বদলে যাওয়া পদ্মা সেতুর শহর

প্রকাশের সময় : 2019-01-31 13:22:39 | প্রকাশক : Admin
বদলে যাওয়া  পদ্মা সেতুর শহর

অজয় দাশগুপ্তঃ পটুয়াখালীর এক জেলা প্রশাসক বদলি হওয়ার সময় বলে গেছেন, চার-পাঁচ বছরের মধ্যে বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলের জমি কিনতে হলে স্বর্ণের দাম দিতে হবে। কেন? উত্তর সহজ- একদিকে পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে, অন্যদিকে পটুয়াখালী অঞ্চলে সীমিত পর্যায়ে চালু হয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দর। এ বন্দর সম্প্রসারণের জন্য ইতিমধ্যে অনেক কাজ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে দুটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে- চট্টগ্রাম ও বাগেরহাটের মোংলায়। পায়রা বন্দর পুরোদমে চালু হলে বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় পণ্য আনা-নেওয়া সহজ হবে। ভৌগোলিকভাবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর যতটা দূরে, তার তুলনায় পায়রা থেকে ঢাকার দূরত্ব অনেকটা কম হওয়ারই কথা। আর পটুয়াখালী-বরিশাল অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্প-বাণিজ্যের প্রয়োজনীয় পণ্য যদি চট্টগ্রামের পরিবর্তে পায়রা থেকে আনা-নেওয়া করা যায়, তাহলে খরচ কমবে অনেক। এটা যে সম্ভব, সেটাই তো এতদিন ততটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হয়নি। আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের বাইরে যেতে চাইনি।

কেউ রাজধানী ঢাকার জুরাইন এলাকা থেকে সড়কপথে মাওয়া হয়ে পদ্মা পাড়ি দিয়ে ফের সড়কপথে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ঘুরে আসুন। দেখবেন যে কী অভাবনীয় কর্মযজ্ঞ চলছে সড়ক ও সেতু নির্মাণের জন্য! হাজার হাজার নারী-পুরুষ কাজ করছেন দিন-রাত। সড়ক প্রশস্ত হচ্ছে। একসময় যে কেওড়াকান্দি-ভাঙ্গা সড়ককে মনে হতো খুবই চওড়া ও মসৃণ। প্রাইভেটকার চালকরা ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার তুলে দিতেন অনায়াসে। এখন সেই সড়ক যেন ছোট লেন! নতুন সড়ক নির্মিত হচ্ছে।

ফরিদপুরের ভাঙ্গার মোড় কয়েকটি জেলায় যাতায়াতের জন্য পরিচিত- বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলা। এর বাইরেও গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ফরিদপুর এবং খুলনা বিভাগের জেলায় যাতায়াতের জন্য ভাঙ্গা মোড় ব্যবহার করতে হয়। এই ভাঙ্গার মোড় এখন চেনাই কঠিন। এখানের নির্মাণ কাজ শেষ হলে কেবল যোগাযোগই সহজ হবে না, একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাও আমরা ওই মোড়ে দেখতে পাব।

আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপির হার ১০ শতাংশে পৌঁছাবে। যাদের এ নিয়ে সংশয় আছে, যারা শুধু রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডিতে আটকা থাকতে চাইছেন, তারা যদি এই নির্মাণযজ্ঞ কিছু সময়ের জন্য দেখে আসেন, বুঝতে পারবেন দেশে আরও অনেক ইস্যু নিয়ে কথা বলার আছে। রাজনীতির স্বার্থ অবশ্যই থাকবে। নিজের দলকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার জন্য ভাবনাতেও কোনো সমস্যা নেই। এ জন্য প্যাঁচ-কূটকৌশলও দূষণীয় নয়।

কিছু বিষয় আছে, যা সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে আমাদের নিয়ে যেতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য শুধু নয়, গোটা বাংলাদেশের জন্যই পদ্মা সেতু তেমনই একটি বিষয়। এ সেতু এবং আনুষঙ্গিক স্থাপনার ব্যয় বেশি পড়ছে কি-না, কেউ সুকৌশলে প্রকল্প বাড়িয়ে নিয়ে নিজের কিংবা গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল করতে চায় কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কারও কাছে এটাও মনে হতে পারে, ঢাকার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জেলা গোপালগঞ্জের যোগাযোগ সহজ করার জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এত উদ্যোগ-আয়োজন। কিন্তু যার যা ভাবনায় আছে, থাকতে দিন। শুধু একটি বিষয়ে একমতে আসুন- বদলে যাওয়া দৃশ্যপট।

বরিশালের কয়েকজন শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলি পদ্মা সেতুর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে। তারা প্রত্যেকেই বলেন নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কথা। পটুয়াখালীর যে জেলা প্রশাসক জমি সোনার দামে বিক্রি হওয়ার কথা বলেছেন, তার কারণ বুঝতে সমস্যা হয় না। সড়ক ও সেতু, হাসপাতাল, বাসভবন, কারখানা- সবকিছুর জন্য চাই জমি। কিন্তু কোথায় মিলবে জমি?

বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চল ধানের জন্য বিখ্যাত। পলিমাটির কারণে জমিতে সোনা ফলে। কিন্তু অবকাঠামো ও শিল্প-ব্যবসার প্রতিষ্ঠানের জন্য যদি জমি চলে যেতে থাকে, তাহলে ফসল মিলবে কীভাবে? আমাদের সমাজের মাথা যারা, প্রশাসন কিংবা অর্থনৈতিক উদ্যোগ অথবা বিভিন্ন পেশায় যারা নিয়োজিত রয়েছেন, তাদের সবার জন্যই কিন্তু এটা ভাবনার বিষয়।

একাধিক উদ্যোক্তা বলেছেন, তারা এতদিন ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম অঞ্চলে জমি খুঁজেছেন; কিন্তু এখন তো বরিশাল-ফরিদপুর অঞ্চলে শিল্প-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান করার মতো পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। পদ্মা সেতু তৈরি হলে সড়কপথে ঘণ্টাতিনেকের মধ্যেই বরিশাল পৌঁছা যাবে। ট্রেনে বরিশাল, পটুয়াখালী কিংবা যশোর-খুলনায় যাওয়া যাবে কম সময়ে। বেনাপোল বন্দর থেকে সড়কপথে ভারত থেকে আসা পণ্য বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। পদ্মায় সড়ক ও রেলসেতু চালু হলে সময় বাঁচবে, খরচও কম পড়বে।

বরিশাল-ফরিদপুর অঞ্চলের অনেকে মনে করছেন, পদ্মা সেতু দিয়ে রাজধানীর ঢাকার সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত কমিউটার ট্রেন চালু হলে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ নিজের বাড়িতে থেকেই ঢাকায় অফিস করতে পারবে। এর ফলে ঢাকায় মানুষের চাপ কমবে। গাড়ির চাপ কমবে। সুষম উন্নয়নের কথা আমরা বলি। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু চালু হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে। পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দৃশ্যপট পাল্টে দেবে।

বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় আধুনিক শিল্প-কারখানা বলতে গেলে প্রায় নেই-ই। চাকরী ও ব্যবসার জন্য ছুটতে হয় ঢাকায়। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখন তৈরি হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জও অনেক। পদ্মা সেতু চালু হলে সহজে সড়ক ও সেতুপথ দিয়ে যাতায়াত করা যাবে। বরিশালকে ইতিমধ্যে পদ্মা সেতুর শহর হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com