হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪০ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-10-10 22:44:43 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪০ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমাকে নিয়ে মহা ভালমানুষী বাবা আমার বিপদেই পরে গেলেন। বিপদ মানে মহা বিপদ। ধলা হাই স্কুল আমাকে কিছুতেই ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দেবে না। আবার সার্টিফিকেট ছাড়া নতুন কোন স্কুলে ভর্তি করানোটাও ঝামেলার। তাই আব্বার চিন্তার অন্ত নেই। অবশেষে সাতপাঁচ ভেবে নিজে নিজেই পাশের গ্রামের নামকরা ভাদুন হাইস্কুলে ভর্তি হতে গেলাম। বহু দূরের পথ। বাসা থেকে দুই মাইলের পথ হেঁটে ভাদুন স্কুল। কাঁদাপানি ভেঙ্গে যেতে হবে। বাঁশের সাঁকো ছিল; ওটাও ভাঙ্গা। আধা ভিজে বইখাতা বগলে চাপিয়ে কোনমতে স্কুলে পৌঁছালাম বটে, কিন্তু ক্লাশে ঢুকতে পারলাম না।

বহুত মুশকিলে পড়ে গেলাম। কথা একটাই; ট্রান্সফার সার্টিফিকেট লাগবে। ওটা ছাড়া ভর্তি হওয়া যাবে না। আর ভর্তি না হতে পারলে ক্লাশেও ঢোকা যাবে না। আবার ধলা হাইস্কুলও গো ধরে বসে আছে। তারাও ওটা দিবে না। তাদের আবদার, যেভাবেই হোক আমাকে এসএসসি পর্যন্ত চান। স্কুলের সুনামের জন্যেই চান। আমাকে দিয়ে ভাল রেজাল্ট করাবেন। বোর্ডে স্ট্যান্ড করিয়ে ফাটিয়ে দেবেন আর কি!

ফাটানো কি এতই সোজা! তাই পড়ে গেলাম দুই স্কুলের ঠেলাঠেলির খেলাখেলিতে। এতে আমাদের জান যায় যায় করছে। অগত্যা ভর্তি ছাড়াই চুপিচুপি ক্লাশ করতে লাগলাম। ক্লাশে ঢুকে সামনের বেঞ্চে সিট থাকলেও বসি না; বসি একেবারে পিছনের বেঞ্চে। যেন স্যারদের চোখে সহজে না পড়ি। সাবধানে থাকি; এদিক ওদিক তাকাই। বসি আবার দরজার পাশে; ধরা পড়লেই যেন দৌঁড়ে পালাতে পারি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। একদিন ধরা পড়ে গেলাম। ইংরেজীর প্রচন্ড রাগী শিক্ষক পোদ্দার স্যারের হাতে পড়লাম।

ধরা পড়ার মূল কারন ইংরেজী গ্রামারের ‘ভয়েস চেঞ্জ’। ফার্স্টবয় সহ ক্লাশশুদ্ধ সবারই ভুলের ছড়াছড়ি। আমার একটিও ভুল না পাওয়াতেই ধরাটা খেলাম। খাতা পুরোটা শেষ করে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে আমাকে দেখে স্যারের চক্ষু চড়ক গাছ। “এই ছেলে! কে তুমি? নতুন নতুন লাগে!” স্যারের কঠিন প্রশ্ন। “রোল কত, বাড়ী কই?” আমি তো চুপ। মহা চুপচাপে মাথা নীচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে নখ খোটার চেষ্টা করছি। ইজ্জত শেষ। ধরা আজকে পড়েই গেলাম। এখন ঘাড়ে ধরে জাস্ট বের করে দেয়াটাই বাকী।

নাহ! তা হলো না। ঘাড়ে ধরলেন না! উল্টো আমার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব শোনার পর এবার স্যারই চুপ হয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপ হয়ে চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবলেন। তারপর ক্লাশ ওখানেই শেষ করে আমাকে হেড স্যারের কাছে নিয়ে গেলেন। হেডস্যারের রুমে অংক, বিজ্ঞানের স্যারদেরও ডাকা হলো। কিছু প্রশ্নও করলেন তাঁরা। চমৎকার ভাবে উত্রে গেলাম দেখে উপস্থিত সবাই খুশী। সবার সিদ্ধান্ত একটাই; ধলা হাই স্কুল টিসি দেক বা না দেক, কোন বিষয় না। টিসি লাগবে না। তৎক্ষনাৎই বিনা পয়সায় আমায় ভর্তি করে নিলেন।

