-09-13 11:21:16 | প্রকাশক : Admin
মঞ্জুর এলাহীর বিশ্বজয়ের গল্প

সিমেক ডেস্কঃ অ্যাপেক্সের জুতা পরেনি এমন রুচিশীল বাংলাদেশী খুঁজে পাওয়া সম্ভবত কঠিন! ২০১৪ সালের আগস্টে বিখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে বাৎসরিক ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন জোড়া জুতা বিশ্বব্যাপী ৪০টি দেশের ১৩০টি খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছে রপ্তানি করে অ্যাপেক্স। যার মধ্যে বিশ্বখ্যাত কিছু মার্কিন, বৃটিশ, জার্মান ও জাপানি জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

শুধু তাই নয় নিজের দেশের মানুষের জন্য বাৎসরিক ৩ মিলিয়ন জোড়া জুতা উৎপাদন করে অ্যাপেক্স, যা দেশবাপী ৫৫০টির অধিক নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র থেকে বিক্রয় করা হয়। অ্যাপেক্স কেবল একটি জুতা প্রস্তুতকারী কোম্পানি নয়, চামড়া-প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ট্যানারি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এবং পাইওনিয়ার ইন্সুরেন্সসহ মোট ৭টি বৃহৎ কোম্পানি রয়েছে অ্যাপেক্স গ্র“পে।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর জন্ম ১৯৪২ সালে কলকাতায়। তার পিতা সৈয়দ নাসিম আলী একজন মুসলিম হয়েও ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, আর মা শরিফা আলী ছিলেন এক বিদুষী নারী। বিচারপতি বাবার সহচার্য খুব বেশিদিন পাননি মঞ্জুর এলাহী। মাত্র ৪ বছর বয়সে বাবাকে হারান।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সম্পূর্ণ শিক্ষা জীবন বলা যায় কেটেছে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত পড়েছেন ১৮৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ট বিদ্যাপিঠ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬২ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ শেষ করে চলে আসেন ঢাকায়। ঐ বছরই ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে অর্থনীতিতে এমএ সম্পন্ন করেন।

এমএ পাশ করার পর এবার কর্মজীবন শুরু করবেন। কী করবেন? আমাদের এই সময়ে এসে শিক্ষা জীবন শেষ করেই যেমন সিংহভাগ তরুণের মধ্যে বিসিএস উন্মাদনা কাজ করে, তেমনি সেসময়ও ছিল সিভিল সার্ভিস উন্মাদনা। উচ্চশিক্ষিত হলেই সিভিল সার্ভিসে যাওয়ার পরামর্শ ও প্রচেষ্টা থাকত সবার। মঞ্জুর এলাহীর সব বন্ধুরাও সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুতরাং চারদিকের প্রভাবে তিনিও সিভিল সার্ভিসের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তাছাড়া এই চাকরিতে যেমন আছে সম্মান আর ক্ষমতা, তেমন আছে অঢেল টাকা। সিএসবি অফিসারের বেতন তখন মাসে চার’শ টাকা!

এমন সময় স্থানীয় এক শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী সিভিল সার্ভিস নিয়ে তার সব ধ্যান ধারণা পাল্টে দেন! তিনি বলেন, মাত্র চার’শ টাকা বেতনের ছাপোষা চাকরি দিয়ে কী হবে? তার চেয়ে বরং মাল্টিন্যাশনাল বড় বড় কোম্পানিতে চাকরির সন্ধান করো। এর চেয়ে ঢের আরামে থাকবে। তরুণ মঞ্জুর এলাহীর চোখ খুলে গেল। মুরুব্বীর পরামর্শে বিমানে চড়ে করাচি ছুটলেন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির সিনিয়রম্যানেজার পদে চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে। অবশ্য তার যাতায়াতের যাবতীয় খরচ ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বহন করেছিল। এই সাক্ষাৎকারে ঘটে এক মজার ঘটনা। নানা প্রশ্নের পর্ব শেষে তারা জানতে চাইলেন কত বেতন চান?

তরুণ মঞ্জুর এলাহী তার দেখা জগতের বাইরে বের হতে পারলেন না! নিজের জানা সিভিল সার্ভিসের বেতনের দ্বিগুণ করে তার সাথে আরও ১০০ যোগ করে দুরু দুরু বুকে বললেন ৯০০ টাকা। শুনে বোর্ডের সবাই একযোগে হেসে উঠলেন। কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে এলাহী নিজ থেকে অঙ্কটা কমিয়ে বললেন, ৬০০ টাকা হলেও তিনি এই কাজে রাজি আছেন। ইন্টারভিউ বোর্ডের প্রধান বললেন, এ পরিমাণ টাকা তো দেওয়ায়ই যায়। তবে সমস্যা হচ্ছে, এ পদের সর্বনিম্ন বেতন এক হাজার ৮০০ টাকা। তরুণ মঞ্জুর এলাহী দ্বিতীয়বার ভ্যাবাচেকা খেলেন!

