হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (২৯ তম পর্ব)

প্রকাশের সময় : 2018-04-27 21:46:44 | প্রকাশক : Admin
�হারানো শৈশব; কুড়ানো সেই সব!! (২৯ তম পর্ব)

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ তখনকার সময়ে ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার একটা ভিন্ন রকমের আমেজ ছিল। শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। যারা পড়াশুনায় ভাল তাদের মাঝ থেকে কয়েকজনকে নিয়ে “বৃত্তি পরীক্ষার্থী দল” নামে একটা বিশেষ গ্রুপ করা হতো। পরীক্ষার প্রায় ছয়মাস আগে থেকেই এই গ্রুপটিকে স্পেশাল নার্সিং দেয়া হতো। স্কুল শুরুর আগে কিংবা পরে হতো নিয়মিত কোচিং। কেয়ারের কোন কমতি ছিল না। সব শিক্ষকগণ মিলেই কেয়ার নিতেন।

আমাদের সার্বিক কেয়ারের দায়িত্ব বর্তালো কোব্বাত স্যারের উপর। অসম্ভব ভাল পড়াতেন তিনি। স্যারের নেতৃত্বে সার্বক্ষনিক কেয়ার নেয়া শুরু হলো। বাসায় কেয়ার নিতেন আম্মা। তিনি নিতেন খাবার দাবারের কেয়ার। এমনিতেই তাঁর কেয়ারের সীমা পরিসীমা ছিল না। এর উপর এসেছে বৃত্তি পরীক্ষা। এবার পোয়া বারো হলো। মন খেতে না চাইলেও জোর করে খাওয়ানো হতো। দুধের সর তুলে এনে আম্মা পাশে বসে খাওয়াতেন। মুখে তুলে খাওয়াতেন।

মা তো মা-ই। তাঁর কথা মনে হলে অন্য কিছু মাথায় আসে না। কেবল তাঁর কথাই আসে। হারানো শৈশবকে কুড়াতে গেলে সবার আগে আসে বাবা-মায়ের কথা; বাবা-মায়ের স্মৃতি। তাঁদের কথা লিখে শেষ করা যায় না। মাঝেমধ্যে লিখিও। পৃথিবীতে মায়ের চেয়ে নিঃস্বার্থবান আর কে হতে পারে! নিজের জীবনের বিনিময়েও সন্তানের মঙ্গল চান। কেবল আমার মা নন; সবার মা-ই চান। আবার কেবল মানুষের মা নন, অন্য প্রাণীর মায়েরাও একই রকম। মাকড়শার মায়ের মতন।

ডিম দেবার পরে মহা দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায় মা মাকড়শা। ডিমগুলো যাতে অন্য কোন প্রাণী খেয়ে ফেলতে না পারে সেই ভয়ে সে অস্থির থাকে। কোথায় রাখবে, কিভাবে রাখবে এ নিয়ে চিন্তার যেন শেষ নেই। এত বড় পৃথিবীর কোথায়ও সামান্য নিরাপদ জায়গা না পেয়ে শেষমেষ নিজের বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে রাখে ডিমগুলোকে। এভাবে চলাফেরায় তার সমস্যা হয়। কিন্তু আগত সন্তানদের ভাবনায় সব সয়ে যায়, সব মেনে নেয়। এক পর্যায়ে সময় আসে; ডিমগুলো ফুটে বাচ্চা বের হবার সময়। মা মাকড়শার কষ্টের বুঝি শেষ হয়! খুশীর আর সীমা থাকে না মা মাকড়শার!