মহা আনন্দে আমার দিন শুরু হলো। নতুন এলাকায় নতুন দিন। স্কুলের ঝামেলা শেষ। লজ্জা পাওয়ার দিনও শেষ। আমকাঁঠালের মৌসুম। মনের সুখে খাইদাই, স্কুলে যাই; আর সুযোগ পেলে এবাড়ী ওবাড়ীর আমজাম চুরি করি। ওসব সহজ চুরি। কঠিন হলো কাঁঠাল চুরি। গাছপাকা কাঁঠাল চুরির নেশায় বাগানময় ঘুরে বেড়াই। এলাকা জুড়ে বিশাল বিশাল আনারস বাগান। ফাঁকে ফাঁকের বেশীরভাগ বাড়ীই হিন্দুবাড়ী। পাড়ার মাসীরা দেখলে ডেকে কাঁঠাল খেতে দেন। ওতে মন ভরে না। মন পড়ে থাকে গাছে থাকা আঁধাপাকা ঢেবঢেবা কাঁঠালের দিকে। 

ঢেবঢেবা এই দুরন্তপনা নিয়েই কৈশোর মাতাচ্ছি। পাখি শিকারের জন্যে গুলাইল বানিয়ে নিয়েছি। এটা দিয়ে কেবল পাখিমারা নয়; পাখির বাসাও ভাঙতাম। আর এরমাথা ওরমাথা তো ভাঙার জন্যে ছিলই। পাখির বাসা ভেঙে ছানা নিজের বাসায় নিয়ে আসতাম। বিশেষ করে শালিকছানা খুব আনতাম। বাদ যেত না চড়–ই ছানাও। ভারী সুন্দর চড়ুইছানা। এছাড়া বিলের পানিতে নেমে জালি টেনে টেনে মাছ ধরতাম। বোরো ক্ষেতের বিল। পরিস্কার টলটলে পানিতে থৈথৈ করতো। পানিতে নেমে হাতিয়ে মাছ ধরা, বড়শি ফেলে মাছ ধরা; কোনটাই বাদ থাকতো না। তালগাছের কোন্দা নিয়ে মাঝবিলে যেয়ে বড়শি ফেলে বসে থাকতাম। বিলপাড়ে সারিবদ্ধভাবে ছোটছোট বড়শি ফেলে রাখতাম রাতে মাছ বিঁধবে আশায়। রাতে টর্চলাইটের আলোতে বিলপারের পানিতে মাছ খুঁজতাম; টেডা দিয়ে মাছ মারবো বলে।

তবে বেশীদিন পারিনি। বেশীদিন এসব সুখ সয়নি আমার কপালে। কপাল পুড়লো ক্লাশ ফাইভে পাওয়া বৃত্তির টাকার জন্যে। বৃত্তি পেতাম তিনবছর। ক্লাশ   সিকস্ টু এইট। ক্লাশ এইটের টাকা উঠানোর জন্যে আব্বা গেলেন ধলা স্কুলে। ফল হলো উল্টো। টাকা তো দিলেনই না, উল্টো আব্বাকে হাত ধরে স্যারেরা কঠিন আবদার করতে লাগলেন। স্যারদের একটাই কথা; টাকাও দেবো না, সার্টিফিকেটও না। সকল শিক্ষকদের আকুল আবদার আমাকে ধলা হাইস্কুলেই এসএসসি পর্যন্ত পড়তে হবে। আমাকে দিয়ে ফাটাফাটি রেজাল্ট করাবেন।

ফাটাফাটি কি এতই সোজা! ফাটাতে চাইলেই কি ফাটানো যায়! রেজাল্ট তো আর পাতলা বেলুন নয় যে, মোটামুটি একটু ফুলিয়ে ফুট্টুস করে ফাটিয়ে দিলাম। রেজাল্টে ফাটাতে হলে পড়াশুনার টেবিলে কাটাতে হয়। এসব তো মেলা কঠিন কাজ। বারবারই যেমনি পড়াশুনায় ভাল ছিলাম, তেমনি ফাঁকি দিতেও ওস্তাদ ছিলাম। ফাঁকি ঠিক পড়াশুনাকে দেইনি; দিয়েছি সময়কে। সময় পেলেই খেলাধূলা কিংবা দুষ্টামিতে মেতে উঠতাম। সেই আমাকে দিয়ে স্যারদের আশা শুনলেও আব্বা আশা দেখেননি। স্যারদের দাবীটাও বুঝতে চাননি।