মাসিক ১৮০০ টাকা বেতন আর সাথে আরও নানান রকম চমকপ্রদ সুযোগ সুবিধা নিয়ে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে চাকরি শুরু করলেন। কোম্পানির শর্ত ছিল দুই বছরের মধ্যে বিয়ে করা যাবে না আর এক বছর কাজ করতে হবে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে। সব শর্ত সানন্দে মেনে নিলেন এলাহী। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় পরিবারিক চাপাচাপিতে কোম্পানি থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে বিয়ে করলেন। তারপর একটানা আরও পাঁচ বছর চাকরি করেন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে।

১৯৭২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ৩০তম জন্মদিন। আয়েশী জীবন ত্যাগ করে উদ্যোক্তা হয়ে অনিশ্চিত সাফল্য যাত্রার জন্য এই দিনটিই বেছে নেন তিনি। এই দিনে ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোব্যাকোর চাকরি ছেড়ে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে যাত্রা শুরু করলেন। সেই যাত্রা শুরু, তারপর দীর্ঘ ৪৪ বছরের পথ পরিক্রমায় আজ তিনি গড়ে তুলেছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্প ও ব্যবসায় গোষ্ঠী অ্যাপেক্স গ্রুপ। ১৯৭২ সালে রেমন্ড ক্লেরিক নামে এক ফরাসী ব্যবসায়ির সাথে পরিচয় হয় তাঁর। রেমন্ড ক্লেরিক ফ্রান্স থেকে ট্যানারি কেমিক্যাল এনে ঢাকায় বিক্রি করতেন। এই ফরাসীর সহচার্য মঞ্জুর এলাহীর চামড়া শিল্পের ব্যবসায় প্রলুব্ধ করে। চাকরি ছেড়ে চামড়ার ব্যবসার কথা শুনে স্ত্রী রাগ করে। শেষমেশ শ্বশুরের মাধ্যমে স্ত্রীকে বোঝোতে সক্ষম হন এলাহী।

এরপর ১৯৭৫ সালে ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে ওরিয়েন্ট ট্যানারি কিনে নেন। নাম পাল্টে অ্যাপেক্স ট্যানারির যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে। অ্যাপেক্স সু প্রথম বাজারে আসে ১৯৯০ সালে আর রিটেইল ব্যবসা শুরু করেন ২০০০ সালে।

সাহসী তরুণ সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে অনুপ্রাণিত করেছেন উপমহাদেশের প্রবাদতুল্য শিল্পোদ্যোক্তা জমশেদজি নুসেরওয়ানজি টাটা। মৃত্যুর ৬৮ বছর পরও জমশেদজি নুসেরওয়ানজি টাটা মঞ্জুর এলাহীর মত তরুণকে নিশ্চিন্ত মোটা অংকের সেলারীর চাকরি ত্যাগ করে উদ্যোক্তা হতে অনুপ্রাণিত করেছেন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বহু বক্তৃতায় জমশেদজি টাটার কথা বলেছেন। এই একটি মানুষকে তিনি আদর্শ জেনে এসেছেন সারা জীবন। সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়াকালীন জমশেদজিকে নিয়ে লেখা একটি বই পড়েন। তারপর অনেক বই পড়েছেন, অনেক পথ হেঁটেছেন, কিন্তু যত দিন গেছে জমশেদজি ততই হয়ে উঠেছেন তার চোখে একমাত্র অনুকরণীয় নায়ক। এলাকার এক মুরুব্বী এলাহীকে সিভিল সার্ভিস থেকেও বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন আর জমশেদজি টাটা শেখালেন তার চেয়েও বড় স্বপ্ন দেখতে।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৯৬ ও ২০০২ সালে দুইবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। উভয় মেয়াদেই উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছেন। বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য ২০১২ সালে তিনি আমন্ত্রিত হন। সেখানে প্রদত্ত বক্তব্য এতটাই মুগ্ধকর ছিল যে, এখনও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তার নাম হার্ভার্ডে উচ্চারিত হয়। ব্যাংক লুট, অর্থ কেলেঙ্কারির এই সময়ে দিকভ্রান্ত তরুণ প্রজন্মের জন্য নিশ্চয় মঞ্জুর এলাহী হয়ে উঠবেন স্বপ্ন দেখার এক দীপ্তিমান কান্ডারী।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com