বাড়ী ফেরার সময় হয়! কিন্তু আফসোস শেষ হয় না!!

প্রকাশের সময় : 2019-01-19 11:34:53 | প্রকাশক : Admin
বাড়ী ফেরার সময় হয়!  কিন্তু আফসোস শেষ হয় না!!

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ প্রাইমারীতে পড়াকালীন জীবন খাতার স্মৃতির পাতা যতটা ঝলমলে অমলিন, ভার্সিটির স্মৃতির পাতা ততটা নয়। বিষয়টি অমূলকও নয়। মানুষের কচি ব্রেইন যা কিছু ধারণ করতে পারে, কিছুটা পরিপক্ক ব্রেইন তা পারে না। কোনভাবেই পারে না। আমার শোনিম যে জিনিস এখন একবার দেখলেই পারে, আমি তা তিনবারেও পারি না। হয়ত এক সময় আমিও পারতাম। কিন্তু এখন পারিনা। বয়সের কারণেই পারিনা। বয়স মানুষকে বদলে দেয়। একদিন শোনিমকেও বদলাবে।

মানুষের জীবনটাই এমন। বড় অদ্ভুত! বয়সের তালে তালে সবকিছু বদলে যায়। বয়সও বাড়ে, বদলে যাওয়াও বাড়ে। বয়স বাড়া বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো স্মৃতিচারণ পরখ করা। স্মৃতিচারণ করার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া বয়স বাড়ারই লক্ষণ। যখন কোন মানুষ ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ বেশী করবে, বুঝতে হবে নিশ্চিত তার বয়স বেড়েছে। বয়স বেড়ে গেলেই কেবল মানুষ ছেলেবেলাকে খোঁজে; বয়স থাকতে খোঁজে না।

আমারও এমন হয়। ইদানীং খুব করে মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা। ছেলেবেলার স্মৃতির গোডাউন আমি। আমার স্মৃতিগুলোও ফাজিল; কেবলই খোঁচায়। অবসরে একের পর এক মান্সপটে ভেসে উঠে শতস্মৃতি। একবার প্রাইমারীতে পড়াকালীন স্কুল পরিদর্শনে আসবেন এসডিও সাহেব। সে কী আয়োজন! স্যারদের মাঝে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। মহকুমা প্রশাসক বলতে কথা! যেমন তেমন অতিথি নন; মান্যবর অতিথি! যেমন করেই হোক মহামান্যতার সাথে ফুলেল ডালায় এবং বরণমালায় বরণ করে নিতে হবে তাঁকে।

বরণের ধরণে হৈ হৈ পড়ে গেল। চারদিকে উৎসব উৎসব ভাব। শিক্ষার্থীদের আনন্দের যেন শেষ নেই। অতিথিকে নিয়েই তাদের আলোচনা। যিনি আসবেন তিনি মানুষটা দেখতে কেমন, কেমন তাঁর ভাবসাব এসব নিয়েই সারাক্ষণ আলোচনা। ক্লাশ আর নিয়মিত হয় না। অনেকটাই অনিয়মিত হয়ে গেল। অনুষ্ঠান প্রস্তুতিতে ক্লাশ নেবার সুযোগও নেই। কে কী পারে, তা নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ হচ্ছে। আমরা ছোটরা তেমন বুঝি না; কেবল এটুকুই বুঝলাম যে ফাটাফাটি কিছু একটা হতে যাচ্ছে। রিহার্সাল শুরু হলো; প্রতিদিন ক্লাশ শেষে রিহার্সাল। নাচ, গান আর কৌতুক। বিশেষ গান বাঁধা হলো মান্যবরের জন্যে। লিনাআপা-পারুল আপারা চেষ্টা করছেন আমাদের এক স্যারের কথা আর সুরে গানটি তুলতে। প্রধান অতিথি হিসেবে সবার সামনে বসে প্রক্সি দিচ্ছেন হেডমাস্টার আফতাব স্যার।  ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে দূর থেকে ফুলের মালা হাতে নিয়ে গান গেয়ে গেয়ে হেঁটে হেঁটে তাঁর গলায় পড়াতে হবে। গানটাও ভারী সুন্দর বেঁধেছে, ধরেন সাহেব পড়েন ভক্তি উপহার! ভক্তি বিনে আমাদের নাহি কিছু আর!!

