জনতার দাবী এবং ক্ষমতার চাবি

প্রকাশের সময় : 2018-11-21 13:34:09 | প্রকাশক : Admin
�জনতার দাবী এবং ক্ষমতার চাবি

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ মন্ত্রী পরিষদের নেয়া সিদ্ধান্তের আলোকে কোটা বাতিলের খবরটা পেয়েছিলাম বাসায় ফেরার পথেই। খুব খুশীই হয়েছিলাম। এই আশায় যে, অন্তত একটি অস্থির এবং গোমট অবস্থার অবসান হলো। গেল ক’মাসে পরপর দু’দুটো ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বাতাস বিহীন কড়া রৌদ্রের মাঝে বিনা নোটিশে হঠাৎ করে কঠিন ঝড় শুরু হলে যেমন লাগে, কোটা সংস্কার আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ঘনঘটায় ঠিক তেমনটি লেগেছিল। শান্ত রাজনীতি হঠাৎ করে অশান্ত হওয়াতে তেমনটি লাগারই কথা।

অশান্ত মনে নয়; শান্ত মনেই আমার শোনিমকে নিয়ে গাড়ীতে বসে আছি। জমজম টাওয়ারের সামনেই বসে আছি। উত্তরার জমজম টাওয়ারটা অনেকেরই চেনাজানা। বিশেষ করে ঢাকার উত্তরা এবং আশেপাশের এলাকাবাসীর কাছে। টাওয়ারটা আমার বাসারও খুব কাছাকাছি এবং দৃষ্টিনন্দন এর অবয়ব। সদা সর্বদা আসতে যেতে এর পাশ দিয়েই যেতে হয়। আর সমস্যাটি এখানেই। টাওয়ারটির প্রায় অর্ধেকাংশ জুড়েই শপিংমল হওয়াতে এর চারপাশে সারাক্ষণই ভীড় লেগে থাকে।

আর ভীড় মানেই ট্রাফিক জ্যাম। মিনিট পনের অপেক্ষার পর জ্যাম থেকে ছাড়া পাই বটে। কিন্তু এর পরেও এগুতে সমস্যা হচ্ছিল। সামনে কোন গাড়ী নেই। সব গাড়ী আমাদের গাড়ীর পেছনে। অথচ এগুতে পারছি না। রাস্তার ঠিক মাঝ বরাবর পিঠে ব্যাগ ঝুলানো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কেউ একজন হেঁটে যাচ্ছিল আমাদের সামনে সামনে। ডানেবামে কিংবা সামনেপিছনে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। আনমনে মাথা নীচু করেই হেঁটে যাচ্ছে। যেন রাস্তা নয়, জনমানবহীন কোন মাঠের খোলা প্রান্তরে দিকবিদিকশূণ্য কেউ একজন হাঁটছে। আনমনেই হাঁটছে।

হাঁটার ধরণটা বিরক্তিকর ছিল। এরপরও হর্ণ না বাজিয়ে কোনভাবে আস্তে আস্তে তাকে ক্রস করে পাশাপাশি হলাম এবং জানালা খুলে খুবই বিনয়ের সাথে বললাম, নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করে সব দাবী আদায় করে তুমি নিরাপদে এবং নিশ্চিন্তে সড়ক ব্যবহার করলেও আমরা কিন্তু কেউই নিরাপদ নই; নিশ্চিন্তও নই। তোমার চিন্তায় আমরা পেছনের সব মানুষ মহাচিন্তিত এবং তোমার স্বেচ্ছাচারী উদাসীনতায় আমাদের চলাফেরাও বেশ বিঘ্নিত। ভাবতে অবাক লাগে, এই তোমরাই ক’দিন আগে সারাদেশ কাঁপিয়ে দিয়ে কী আন্দোলনটাই না করলে!

ছেলেটা আমার কথা শুনে প্রথমে ভ্যাবাচেকা খেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। ভাবলাম নিজের ভুলের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করবে। অনুতাপ তো প্রকাশেরই কথা। আফটার অল সদা মহাব্যস্ত মহাসড়ক। তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং আমার ভাবনাটা ভুল প্রমাণ  হলো ওর রাগত মন্তব্যে। রাস্তাটা   কি আপনার বাপের? গাড়ী নিয়া ফুডানি কইরা শুধু আপনারাই চলবেন? আমরা চলবো না! ওর তীর্যক প্রশ্ন। আমি আর দেরী করিনি। জানালার গ্লাসটা লাগাতে লাগাতে চলে এসেছি! চলে না এসে আর কীইবা করতে পারতাম। চাইলেই কি ওর মুখের উপর একগাদা থুথু দিতে পারতাম?

