বাংলা কেন ব্যবহারিক ভাষা হতে পারছে না?

প্রকাশের সময় : 2019-02-28 14:56:34 | প্রকাশক : Admin

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী: আমরা বাংলা ভাষা নিয়ে গর্ব করি। ভাষা আন্দোলন নিয়ে গর্ব করি। এমন দাবিও করি যে, রবীন্দ্রনাথ তার কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় এবং বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা দেয়ায় আমাদের ভাষা বিশ্ব ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। কথাটা তাত্ত্বিকভাবে সত্য। কিন্তু বাস্তবে আমরা ভাষাকে কার্যকর জাতীয় ভাষা হিসেবেও গড়ে তুলতে পারিনি। উপমহাদেশের নেটিভ খ্রীস্টানদের যেমন বলা হয় এ্যাংলো ইন্ডিয়ান, তেমনি বর্তমান বাংলাদেশে সাধারণ সমাজ জীবনে যে বাংলা প্রচলিত তাকে বলা চলে এ্যাংলো-বাংলা লেঙ্গোয়েজ বা বাংরেজি ভাষা।

এই এ্যাংলো-বাংলা লেঙ্গোয়েজের উপর আবার হিন্দী ভাষার আধিপত্য বাড়ছে। এই আধিপত্যটা সমাজ ও সংস্কৃতিতে আরও বেশি প্রকট। ঢাকায় কোন সামাজিক অনুষ্ঠান বা বিবাহ-উৎসবে গেলে মনে হয় না বাংলাদেশে আছি। উৎকট হিন্দী গান ও নাচের অনুকরণ এবং বর-কনের পোশাক দেখলে বোঝা যায় আমাদের সামাজিক জীবনে অবক্ষয় কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে। রাজধানীতে আমরা অনেকে ভারতীয় আধিপত্যের ভয়ে ভীত। কিন্তু সেই আধিপত্য যে অপসংস্কৃতির বেশ ধরে আমাদের সামাজিক জীবনে শর্ষের মধ্যে ভূত হয়ে বসে আছে সেদিকে আমাদের খেয়াল নেই।

এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে সব দেশের ভাষা সংস্কৃতির মধ্যেই একটা বড় রকমের আদান-প্রদান চলছে। তা ঠেকানো যাবে না এবং তা ঠেকানো উচিতও নয়। নয়া প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হতে হলে ইংরেজী বা ফরাসী ভাষার সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে উপায় নেই। রেডিও, টেলিভিশনের ইংরেজী নামের মতো বর্তমান যুগের নবপ্রযুক্তির উদ্ভাবনাগুলোর বিদেশী নামও বাংলা ভাষায় ঢুকে গেছে। তা বাংলা ভাষাকে উন্নত করছে।

এটাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু ভয় পাই বিদেশী উন্নত সংস্কৃতি নয়, অপসংস্কৃতির আধিপত্যকে এবং ভাষায় তার অশুভ অনুপ্রবেশ দেখে। আমি ভাষা বিশারদ নই; আমার ভাষাও ভুলত্র“টি মুক্ত নয়। যথাসম্ভব ভাষা-বিকৃতি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। কিন্তু দেশের পত্রপত্রিকায় এবং নতুন কবি সাহিত্যিকদের অনেকের লেখায় এই ভাষা বিকৃতি দেখে দুঃখ পাই। এই ভাষা বিকৃতির উদাহরণ দিলাম না এ জন্য যে, যাদের লেখা থেকে উদাহরণ দেব তারা অসন্তুষ্ট হবেন।

বাংলা ভাষা এখন আমাদের রাষ্ট্রভাষা এবং জাতীয় ভাষা। কিন্তু না আমাদের রাষ্ট্রে, না জাতীয় জীবনে তা কার্যকর হয়েছে। দেশের শিক্ষিত অংশ বিশেষ করে অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা এবং উর্ধতন সরকারী অফিসারেরা এ্যাংলো-বাংলা বা বাংরেজি ভাষায় কথা বলেন, কাগজপত্রে বা ফাইলে তা লেখেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের একটি কাহিনী। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এক স্যুট বুটধারী শিক্ষিত বাঙালী দেখা করতে এসেছেন। তিনি অনবরত ইংরেজী মিশ্রিত বাংলায় কথা বললেন। তিনি চলে যেতেই রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘ভদ্র লোক ইংরেজী বাংলা কোনো ভাষাই ভালো করে শেখেননি।’

বাংলাদেশের বর্তমান অফিস-আদালতে গেলে রবীন্দ্রনাথের কথায় সত্যতা বোঝা যায়। অনেক উর্ধতন অফিসারও ইংরেজী ও বাংলা মিশ্রিত ভাষায় কথা বলেন, অফিস অর্ডার লেখেন, কিন্তু কোন ভাষাই ভাল করে হয় তো শেখেননি। আগের দিনের ব্যুরোক্র্যাটরা অন্তত ইংরেজীটা ভালভাবে শিখতেন।

একাত্তরের শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীর শিক্ষক ছিলেন। পরে বাংলা বিভাগে চলে আসেন। ইংরেজী, বাংলা দু’ভাষাতেই তিনি ছিলেন পারদর্শী। আমার বন্ধু ড. সিরাজুর ইসলাম চৌধুরীর বাংলা প্রবন্ধ পড়ে মুগ্ধ হতে হয়। অথচ তিনি ইংরেজীর অধ্যাপক। অর্থাৎ এরা দু’জনেই ইংরেজী ও বাংলা দুটো ভাষায় ভালভাবে শিখেছেন। বর্তমানে এই উদাহরণ কম। এখন ইংরেজ শিক্ষার ওপর গুরুত্ব কমে যাওয়ায় ভাল ইংরেজী জানা মানুষের সংখ্যা কম।

আবার বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে তার প্রচলন কার্যকর না হওয়ায় ভাল বাংলা জানা ও বলাও অনেকে প্রয়োজন মনে করেন না। বাংলাদেশে এখন যা চলছে তাহলো বাংলা ভাষাকে কেবল নামে জাতীয় ভাষা ঘোষণা করেছে। তাকে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে ব্যবহারিক ভাষা করার ব্যবস্থা হচ্ছে না।

ফলে সমাজজীবনে যে বাংরেজি ভাষার আধিপত্য চলছে তার সম্প্রসারণ তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছলে শুধু ভাষার নয়, সমাজ জীবনেরও গুরুতর অধঃপতন ঘটবে। ভাষা আন্দোলনের সব সাফল্য নষ্ট হবে। (সংকলিত)

 

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ সরদার মোঃ শাহীন,
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ রফিকুল ইসলাম সুজন,
বার্তা সম্পাদকঃ ফোয়ারা ইয়াছমিন,
ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ আবু মুসা,
সহঃ সম্পাদকঃ মোঃ শামছুজ্জামান

প্রকাশক কর্তৃক সিমেক ফাউন্ডেশন এর পক্ষে
বিএস প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড,
ওয়ারী, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০ হতে প্রকাশিত।

বানিজ্যিক অফিসঃ ৫৫, শোনিম টাওয়ার,
শাহ মখ্দুম এ্যাভিনিউ, সেক্টর # ১২,
উত্তরা, ঢাকা,
ফোন: ০১৯১২৫২২০১৭, ৮৮০-২-৭৯১২৯২১
Email: simecnews@gmail.com