আবার স্যারেরাও আব্বার এসব ভাবনা বুঝতে চাননি, মানতে পারেননি। এসব কিছু স্যারদের মাথায়ই ঢোকে না। বড়ই অবুঝ তাঁরা। গো ধরেছেন; ছাড়বেনই না। আবদার তাদের রাখতেই হবে। ধলা হাইস্কুলে সদ্য জয়েন করা দুজন শিক্ষক ছাড়া এক এক করে সব স্যারেরাই আসছেন। আব্বাকে বোঝাচ্ছেন। আসছেন মোজাম্মেল স্যার, জব্বার স্যার, আবদুল হাই স্যার, বজলুল হক মাওলানা স্যার। কেউই বাকি ছিলেন না । আব্দুর রহমান স্যার আর আলম স্যারের কথা নাই বা বললাম। বাদ যাননি কার্তিক স্যারও। তবে সদ্য জয়েন করা ঐ দুজনার ব্যাপার ভিন্ন। তাঁরা বরাবরই ভিন্ন। তাঁরা দূর থেকে মাঝে মাঝে আব্বাকে তাকিয়ে দেখছেন। কিন্তু সামনে আসেননি। অবশ্য আসার মত সাহসত্ত তাদের ছিল না; মুখ তো ছিলই না।

শেষতক আব্বা মুখ রাখলেন। স্যারদের কথা ফেলতে পারলেন না। এতোজনার এত অনুরোধ শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারলেন না। সব স্যারদের অনুরোধ মোটামুটি হালকা পাতলা করে ফেলতে পারলেও কিছুতেই প্রধান শিক্ষক তৈয়্যব স্যারকে পারলেন না। স্যারও কঠিন মানুষ। কিছু একটা ধরলে আর ছাড়েন না। সেদিনও কোনভাবেই ছাড়াছাড়ির নাম নেই। আব্বার হাত চেপে ধরেছেন তো ধরেছেন; ছাড়েনই না। কথা আব্বাকে দিতেই হবে। কঠিন কথা। বেলা গড়িয়ে আসছে; অথচ ছাড়ার নাম নেই।

কী আর করা! অবশেষে অগত্যা অসহায় বাবা আমার হাত ছাড়তে পারলেন। আমাকে তিনদিনের মাঝেই ধলায় পৌঁছে দেবার কথা দিয়েই হাত ছাড়ালেন। ফিরে আসলেন পূবাইল। এসেই মায়ের হাতে পড়লেন। মায়ের হাত নয়, যেন মহা বিপদে পড়লেন। পড়বেনই তো! মায়ের কোল খালি করবেন আর বিপদে পড়বেন না, তা তো হয় না! আমি হলাম মায়ের গর্ভঝারা কনিষ্ঠ মানিক। চাট্টিখানি কথা! অথচ সেই আমাকে আর আমার গর্ভধারিনী মাকে কষ্ট দেবার পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত করেই তিনি ফিরেছেন।

ফেরার আগে ধলা বাজারের প্রাইমারী স্কুলের ঠিক পশ্চিম পাশের টিনশেডের বাসাটা ভাড়া করে রেখে এসেছেন। যেখানে শুরু হবে আমার একাকী জীবন। বাবা-মা ভাইদের ফেলে আজকের আমার শোনিমের বয়সী ছোট্ট একটি ১৩ বছরের বালকের একেলা একাকী জীবন। বড় কঠিন জীবন। বড়ই কঠিন! নিত্যদিনের বাজারঘাট, খাওয়াদাওয়া এবং পড়াশুনা সবই নিজের করতে হবে। একাকী করতে হবে। দেখার কেউ নেই, খেয়াল করার কেউ নেই। কারো আদর পাওয়া দূরের কথা, বাঁদর হলেও শাসন করারও কেউ নেই। যে বয়সে মায়ের কোলে থেকে ভাবনাহীন দুরন্তপনা দিয়ে কেটে যাবার কথা সারা দিনমান, ঠিক সেই বয়সে দুঃসাহসিক এক একাকী জীবনের যাত্রা শুরু আমার!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com