কোনভাবেই পারতাম না। এটা আমার দ্বারা সম্ভব না। হয়ত ওর দ্বারা সম্ভব। অধিকাংশ শিক্ষার্থী না হলেও, আন্দোলনের নামে টানা দশদিন ওর মত অনেকেই রাস্তায় থুথু দিয়েছে। সরকারের কোন কোন বিশেষ ব্যক্তিদের ছবি টানিয়ে সেসবের মুখে নেচে নেচে থুথু দিয়েছে। আনন্দ করতে করতে দিয়েছে। আজ এই ছেলেটির আচরণে মনে হয়েছে, ওসব ছিল শুধুই আন্দোলনের নামে থুথু ছিটানোর মহা উৎসব। ইস্যু একটা পেলেই এমনি উৎসবে মেতে ওঠে। মজা করা ছাড়া ওদের মত গুটিকয়েকের আর কোন লক্ষ্য নেই। না সরকার তথা পূরো জাতিকে শেখানোর লক্ষ্য, না নিজে শেখার কোন উদ্দেশ্য!

শুধু ওকে কেন? কোটা সংস্কারকারীদের অনেককে দেখেও বোঝার উপায় নেই ওরা নিজেরা কোটা বিষয়টা আদৌ বোঝে কি না। সরকার কোটা ব্যবস্থাটাই বাতিল করে দেওয়াতে ওরা বেকায়দায় পড়েছে। বলা যায় মহা বেকায়দায়। ওরা আসলে চায়ইনি কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সরকার একটা সমাধানের পথে আসুক। চেয়েছিল বিষয়টি ঝুলে থাকুক যাতে নিশ্চিন্তে এই ইস্যুটিকে পুঁজি করে নির্বাচনের আগে আন্দোলনের নামে মাঠে থাকতে পারে। এখন সরকারের কৌশলী প্যাঁচের কাছে ধরাশায়ী হয়ে প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছে। পরে হারিয়েছে হুঁশ। হুঁশ ফেরার পরে অবস্থা বেগতিক বুঝতে পেরে এখন নিজেরাই প্যাঁচাচ্ছে।

যেমন তেমন প্যাঁচ না; কঠিন প্যাঁচ। বলছে, “কোটা বাতিল চাইনি। চেয়েছিলাম সংস্কার। তাই এটা মানি না”। ভন্ডামিটা বোঝার চেষ্টা করুন। বিষয়টি এমন যে, “দশ টাকা চাইলাম, বিশ টাকা দিলি কেন্? কেইসটা কি? তাই এটা নেব না। আমার দশ টাকাই লাগবে”। বিশ টাকার মাঝেও যেমনি দশ টাকা লুকিয়ে আছে, তেমনি বাতিলের মাঝেও তো সংস্কার লুকিয়ে আছে। এটা বোঝার জন্যে কি   কোটার উপরে দেশের জনগণকে পিএইচডি করতে হবে! দেশের মানুষ কি এতটাই বোকা!

বরং ওরাই বোকা। কৌশলী খেলা খেলে সরকারই ওদেরকে বোকা বানিয়েছে। অনেক চিন্তাভাবনা করে ওরা ইস্যুটি বানিয়েছিল এবং বহু যত্ন করে ইস্যুটি লালিত হচ্ছিল যেন নির্বাচনের আগে আগে কায়দা করে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই মহাঅস্ত্রটি এক ধাক্কায় ভোঁতা করে দেবার কারণে বোকা বনে যাওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না। মিডিয়ার সামনে যাই বলুক, আড়ালে আবডালে হাপিত্যেস করা ছাড়া ওদের এখন আর কিচ্ছু করার নেই। কারণ কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তে সাধারণ শিক্ষার্থীগণ সন্তুষ্ট।

তাহলে ওরা খুশী নয় কেন? ওরা কারা? ওরা আর যাই হোক, সাধারণ শিক্ষার্থী নয়। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বরং মহাখুশী। ওরা অসৎ উদ্দেশ্যে আন্দোলন করেনি। করেছে মন থেকে। পূরো আন্দোলনে ওদের মনের কথা আর মুখের কথা এক ছিল। তাই এখন দাবী পূরণ হওয়াতে প্রকাশ্যে আনন্দ করছে; সরকারকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। মুখ গোমড়া করে ঝিমুচ্ছে না। ঝিমুচ্ছে কেবল তারা, যারা ভিসির বাড়ী পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিয়েছিল। যারা ভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে মাঠে নেমেছিল।  

