বিদেশে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল মুখ

প্রকাশের সময় : 2019-02-14 16:03:19 | প্রকাশক : Admin
বিদেশে বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল মুখ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় চাকরিস্থল হওয়াটাই আমার জন্য বিশাল সৌভাগ্যের বিষয়। শুরুতে যখন আমাদের শিক্ষক স্বল্পতা ছিল, পাঠ্যপুস্তকের অভাব ছিল, অভাব ছিল ল্যাবরেটরি এবং জায়গার, ওই দিনগুলোয় এইচএসসি পাস করা মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধার কথা জেনেই আমাদের বিভাগে ভর্তি হয়েছে।

কেবল শেখার অদম্য আগ্রহ পুঁজি করে নতুন প্রযুক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছে। যদিও শুরুতে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের চাকরির জন্য তাদের পরিবর্তে অন্য যে কোনো বিষয়ের স্নাতকদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছিল, তারপরও আমাদের স্নাতকরা হতাশ হয়নি এবং নিজেদের যোগ্যতা উন্নত দেশগুলোয় প্রমাণ করেছে। সবাই নানা পাবলিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় স্থান পেয়ে প্রমাণ করেছে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারাবাহিকতা। এখন অবশ্য আমাদের ছেলেমেয়েদের আর এরকম শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার সুযোগ নেই, কারণ মেধা তালিকাই এখন আর করা হয় না পাছে অসংখ্য ছেলেমেয়ে অসন্তুষ্ট হয়, যদিও অন্যসব প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডেই প্রণোদনা, পুরস্কার এবং প্রচারের ব্যবস্থা রয়েছে।

মনে পড়ে, দ্বিতীয় বর্ষের দু’জন ছাত্র অণু ও ইকবাল একদিন ঠিক করল আমার জোগাড় করা যত গবেষণা পেপার আছে, তা তারা সাজিয়ে রাখবে যাতে পেতে সুবিধা হয়। প্রায় প্রতি টার্মে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা এই কাজটি করত। অবশ্য বলাই বাহুল্য, এই প্রাক-স্নাতক ছাত্ররা ওই গবেষণা পেপারগুলো পড়ত, যদিও পরীক্ষায় সে পড়ার অবদান থাকার সম্ভাবনা ছিল না। দ্বিতীয় ব্যাচের অতি মেধাবী এবং নানা গুণে গুণান্বিত মঞ্জুর মোর্শেদের উপস্থিতিতে মেধার চর্চায় নব্যপ্রতিষ্ঠিত বিভাগটি শুরু থেকেই নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

মঞ্জুর মোর্শেদ বিদেশে অবস্থান করেও তার দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে উদাহরণ তৈরি করেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্ত গ্রেড অষ্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতুল্য গ্রেড হিসেবে গণ্য করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে, ফলে শুধু আমাদের বিভাগের ছাত্ররাই নয়, দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও সহজে মোনাশে ভর্তি হয়েছে। শ্রেয়তর মূল্যবোধ, অনুকরণীয় ব্যবহার ও মানবিকতা দিয়ে বাংলাদেশকে উঁচু আসনে বসিয়েছে। ফলে আমাদের জাতীয় দিবসগুলোও অস্ট্রেলীয়দের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হচ্ছে। মঞ্জুর মোর্শেদের সুবাদে মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গিপ্সল্যান্ড ক্যাম্পাসে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। দোতলায় বসানো অনার বোর্ডে সব ছবিই বাংলাদেশিদের দেখে অভিভূত হয়েছিলাম।

সেই একই রকম অভিজ্ঞতা হল এবার মার্কিন মুল্লুকে। উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের মিলওয়াকি শহরে, যেখানে মার্কেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত। মার্কেটের পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক ইকবাল আহমেদ আমাদের বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র। কাডেহি হলের তিন তলায় ইউবিকম্প ল্যাব, যার পরিচালক তিনি। বেশির ভাগ ছাত্র বাংলাদেশের এবং তারা ভালোও করছে। আমেরিকায় অধ্যাপকদের ফান্ডিংয়ের জন্য লড়তে হয়। গোটা দশেক প্রকল্প জমা দিলে একটিতে সাফল্য আসতে পারে। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অধ্যাপক আহমেদ ফান্ড পান, যা অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও প্রযোজ্য। আর সেই ফান্ডের সুবাদে আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মার্কেটে পড়ে।

শুধু তাই নয়, তার গবেষণার বিষয়বস্তুও বাংলাদেশের জন্য উপযোগী। যেমন- মোবাইল ফোন ব্যবহার করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া যায়। উপাত্ত সংগ্রহের জন্য ছাত্রদের অনেক সময়ই দেশে পাঠান- তাতে রথও দেখা হল, কলাও বেচা গেল। তার ল্যাবের বাইরে দেয়ালে দেখলাম টিএ আর এদের অনার বোর্ড। বেশির ভাগ বাংলাদেশির ছবি ও নাম দেখে বুক গর্বে ভরে উঠল। ইকবাল আমেরিকায় গিয়েছে প্রায় সিকি শতাব্দী হয়ে গেল।

তার সুবাদে মার্কিন মুল্লুকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের একটি দ্বীপ হয়েছে। শিক্ষকদের গবেষণালব্ধ কাজ দিয়ে পোস্টার করা হয়েছে, যাতে অতিথি ও ছাত্ররা চলমান গবেষণা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। সেগুলোতেও বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের আধিক্য দেখে মন ভালো হয়ে গেল। বেশির ভাগ সময়েই স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয় যাতে করে তাদের পড়ালেখার জন্য বিভিন্ন স্থানে থাকার বিড়ম্বনা পোহাতে না হয়।

কম্পস্যাক নামের নামকরা কনফারেন্সের তিনি কনফারেন্স চেয়ার। ২০০৭ সালে ওয়ে-ক্লিঙ্গার নবীন গবেষক পুরস্কার পেয়েছেন। শ’দেড়েক প্রকাশনা এবং দশের বেশি শ্রেষ্ঠ পেপারের পুরস্কারও পেয়েছেন। বর্তমানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অবদান রাখার জন্য সাতটি প্রকল্পের তিনি প্রকল্প পরিচালক। এ বিষয়ের ওপর নয়টি পিএইচডি থিসিস এবং ৩০টি মাস্টার্স থিসিস তত্ত্বাবধান করেছেন। মার্কেটের গণিত, পরিসংখ্যান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগটি দু’ভাগ করা হয়েছে এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগটির প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

দীর্ঘদিন বিদেশে থেকেও দেশের প্রতি তার মমত্ববোধ এতটুকুও কমেনি। বাংলাদেশের ছাত্রদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা করে দেয়ার বাসনা থেকে দেশের প্রতি তার ভালোবাসার মাত্রাটুকু অনুমান করা যায়। যে দেশের জনঘনত্ব পৃথিবীর গড় জনঘনত্বের ২৪ গুণ বেশি, তার যোগ্য সন্তানরা অধ্যাপক ইকবাল আহমেদের মতো হবে- এটাই আমরা কামনা করি। -ডঃ মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com