হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (পর্ব ৪৫ তম)

প্রকাশের সময় : 2018-12-19 10:42:13 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (পর্ব ৪৫ তম)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আসলেই আমার কী হতে কী হয়েছিল আমি নিজেও বুঝতাম না। বুঝতাম কেবল বিনোদন আর বিনোদন। বিনোদন ছাড়া কিছুই বুঝতাম না। আবার বিনোদন বলতে শুধু সিনেমা নয়; ফুটবলও ছিল আমার বিনোদনের অন্যতম আইটেম। ওই সময়টাতে বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে খেলার বিনোদন বলতেও কেবল ফুটবল। ফুটবল মানে আবাহনী, ফুটবল মানে মোহামেডান।

আবাহনী ও মোহামেডানের তখন ভরা যৌবন। আমরা কান পেতে রেডিওতে খেলার ধারাবিবরণী শুনতাম। সমর্থকদের দল কঠিন আগ্রহ ভরে রেডিওর চারপাশ ঘিরে রাখতো। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চেয়েও কঠিন। সত্যি বলতে স্টেডিয়ামে যেয়ে খেলা দেখার চেয়েও রেডিওতে খেলার ধারাবিবরণী শোনা অনেক বেশী মজার ছিল। আনন্দের ছিল। সে কী ধারা বর্ণনা! আর শ্রোতা হিসেবে আমাদেরও কঠিন অবস্থা। যেদিন খেলা থাকতো টানটান উত্তেজনায় শরীরের ঘাম ছুটে যেত। আর খেলা না থাকলে দৌঁড়ে ধলা স্কুলের মাঠে। বিকেল হতে দেরী হতো; মাঠে যেতে দেরী হতো না। 

বিশাল মাঠ। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে পাশাপাশি দু’দুটো মাঠ। দুটোই বিশাল; একটা ছোটদের আর অন্যটা বড়দের। সাইজে খাটো হলেও নাইনের ছাত্র বলে আমি অলরেডি বড়দের দলে ঢুকে পড়েছি। সহজে ঢুকতে পেরেছিলাম গোলকীপারের ক্রাইসিসের কারণে। মূলত কোন ছেলেরাই তখন গোলপোষ্টে খেলতে চাইতো না। সবাই পুরো মাঠজুড়ে খেলবে। কী আর করা! গোলপোষ্ট তো খেলোয়ার শূণ্য রাখা যায় না। তাই হালকা পাতলা এই আমার সহজ সুযোগ। 

সুযোগ পেয়ে আর দেরী করিনি। ছোটখাট নামটামও কামিয়ে ফেলি। এখানে যে নাম কামানো যায় এটা আমি নিজেও বুঝতাম না। গোলকীপারকে মূল একাদশের খেলোয়ার হিসেবে কেউ তেমন মনেই করতো না। আমিও মনে করতাম না। লাইনের বাইরে দূরে কোথায়ও বল চলে গেলে দৌঁড়ে সেই বল কুড়িয়ে আনা আর স্টপারবেগের লং কিকের জন্যে সুন্দর করে বল মাঠে বসিয়ে দেয়া ছাড়াও যে গোলকীপারের আরো কাজ আছে এটা জানতাম না।  

নিজে না জানলে কি হবে, লোকজন জানতে শুরু করলো আমার নাম; শাহীন গৌলী। এখানে সেখানে নাম ছড়াতে লাগলো। গাওগেরামের বিষয়, ছড়াতে বেশী সময় লাগে না। বিষয়টা আমি নিজেও এনজয় করা শুরু করলাম। কিন্তু এটাতে একটা মজার বিষয় তৈরী হলো। মাঝেমধ্যে এখানে ওখানে খেলার জন্যে ডাক আসতে লাগলো। হায়ারে, মানে ভাড়ায় খেলার ডাক। এ এক ভীষণ সম্মানের বিষয়। মহা সম্মানের। যেদিন যেতাম সেদিন সকাল থেকেই হাবভাব পাল্টে যেত আমাদের। পাল্টে যেত হাঁটাচলার স্টাইল। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মত করে হাঁটার ধরণ প্র্যাকটিস করতাম। 