ভিন্ন এজেন্ডা নিয়ে বিচারপতি সিনহা সাহেবকেও নামানো হয়েছিল। আমেরিকায় বসে তিনিও ঝিমুচ্ছেন এখন। করছেন হাজারো অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগের পাহাড় সেখানে তিনি একেবারেই নিশ্চুপ। নিশ্চুপ তার ব্যাংক একাউন্টে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে। তিনি কি অস্বীকার করতে পারবেন টোকিও বিএনপি নেতার বাসায় ডিনার করার কথা? আর প্রধান বিচারপতি থাকাকালে আসামীর পরিবারের সদস্যদের সাথে    দেখা করার কথা? পারবেন না। কারণ চাপে পড়ে আপিল কোর্ট এজলাশে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন বিষয়টি।

তবে এখনো স্বীকার করেননি বর্তমানে আমেরিকায় কেনা বাড়ীটির অর্থের উৎসের কথা। জিজ্ঞেস করলেই আমতা আমতা করেন। কিন্তু হাসিনার বিরুদ্ধে বলার সময় মুখে নামতা ফোটান। কোন হুঁশ থাকে না। সাংবাদিক পেলেই বলছেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত’। সিনহা সাহেব যদি সত্যিই এত সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হন তাহলে এই ‘প্রহসনের সরকারের’ দ্বারা মনোনীত হয়ে প্রধান বিচারপতি পদে এতকাল রইলেন কেন? সরকার যদি অবৈধ হয় তাহলে তাদের দ্বারা মনোনীত হয়ে প্রধান বিচারপতি পদে থাকাও কি অবৈধ নয়?

যিনি তাকে প্রধানমন্ত্রী বানালেন তার সব ক্ষোভ কেবল তাঁর উপর। সব অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু কেন? সিনহার নৈতিকতা নিয়ে যত অভিযোগ উঠেছে, তার একটাও তো হাসিনার বিরুদ্ধে এখনো উঠেনি। তাহলে হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু বলা অন্যের মুখে শোভা পেলেও সিনহার মুখে কি শোভা পায়? পায় না। কেননা তিনি জীবনে যখনই কোন ভাল সুযোগ পেয়েছেন, ভুলভাবে সেটাকে কাজে লাগিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে হয়েছেন যুদ্ধবিরোধী শান্তি কমিটির সদস্য। আর প্রধান বিচারপতি হয়ে বিচার কাজে মনোনিবেশ না করে লাগালাগি করেছেন।

লাগালাগি করেছেন সরকার প্রধানের সাথে। কিন্তু সরকার প্রধান এসবে দমে যাননি; থেমে থাকেননি। শত প্রতিকুলতার পরেও দেশের উন্নয়নে সময় দিয়েছেন। অথচ এসব উন্নয়ন মেনে নিতে পারছেন না সিনহা সাহেব। মেনে নিতে পারছেনা দেশের কিছু বঞ্চিত গোষ্ঠীও; কিছু চেনামুখ। তারা মুখোশের আড়ালে মিশে গেছে সাধারণ মানুষের কাতারে। মানুষের কিছু ন্যায্য দাবীর উছিলায় পূরণ করতে চাইছে নিজেদের গোপন বাসনা। মানুষকে প্রতিনিয়ত করছে বিভ্রান্ত। আর জাতিকে দিকভ্রান্ত।

কিন্ত বাস্তবতা বড় কঠিন। এভাবে লুকোচুরি করে বাংলার ইতিহাসে দাবী পূরণের একটি নজিরও নেই। বাস্তবতায় এভাবে হয়ও না। বাস্তবতা বলে, দাবী পূরণের জন্যে মুখোশ লাগে না। লাগে সাহস। লাগে জনতার প্রতি ভালবাসা। লাগে ত্যাগ; লাগে জনতার স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া। ব্যক্তিগত কিংবা দলের স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়ে হলেও লাগে। সময়ের বিবর্তনে জনতাই এক সময় জনতার সেই দাবীকে ক্ষমতায় যাবার চাবি বানিয়ে দেয়।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com