হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!!( ৪৬ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2019-01-03 20:38:29 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!!( ৪৬ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ কার্তিক স্যার মানুষটা একেবারেই অন্যরকম ছিলেন। গতানুগতিক স্যারদের মত ছিলেন না। কথাবলন, চালচলন, কিংবা শেখানোর ধরণ; কোন কিছুতেই অন্যদের সাথে মিল ছিল না। ছাত্র শিক্ষকদের মাঝের দেয়ালটা তিনি রাখেননি কোনদিন। আমরা সাধারণত স্যারদের দেখলে ভয় পেতাম কিংবা সামনে থেকে সরে যেতাম। কিন্তু কার্তিক স্যারের বেলায় বিষয়টি ছিল একেবারেই আলাদা। তাঁকে দেখলে আমরা তো দূরে সরতামই না; উল্টো এগিয়ে কাছে আসতাম। কাছে টেনে নেবার প্রচন্ড ক্ষমতা তাঁর ছিল। ছিল মিটিমিটি চোখে দুষ্টামিতে ভরা শিশুসুলভ সব আচরণ।

ছাত্রদের সাথে সহনীয়মাত্রার সব দুষ্টামিই করতেন স্যার। ক্লাশে স্যার বোর্ডে প্রশ্ন লিখতেন আর আমরা উত্তর লিখে টেবিলে জমা করতাম। আমাদের ক’জনের মাঝে প্রচন্ড প্রতিযোগীতা ছিল কার আগে কে জমা দেবে। দেখা যেত স্যার প্রশ্ন লিখে শেষ করতে পারেননি কিন্তু উত্তর লিখে জমা দেবার হিড়িক পড়ে গেছে। এসব দেখে স্যার নিয়ম করে দিলেন, তাড়াহুড়ো করবে করো। তবে এটা করতে যেয়ে যদি সামান্য বানানও ভুল পাওয়া যায়, তবে রক্ষা নেই। ভুল হলেই কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে। এমন কি যদি সামান্য ইংরেজী টি এর মাথাটাও ভুল করে কাটা না থাকে।

এভাবেই চলছিল; আমরা প্রতিদিনই কেউ না কেউ কান ধরে দাঁড়াতাম। একদিন স্যার আমার খাতায় মাথাকাটাবিহীন টি পেয়ে গেলেন। মুচকী হেসে বলছেন, খাড়াইয়া না থাইক্যা ধইরা ফালা। আমি খুবই নীচু গলায় বললাম, কারটা ধরবো? মানে? স্যার ঘাবড়ে বললেন। মিন মিন করে বললাম, বোর্ডে তাকিয়ে দেখেন। বোর্ডে তাঁর নিজের ভুল দেখে স্যারের তো আক্কেলগুরুম। স্যার খুব আস্তে করে বললেন, চাইপ্যা যা; রাতে চিত্রপুরীতে আসিস্। টিনের ফুটা দিয়া দেখা লাগবো না। মেশিন রুমে বসাইয়া দেখাবো।

এই হলো আমার অসম্ভব প্রিয়, শুধু আমার কেন বলছি; আমাদের সকলের পরম প্রিয় এবং শ্রদ্ধার মানুষটি। আমার জীবনে পাওয়া ৩ জন শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মাঝে তিনি একজন। কার্তিক স্যার নামেই তিনি সকলের পরিচিত ছিলেন। প্রদীপ চন্দ্র দেবনাথ তাঁর পুরো নাম। বালিপাড়া বাজার থেকে আসতেন সাইকেলে চড়ে। প্রথম থেকেই স্যারকে ব্যতিক্রমী আচরণে পেয়েছি; গতানুগতিক ধারার শিক্ষক সুলভ আচরণ করেননি। ছাত্র শিক্ষকের মাঝের প্রাচীরটা কখনোই রাখেননি। শিক্ষার্থীদের সাথে মিশে যেতেন একেবারে বন্ধুর মতন। হাসি, তামাশা কিংবা আনন্দ ফূর্তি সবই করতেন; কেবল পড়াশুনার ব্যাপারে ছাড় দিতেন না এতটুকুনও।

