হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪২ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-11-21 13:45:36 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (৪২ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমি চেপে থাকলেও ধলায় আমার কষ্টে থাকার বিষয়টি চোখ এড়ায়নি কালাম ভাইয়ের। কালাম ভাই; আবুল কালাম মন্ডল। রক্তমাংশের সম্পর্কবিহীন ভাই আমার; তবে আত্মার সম্পর্কে অতীব নিকটাত্মীয়। গফুর মোড়লের ছেলে। অবস্থাসম্পন্ন বাবার ঘরের একমাত্র সন্তান। সমসাময়িক কালের বেশ সম্পদশালী এবং প্রভাবশালী মানুষ। পাঁচ বছর বয়স থেকেই তাঁর কোলে থাকার এবং ঘুমোবার সুযোগ হয়েছে আমার।

কালাম ভাই ভেবেছিলেন, আমি ভালই চলতে পারছি। অনুমান করেই এমনটা ভেবেছিলেন এবং নিশ্চিন্তে ছিলেন। বাস্তবতা মোটেও বুঝতে পারেননি। অবস্থাটা যে এতটা বেগতিক তিনি সামান্যও আঁচ করতে পারেননি। তাই প্রথমে তেমন গা করেননি; কোন খোঁজও রাখেননি। যখন বুঝতে পারলেন, ততদিনে সময় মেলা গড়িয়েছে এবং আমি ইতিমধ্যেই ক্লাশ নাইনে উঠে গেছি।

এত সমস্যার মাঝেও বরাবরের মত ফার্ষ্ট হয়েই উঠেছি। ব্যাপারটা কেমন যেন সবার কাছে সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এটা নিয়ে না আমি, না অন্য কেউ! কেউই আর তেমন অবাক হতো না; আপু−ত হতো না। বিষয়টি যেন নির্ধারিতই ছিল। তবুও রেজাল্ট জানাবার জন্যে এক সন্ধ্যায় কালাম ভাইয়ের কাছে যাওয়া। আর যাওয়াতেই তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানার চেষ্টা করেন। এবং জেনে যেন আকাশ থেকে পড়েন। খুবই বিষন্ন হন। তাঁকে অপরাধী মনে হলো। কিছুক্ষণ অপরাধী মনে কী যেন ভেবে তৎক্ষণাৎ লোক পাঠালেন আমার বাসায়। লোকজন সিকদার সাহেবের বাসা থেকে ছোটখাট এই মানুষটির বড়ই ছোট সংসারখানা মূহুর্তের মাঝে শিফ্ট করে কালাম ভাইয়ের ঘরে নিয়ে গেল। 

মধ্যবাজারের বিশাল বটতলার (রাজকীয় বটবৃক্ষটি এখন আর নেই) বরাবর নীচেই ওনার ব্যবসায়িক ঘর। মরহুম নুরুল ইসলাম মোড়ল সাহেবের ঘর। আমার ঠিকানা হলো এই ঘরে। মহাজনী ঘরের মতই। সারা দিনমান শত মানুষের আনাগোনা। বছরব্যাপী ধান, চাল, ডাল, অথবা বাদামে ঠাসা থাকে ঘর। এদিকে গরমে টেকা দায়। ঘরে সিলিং নেই, কোনও ফ্যানও নেই। গুদামের মত খাঁ খাঁ ঘরই আমার ঘর। আমার পড়াশুনা আর থাকার ঘর। এ ঘরেই ব্যবসা ও পড়াশুনা পাশাপাশি চলবে।

কার্তিক স্যার বললেন, চিন্তা করিস না। পড়াশুনা করার ইচ্ছে থাকলে চলন্ত জাহাজের পাটাতনের  উপর বসেও করা যায়। তোর তো তাও ঘর আছে। যার ঘর নেই তার তো কিছুই নাই। আমি উৎসাহ  পেলাম। স্যারের সব কথা সব সময়ই উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। তাই ১০০ পাওয়ারের দুটো বাতির নীচে ঘুমুতেও কষ্ট হয়নি। বাতি দুটো সারারাত জ¦লতো। চোরের উপদ্রুপের কারণে বাতি দুটো জ্বালিয়ে রাখতে হতো।

কালাম ভাই ব্যবসায়িক কাজে সময় দিতেন। সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরতেন। মাঝেমধ্যে ঢাকা যেতেন। তবে নিয়ম করে রোজ দূপুরে নিজবাড়ীতে যেতেন। কিন্তু বিকেলের ঘুমশেষে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পরপরই বাজারে চলে আসতেন। বাজারেই ওনার রাতের থাকার জায়গা। আমরা দুইভাই রাতে এক খাবার খেতাম। একই বিছানায় একসাথে ঘুমুতাম।

