বিরল এক সম্পাদক

প্রকাশের সময় : 2018-09-26 15:47:41 | প্রকাশক : Admin
�বিরল এক সম্পাদক

আবুল মাল আবদুল মুহিত: গোলাম সারওয়ার সম্মাননাগ্রন্থ 'সুবর্ণরেখায় বাতিঘর'-এ তাঁর ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে কয়েক মাস আগে লিখেছিলাম- 'গোলাম সারওয়ারকে দেখলে মনেই হয় না, তার বয়স ৭৫ হলো! তিনি প্রাণবন্ত ও তারুণ্যদীপ্ত একজন মানুষ।' আজ তাকে স্মরণ করছি তার অনুপস্থিতিতে। যে জীবন পার করে গিয়েছেন গোলাম সারওয়ার, তা সত্যিই বিরল।

দেশের দুটি জনপ্রিয় পত্রিকা যুগান্তর ও সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতা শুরু করেন। এ পেশায় পার করেছিলেন ৫৬ বছরের অধিক। এটি আমার এবং আমাদের সবার জন্য ছিল গৌরবের বিষয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি একজন যুবক। যৌবনে পদার্পণ করেছেন; এ রকম অবস্থা। যেটা তখন উন্নম্নতমনা ছাত্রদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ছিল, সেটাই করেছেন তিনি। গোলাম সারওয়ার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের গৌরবে দীপ্ত এক মানুষ।

সম্পাদক হিসেবে সম্ভবত যুগান্তর পত্রিকা থেকেই চিনতাম। তার অফিসে গিয়েছি, কথা বলেছি। অনেক গল্পও হতো। বরেণ্য অনেক সম্পাদকের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক পুরনো। সবচেয়ে পুরনো সম্পর্ক ছিল প্রয়াত জহুর হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে। জহুর হোসেনের স্ত্রী আমার সহধর্মিণীর শিক্ষক ছিলেন। চাকরি জীবনে পরিচয় হয় ইত্তেফাকের সম্পাদক প্রয়াত মানিক মিয়ার সঙ্গে।

গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচয় হয় খুব সম্ভব আমার চাকরি ছাড়ার পর। ১৯৮২ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিই। এর পর মন্ত্রী হই দুই বছরের জন্য। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসর জীবন কাটাই। সে সময় সুশীল সমাজের সদস্য ছিলাম। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যেতাম। তবে চারটি বছর আমাকে বিদেশ থাকতে হয়েছে। কারণ, তখন এরশাদ আমাকে গ্রেফতারের ঘোষণা দেন। গ্রেফতার হওয়া মানে আমার পরিবার ধংস হওয়া। আমার পরিবার আমার আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে বাধ্য হয়ে চার বছর নির্বাসনে কাটাই।

সারওয়ার সাহেব তখন সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যতদূর মনে পড়ে, সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্নে কারওয়ান বাজারের পান্থপথের অফিসে গিয়েছিলাম পুরনো সম্পর্কটা আরও নিবিড় আর ঘনিষ্ঠ করে তোলার জন্য। শুরু থেকে দেখেছি, গোলাম সারওয়ার সংযতভাবে ভেবেচিন্তে কথা বলেন। অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করেন না। খুব গুছিয়ে ও চিন্তার পর কথা বলেন।

তার সঙ্গে কথা বলা সব সময়ই আনন্দদায়ক ছিল। আলোচনার মধ্যে বুদ্ধিভিত্তিক আবহ থাকত। এটা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় বলে মনে হয়েছে। সব সময় অনেক জ্ঞানী ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনায় এ রকম পরিবেশ তৈরি হয় না। গোলাম সারওয়ার ছিলেন তার ব্যতিক্রম। এটাই তার সম্পর্কে 'ইমপ্রেশন'। 'দিস ইজ রিমেইন্ড আনচেঞ্জড'। এর কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তার লেখা সম্পাদকীয়গুলো আমার খুব ভালো লাগত। লেখার মধ্যে থাকত বুদ্ধিমত্তার ছাপ। যাদের জ্ঞান অনেক বিস্তৃত ও বহুমুখী তাদের ক্ষেত্রেই এটা ঘটে থাকে। বহুমুখী ও বিস্তৃত জ্ঞান খুব কম লোকেরই রয়েছে। গোলাম সারওয়ার ছিলেন তাদেরই একজন। বলা যেতে পারে, তিনি শুধু গুণী নন; ছিলেন একজন জ্ঞানী ব্যক্তিও বটে। আমি তাকে একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে জেনে এসেছি। তার কাছে আগত অতিথিদের জন্য ছিল তার অত্যন্ত স্নেহ, আদর ও সম্মান।

তাকে একজন সফল সম্পাদক মনে করি। দেশের অন্যতম প্রধান দুটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিষ্ঠা হয়েছে তার হাত দিয়ে। প্রায় ২০ বছর সম্পাদনা করছেন পত্রিকা দুটি। টিকে থাকার জন্য তাকে একজন ভালো সম্পাদক হতেই হবে। কারণ, এখানে প্রতিযোগিতা অনেক। আমাদের দেশের লোকজন ভালো করছে। লেখাপড়া, অর্থনৈতিকভাবে ভালো করছে। ফলে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ২০ বছর সম্পাদক হয়ে টিকে থাকা সহজ নয়। এর জন্য শ্রেষ্ঠত্বের প্রয়োজন। সেদিক থেকে ভালোভাবেই উতরে গিয়েছেন গোলাম সারওয়ার।

যেভাবে সাংবাদিকতায় নিজস্ব একটা বলয় তৈরি করতে ও সামাজিক অনেক দায়বদ্ধতা সত্ত্বেও তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন, সে জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় ব্যক্তিত্বের। সজ্জন এই মানুষটির ছিল সেই ব্যক্তিত্বও। সৃজনশীলতার নানান শাখায় তার যে বিস্তর জ্ঞান ছিল, তা তার লেখা পড়লেই সচেতন পাঠকমাত্র অনুধাবনে সক্ষম। বাংলাদেশের সংবাদ জগতে তিনি যে নতুনের ডাক দিয়েছেন, ভিন্নমাত্রার নানান কিছুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, সেটা একমাত্র তার মতো একজন কর্মবীর ও চিন্তাশীল মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রিয় কর্মস্থল ছিল তার একমাত্র জায়গা, যেখানে তিনি ছিলেন ধ্যানী পুরুষ ও একজন নিষ্ঠাবান। গোলাম সারওয়ারকে সব সময় দেখেছি তারুণ্যদীপ্ত ও প্রাণবন্ত একজন মানুষ হিসেবে। শেষকালেও হয়তো ছিলেন একই রকম।

সম্মাননাগ্রন্থের সেই লেখার শেষে বলেছিলাম, আমি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের শতায়ু প্রার্থনা করি। আয়ুর দিক থেকে তিনি হয়তো শত বছর পার হয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু তার কাজ, ব্যক্তিত্ব এবং দেশ ও জাতির জন্য যে অবদান, তাতে তিনি বেঁচে থাকবেন কয়েক শতক জুড়ে। তার আত্মার শান্তি কামনা করি। - সূত্রঃ সমকাল

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com