বাচ্চা হবার পর শুরু হয় নতুন সমস্যা। এতগুলো বাচ্চা খাবার পাবে কোথায়? ক্লান্ত দেহের শ্রান্ত মা খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে না। শেষমেষ হাতের কাছে মায়ের দেহ থাকে বিধায় বাচ্চাগুলো মায়ের দেহের রক্তমাংশ খাওয়াই শুরু করে। এভাবে ওদের জীবনের যাত্রা শুরু হয়। ওরা বড় হতে থাকে। দুঃখিনী মা নীরবে কঠিন কষ্ট হজম করে; কিন্তু বাঁধা দেয় না। অবশেষে এক পর্যায়ে বুকধারিনী মায়ের দেহকে শুকনো খোসায় পরিণত করে নির্মম পাষন্ডের মত বাচ্চাগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে নিজেদের জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। মৃত মায়ের দিকে ফিরে তাকাবার সময় ওদের হয় না!

এই হলো মা; সামান্য মাকড়শার অসামান্য মা! নিজের জীবন নিঃশেষ করে সন্তানের জীবন শুরু করে দিয়ে যায়। আমাদের মত মানব সন্তানদের এত নিষ্ঠুরভাবে জীবন শুরু করতে হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন কাজের ভীড়ে দু’এক বেলা মাকে ভুলে যাই কিংবা আমার শোনিমকে পেলে আর কিচ্ছু মনে থাকে না, তখন মাকড়শার বাচ্চার চেয়েও অধম মনে হয় নিজেকে। নিজেকেই নিজে ছিঃ ছিঃ করি। মাকড়শার বাচ্চার মত এতটা নির্মম ভাবতে ভীষন লজ্জা লাগে। আমি দিব্যি বেঁচে আছি আজ সাত বছর হলো। এককালে যে আমি মাকে ছাড়া মাত্র সাত মিনিট একা থাকতে পারতাম না, সেই আমি সাতটি বছর একা একা পার করে দিলাম! ওই পাড়ে বসে মা কি এসব দেখছেন!

অথচ এই আমার জন্যে মা মিথ্যে কথাও বলতেন। শুধু আমার মা নন, সবার মা-ই মিথ্যে বলেন। সত্যি বলছি, মা ও মিথ্যে বলেন। কেবল ঘরে যখন ৩ জনের খাবার থাকে আর মানুষ হয় ৪ জন, তখন মা বলে, তোরা খা। আমি একটু আগেই খেয়েছি। আমাদের ছোটবেলায় সবার খাওয়া শেষে মুরগীর ছোটখাট একখানা হাড় চিবানো ছাড়া মায়ের ভাগে আর কিছু পড়েছে বলে মনে পড়ে না! নিজের ভাগে ঠিকমত খাবার না পড়লেও সংসারের সবার কষ্টের ভাগ মাকেই নিতে হতো। মা কষ্টের ভাগ নিতেন, ব্যথার ভাগ নিতেন। জন্মের শুরু থেকেই নিতেন। অসহ্য যন্ত্রনার ব্যথা সহ্য করে মা আমাকে জন্ম দেন। মাঝে মাঝে খেয়ালবশে মায়ের ব্যথা পরিমাপ করার ব্যর্থ চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না। ব্যথা মাপার ইউনিট কী, আমি সেটা জানিও না। কিন্তু এটা জানি, একজন সাধারণ মানুষ ৪৫ ডেলস ইউনিট ব্যথা সহ্য করতে পারে। তবে একজন মা পারে ৫৭ প্লাস। একসাথে শরীরের ২০টি হাঁড় ভেঙে যাওয়ার ব্যথার থেকেও কষ্ট। সন্তান জন্মের সময় মাকে এই ব্যথা সহ্য করতে হয়। সব মায়েরাই এই ব্যথা সহ্য করেন। কিন্তু অধিকাংশ সন্তানই মায়ের সামান্য ব্যথাও সহ্য করতে পারে না। অচিরেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মা একাই তার ৫ জন সন্তানকে সেবা করতে পারেন, লালন পালন করতে পারেন। আর আমরা ৫ জন সন্তান মিলেও মায়ের সেবা করতে পারি না!