পেছনের রান্না ঘরে বুয়া দূপুরে রান্না করে রাখতো। ওটা দিয়েই দূপুর এবং রাতের খাবার খেতাম। মন্দ ছিল না। সকালের নাস্তা রেডিমেড। সাত সকালে বাজারে অনেক কিছু মিলত। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল নসো মুন্সীর পুরি। এক টাকায় তিনটা পুরি মিলতো। কী যে স্বাদ! কালাম ভাই ঘুমিয়ে আছেন। একটু দেরী করেই উঠতেন। বিছানার পাশে তাঁর ঝুলানো জামার পকেট হাতরে একটি টাকা নিয়েই পুরির দোকানে দৌঁড়।

তাঁর পকেট খালি থাকলেও সমস্যা ছিল না। ধলা বাজারের সব দোকান ছিল বাকীর দোকান। সব দোকানেই আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। ইচ্ছেমত সব দোকানে বাকী খেতাম আর মাস শেষে কালাম ভাই টাকা পরিশোধ করে দিতেন। ক্ষুধা লাগলে আর কথা নেই। যেখানেই চাইতাম, সবাই বাকী দিয়ে দিত। এভাবেই এই একা আমাকে বুকের মাঝে আদরে আগলে রেখেছিলেন একজন মানুষ; মরহুম আবুল কালাম মন্ডল!

কালাম মন্ডলের কারণে আমার আর কোন সমস্যা ছিল না। একাকী জীবনের সামান্য ডর ভয় ছিল না। ভূতের খুব কাছে থেকেও বটবৃক্ষের ভুতের ভয়ও ছিল না। লোকে বলতো বটবৃক্ষে লুকিয়ে আছে বিশালাকার একটা অজগর সাপ আর দুলদুলের মত ঘোড়া। বৃষ্টিভেজা অমাবস্যার রাতে এরা নীচে নেমে আসে। নীচে এসে ঘোড়াবাবু নাচে আর সাপমহাশয় ফনা তুলে তাকিয়ে দেখে। দু’চারজনায় নিজচোখে দেখেছে বলেও দাবী করতো।

আমি তো একসাইটেট। কঠিন রকমের একসাইটেট। যেভাবেই হোক ঘোড়া আর সাপের লীলাখেলা আমার দেখতেই হবে। পেছনের বাসার মাসীমার কাছ থেকে অমাবস্যার দিন তারিখ জেনে অপেক্ষায় থাকতাম।  অমাবস্যার রাত এলেই আমার উসখুশ বেড়ে যেত। এরপর অপেক্ষা; কঠিনতর অপেক্ষা। কিন্তু ওসবের দেখা মেলে না। লোকজন বলে এসব দেখা সবার ভাগ্যে জোটে না। একদিন সুযোগ এলো। মহা সুযোগ। ভাগ্যে জোটার সুযোগ। মাঝরাতের আগেই বৃষ্টি শুরু হলো। মুষলধারে বৃষ্টি। সাথে ঝড়। কঠিন থেকে কঠিনতর ঝড়।

ঝড়ের ঝাপটায় একটা সময় বৃষ্টি থেমে গেলে। ঝড় থামলো না। প্রচন্ডবেগে বাতাস বইতেই লাগলো। হঠাৎ চলে গেল বিদ্যুৎ। একটা থমথমে অবস্থা। শো শো করে বাতাস বইছে। বিশাল বটবৃক্ষের পাতাসমূহ পতপত শব্দ করে উড়ছে। কেবলই উড়ছে। এই মোক্ষম সময়। একাকী আমি চোখকান খাড়া করে দরজায় ফাঁক গলে বাইরে তাকিয়ে আছি। পলক না ফেলা চোখে তাকিয়ে আছি।

মনে কোন ভয় নেই। দিলে কোন ডর নেই। কেবল আশায় আছি, এই বুঝি নেমে এলো। দূর্ভাগ্য! শেষমেষ নামেনি। যতদিন ওই ঘরে ছিলাম ততদিনে একবারও নামতে দেখিনি। এই নিয়ে খুব আক্ষেপ ছিল আমার। অতি দূর্লভ জিনিস দেখতে না পারার আক্ষেপ। তবে ক্ষোভ ছিল না। ক্ষোভ ছিল শুধু তেলাপোকার উপর। বড় ফাজিল তেলাপোকা। শীতে যেমন তেমন, গরমের দিনে ফুরফুর করতো।