তাঁর শেখাবার পদ্ধতিটিও ছিল চমৎকার। বাংলা ব্যাকারণে কারক বিভক্তি শেখাবেন। বইয়ের উদাহরণ বাদ দিয়ে সেই সময়কার জনপ্রিয় গানের কলি আওড়াতেন; ডেগেরও ভিতরে ডাইলে চাইলে উৎলাইলে গো সই; ডেগের নীচে দাগ। এবার বল্ কোন কারকে কোন বিভক্তি? বাস্তবধর্মী শিক্ষাব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। মজা করেও যে পড়াশুনা করা যায় কিংবা পড়াশুনাটাও যে একটা মজার বিষয় সেটা হাতে কলমে শিখিয়েছেন আমাদের কার্তিক স্যার।

সব বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন। ক্লাশে পড়াতেন ইংরেজী গ্রামার আর প্রাইভেটে পড়াতেন বাংলা গ্রামার। বরফসম কঠিন গ্রামার স্যারের ব্যাখ্যায় পানির মত সহজ হয়ে যেতো। সিনেমায় কোন দৃশ্য কেন দেখালো, সেই দৃশ্যে কী মিন করছিল; স্যার সে সব বলতেন আর আমরা হা করে তাকিয়ে শুনতাম। ইসলাম শিক্ষায়ও তাঁর যথেষ্ট পান্ডিত্য ছিল। সব ধর্মের মূলমন্ত্র যে এক এবং অভিন্ন, একসূত্রে গাঁথা তা কোরআন, মহাভারত আর রামায়নের বিশ্লেষন দিয়ে বোঝাতেন। বলতেন, ধর্মের মূল কথাই হলো আত্মাকে শুদ্ধ করা। আত্মা অশুদ্ধ তো জীবনটাই অশুদ্ধ।

স্যারের কথামত আমার ছোট্ট এই জীবনটাকে শুদ্ধ করার জন্যে আজো চেষ্টা করে যাচ্ছি। আজো আপ্রাণ চেষ্টা করছি আত্নাকে শুদ্ধ করতে। আত্নাকে শুদ্ধ করা এত সহজ নয় জেনেও চেষ্টা করেই চলেছি। শিখছি অবিরত, শিখছি দিনরাত। তবে খুব যে শিখতে পারছি, তাও মনে হয় না। নিজের আচরণ দেখলে মনে না হবারই কথা। মনে হয় এখনো অনেক পথ বাকী; এখনো অনেক রাত। 

কার্তিক স্যারও সেই রাতের কথা বলতেন। মনটা বিষন্ন করেই বলতেন। তারপর একটু হাসি দিয়ে আবার বলতেন, চেষ্টা কর। চেষ্টা করলে মানুষ কী না পারে! চেষ্টা করলে রাতকে দিনও করে ফেলতে পারে। এরপর হাসির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন, চেষ্টা করলে মেয়েকে ছেলে আর ছেলেকে মেয়েও বানানো সম্ভব। আমরা তো হেসে কুটি কুটি করছি। স্যার হাসতেন না। কঠিন কথা বলার সময় স্যার এমনি করেই মজা দিতেন। কিন্তু নিজে নিতেন না। সীমার মধ্যে থেকে সীমাহীন হেন দুষ্টামি নেই যা স্যার আমাদের সাথে করতেন না। স্যারের রক্তভরা ছিল দুষ্টামিমাখা মজা করার সুমন্ত্রণা।

ক্লাশ নাইনে স্যার নিতেন ইংরেজী গ্রামার। গ্রামার ক্লাশে সাধারণত চাপ থাকতো না। থাকতো মজা আর দুষ্টামি করার প্রবণতা। স্যার মহাব্যস্ত; টেবিলে রাখা আমাদের জমা দেয়া খাতা একটার পর একটা দেখে চলছেন। আর আমরা ব্যস্ত গালগল্পে। কেউ বাড়ী থেকে আনা কাঁচাআম ছিলে খাচ্ছে। কেউবা স্কুলের সামনে বসা আচাড় বিক্রেতার কাছ থেকে আচাড় নিয়ে চাটছে। আবার কেউ কেউ পাশের বেঞ্চে বসা মেয়েদের সাথে একআধটু চোখাচুখিত্ত করছে।

