‘আমার আর কী চাওয়ার থাকতে পারে?’

প্রকাশের সময় : 2018-12-06 14:49:29 | প্রকাশক : Admin
�‘আমার আর কী চাওয়ার থাকতে পারে?’

সিফাত বিনতে ওয়াহিঃ সৈয়দ হাসান ইমাম বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান অভিনেতা, নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক। ১৯৬০ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তার। ‘লালন ফকির’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পদার্পণ করেন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্নি পুরুষ সৈয়দ হাসান ইমাম। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিক্ষুব্ধ বাঙালি শিল্পী সমাজকে যারা সুসংগঠিত করেছিলেন, তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী ও কলা-কুশলী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন সৈয়দ হাসান ইমাম। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

রাজধানীর মগবাজার ওয়্যারলেসের নিজ বাসভবনে বসে কথা শুরু হয় গুণী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসান ইমামের সঙ্গে। আড্ডার শুরুতেই শৈশবের স্মৃতিচারণ করেন তিনি। জানান, বাবার কোনো স্মৃতি তার মনে নেই। বড় ভাই, মা, পরিবারের অন্যদের কাছ থেকে যতটুকু শুনেছেন, তার কাছে ততটুকুই বাবার স্মৃতি। বাবা সৈয়দ সোলেমান আলী ছিলেন ইনকামট্যাক্স অফিসার। তার বাবা মানে আমার দাদা খান বাহাদুর সৈয়দ সুলতান আলী ছিলেন আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদ।

শৈশবে বাবাকে হারালেও, তার দাদা হাসান ইমামের বিয়ে দেখে যেতে পেরেছিলেন। দাদা যতদিন বেঁচে ছিলেন দাদাবাড়ি বাগেরহাটে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। যদিও স্থায়ীভাবে নানাবাড়ি বর্ধমানেই বসবাস করতেন। তার মামারা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। সেখানকার লেখাপড়ার পরিবেশটা ভালো ছিলো বলেই হাসান ইমামের বাবা চেয়েছিলেন তার সন্তানরা বর্ধমানে থেকেই বড় হোক। নানা বাড়ির পরিবার ছিল বিরাট এক যৌথ পরিবার, সেখানেই তাদের বেড়ে উঠা।

দীর্ঘ এক রাজনৈতিক ক্যারিয়ার রয়েছে সৈয়দ হাসান ইমামের পরিবারের। তার মামারা সবাই রাজনীতি করতেন। কেউ কেউ কমিউনিস্ট পার্টিও করতেন। মেজ মামা ছিলেন স্পিকার। বড় মামাও দীর্ঘ সময় সংসদ সদস্য ছিলেন। আরেক মামা সিপিএম করতেন, তিনিও মন্ত্রী হয়েছিলেন। তার এক মামাতো বোন এখনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল পার্টি করেন, এমপি ছিলেন।

হাসান ইমামের মায়ের মামা আবুল হাশেম সাহেব দেশ ভাগের আগে মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, বেঙ্গল অ্যাসেম্বলিরও মেম্বার ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি কথাতেও উনার অনেক কথা আছে, কারণ তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুদেরও নেতা। বঙ্গবন্ধু তখন ছিলেন ছাত্রনেতা, আবুল হাশেম সাহেব ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা। দাদাবাড়িতেও একই সঙ্গে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, এবং মুসলিম লীগের রাজনীতি দেখে বড় হয়েছেন গুণী এ অভিনেতা। তার দাদা করতেন কৃষক প্রজা পার্টি, ফলে ছোটবেলা থেকে পরিবারের মধ্যেই রাজনীতির ধ্যান-ধারণা পোক্ত হয়েছে তার। বলা যায়, শিল্পী জীবন শুরুর আগেই রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় তার।