বিছানার পাশে কয়েল জ্বালিয়ে কেবল ঘুমুতে গেছি। অমনি কোত্থেকে উড়ে এসে গায়ে পড়তো। ফরফর করে পড়তো। আমি “ওরে বাবারে” বলে ধরমর করে লাফিয়ে উঠতাম। খাট থেকে লাফ দিয়ে মেঝেতে, মেঝে থেকে একলাফে দরজা খোলে বাইরে। এই পৃথিবীতে কেবল এই একটি প্রাণীকে আমি গোণায় ধরি। দেখতে ছোট হলে কি হবে, হলুদ মাথার দুপাশে দু’টো পশম দেখলে আমার গায়ের পশম এখনো দাঁড়িয়ে যায়। একবার বাজারের বড় মসজিদের টয়লেটে বসে ভয়ানক বিপদে পড়েছিলাম। টয়লেটে কর্মসম্পাদনের মাঝামাঝিতে আমি। মানে অর্ধেক শেষ হয়েছে কেবল। হঠাৎ দেখা মিলল টিনের বেড়ায় কালো রঙয়ের বিরাটাকার তেলাপোকা। পিটপিট করে তাকাচ্ছে আর মুখের দুপাশের পশম দুটি নাড়াচ্ছে। আমার গা শীতল হয়ে উঠলো। একটুও না ভেবে সোজা দৌঁড়। কর্ম আধা রেখেই দৌঁড়। এখনো মনে হলে গা শিরশির করে।  

এমনিতেও সব সময় গা শিরশির করতো হাগু বিষয়টি নিয়ে। নিজেদের কোন টয়লেট ছিল না। নিজেদের কেন, কারোরই ছিল না। সারা বাজারে সবেধন একখানা টয়লেট। এটাতেই সবার ভরসা। মসজিদের পাবলিক পায়খানা। আমার ঘর থেকে মেলা দূরে। অনেকগুলো দোকানঘর ঘুরে যাওয়া লাগতো। বলা চলে দুনিয়া ঘুরে যাওয়া লাগতো। পিশুতে কোন সমস্যা ছিল না। ঘরের পিছনে ছোঠখাট চিপায় বসেই পিশু করতে পারতাম। হাগু চাপলে মাঝেমধ্যে দৌঁড়ে ঐ পর্যন্ত যাবার সময় থাকতো না।

তাই চেষ্টা থাকতো সারাদিন এটা চেপে রাখার। চেপে রাখতাম রাতের জন্যে। কোন রকমে দিনের আলোটা পার করতে পারলেই শান্তি। রাতে দৌঁড়ে ঐ পর্যন্ত যাওয়া লাগতো না। সারা বাজারই আমার। যেখানে সেখানে মোটামুটি চিপা একটা পেলেই করতে পারতাম। বিশেষ করে আমার ঘরের পিছনের চিপা। দিনে মাটি কেটে ছোট গর্ত করে রাখতাম। আর রাতে কর্ম সেরেই মাটি দিয়ে গর্ত ঢেকে দিতাম। খুব সহজ কাজ। নিমিষেই করা যেত। বুঝতো না কেউ। দিনে কেউই বুঝতো না।

তখনকার দিনে সারা বাংলা ছিল কাঁচা পায়খানার বাংলা। অন্য এলাকার কথা জানি না, তবে ময়মনসিংহ এলাকায় প্রকৃত অর্থে টয়লেট ছিলনা বললেই চলে। পেটে চাগান দিলে সবাই পাটক্ষেতে অথবা ছোটখাট জংলায় বসে যেত। কিংবা বসতো বাড়ীর পেছনের ঝোপঝাড়ে। সামনে কিছুই থাকতো না। থাকলেও কলাগছের শুকনো পাতা; কিংবা বড়জোর আধাছেড়া ছালার চট। কোথায়ও এর চেয়ে ভাল কিছু থাকলেও মূলত সবই ছিল খোলামেলা কাঁচা পায়খানা। এসবের মাঝে আমারটা ছিল দূষনমুক্ত এবং যুক্তিযুক্ত ঢাকনাওয়ালা খাঁটি পাকা টয়লেট! টনটনা পাকনা বুদ্ধির কনকনা পাকনা টয়লেট!! চলবে....

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com