বয়সটা তো চোখাচুখিরই। চোখাচুখির এই বয়সে একটু মুখামুখি হলেই কেল্লা খতম। তবে বিষয়টি এত সহজ ছিলনা। সমাজ কিংবা পরিবার বিষয়টি মোটেই মেনে নিত না। আর শিক্ষকদের তো অবস্থা আরো জটিল; আরো কঠিন এবং কঠোর। ধরা পড়লে আর রক্ষে নেই। সন্দি বেতের বারি একটাও মাটিতে পড়তো না। অভিভাবক ডেকে হাতে ধরিয়ে দিতেন। এখন দিন বদলেছে। ক্লাশে শিক্ষার্থীরা কী করবে! শিক্ষকরাই তো সুযোগ পেলে হাতছাড়া করে না।  আকারে ইঙ্গিতে কুপ্রস্তাব দিতে একটুও দ্বীধা  করেনা।  

আমাদের সময়ে কুপ্রস্তাব না; আমরা মাঝেমধ্যে কুকর্ম করতাম। কার্তিক স্যারের ভাষায় কুকর্মই। একদিন ক্লাশ চলছে। নিরিবিলি ক্লাশের নিরিবিলি পরিবেশ। বলা নেই, কত্তয়া নেই; হঠাৎ করে পেছন দিকের কেউ একজন কুকর্মটি করে ফেললো। সবাই তো হেসে কুটি কুটি। কুকর্মের শব্দটা খুব জোরে না হয়ে ফ্যাসফ্যাসে হলেও হতো। স্যার কেন, কেউই টের পেত না। পরিস্থিতির বাস্তবতায় স্যার বিব্রত হলেও মূহুর্তেই সামলে নিলেন নিজেকে। সামান্য সময় নিয়ে কিছু একটা ভেবে চক দিয়ে বোর্ডে ছন্দমাখা ক’টি লাইন লিখলেন; আইছে পাদ? পড়ালেহা বাদ।/ যাইবি বাইরে, ডাকবি ভাইরে!! / পেডে দিবি চাপ, বাপরে বাপ!!! / খালাশ হইবো হাফ, সাত খুন মাফ!!!!

একবার সাত খুন মাফ করে চলা এই মহা ভাল মানুষটিকে দেখার খুব সাধ হলো। স্কুল ছাড়ার বহুদিন বহুবছর পরে ২০০৬ সালে আমাদের ব্যাচের ক’জনে মিলে ময়মনসিংহ শহরে একসাথে হয়েছিলাম। আমরা তো মহাখুশী; মহাখুশীর সবচেয়ে বড় কারণ বহু বছর পরে আমরা দলবেঁধে একজন বিশেষ মানুষের কাছে যাবো; তাঁর সান্নিধ্যে কিছুক্ষণ কাটাবো। মিলিত হবার পরে বন্ধুদের চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম দিনে দিনে বেলা অনেক হয়েছে; বয়সের ছাপ চলে এসেছে। গেলাম বিশেষ সেই মানুষটির বাসায়; অপেক্ষায় আছি কখন তিনি আসবেন। তিনি এলেন; অবিকল সেই মুখ, সেই চেহারা, সেই হাসি। লাবণ্যতায় একটুও ঘাটতি পড়েনি; চেহারায় বয়সের চিহ্ন নেই। ঠিক একই রকম আছেন কার্তিক স্যার।

এক এক করে পায়ে পড়ে প্রনাম পর্ব সারলাম। বিছানার কোণে বসে তিনি শুরু করলেন। মনে হলো না বহু বছর পরে দেখা। তিনি বলেই যাচ্ছেন; আমরা হা হয়ে শুনছি। তাঁর ছাত্র জীবনের নানা গল্প করলেন, তাঁর শিক্ষকদেরকে স্মরণ করলেন গল্পে গল্পে। হেসে আমাদের পেট ফাটার মত অবস্থা। সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গেও আলোচনা করলেন। লক্ষ্য করলাম প্রতিটি বিষয়ে তিনি সাংঘাতিক রকমের জ্ঞান রাখেন। বিষয়বস্তুর ঠিক গভীরে যেয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেন। সেই সময়ে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়িয়ে কিছুটা পন্ডিত হয়ে গেছি বলে যাও এক আধটু ধারণা মনে পোষন করতাম; সেদিনের পর মনে হলো এই মানুষটির ছোট্ট একটি নখের সমতুল্যও হতে পারিনি! আর কোনদিন পারবোও না!!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com