হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪২ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-11-07 17:47:51 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪২ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ ধলা বাজার সরকারী প্রাইমারী স্কুলের পশ্চিম পাশের সিকদার সাহেবের বাসা। নতুন টিনের চৌচালা বড় ঘর। অর্ধেকটায় মহসিনরা থাকে। বেশীদিন হয়নি ওর আব্বা মারা গেছেন এই ঘরেই। চোখের সামনে দেখেছি মানুষটির মৃত্যুর কষ্ট। ক্যান্সারে মৃত্যু। গলায় সামান্য ফোঁড়া থেকে ক্যান্সার। পতিব্রতা খালাম্মা অহর্নিশি রোজামুখে সেবা করে গেছেন স্বামীর। দিন নেই, রাত নেই; কোলের মধ্যে খালুর মাথা রেখে ফোঁড়ার ক্ষত স্থান পরিস্কার করতেন। দু’চোখ ভর্তি জল নিয়ে দিনভর করতেন!

সিকদার সাহেবের ঘরের বাকী অর্ধেকটা বছর চুক্তিতে ভাড়া নিয়ে আমাকে রেখে ঢাকায় ফিরলেন আব্বা। শুরু হলো সিলিংবিহীন টিনের ঘরে আমার একদম একাকী জীবন। বিদ্যুৎ থাকলেও ফ্যান নেই; গরমে টেকা দায়। মাটির কাঁচা মেঝের ঘরে কিচ্ছু নেই; একটি খাট ছাড়া। খাটে কোন বিছানাও নেই। তবে আদেশ আছে। সিকদার সাহেবের কড়া আদেশ। ক্যাটকেটা মানুষের ক্যাটকেটা টাইপের নির্মম আদেশ; “ঘরভাড়া দিছি, কিন্তু খাট ভাড়া দেই নাই। কোনভাবেই খাটে হুতুন যাইতো না। এমনকি বউনও না”।

আদেশ দিলে কী হবে! শোয়াবসা না করার এই কঠিন আদেশটা সপ্তাহের পাঁচদিনই মানতাম না। তিনি টঙ্গীতে থাকতেন বলে না মেনেও পারতাম। তবে সপ্তাহান্তে আসতেন। তাই সাপ্তাহিক ছুটির রাতে সতর্ক থাকতাম। হঠাৎ ঢাকা থেকে এসে পড়লেই বিপদ। সেদিন আল্লাহকে ডাকতাম; যেন না আসে। এই জন্যে মুখস্ত থাকা সব দোয়াও পড়তাম। একদিন দোয়াটোয়া পড়ে বিছানা বিছিয়ে শুয়েছি কেবল। সাথে মহসিনও ছিল। গভীর ঘুমে যেতে পারিনি আমরা, অমনি দরজায় ডাক।

হুরমুর করে লাফিয়ে উঠেই চোখ ডলা শুরু করেছি। মহসিনসহ দু’জনেই বিছানায় বসে হাত দিয়ে দু’চোখ ডলছি। বিছানা থেকে নামার আগেই ধরমর করে গৃহে প্রবেশ করলেন সিকদার সাহেব। ঘুমের আগে দোয়ার ব্যস্ততা এবং অতি সতর্কতায় দরজার সিটকানী লাগাতেই ভুলে গিয়েছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম ১০০ পাওয়ারের বৈদ্যুতিক বাতি নেভাতেও। মহাবিপদ হয়ে গেলো আজ। হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলাম। চোর ধরা পড়লে যেমন হয়, আমাদের দু’জনের অবস্থাটাও অনেকটা তেমনই হলো।

সখের খাটে দু’জনকে শোয়া দেখে সিকদার সাহেবের কঠিন অগ্নিমূর্তি। ভীষন রেগে গেলেন আজকে। রাগলে তিনি পুরোপুরি শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে পারতেন না। আঞ্চলিক আর শুদ্ধ ভাষা গুলিয়ে ফেলতেন। আজও তাই করলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভীষন গরম করা চোখে কষে একখানা ধমক দিয়ে টেনে মাটির মেঝেতে বসিয়ে দিলেন আমাদেরকে। এরপর শুরু করলেন বকা। কঠিন বকা; “জমিদারের ছাও কোথাকার! অসভ্য ছেলেপুলা! পুংটা! পুংটা পোলাপাইন। দেখছোনি করছেডা কি! অহনও নাক দিয়া হিংগাইল পড়ে। কত্ত বড় সাহস! আমার খাটে হুইত্তা ঘুমায়!!!”