কী অসাধারণ সৃষ্টি! সাধারণ কথায় অসাধারণ ভক্তি! তখনকার সময়ে সবকিছুতেই ভক্তি ছিল। যিনি আসতেন, কিংবা যাদের কাছে আসতেন সবারই সবার প্রতি ভক্তি ছিল, শ্রদ্ধা ছিল। ছিল দু’পক্ষেরই এক এবং অভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্যে একটি অনন্য সুন্দর দিন উপহার দেয়া। প্রধান অতিথি মানেই বিশেষ কেউ। তিনি শিক্ষিত জ্ঞানী কোন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কিংবা উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা। তিনি আসবেন, সারাদিন শিক্ষার্থীদের সাথে কাটাবেন। মন উজাড় করে জ্ঞানগর্ভ কথা বলবেন। শিক্ষার্থীগণ মন্ত্রমুগ্ধের মত কৃতার্থ হবে সেসব শুনে। আর মনে রাখবে জীবনভর।

এসবই স্মৃতির কথা। আজকাল সব কেমন যেন মেকি হয়ে যাচ্ছে। সব প্রতিষ্ঠানে না হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানেই বিষয়টি লক্ষ্যণীয়। আগের মত অভিন্ন নেই; লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে গেছে। সবকিছু যেন লেনদেনে মাখামাখি হয়ে জগাখিচুরি হয়ে গেছে। আগে যিনি আসতেন, তিনি বিখ্যাত ছিলেন বলেই আসতেন। এখনও কোথায়ও কোথায়ও বিখ্যাতরা আসেন বটে। তবে বেশী আসেন অখ্যাতরা। আগে বিখ্যাত হয়ে অনুষ্ঠানে আসতেন। এখন বিখ্যাত হবার জন্যে আসেন। ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদেরকে পুঁজি করে তারা মঞ্চ আলোকিত করার চেষ্টা করেন। মঞ্চ আলোকিত হোক না হোক, তারা আলোকিত হন; বিখ্যাত হোন। তারা ঘোষণায় থাকতে চান। মঞ্চে এবং ব্যানারেও থাকতে চান। সর্বোপরি বিখ্যাত হবার জন্যে তারা প্রচার চান।

ইদানীং বিখ্যাত হবার জন্যে জ্ঞানী হতে হয় না, ভাল কাজ করতে হয় না। টাকা কামাতে পারলেই হয়। টাকা থাকলেই মঞ্চে থাকা যায়। যারা কোনভাবেই মঞ্চে কিংবা ব্যানারে জায়গা পান না, তারা দাওয়াতের কার্ডে হলেও থাকতে চান। কোন না কোনভাবে লাইম লাইটে থাকতেই হবে। তাদেরকে নিয়ে আয়োজকদের আরেক ঝামেলা। কার্ডে তাদের নাম দিতেই হবে। তাই বর্তমান জমানায় কার্ডের সাইজ দিনদিন বড় হচ্ছে। শতশত বিশেষ অথবা সম্মানিত অতিথির নামে কার্ড হিবিজিবি হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে, বলা যায় না, অদূর ভবিষ্যতে সম্ভাব্য দর্শকগণও কার্ডে নাম চাইতে পারে। না হলে তারাও না আসার জন্যে হুমকি দেবে।

আজকাল আয়োজকগণ আসলেই হুমকিতে থাকে। আয়োজকদের উদ্দেশ্য সৎ হলে এমনটা হতো না। সৎ নয় বলেই তাদেরকে এসব হুমকি কিংবা চাপ চুপেচাপেই মোকাবেলা করতে হয়। তারা তো চাপে থাকবেই। কেননা তাদের খাসিলতটাই তো চাপাচাপির। শক্ত হাত পেলেই চেপে ধরে; চাপে। এর হাত ওর হাত চাপার সময় তাদের মাথায়ই থাকে না যে তারা পবিত্র বিদ্যাপিঠের লোক। মঞ্চ আলোকিত করার জন্যে তারা জ্ঞানী কিংবা বিখ্যাতদের খোঁজেন না। খোঁজেন হাত খুলে দান করতে পারবে এমন পাত্তিওয়ালাদের। শিক্ষার্থীদের পুঁজি করে অনুষ্ঠান সাজিয়ে অনুদান নেয়াটাই উদ্দেশ্য। নিষ্পাপ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানগর্ভ শিক্ষা দেয়াটা উদ্দেশ্য নয়। 

