হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪১ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-10-24 17:29:19 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪১ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ কিন্তু বাগড়া দিলেন আমার মা। চিৎকার দিয়ে ফেটে পড়লেন। যেনতেন চিৎকার নয়; গগনবিদারী চিৎকার। আম্মার চিৎকার দেবার ধরণ ছিল বড় বাড়ীর বড় মেয়ের মতন। কাউকেই কেয়ার করতেন না। আশেপাশের কয়েক বাড়ীর মানুষও টের পেত তাঁর চিৎকার; আর অগ্নিমূর্তি। কিচ্ছুতেই তিনি কোলের ছেলেকে কোথাও একা দেবেন না; একা ছাড়বেন না কোন একাকী জীবনে। আমি তাঁর পাঁচ সন্তানের সর্বকনিষ্ঠ। কনিষ্ঠ ছেলেকে তো কোলের ছেলেই বলে। এই কোলের ছেলেকে কোল ছাড়া না করবার ব্যাপারে মা আমার ইষ্পাত কঠিন অবস্থান নিয়েছেন। বাসায় মোটামুটি আইয়ুব খানের মার্শাল জারি করে ফেলেছেন।

কোর্টমার্শালের একমাত্র আসামী আমার সহজ সরল আব্বা। তাঁর অবস্থা বড়ই বেগতিক এবং করুণ। ভিটামাটি হারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতই করুণ। নিজের ঘরেও পরবাসীর মত লাগছে। সামান্য মূল্য নেই, নুন্যতম যতœআত্মিক নেই। খুবই অসহায়মাখা মুখে এখানে সেখানে বসে থাকেন, শুয়ে থাকেন, কখনো বা বারান্দায়; কখনো বা ঘরে। ক্ষুধা পেটেও কাউকে বলতে পারেন না, ক্ষুধা লেগেছে। নিজের ভাত নিজে বেড়ে খান। দেবারও কেউ নেই, দেখারও কেউ নেই। কেবল আছে আম্মার বকুনি। এক পাক্ষিক বকুনি। এটা আম্মার টাইপ। একবার শুরু করলে টানা তিনদিন চালান। একা একাই চালান। 

এসবে আব্বা আগে থেকেই অভ্যস্ত ছিলেন বলে তেমন সমস্যা হচ্ছিল না। এককানে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিচ্ছিলেন। তবে সময় মত লাল গুড়ের গরম চা না পাওয়াতে বেজায় কষ্ট হচ্ছিল। অসহায় লাগছিল। আর আব্বার অসহায়ত্বটা চোখেও পড়ছিল। তবে মুখে হাসিহাসি ভাব ধরে রাখার চেষ্টার কোন কমতি ছিলনা। বেশী হাসতেন আমাকে দেখলেই। দেখলেই চুপিচুপি কাছে টেনে নিতেন; হেসে হেসে সাহস দিতেন। আম্মার সামনে ভুলেও সেটা করতেন না; কচন খাবার ভয়তেই করতেন না। তখন অভিনয় করতেন। মুখ ভার করে গোমরামুখী অভিনয় করতেন।

অভিনয় নয়, আমি সত্যি সত্যি ছটছফটানি শুরু করেছি। মনটাও কেমন যেন করছে। আধা খারাপ, আধা ভাল। যখন ভাবি, স্বল্প সময়ে তৈরী হওয়া স্কুল এবং গ্রামের স্বল্প সংখ্যক বন্ধুদের ছেড়ে চলে যেতে  হবে, তখন মনটা খারাপ হয়। পাখির বাসায় থাকা পাখির ছানার কথা মনে হয়। আবার যখন ভাবি, ধলায় ফিরে গেলে ফেলে আসা সব বন্ধুদের একসাথে ফিরে পাবো, তখন মনটা খুশীতে ভরে ওঠে। খিলখিলিয়ে হাসতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে উপায়ও নেই। হাতে যে সময় খুবই কম। গোছগাছ করতে হবে। সবার আগে গোছাতে হবে খাতাকলম, বইপত্র। আর কাপড়চোপড় তো আছেই। তবে ব্যাগ নেই। সারাবাড়ী খুঁজে যে ব্যাগ পাওয়া গেল তা কোথাও নিয়ে যাবার মত নয়। শেষমেষ প্লাষ্টিকের ঝুড়িই হলো ভরসা।