সাহস আমার বরাবরই ছিল। নাহলে ঐ বয়সে কেউ এতটা সাহস করে একাকী জীবনে ফাইট দেয়! অবশ্য আমি দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তাই সমস্যাকে কখনো সমস্যাই মনে করতাম না। একাকী জীবনে এক রান্নাবান্না ছাড়া আর কোন কিছুকেই পাত্তা দিতাম না। রান্নার জন্যে বুয়া টাইপের খালা ঠিক করা ছিল। তিনি এসে যা পেতেন তাই রান্না করে যেতেন। বাজার করা থাকলে রাঁধতেন; না করা থাকলে পাতিল উল্টো করে রেখে যেতেন।

টিফিন পিরিয়ডে বাসায় ফিরে উল্টো পাতিলই বেশী পেতাম। কখনো বা শুধু ভাত পেয়েছি। কখনো ভাতও পাইনি; কেবল তরকারী পেয়েছি। তবে বেশী পেতাম পাতলা ডাল। ভাত না পেলেও ডাল পেতামই। পেটপুরে শুধু ডাল খেয়ে অনেক বেলা পার করেছি। আবার শুকনো ভাতে পানি ঢেলে শুধু লবন মেখেও কম খাইনি। বাজারে বাস করেও বাজার না করার কারণেই এমন হতো। আলসেমোর কারণে যেমনি, তেমনি পয়সার কমতির কারণেও মাঝেমধ্যে বাজার না করেই থাকতাম।

বিষয়টি মহসিনের আম্মার চোখ এড়াতো না। কাছে ডেকে নিয়ে খালাম্মা আমাকে কিছু না কিছু খেতে দিতেন। নিজে কম খেয়ে হলেও দিতেন। তিনি বুঝতেন আমার কষ্টের অনুভূতি। কিন্তু যে স্কুল আমাকে এত সখ করে গাজীপুর থেকে জোর করে ফিরিয়ে আনলো, সেই ধলা স্কুল কোন ব্যবস্থাই নিল না। এমনকি জানতেও চাইলো না আমি কেমন আছি। স্কুলে এত শিক্ষক! এলাকায় এত্ত মানুষ, কেউ জানতে চাইলো না!!!

আমি নিজে থেকেও কাউকে বলিনি। বলার মত বিষয় হলে বলা যায়। এটাতো লজ্জার বিষয়। বলি কিভাবে! আমার স্বভাবেও এটা নেই। তাই বলিনি কাউকে। মাঝেমধ্যে না খেয়ে থাকতাম বটে, তবে পড়াশুনাটুকু না করে থাকতাম না। বেশী ক্ষুধা পেলে মিষ্টির দোকানে যেয়ে শুকনো চিড়া ভিজিয়ে রসগোল্লার রসে মাখিয়ে খেতাম। জীতেন্দ্র দা শুধু চিড়ার দাম নিতেন। রসের দাম নিতেন না। ভাতের দোকান ছিল না বাজারে। তাই চিড়াভেজা দিয়েই চালাতাম। একবেলা খেলে দু’বেলা না খেয়ে চালাতে পারতাম।      

এতে কষ্ট হতো। ক্ষুধার কষ্টের চেয়ে বড় কষ্ট আর কী আছে জীবনে! কিন্তু প্রকাশ করিনি। তবে একাএকা কান্না যে করিনি তা নয়। কান্না করেছি আড়ালে আবডালে; নীরবে নিভৃতে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বসে; একা একা। খুব করে মায়ের কথা মনে করে কান্না করেছি। সোনামায়ের মুখকে মনে পড়তো খুব বেশী। মাকে মনে পড়লেই চিঠি লিখতাম। অনেক বড় করে লিখতাম। মনের সব কথা লিখতাম। কিন্তু কষ্টের কথা কখনো লিখিনি। ভুলেও লিখিনি। লিখলে মা কষ্ট পাবেন এই জন্যেই লিখিনি।