একবার খেলতে গেছি ময়মনসিংহ স্টেডিয়ামে। শহরের কোন ক্লাবের কারা এসে যেন নিয়ে গেছে আমাদের। নামটি ঠিক মনে করতে পারছি না। গ্রাম থেকে শহরে হায়ারে যাওয়া! এদিন থার্ডক্লাশে নয়, সেকেন্ড ক্লাশে করে গিয়েছি। ময়মনসিংহ ষ্টেশনে এসে লোকজন দলবেঁধে সম্মান দিয়ে ট্রেন থেকে নামালো। নিয়ে গেল শহরের এক বাসায়। ভীষণ সমাদর করলো। এখানেই খাওয়াদাওয়া এবং বিশ্রাম। তবে বিশ্রাম নেবো কি! রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা আমাদের জন্যে রান্না চলা পোলাওমাংসের ঘ্রাণে বিশ্রাম নেয়া দায়। একটু পরপর নাক দিয়ে ঘ্রান নিচ্ছি। আহ্ কী ঘ্রাণ!

সমস্যা হলো দূপুরের পর। খাওয়াদাওয়া সেরে কেবল একটু শুয়েছি। অমনি ঝপাৎ করে নামল মূষলধারে বৃষ্টি। বৃষ্টিতে মাঠ ভিজে একাকার। সারা মাঠে কাঁদা আর কাঁদা। লাথি দিলে শরীর এগোয়, কিন্তু বল এগোয় না। দেহ ইমব্যালেন্সড; ভারসাম্য ধরে রাখাই কঠিন। আরো কঠিন অপরপক্ষ; খুবই শক্তিশালী। আমাদের পক্ষের খেলোয়াড়রা কুলোতে পারছে না। কুলোতে আমিও পারিনি। মোটামুটি খেলার প্রথম হাফেই দুটো গোল হজম করি। বিরতির পর কপাল গুণে আর মোটে একটা গোল খেয়ে খেলা শেষ হয়। 

কিন্তু আমাদের চিন্তা শেষ হয় না। চুক্তি মোতাবেক টাকা পাবো কিনা এই নিয়ে টেনশানের শেষ নেই আমাদের দলপতির। চারজনে আশি টাকা! ফেরার সময় একা একাই ফিরলাম। মেঝবান কাউকে পেলাম না। একদুইজন ছাড়া আর কেউ স্টেশনে এলো না ট্রেনে উঠিয়ে দিতে। এমন কি টিকিটটা পর্যন্ত দিল না। মন খুবই খারাপ আমাদের। খোকা, মোখলেস ওদের কারো মুখে রা নেই। আমিও চুপ। দুঃখভরা মনে একবার আমি রফিজের দিকে তাকাই, আবার রফিজ আমার দিকে। বড় করুণ চেহারা রফিজের। রফিজ উদ্দিন মড়ল। আমাদের দলের দলপতি; স্বঘোষিত ক্যাপ্টেন।

এই ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে একবার গফরগাঁয়ে গেলাম। খেলা হবে ইসলামিয়া হাই স্কুল মাঠে। প্রতিপক্ষে আঠারদানার ঘাড়বেকা কামালও আছে। তুখোর স্ট্রাইকার। বলা যায় জাত খেলোয়াড। কোনমতেই ঠেকানো যায় না তাকে। ভয়টা তাকে নিয়েই। কামাল ভাইয়ের সাথে ধলার মাঠে আগেও খেলেছি। তাই আমাদের হায়ার করে নেয়। চুক্তির শর্ত একটাই। টাকা পয়সা লাগবে না; আস্ত খাশি খাওয়াতে হবে। বাজার থেকে খুচরা মাংস কিনে এনে খাওয়ালে কোনভাবেই হবে না।