বাজার থেকে আব্বা আমার জন্যে ছোট লুংগী কিনে এনেছেন। এনেছেন ছোট গামছাও। জীবনে এই প্রথম নিজের ব্যক্তিগত গামছাও হলো। ব্যক্তিগত জিনিসের কদরই আলাদা। নাকের কাছে বারবার নিয়ে ঘ্রাণ শুকছি। কী দারুন ঘ্রাণ সেই গামছার! শুধু গামছাই নয়, ছোটখাট দুটো পাতিলও আনা হয়েছে। বড় সুন্দর এ্যালুমিনিয়ামের পাতিল। একটা ভাতের আর একটা তরকারীর। ছোটখাট সংসারের ছোটখাট আয়োজন। সব আব্বাই করছেন। তবে আম্মার ভয়তে গোপনে গোপনে করছেন। আড়চোখে আম্মা সবই দেখছেন; কিন্তু বুঝতে দিচ্ছেন না যে তিনি দেখছেন।

আমিও দেখছি। মানুষ দুজনাকে না পেয়ে উঁকি দিয়ে দেখছি। এঘর ওঘর দেখছি। ঘরে এবং বারান্দায় দেখছি। কিন্তু বাবা-মা কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না। পরদির সকালের ট্রেন। তাই একটু আগেভাগে বিছানায় যেতে হবে। তাদেরকে একসাথে নিয়ে বিছানায় যাবো। কিন্তু তারাই নেই। অগত্যা খুঁজতে বাইরের উঠোন কোণে গেলাম। দক্ষিণা হাওয়ায় আব্বা সাধারণত এখানেই পাটি পেতে প্রতিরাতে একাএকা গভীর রাত অবধি শুয়ে থাকেন। হয়ত আজো আছেন এই আশাতেই গেলাম। অন্ধকারের মিটিমিটি আলো হাতরিয়েই গেলাম।

অবিশ্বাস্য দৃশ্য। লম্বা হয়ে শুয়ে বালিশে মুখ রেখে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন বাবা আমার! আর শিয়রে বসে আম্মা তাঁকে শান্তনা দিচ্ছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। অবিশ্বাস্য তো বটেই। কষ্টে আব্বা খুবই কাতর হয়ে গেছেন। গলা থেকে শব্দটুকু পর্যন্ত বের হচ্ছে না তেমন। কী বলছেন দূর থেকে স্পষ্ট বুঝতেও পারছি না। কিন্তু আম্মা শক্ত। সারাদিনের দেখা মায়ের সাথে আঁধারে দেখা এই মায়ের কোন মিল নেই। মাথায় হাত বুলিয়ে আব্বাকে বুঝাচ্ছেন। খুবই শান্ত কন্ঠে বলছেন, “কিচ্ছু হবে না আপনার শাহীনের। আপনে একটুও ভাববেন না। ও পারবে। ও আমাদের ছেলে না! ও সব পারবে!! খারাপ হয়নি! খুব ছোটবেলায় ওর বড় একটা ট্রেনিং হয়ে যাবে!! কঠিন এই জীবনের বড় কঠিন ট্রেনিং!”

আমি আর এগুইনি; একটুও এগুতে পারিনি। অন্য সময় হলে দুজনার মাঝে গিয়ে দুজনার শরীরে দু’পা দিয়ে শুয়ে পড়তাম। আজ পারলাম না। প্রকৃতি আমাকে পারতে দেয়নি। নিকষকালো অন্ধকারের আলোতে কখন যে আমি হঠাৎ করে বড় হয়ে গেছি বুঝিনি। তাই ফিরে এসেছি। চুপিচুপি পা ফেলে ঘরে এসে একাএকাই বিছানায় শুয়ে পড়েছি। নীরব ঘরে আর কেউ নেই। সামনে ঘরের দক্ষিণা খোলা দরজা। আর উপরে সাদা টিনের চালা। আমি কী যেন ভাবতে চাচ্ছি। বৈষয়িক কোন কিছু ভাবার বয়স না হলেও আনমনেই কী যেন ভাবার চেষ্টা করছি।