চিঠি মা নিজেও লিখতেন। নিয়মিতই লিখতেন। এবং লেখার ধরনই ছিল মনকাড়া। আমি মাসভর আশায় আশায় অপেক্ষায় থাকতাম। ডাক পিয়নের সামনে পড়লেই গায়ে কাঁটা দিত। এই বুঝি মায়ের চিঠি পাবো! সেই ব্রিটিশ আমলের ক্লাশ সেভেন পাশ মা আমার কাটা কাটা অক্ষরে লিখতেন, “আমার লক্ষ্মী সোনা কুট্টি বাবা আমার! তুমি চলিয়া যাইবার দিন হইতে আমার আর কিছুই ভাল লাগে না। কোন  কিছুই খাইতে পারি না। আমার কোলের মানিক পক্ষী! তুমি নাই, সারারাত আমার কোল খালি থাকে; ঘুম আসে না। আমার কলিজায় কিচ্ছু নাই। আমি আর সহ্য করিতে পারিনা। রোজ বিকালের ট্রেনটা যাইবার সময় আমি পথের দিকে তাকাইয়া থাকি। তুমি আসিবা এই ভাবিয়াই তাকাইয়া থাকি। তোমার কথা মনে আসিলেই চোখ ঝাপসা হইয়া উঠে। কেন উঠে জানি না! তবে ওঠে! আমার জান, আমার মানিক! তুমি কবে আসিবা?”

লক্ষ্মী মা আমার! প্রতিটা দিন আজো মনে পড়ে মাকে! আজ তিনি আর আমার অপেক্ষায় থাকেন না! চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন দেশের বাড়ীর কবরে। বাবার পাশে। আমাদের গ্রামের বাড়ীতে ঢুকতেই বহু পূরনো মসজিদ। এর ঠিক পশ্চিম পাশেই ছোট্ট একটি পুকুর। তারপরই পারিবারিক কবরস্থান। কবরস্থানের গেটের শুরুতেই দাদা-দাদুর পায়ের কাছেই মা বাবার পাশাপাশি কবর।

গেল ঈদের দিন বিকেলে মসজিদে মাগরিবের জামাত শেষে আফছা অন্ধকারে কবর ধারে দাঁড়িয়েছি কেবল। আমার শোনিমকে সাথে নিয়ে দাঁড়িয়েছি। পাকা কবরে ঘাস জমে গেছে। জন্মেছে আগাছাও। বিড়বিড় করে সালাম দিতেই মনে হলো তাঁরা দু’জনায় আমাদের দেখে নড়েচড়ে বসেছেন। যেন খুশীতে দু’জন দু’জনার মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করছেন। তাঁদের ঠোঁটের কোণায় অবিকল সেই হাসি। চাঁদের চেয়েও সুন্দর হাসি।

আমি দোয়া পড়ছি। যতটুকু পারি, সব পড়ছি। চোখ ভিজে পড়ছে জল। সব বার এমনটা হয় না। এবার অনেক বেশী আবেগী আমি। ডুকরে কাঁদছি। আর বারবার “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি ছগিরা” বলে পানাহ চাইছি। মন আমার বড় অশান্ত। কবরের প্রাচীর আর মাটি একটু ধরলেই এ মন অশান্ত হয়! বড়ই শিশুর মত মন। এ মন বাবামাকে ছুঁতে চায়, ধরতে চায়! একটু ছুঁতে, একটু ধরতে না পারলে মন যে ঠান্ডা হয় না!

এরপর ফিরে আসা! বারবার পেছন ফেরে ফেরে ফিরে আসা। দু’কদম এগিয়ে দাঁড়িয়ে পরা; আবার সামনে হাঁটা। মনে হচ্ছিল তাঁরা দু’জনা মন খুব খারাপ করে বসে বসে আমার ফিরে যাওয়া দেখছেন। কবর থেকে মাথা বের করে দেখছেন! অথচ কী পাষান আমি! তাঁদেরকে ফেলে অবলীলায় চলে যাচ্ছি। কিন্তু তাঁরা কি পারতেন? যদি  বেঁচে থাকতেন, আমাকে এভাবে একলা কবরে ফেলে বাড়ী ফিরতে পারতেন? মনে হয় পারতেন না! পৃথিবীতে কোন বাবা-মাই পারেন না! সন্তানের মৃত্যুশোক কোন বাবা-মাই সইতে পারেন না!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com