খাবার বাড়া হচ্ছে। গোডা আলু দিয়ে মাংস রান্না হয়েছে সেই রকম। পেট চোঁ চোঁ করছে। নাকে আসা ঘ্রাণও মন্দ নয়। হঠাৎ দেখলাম ক্যাপ্টেন রফিজ ক্ষেপে গেছে। কোনমতেই সে খেতে বসবে না। বিষয় বড় জটিল। চুক্তির বরখেলাপ হয়েছে। আস্ত খাশি জবাই হয়নি। রফিজের একটাই কথা। রান্না মাংস নয়, আস্ত খাশির আস্ত চামড়া দেখাতে পারলে খাবে। না হলে খাওয়ার কোন সুযোগই নেই। বিষয়টি এরকম যে, দরকার হলে না খেয়ে খেলবো, তবুও খাবো না। যারা মানী মানুষের মানইজ্জত দিতে জানে না, তাদের মানইজ্জত দেখা আমাদের কাজ নয়।

কথাটি শিখেছিলাম তদানিন্তন সময়ের ওই অঞ্চলের বিখ্যাত মাখন গৌলীর কাছ থেকে। আমি নিজেও তখন মাখন গৌলী হবার চেষ্টায় রত। তার মত করে জাম্প দিয়ে বল ধরি, লাফিয়ে বল ঠেলে দিয়ে গোল সামাল দেই। যত না গোল সামাল দেয়ার উদ্দ্যেশ্য, তারচেয়ে ঢের বেশী লক্ষ্য দর্শকদের তালি পাওয়া। একদিন ধলা হাই স্কুল মাঠে ষোড়শীবালা শিল্ডের খেলা হচ্ছে। খেলা হবে পাকাটি বনাম বালিপাড়া’র মাঝে। পাকাটি টিম এসেছে। ঢাকার রহমতগঞ্জ ক্লাব থেকে একঝাঁক খেলোয়াড় হায়ার করে আনা হয়েছে। তবে রাগ করে বালিপাড়া আসেনি। কী আর করা! ধলা হাইস্কুলের স্টান্ডবাই টিমকে প্রক্সি দিতে নামতে হবে। নাহলে দর্শক সামাল দেয়া যাবেনা।

দারুন খেলেছিলাম সেদিন। দুই গোলে হারলেও খারাপ লাগেনি। দর্শকও উপভোগ করেছিল পুরো খেলা। ঢাকার খেলোয়াররাও আমাদের খেলায় মুগ্ধ হয়েছিল। উৎসাহ দিয়েছিল। আমাকে খেলায় সবচেয়ে বেশী উৎসাহ দিতেন কার্তিক স্যার। সময় পেলে একসাথে নিয়ে খেলতেনও। খুব ভাল খেলতেন কার্তিক স্যার। আমার সাথে দারুণ সখ্যতা ছিল স্যারের। পড়াশুনায় ভাল ছিলাম বলে স্যার সবার চেয়ে একটু বেশী আদর করতেন আর সবকিছুতেই ছাড় দিতেন। আমার সাথে স্যারের ছিল  ছাড়াছাড়ি দেয়া গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।

আবার বন্ধুত্বের পাশপাশি শত্রুতাও ছিল। বল খেলার সময় বিপক্ষ দলে থাকলে আমাদের বন্ধুত্বের লেশমাত্র থাকতো না। তিনি স্ট্রাইকার আর আমি গোলকীপার। একদলে থাকলে খাতিরের শেষ নেই; কিন্তু বিপক্ষ দলে পড়লেই সরাসরি শত্রুতা শুরু হয়ে যেত। একবার বালিপাড়া গরুর হাটে ধলা-বালিপাড়া খেলা পড়লো। মাঠভর্তি দর্শক; তুমুল উত্তেজনা। তিনি ডি বক্সে বল নিয়ে চলে আসেন বারবার; কিন্তু গোল পান না। তাঁর নিজের মাঠে খেলা; একটা ইজ্জতের ব্যাপার। চুপিচুপি আমাকে আবারো ফ্রি সিনেমা দেখানোর অফার করেন; বিনিময়ে কেবল একটা বল ছেড়ে দেবো। কে শোনে কার কথা; শেষে গোলশুণ্য ড্র দিয়ে খেলা শেষ হয়।

এবার বিদায়ের পালা। বিদায় বেলায় স্যার বললেন, “কাজটা কি তুই ঠিক করলি? গরুর হাঁটে এসে তুই একটা খবিশ গরুর মত আচরণ করলি। শিক্ষকের ইজ্জত যে বোঝে না, সে গরু নয়তো কী! একটা খবিশ গরু!” চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com