যদিও প্রথম জীবনে রাজনীতি বা অভিনয় নয়, খেলাধুলার প্রতিই বেশি ঝোঁক ছিল সৈয়দ হাসান ইমামের। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় থেকে খেলাধূলায় বেশ ভালো করছিলেন, ফলে ওই বছরই স্পোর্টসের জন্য পুরস্কার পান তিনি। বেল সাহেব নামে একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট এসেছিলেন ছাত্রদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে। ওইদিনের ঘটনা স্মরণ করে হাসান ইমাম বলেন, ‘সে সময় ধীরেন দা বলে ক্লাশ টেন-এর একজন ছাত্র ছিলেন, তিনি আমাদের কানে কানে বললেন- পুরস্কার নিতে যখন ডাকবে আমি দাঁড়িয়ে বলবো কোনো ইংরেজের হাত থেকে আমি পুরস্কার নিবো না। তোরাও সবাই দাঁড়িয়ে একই কথা বলবি। আমরাও দাঁড়িয়ে তাই এটা বলে বের হয়ে আসলাম। সে হিসাবে ধরতে গেলে ছয় বছর বয়স থেকেই আমার প্রতিবাদ এবং আন্দোলনের শুরু।‘ কলেজে এসে তিনি যুক্ত হলেন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বাম জোট করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন হাসান ইমাম। কলেজে স্টুডেন্ট ফোরামে কংগ্রেসকে হারিয়ে তারা জয় লাভও করেছিলেন।

ছাত্র জীবনে খেলাধুলার পাশাপাশি ভালো গানও করতেন হাসান ইমাম। পরিবারের অন্যদের মতো পড়াশোনায় অত ভালো ছিলেন না বলে দাবী করেন এ প্রবীণ সাংস্কৃতিক নেতা। তবে খেলাধুলা, গান এবং আবৃত্তির প্রতি তীব্র আগ্রহ ছিল তার। স্কুল থেকেই তাই শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন তিনি। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে নাটকের সঙ্গে তার যুক্ত হওয়ার স্মৃতি বেশ মজার। কলেজে বাৎষরিক অনুষ্ঠানে সিনিয়াররা অনেকটা জোর করেই নাটকে ঢুকালো তাকে। দেওয়া হলো নায়িকা মিশর কুমারীর চরিত্রে অভিনয় করতে। ওই নাটকে ভালো না লাগায় গোপনে আরেকটা নাটকের রির্হাসেল শুরু করে দিলেন তারা। ওই নাটকে নায়কের চরিত্রেই অভিনয় করলেন তিনি। একদম শেষ দিনে দুটো নাটকই মঞ্চায়ন করা হলো এবং সেটা সফলও হলো। জীবনের প্রথম দিনেই একই সঙ্গে তিনি নায়ক এবং নায়িকা দুটো চরিত্রেই নাটক মঞ্চায়ন করলেন। এরপরেই নাটকে তার বেশ নাম হয়ে গেল।

রাজনীতি, খেলাধুলা, গান, অভিনয়- সব বিষয়ে সমান দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও হাসান ইমামকে অভিনেতা হিসেবে ভাবতেই বোধহয় মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলে অনেকটা আক্ষেপের সুরেই গুণী এই অভিনেতা বলে ওঠেন, ‘কিন্তু জানো, ছাত্র জীবনে আমার ঝোঁকটা বেশি ছিল খেলাধুলার প্রতিই। কিন্তু আমাকে এক সময় খেলা ছেড়ে দিতে হলো। একবার খেলতে গিয়ে আমার হাটুর লিগ্যামেন্ট ছিঁড়ে যায়। তখন চিকিৎসা ব্যবস্থা অত ভালো ছিল না, তাই বাধ্য হয়েই খেলাটা আমাকে ছেড়ে দিতে হলো।

ফুটবল ছেড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু খেলাধুলা পুরোপুরি ছাড়লাম না। ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার পর ক্রিকেটের দিকে মনোযোগী হলাম। এমনকি খেলাধুলার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে বর্ধমান ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকেই তিনি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। এমনকি তাকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এসোসিয়েশনেরও জেনারেল সেক্রেটারি বানানো হয়।

জীবনে এত এত প্রতিভায় গুনান্বিত হয়েও কী কোনো ধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগেন এই বয়সে? এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুটা স্মিত হাসলেন, বললেন, ‘মোটেও না। আমি তো মনে করি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য না থাকার কারণে আমার বন্ধু ভাগ্য ঈর্ষনীয়। যখন যে এসে কোনো পদ বা কোনো কিছুই ছেড়ে দিতে বলেছে, আমি ছেড়ে দিয়েছি। কারো সঙ্গেই আমার কোনো প্রতিযোগিতার সম্পর্ক ছিলো না। আর তা ছাড়া জীবনে না চাইতেই তো অনেক কিছু পেয়েছি। মানুষের এত ভালোবাসা পেয়েছি, আমার আর কী চাওয়ার থাকতে পারে? এই ভালোবাসার ঋণ-ই আমি শোধ করতে পারবো না কোনোদিন।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com