দানের নামে পাত্তি খসানোর কৌশলটাও হাস্যকর। শিক্ষার্থীদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে বরণ করে মঞ্চে নিয়ে পড়িয়ে দেয়া হয় ফুলের মালা। সামাজিকভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মত জায়গায় সেই মানুষটি এ মালা পাবার আদৌ যোগ্য  কিনা তা একটিবারও ভাবা হয় না। তথাকথিত মান্যবরকে সম্মাননা দেবার জন্যে শিক্ষার্থীকে দিয়ে পাঠ করানো হয় মানপত্র। এটা ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশদের চালু করা রেওয়াজ। অতিথি মহোদয় বাস্তব জীবনে যা নয়, ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তাকে তাই বানানোর চেষ্টা করা হয় মানপত্রে। সমাজের সবচেয়ে সেরা মানুষ হিসেবে তাকে তুলে ধরা হয়। টাকার বিনিময়ে তথাকথিত সামাজিক স্বীকৃতি দেবার নামে অতি কিপটা মানুষকেও দাতা হাতেম তাই কিংবা হাজী মোহাম্মদ মহসিন আখ্যায়িত করা হয়।

এতে পয়সাপাত্তি হয়ত কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু মানপত্রের মান আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মানহীন এই মানপত্র পামপত্রে পরিণত হয়। এইসব পামপত্রের আশায় কিংবা সেইসব ফুলেল বরণের নেশায় মান্যবরেরা শত ব্যস্ততার মাঝেও আসেন। সময় মত না পারলে বেসময়ে হলেও আসেন। প্রথম দিন না পারলে দ্বিতীয় দিন আসেন। সকালে না পারেন, বিকেলে আসেন। আসতে আসতে সন্ধ্যে হয়ে যায়! তবুও আসেন। হাজিরা দিতে আসেন। গোধূলীলগ্নে তাদের উপস্থিতিতে দিনভর মনমরা হয়ে থাকা শিশুরা প্রাণ ফিরে পায়। প্রাণ ফিরে পান আয়োজকগণও।

কিন্তু স্বস্তি পান না। স্বস্তি হলো মনের ব্যাপার। ভাষনের শুরু থেকেই মন হিসপিস করতে থাকে। কাঙ্খিত ঘোষণার অপেক্ষায় হিসপিস করতে থাকে। অনুদানের ঘোষণার জন্যে দর্শকগনও অপেক্ষায় থাকেন। ঘোষণা কখনো আসে, কখনো আসে না। কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হবার ঘোষণা ঠিকই আসে; এক সময় অনুষ্ঠান শেষ হয়। শুধু আয়োজকদের কষ্ট শেষ হয় না। দিনশেষে তাদের হিসেব মিলে না। যা কিছু পাবার আশায় এত আয়োজন, ঘোষণার সাথে তার কোন মিল খুঁজে পান না।

কেবল খুঁজে পান আশপাশের মানুষদের প্রত্যাশিত কিন্তু অবাঞ্চিত কিছু প্রশ্ন। নানাজন নানাভাবে মোটামুটি একই প্রশ্ন করে কান ঝালাপালা করে। “কী খবর? বলেন দেহি হুনি! প্রধান অতিথি আইছিলেন নাকি? কী দিয়া গেলেন, কত দিয়া গেলেন?” এই জাতীয় প্রশ্ন শুনতে শুনতে ত্যক্ত হন, বিরক্ত হন। এক সময় তাদের বাড়ী ফেরার সময়ও হয়!! কিন্তু তাদের শিক্ষা হয় না; লজ্জাও হয় না! এবং আমি নিশ্চিত, কোনদিন হবেও না!!

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com