আমরা পারি কেবল বাঁধাবাধি করতে, লাগালাগি করতে। নিজেদের মধ্যেও করি। বাইরের লোকদের সাথেও করি। বিশেষ করে ছোটবেলায় বেশী করতাম। ছোট বেলায় তো কত কিছুই করতাম। বয়সটাই তো ঐ রকমের। তবে অনেকের তুলনায় আমি কম করলেও একেবারে যে করতাম না তাও নয়। করতাম; তবে বুঝেশুনে। গায়েগতরে খুব শক্তিশালী ছিলাম না বলে ভয় পেতাম। যতনা মাইর দিতাম, খেতাম তার চেয়ে বেশী। বলা যায়, মাইরের ভয়তেই  আগ বাড়িয়ে মারামারি করতাম না।

তবে থাবাথাবি করতাম। ভাল কোন খাবার পেলে ভাগে একটু বেশী নেবার জন্যে থাবাথাবি করতাম। ভাল খাবার মানে ডালপুরি। আমার ভীষন প্রিয় খাবার। ধলা বাজারে খুব সকালে ভাজা হাতো। কোব্বাত স্যারের কোচিং এ যাবার সময় দেখতাম। অতি ভোর বলে মাঝেমধ্যে না খেয়েও কোচিং এ আসতাম। আমাদের সাথে কোচিং করতো শফিকুল, আজিজুল আর মোশাররফ। মোড়ল বাড়ীর বন্ধু ওরা। খুবই অবস্থা সম্পন্ন। বাড়ী থেকে নিত্যরোজ টাকা নিয়ে আসতো এটা সেটা কিনে খাবার জন্যে। আমরা সেটা পারতাম না। আমরা বলতে, আমি আর আমার পিঠাপিঠি বড় ভাই মুনীর। আমাদেরকে আব্বা সেভাবে টাকা দিতেন না। ওদেরকে ওদের অভিভাবকগন দিতেন। ওরা স্কুলে এসে এক টাকায় নসো মুন্সীর দোকান থেকে তিনপিস গরম পুরি কিনে খেত।

চো চো করা খালি পেটে আমি সেসব দেখতাম আর জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজাতাম। এখনো পুরি দেখলে খেতে ইচ্ছে করে। পুরি আমার কেন এত প্রিয় তা আমি আজো জানি না। কেবল এটুকু জানি যে, এখনো বেজায় প্রিয়। অসম্ভব স্বাদের সেই ডালপুরি আমি ত্রিশালে গিয়েও খেয়েছি। ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল ত্রিশালের নজরুল একাডেমীতে। পাশে বয়ে চলা ছোট্ট নদী। কাঠের সাকোঁ দিয়ে মানুষ পারাপার হয়। নদীর অপর পারে এক বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের মেঝেতে ঢালাও বিছানা করে আমাদের রাতের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। সকালে নদীর জলে গোসল সেরে পরীক্ষা দিতে গেলাম।

সামনের বেঞ্চে সিট পড়েছে; রোল আমার ২৮। শেষ ঘন্টা বাজার বেশ কিছুটা সময় আগেই আমি লেখা শেষ করে রিভাইস দিয়ে বসে আছি। হঠাৎ ম্যাজিষ্ট্রেট রুমে এলেন। আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তিনি অবাক। “কি ব্যাপার। পরীক্ষা ভাল হয়নি!” বলে খাতা খুলে দেখলেন। পুরোটাই দেখলেন। অবশেষে অবাক হয়ে বললেন, বাহ্! ভালই তো লিখেছো। এত তাড়াতাড়ি লিখলে কিভাবে? আমাকে চুপ থাকতে দেখে একথা সেকথার পর একটা প্রশ্ন করলেন। “বলোতো, পাঁচ আর পঞ্চমের পাথর্ক্য কি?” উত্তর শুনে ম্যাজিষ্ট্রেট খুশীতে আমায় জড়িয়ে ধরলেন। বুকের মধ্যে রেখেই বললেন, বলো, কী খাবে? কী খেতে চাও? আমি তার বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে নিতে বললাম, পুরি! ডালপুরি!! আমি ডালপুরি খাবো!!! চলবে...

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com