সকাল সকাল ট্রেন। খুব ভোরের ট্রেন। তাই খুব ভোরেই উঠতে হবে। অথচ ঘুম আসছে না। এপিঠওপিঠ করছি। জোর করে চোখ বন্ধ করে ঘুমুবার চেষ্টা করছি। সব চেষ্টা বৃথা। কিছুক্ষণ পর আম্মা এলেন। মা আমার! কোন কথা না বলে চুপচাপ সোজা বিছানায় চলে এলেন। মায়ের এখনকার আচরণ একেবারেই ভিন্ন রকমের।  বিছানায় এসেই আম্মা নীরবতা ভাঙলেন। আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলেন। প্রথমে নিঃশব্দে, পরে জোরে। কখন যে দরজা মেলে আব্বা এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাইনি। কিন্তু এবার তিনি শান্ত। একেবারেই  উল্টো। বিছানায় মায়ের শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

ভোরের আলো ফোটবার আগেই রওনা দিয়েছি আব্বার সাথে। আব্বা আমায় রেখে আসবেন ধলা হাইস্কুলে। প্লাষ্টিকের ঝুড়ি হাতে আগে আগে হাঁটছেন। আমি পিছে পিছে। সাথে আম্মাও আছেন। আমাকে বিদায় দিতে মা জোর করে বেরিয়েছেন। রাতের কাপড়েই বেরিয়েছেন। আব্বা যতই না বলছেন মাকে, মা ততই এগুচ্ছেন। আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগুচ্ছেন, বেসামালভাবে হাঁটছেন; আর আঁচলে চোখ মুছছেন। পাশাপাশি থেমে থেমে একটু পরপর জড়িয়ে ধরছেন আমায়। জড়িয়ে ধরেই চুমু। চোখেমুখে সব জায়গায় চুমু। কান্নাভেজা চোখেমুখে আমাকে ভিজেয়ে কঠিন আদরে গভীরভাবে দিয়ে যাচ্ছেন ভালবাসায় সিক্ত চুমু!

সদর রাস্তায় এসে পড়েছি। আর আগানো ঠিক হবে না বিধায় চোখেমুখে আবারো এত্তএত্ত চুমু দিয়ে এলোমেলো ভাবে ভাঁজ করা দশ টাকার একটা নোট গুজে দিলেন আমার পকেটে। সেই আমলের দশ টাকা! নিশ্চিত বাজারের টাকা থেকে মা আমার কষ্ট করে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। এবার আমি কাঁদছি, মাও কাঁদছেন। মা-ছেলের বিদায় দৃশ্যে প্রকৃতির আর সব যেন থেমে গেছে। থেমে গেছে গাছগাছালির পাতা নড়ার শব্দ; পাখির কলরব। থেমে গেছে পথেচলা পথিকের পথচলা।

শেষমেষ মায়ের হাত ছাড়িয়ে হাঁটা শুরু করলাম। এবার গগনবিদারী চিৎকার দিলেন না মা আমার। কিন্তু মুখে কাপড় গুজে কেঁদেই চললেন। আমি চোখ মুছে মুছে সামনে এগোচ্ছি আর পিছনে ফিরছি। ততদূর পেছনে ফিরছি; যতদূর পেছনে চোখ যায়, বারে বারে ফিরছি আর মাকে দেখছি। মায়ের ভেজা চোখের মলিন মুখখানা দেখছি। গর্ভধারিণী মা আমার দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলেন। মনে হয় গাজীপুরের পূবাইল পোষ্ট অফিসের সামনের ঐ রাস্তায় মা আমার আজো আমারই জন্যে দাঁড়িয়ে আছেন! এখনো দাঁড়িয়ে আছেন!! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন!!! কেবল আমার জন্যেই কাঁদছেন!!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com